Published : 25 Nov 2025, 10:04 PM
আগে দায়িত্ব পালন না করা ও দীর্ঘদিন দায়িত্ব থেকে বাইরে থাকা পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়ার পর তারা এখন দায়িত্ব পালনে নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রশিক্ষণ চাইছেন।
ভোটের দিন দায়িত্ব পালন নিয়ে নিরাপত্তার শঙ্কার কথা জানিয়ে কোন কোন পর্যবেক্ষক সংস্থা নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও সুপারিশ করেছেন কমিশনের কাছে।
আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যবেক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার দায়িত্ব না নিলেও নির্বাচন কমিশন পর্যবেক্ষকদের প্রশিক্ষিত করতে সংস্থাগুলোকে ‘কিছুটা’ সহায়তা করার আশ্বাস দিয়েছে।
আর নিরাপত্তার বিষয়ে কমিশন নির্বাচনের সময় কোনো পরিস্থিতিতেই হস্তক্ষেপ না করে পর্যবেক্ষকদের দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
মঙ্গলবার সকাল ও বিকালে আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে ৮১টি দেশি পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করে ইসি। এসময় পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে নানা সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার-সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে দুই সেশনেই অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তারা সংলাপে অংশ নেন।
‘নতুনদের প্রশিক্ষণ না দিয়ে মাঠে পাঠানো উচিত হবে না’
২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে যেসব পর্যবেক্ষক সংস্থা নির্বাচন পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করেছে, তাদের বাদ দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা আগেই জানিয়েছিল ইসি।
বিকালে সংলাপে অংশ নিয়ে এসডিএসের নির্বাহী পরিচালক রাবেয়া বেগম বলেন, “অনেকগুলো সংস্থা আছে যারা একেবারেই নতুন, যদিও এসডিএস আগে দুইবার পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছে। যেহেতু এটি খুব সেনসেটিভ কাজ, অবজারভারদের প্রশিক্ষিত করা ছাড়া মাঠে পাঠানো উচিত হবে না।
“আমরা প্রতিশ্রুতি চাই, আমাদের পর্যবেক্ষকদের বা টিম লিডার বা দুই-একজনকে যেন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।”
বিকালের সেশনে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা রাষ্ট্রীকের চেয়ারম্যান মোড়ল নূর মোহাম্মদ পর্যবেক্ষকদের দ্রুত প্রশিক্ষণ দিতে নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ জানান।
তিনি বলেন, “নতুন যেহেতু আমরা, আমরা একদমই নতুন। যারা নতুন অবজারভার হিসাবে কাজ করবেন তাদের জন্য যে ট্রেনিং হবে, সেটা যেন একটু তাড়াতাড়ি দেওয়া হয়। যাতে তারা যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে যেতে পারেন।”
গণভোট নিয়ে পর্যবেক্ষকদের মাধ্যমে ভোটারদের সচেতন করার আহ্বান জানান নূর মোহাম্মদ।
আরেকটি পর্যবেক্ষণ সংস্থার প্রতিনিধি নির্বাচন কমিশনকে প্রশিক্ষণের গাইড লাইন পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোকে দ্রুত সরবরাহ করার আহ্বান জানান।
প্রশিক্ষণের দায়িত্ব সংস্থার, কমিশনের না: ইসি
নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া যে সংস্থাগুলো নিজেদের দায়িত্ব, সে কথা তুলে ধরে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বিকালের সেশনে বলেন, “প্রশিক্ষণ প্রাইমারিলি সংস্থার নিজের দায়িত্ব। আমরা যে সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করতেসি, এটা পারলে অ্যাডিশনাল সহায়তা পাবেন।
“আপনাদের এটা ভেবে নেওয়ার কারণ নেই যে নির্বাচন কমিশন পর্যবেক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেবে। পর্যবেক্ষকরা তখন নির্বাচন কমিশনের লোক হয়ে গেল, সেটা চাই না। আপনারা আমাদের সহযোগী সংগঠন, আমাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ, কিন্তু আপনারা স্বাধীন।”
নির্বাচন কমিশন কিছু ‘টিউটোরিয়াল তৈরি করছে জানিয়ে’ তিনি সেগুলো পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোকে সরবরাহ করার কথা বলেন।
পর্যবেক্ষকদের নিরাপত্ত নিশ্চিত করার সুপারিশ
সকালের সেশনে খান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রোকসানা খন্দকার বলেন, “ভোটার তালিকা ভোটকেন্দ্রে টানিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। প্রার্থীরা বাসায় গিয়ে নম্বর দেয়, কিন্তু কেন্দ্রে দুর্ভোগ পোহাতে হয় ভোটরের। প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখতে হবে।”
শারীরিক প্রতিবন্ধীদের ভোটকেন্দ্রে যেতে অসুবিধা হয়, সেজন্য তাদের সহায়তা দেওয়ার সুপারিশ করেন তিনি। একইসঙ্গে নারী ভোটার কত শতাংশ ভোট দিয়েছে তাও জানানোর দাবি জানান।
পর্যবেক্ষকদের নিরাপত্তা চেয়ে রোকসানা খন্দকার বলেন, “অবজারভারদের সিকিউরিটি এনশিওর করা প্রয়োজন। প্রার্থীরা অনেক সময় পর্যবেক্ষকদের প্রতিপক্ষ মনে করে, এজন্য তাদের সিকিউরিটি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই সবার ভূমিকা থাকবে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য। ”
ভোটকেন্দ্র পরিবর্তন হলে তাও পর্যবেক্ষকদের আগে জানানো, পর্যবেক্ষকদের পরিচয়পত্র আগে থেকে হস্তান্তর ও জেলা নির্বাচন অফিসারের সহযোগিতা নিশ্চিতের অনুরোধ জানান তিনি।
পর্যবেক্ষকদের অবাধে তথ্য সরবরাহের পরিবেশ নিশ্চিত হওয়া, আচরণবিধি অনুসরণ ও নির্বাচনী ব্যয় তদারকির আহ্বান জানান আরেকটি পর্যবেক্ষণ সংস্থার প্রতিনিধি। পোস্টাল ব্যালটের বিষয়ে ব্যাপক প্রশিক্ষণ দেওয়ার দাবিও জানান তিনি।
অপতথ্য রোধে ইসির প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ চান পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রতিনিধিরা।
গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন একই দিনে হলে গণনার পদ্ধতি নিয়ে ধারণা দেওয়া, ভোটের আগে-পরে ১০ দিন করে সেনা মোতায়েন রাখার দাবি, ভোটের তিন দিন আগেই যেন পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রতিনিধিতের পরিচয়ত্র দেওয়ার দাবি জানান পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা।
ইন্টারন্যাশনাল আসক লিগ্যাল এইড ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি মো. আব্দুল হক পর্যবেক্ষকদের নিরাপত্তা দিতে প্রজাইডিং ও পোলিং এজেন্টদের নিজ নিজ জেলায় দায়িত্ব না দেওয়ার সুপারিশ করেন।
ইলেকশন আবজারভার সোসাইটির সভাপতি ইকবাল হাসান গণভোটের বিষয়ে ভোটারদের জানাতে পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর সাহায্য নেওয়ার পরামর্শ দেন।
কাজের পরিধির বাইরে যাবেন না: ইসি
সকালের সেশনে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ পর্যবেক্ষণ নীতিমালার সার্বিক বিষয় তুলে ধরেন।
পর্যবেক্ষকদের নিরাপত্তার নিয়ে তিনি বলেন, “পর্যবেক্ষকদের নিরাপত্তার বিষয় এসেছে আলোচনায়। দেখুন- একটা পয়েন্ট নিরাপত্তা, আরেকটা এলাকার নিরাপত্তা। এখানে আপনি, আমি, সব এলাকার নিরাপত্তার মধ্যে পড়ি।
“ব্যক্তি অবজারভারদের নিরাপত্তা দেওয়ার সক্ষমতা রাষ্ট্রের নেই। একজনের সাথে একজন গানম্যান নিয়োগ করে দিলাম, নো। ইটস নট পসিবল, ইটস নট ফিজিবল, প্র্যাকটিকেবেলও নয়।
“সেক্ষেত্রে বিদ্যমান পরিবেশে যেন নিরাপদ থাকে। তারপরও নিরাপত্তা হানিকর ঘটনা করলে যেন এড্রেস করব। অবজারভাররা নিজেকে এনডেঞ্জারড করবে না। এমন কোনো জায়গায় যাবে না, যেখানে তার যাওয়ার প্রয়োজন নেই। তাকে তার কাজের ডোমেইনে থাকতে হবে।
“ব্যক্তিগত কাজে গিয়ে যদি বলে ‘আমি অবজারভার’–দুঃখিত, সে দায়দায়িত্ব তার প্রতিষ্ঠানও নিতে পারবে না, নির্বাচন কমিশনও নিতে পারবে না। এটা খেয়াল রাখতে হবে”
সকালের পর্বের সমাপনী বক্তব্যে সিইসি এএমএম নাসির উদ্দিন বলেন, “অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে নির্বাচন কমিশন কাজ করছে। ইসির ওয়েবসাইট ফলো করবেন, প্রচার কাজে সহায়তা করবেন, পোস্টাল ব্যালট সম্পর্কে অবগত হবে। এক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।”
অংশীজনদের সঙ্গে ধারাবাহিক মতবিনিময়ের শেষ ধাপ ছিল পর্যবেক্ষকদের সাথে সংলাপ।
পর্যবেক্ষকদের ‘অরাজনৈতিক’ হওয়ার আহ্বান সিইসির
বিকালের সেশনের সূচনা বক্তব্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার-সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন পর্যবেক্ষকদের অরাজনৈতিক হওয়ার আহ্বান জানান।
পর্যবেক্ষক নিয়োগে সংস্থাগুলোকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে সিইসি বলেন, "আপনারা যাদের নিয়োগ দেবেন, কাকে দায়িত্ব দিচ্ছেন—সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মাঠে তাদের মনিটর করার দায়িত্ব আপনাদেরই। তারা যেন কখনো বায়াস না হয়।
"অবজারভাররা যদি রাজনৈতিকভাবে মোটিভেটেড হয়ে কাজ করে, তাহলে পুরো ইমেজ নষ্ট হয়ে যাবে।"
পর্যবেক্ষকদের দায়িত্ব সম্পর্কে সতর্ক করে সিইসি বলেন,"অবজারভারদের কাজ হল পর্যবেক্ষণ করা, হস্তক্ষেপ করা নয়। আপনারা কাউকে প্রভাবিত করতে পারবেন না, কাউকে লাইনে দাঁড় করাতে পারবেন না। শুধু রিপোর্ট করবেন, সঠিক সময়ে পরামর্শ দেবেন। ফাইনাল রিপোর্টে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিশ্লেষণ দেবেন—যার ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যৎ সংস্কার করা সম্ভব হবে।"
'সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে' আবারও অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের প্রত্যয় জানিয়ে সিইসি পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে বলেন, "আমরা কনসিস্টেন্টলি বলে আসছি—আমরা জাতিকে একটি সুষ্ঠু, সুন্দর, নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে চাই।
“নির্বাচন কমিশনের এজেন্ডা একটাই—সুন্দর, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। যত চ্যালেঞ্জই আসুক, এই কাজটি আমরা করতে চাই। আর এই কাজে আপনাদের সহযোগিতা খুব প্রয়োজন।"