Published : 28 Jun 2026, 05:16 PM
জুলাই আন্দোলনের সময় ঢাকার রামপুরায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি এবং আরও দুজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে প্রসিকিউশন।
অন্যদিকে এ রায়কে ‘ত্রুটিপূর্ণ’বর্ণনা দাবি করে উচ্চ আদালতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে আসামিপক্ষ ও দণ্ডপ্রাপ্ত একজনের পরিবার।
রোববার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর দেওয়া রায়ে ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক এডিসি রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ওসি মশিউর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
একই থানার সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়ার যাবজ্জীবন এবং রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে কেবল চঞ্চল সরকার কারাগারে রয়েছেন।
রায় ঘোষণার পর ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম বলেন, “মামলাটি সম্পূর্ণরূপে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় মাননীয় ট্রাইব্যুনাল ৩ জন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড, আসামি তরিকুল ইসলামকে যাবজ্জীবন এবং চঞ্চল সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। আমরা এই রায়ে মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি।”
তিনি বলেন, “এই মামলার মধ্যে আমরা ভিডিও বার্তা, যেটা ভিডিও ক্লিপ ছিল, সেটা আদালতে প্রদর্শন করেছি। ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের ওয়্যারলেস মেসেজ আমরা উপস্থাপন করেছি।
“এছাড়া আহত এবং নিহত হওয়ার সপক্ষে আনুষঙ্গিক যেসব এভিডেন্স ছিল, সেগুলোও উপস্থাপন করা হয়েছে।”
রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল কী বলেছে, এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, “ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণে বলেছেন, কমিশনার হাবিবুর রহমান অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে ওয়্যারলেস মেসেজের মাধ্যমে তার অধীনস্তদের উসকানি দিয়েছেন এবং এই হত্যাকাণ্ড ও হতাহতের ঘটনায় প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেছেন।”
আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের প্রসঙ্গে আমিনুল বলেন, “এভিডেন্সে এসেছে যে, ১৯ তারিখে হত্যাকাণ্ড ঘটার পর ২১ অথবা ২২ তারিখে যারা রাশেদের নেতৃত্বে ওই হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিল, হাবিবুর রহমান কমিশনার তাদের প্রত্যেককে এক হাজার এবং ওসিকে এক লক্ষ টাকা পুরস্কার দিয়েছেন।”
বিগত সরকারের সমালোচনা করে তিনি মন্তব্য করেন, “তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে তারা নির্বিচারে মানুষকে আহত এবং নিহতের ঘটনা ঘটিয়েছে।”
আসামিদের বিরুদ্ধে ‘যথার্থ বিচার ও সাজা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, “আগের চারটি রায়ে যারা পলাতক আছেন, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে সরকারের কাছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পাঠানো হয়েছে।
“ইতোমধ্যে রংপুরের তৎকালীন ভিসিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্যদের ক্ষেত্রে ইন্টারপোলের সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। আজকের রায়ের পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধেও আইনের ২০-এর ৩ ধারা অনুযায়ী গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হবে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কপি পাঠিয়ে ইন্টারপোলের সাহায্য নেওয়া হবে।”
অপরাধের মাত্রা বর্ণনা করতে গিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী বলেন, “মায়া ইসলাম পেটে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এটা অত্যন্ত নিষ্ঠুর যে, বাসিত খান মুসা নামের যে শিশু বাচ্চাটিকে গুলি করা হয়েছে, সে আইসক্রিম খেতে চেয়েছিল। তার বাবা তাকে নিয়ে যাচ্ছিল আইসক্রিম কিনে দিতে এবং তার দাদি পেছনে পেছনে যাচ্ছিলেন। ঠিক এই পর্যায়ে পুলিশ নির্বিচারে গুলি করে।
“শিশু মুসাকে মাথায় একপাশ দিয়ে গুলি করে, যা অন্যপাশ দিয়ে বের হয়ে দাদির পেটে লাগে এবং পরবর্তীতে দাদি মৃত্যুবরণ করেন। এছাড়া নাদিম মিজান মসজিদ থেকে ফেরার পথে তাকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়।”
কার্নিশে ঝুলে থাকা আমির হোসেনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “আমির হোসেন নামের এক ব্যক্তি আত্মরক্ষার্থে কার্নিশে ঝুলে নিজেকে আত্মগোপন করেছিলেন।
“কিন্তু আসামিরা তাকে প্রথমে ঝাঁপ দিতে বলে এবং তিনি না দেওয়ায় ওই ঝুলন্ত অবস্থাতেই তাকে ছয়টি গুলি করে চিরদিনের মতো পঙ্গু করে দেয়।”
আমিনুল ইসলাম বলেন, “এই যে চারটি পরিবারের দুইজনকে হত্যা করল, দুইজনকে তারা এই নির্মমভাবে তারা আহত করল, এইটাই হচ্ছে মামলার গ্র্যাভিটি অফ অফেন্স। এই নিষ্ঠুরতা, এই বর্বরতার কারণেই আজকে ট্রাইব্যুনাল তিনজনকে সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়েছে।
“একজনকে যাবজ্জীবন শাস্তি দিয়েছে, একজনকে ২০ বছরের শাস্তি দিয়েছে। আমরা মনে করি যে, অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে এই রায়টি দেওয়া হয়েছে এবং প্রত্যেকের বিরুদ্ধে যে রায় হয়েছে, এটি আইন অনুযায়ী যথার্থ হয়েছে।”
‘সংক্ষুব্ধ’ আসামিপক্ষ, যাবে আপিলে
রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন দণ্ডপ্রাপ্ত চঞ্চল চন্দ্র সরকারের আইনজীবী সারওয়ার জাহান নিপ্পন।
তিনি বলেন, “এই রায়ের বিরুদ্ধে আমরা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে যাব। আমার ক্লায়েন্টের কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না।
“১৯ জুলাই সে টেলিভিশন সেন্টারে ডিউটিতে ছিল; সিডিআর ও সিসি ক্যামেরার ফুটেজ এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ তাই বলে।”
নিপ্পনের ভাষ্য, হঠাৎ করে সামনে আসা একটি ‘এক্সট্রা জুডিসিয়াল কনফেশন’ বা ভিডিও বার্তার ওপর ভিত্তি করে এ রায় দেওয়া হয়েছে।
“আমরা বারবার নিবেদন রেখেছিলাম যে, এই প্রমাণটি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে না। বিচারকাজ শেষে হঠাৎ করে একটি ভিডিওর ভিত্তিতে যেভাবে এটিকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, তাতে আমরা সংক্ষুব্ধ।”
চঞ্চলের ২০ বছরের কারাদণ্ডের রায়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তার ছোট ভাই উৎপল চন্দ্র সরকার।
তিনিও সিডিআর (কল ডিটেইল রেকর্ড), অস্ত্র ইস্যু না থাকা এবং গ্রেপ্তারের সময় নিয়ে প্রসিকিউশনের বিরুদ্ধে একাধিক অসঙ্গতির অভিযোগ তুলে আপিলের ঘোষণা দেন।
প্রসিকিউশনের দাখিল করা সিডিআর অনুযায়ী বিকাল ৩টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত চঞ্চলের ডিউটি রামপুরা টিভি ভবনের তিন নম্বর গেটে ছিল দাবি করে উৎপল বলেন, “২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত যদি ওই মামলার ঘটনাগুলো হয়ে থাকে, তাহলে আমার ভাই ৩টা ৪৫ পর্যন্ত রামপুরা টিভি ভবনে।
“সে ওই মামলায় কীভাবে অকারেন্সগুলো করল? ট্রাইব্যুনালে বিচারকরা প্রসিকিউশনকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলেও তারা কোনো উত্তর দিতে পারেনি, চুপ ছিল।”
ঘটনার দিন চঞ্চলের নামে কোনো অস্ত্র বা গোলাবারুদ ইস্যু করা ছিল না দাবি করে উৎপল বলেন, “যাদের নামে অস্ত্র ইস্যু ছিল, তারা এই মামলায় আসামি হয়নি। আমার ভাইকে ভিকটিম বানানো হয়েছে।”
গ্রেপ্তারের সময় নিয়ে অসঙ্গতির অভিযোগ তুলে উৎপল বলেন, “গত ২৬ জানুয়ারি খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার তাকে ক্লোজ করে। কিন্তু ট্রাইব্যুনালে তার অ্যারেস্ট দেখানো হয়েছে ২৮ জানুয়ারি। তাহলে এই ৪৮ ঘণ্টা সে কোথায় ছিল?”
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আশ্চর্যজনক একটা বিচার হলো। আজকে মূলত বিষয় এটা না, মূলত হলো আমরা সংখ্যালঘু। এই দেশে সংখ্যালঘু হিসেবে জন্মগ্রহণ করাটাই হলো আমাদের পাপ।”
তবে বিচার ব্যবস্থার ওপর পরিবারের আস্থা আছে জানিয়ে উৎপল বলেন, “আমরা অবশ্যই আপিলে যাব। আমি আপিলে যেতে বাধ্য।”
কার্নিশে ঝোলা তরুণকে গুলি: সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবসহ ৩ পুলিশের প্রাণদণ্ড