১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

মানবতাবিরোধী অপরাধ: জিয়াউল আহসানের বিচার শুরুর আদেশ

প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য ও সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ৮ ফেব্রুয়ারি দিন ঠিক করে দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।

মানবতাবিরোধী অপরাধ: জিয়াউল আহসানের বিচার শুরুর আদেশ
জিয়াউল আহসান, ফাইল ছবি

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 14 Jan 2026, 05:11 PM

Updated : 26 Aug 2026, 05:33 PM

শতাধিক গুম-খুনের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

বুধবার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য ও সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ৮ ফেব্রুয়ারি দিন ঠিক করে দিয়েছে।

আদেশের পর প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, “১০৪ জনের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত এই মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এই আসামির বিরুদ্ধে আরও অনেক গুম-খুন এবং তাদের লাশ পেট কেটে নদীতে সাগরে ভাসিয়ে দেওয়ার আরও বেশ কিছু হত্যাকাণ্ডের বিবরণ তদন্তাধীন আছে, সহসাই সেগুলোর অভিযোগপত্র দাখিল হবে বলে আমরা আশা করছি।”

গত ৮ জানুয়ারি অভিযোগ গঠনের শুনানিতে জিয়াউলের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী এবং তার বোন আইনজীবী নাজনীন নাহার।

শুনানিতে প্রসিকিউশনের তিনটি অভিযোগের বিরোধিতা করেন তারা। এসব ঘটনার সঙ্গে জিয়াউল আহসানের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও তারা দাবি করেন।

জিয়াউলকে এ মামলা থেকে অব্যাহতি দিতে ট্রাইব্যুনালের কাছে আর্জি জানান তার আইনজীবীরা।

অন্যদিকে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম এর বিরোধিতা করে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দি দেওয়া দুজনের সাক্ষ্য তুলে ধরেন।

গত ৪ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি শেষ করে প্রসিকিউশন। সেদিন জিয়াউলের বিরুদ্ধে যেসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়েছে, তার বিবরণ দেওয়া হয়।

তথ্যপ্রমাণ বিবেচনায় আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আবেদন করেন চিফ প্রসিকিউটর।

এ মামলায় সুনির্দিষ্ট তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রথমটি হল– ২০১১ সালের ১১ জুলাই রাতে গাজীপুর সদর থানার পুবাইলে সড়কের পাশে জিয়াউলের ‘সরাসরি উপস্থিতিতে’ সজলসহ চারজনকে হত্যা।

দ্বিতীয় অভিযোগে অপরাধের সময়কাল ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত। এ সময়টায় বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের চরদুয়ানী খালঘেঁষা বলেশ্বর নদীর মোহনায় নজরুল, মল্লিকসহ ৫০ জনকে হত্যা করা হয়।

তৃতীয় অভিযোগেও ৫০ হত্যার অভিযোগ এনেছে প্রসিকিউশন। অর্থাৎ দ্বিতীয় অভিযোগে উল্লিখিত সময়ে বরগুনার বলেশ্বর নদী ও বাগেরহাটের শরণখোলায় সুন্দরবনের বিভিন্ন অঞ্চলে তথাকথিত বনদস্যু দমনের আড়ালে মাসুদসহ ৫০ জনকে হত্যা করা হয়।

এসব হত্যাকাণ্ডের দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত ২৩ ডিসেম্বর জিয়াউলকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।

১৭ ডিসেম্বর তার বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়। একই দিন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন।

ওই তিন অভিযোগে হত্যা ও গুমের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন করলে প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বুধবার সংবাদিকদের বলেন, “১০৪ জন, কারণ হচ্ছে গাজীপুরে সজল এবং আরো তিনজন, এখানে মোট চারজন। আর ওইখানে বরগুনাতে দুটো চার্জে ৫০ এর অধিক বা বলা হয়েছে অজ্ঞাতনামা ৫০ এবং ৫০, ওখানে ১০০। সেই হিসাবে এখানে ১০৪ জন হয়।”

১০৪ জনের সবাইকে হত্যা করা হয়েছে কিনা প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন,

“সবাইকে গুমপূর্বক হত্যা, শুধু হত্যা না। তাদেরকে গুম করা হয়েছে। তারপরে একটা নির্দিষ্ট সময়ে গোপন বন্দিশালায় আটক রাখা হয়েছে, টর্চার করা হয়েছে। এরপরে তাদেরকে ঢাকা থেকে বা বিভিন্ন জায়গা থেকে বরিশালে নেওয়া হয়েছে, বরগুনাতে নেওয়া হয়েছে।

“তাদের চোখ-পা-হাত বেঁধে ট্রলারে ওঠানো হয়েছে। তারপরে ট্রলার চালিয়ে সাগর বা নদীর মোহনায় গিয়ে যেখানে গিয়ে ফেললে লাশগুলো ভেসে আবার উজানে আসার কোনো আশঙ্কা নেই, সেইরকম একটা জায়গায় নিয়ে গিয়ে তাদের মাথায় এবং বুকে গুলি করা হয়েছে এবং কমান্ডো নাইফ দিয়ে পেট চিরে নাড়িভুঁড়ি ফেলে দেওয়া হয়েছে। এই অপারেশনটাকে তারা বলত 'গেস্টাপো অপারেশন'।

“অর্থাৎ গুমপূর্বক গুলি করে হত্যার পরে নাড়িভুঁড়ি কেটে ফেলে দিয়ে সাথে ইটের ব্লক এবং সিমেন্ট বেঁধে দিয়ে সাগরে ডুবিয়ে দেওয়া–এই পুরো অপারেশনটার নাম ছিল গেস্টাপো অপারেশন। এরকম শত শত অপারেশন এই আসামি করেছেন, যার মধ্যে ১০৪ জনের ব্যাপারে সো ফার এই মামলাতে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। বাকি অভিযোগগুলো এখনো তদন্তাধীন আছে, খুব সহসাই এই রিপোর্টগুলো দাখিল হবে।”

গত বৃহস্পতিবার আসামিদের অব্যাহতির আবেদনের শুনানির সময় তাজুল ইসলাম বলেছিলেন, সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া এ মামলায় সাক্ষ্য দেবেন।

এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে বুধবার তিনি বলেন, “আপনারা বুঝতে পেরেছেন যে আমরা কোর্টে যখন আর্গুমেন্ট করেছিলাম তখন সাক্ষীদের জবানবন্দি থেকে কিছু অংশ আমরা আদালতে পাঠ করিয়ে শুনিয়েছিলাম ‘প্রাইমা ফেসি কেইস’ শো করার জন্য। সুতরাং সাক্ষীদের নাম আপনারা জেনে গেছেন।

“তারা সাক্ষী দেবেন আদালতে এবং সে সাক্ষীর মাধ্যমে তুলে ধরবেন কীভাবে সামরিক বাহিনীর অফিসারদেরকে র‍্যাবে পাঠানোর কারণে তাদের চরিত্র ধ্বংস হয়েছে, কীভাবে এই অফিসারগুলো সেখানে গিয়ে একটা নিষ্ঠুর খুনিতে পরিণত হয়েছে, সেই কথাগুলো একজন সেনাপ্রধান হিসেবে তিনি অবলোকন করেছেন, সেগুলোর ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করেছেন এবং তিনি এটার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন।”

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নে সেনাবাহিনীর অফিসারদের পাঠালে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়, কী কী সমস্যা হয়, সেগুলোর ব্যাপারে ইকবাল করিম ভূঁইয়া সাক্ষ্য দেবেন বলে তাজুল ইসলাম জানান।

জিয়াউলের আইনজীবী নাজনীন নাহার বলেন, “উনার (জিয়াউল আহসান) যে কার্যক্রম ছিল ইতোপূর্বে বাংলাদেশের ল এনফোর্সমেন্ট এজেন্সির সাথে, সেই কার্যক্রমগুলো উনি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করেছেন।

“উনি নির্দোষ বলেছেন, কারণ উনি নির্দোষ। উনি নির্দোষ সেই কারণেই কিন্তু উনি এই দেশ থেকে পালিয়ে যাননি। ৬ তারিখে যখন উনাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, ৭ তারিখে রাতে উনাকে বাসা থেকে আর্মিরা ধরে নিয়ে গেছে। তখন তার নামে কোনো মামলা ছিল না এবং ১৬ তারিখে উনাকে আবার ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে।”

নাজনীন নাহার বলেন, “উনি যদি দোষী হতেন, তাহলে উনি পালিয়ে যেতেন। উনি কিন্তু পালিয়ে যাননি। উনি একজন কমান্ডো অফিসার। কমান্ডো অফিসার বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে যেভাবে থাকা উচিত, উনি সেই মর্যাদা নিয়ে আছেন এবং সেই মর্যাদা নিয়ে উনি শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবেন।”

জিয়াউল আহসান সবশেষ মেজর জেনারেল হিসেবে টেলিযোগাযোগ নজরদারির জাতীয় সংস্থা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মহাপরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ে রদবদলের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৬ অগাস্ট তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। পরে ১৬ অগাস্ট তাকে গ্রেপ্তার করার কথা জানায় পুলিশ।

প্রথমে তাকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হকার শাহজাহানকে হত্যার অভিযোগে ঢাকার নিউ মার্কেট থানার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ওইবছর ১২ নভেম্বর তাকে জুলাই-অগাস্টের হত্যা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়।

ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সেদিন বলেছিলেন, “বরখাস্তকৃত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। অসংখ্য হত্যাকাণ্ড ও গুমের সাথে তার সম্পৃক্ততা। আমাদের তদন্ত সংস্থা ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে প্রমাণ পেয়েছে।”

১৯৯১ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশন পাওয়া জিয়াউল সেনাবাহিনীর একজন প্রশিক্ষিত কমান্ডো ও প্যারাট্রুপার ছিলেন। ২০০৯ সালে মেজর থাকাকালে তিনি র‌্যাব-২ এর উপঅধিনায়ক হন।

ওই বছরই তিনি পদোন্নতি পেয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হন এবং র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখার পরিচালকের দায়িত্ব পান। র‌্যাবে দায়িত্ব পালনের সময় থেকেই জিয়াউল আহসান হয়ে উঠেছিলেন সংবাদমাধ্যমে পরিচিত নাম।

কর্নেল পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে অতিরিক্ত মহাপরিচালক করে তাকে র‌্যাবেই রেখে দেওয়া হয়। ২০১৬ সালে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে জিয়াউল আহসানকে পাঠানো হয় জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) পরিচালকের দায়িত্বে।

পরের বছরই এনটিএমসির পরিচালক করা হয় জিয়াউল আহসানকে। ২০২২ সালে সংস্থাটিতে মহাপরিচালক পদ সৃষ্টির পর তাকেই সংস্থাটির নেতৃত্বে রাখা হয়েছিল।

আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে গুম, খুন এবং ‘আয়নাঘর’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া গোপন বন্দিশালায় নির্যাতনে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এছাড়া প্রায় ৪০ কোটি ৮৭ লাখ টাকার ‘অবৈধ সম্পদ’ অর্জন এবং ৩৪২ কোটি টাকার ‘অস্বাভাবিক লেনদেনের’ অভিযোগে জিয়াউল আহসান এবং তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেছে দুদক।

দুদকের আবেদনে ঢাকার জজ আদালত জিয়াউল আহসানের তিনটি ফ্ল্যাট, পাঁচটি বাড়ি ও প্রায় ১০০ বিঘা জমি জব্দ এবং তার নয়টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করারও আদেশ দিয়েছে।