Published : 30 Jan 2026, 11:12 PM
বাংলাদেশ ব্যাংক সদরঘাট শাখার সহকারী ব্যবস্থাপক দিপু সানা এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকুরে তরুণ কুমার বিশ্বাস তাদের একমাত্র সন্তানকে নিয়ে সুন্দর জীবন গড়ার স্বপ্ন বুনেছিলেন; সেই স্বপ্নে যতি নেমে আসে দুই বছর আগে।
অফিস ছুটির পর সহকর্মীদের সঙ্গে বেরিয়েছিলেন দীপু, ফুটপাত ধরে ফিরছিলেন বাসায়। হঠাৎ নির্মাণাধীন ভবন থেকে তার মাথায় কংক্রিটের ব্লক পড়ে নিভে যায় প্রাণপ্রদীপ।
স্ত্রীকে হারিয়ে তরুণের আক্ষেপ ঝরা কথা: “স্বপ্ন নিয়ে আগাচ্ছিলাম, গাড়ি, বাড়ি করব, সব স্বপ্নে ফুল স্টপ।”
ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী এলাকায়। এ ঘটনায় দীপু সানা ওরফে দীপান্বিতার স্বামী তরুণ হত্যার অভিযোগ এনে পরদিন রমনা মডেল থানায় মামলা করেন। থানা পুলিশের হাত ঘুরে মামলার তদন্তভার পায় ডিবি পুলিশ।
একবার তদন্তের পর প্রতিবেদন নিয়ে বাদীর আপত্তিতে মামলাটি পুনঃতদন্তে যায়, দায়িত্ব পান ডিবির একজন পরিদর্শক।
গত বৃহস্পতিবার মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমার দিন ধার্য ছিল। কিন্তু ওইদিন তদন্ত সংস্থা ডিবি পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি। বিচারক ৫ মার্চ প্রতিবেদন দাখিলের পরবর্তী দিন ধার্য করে দেন।
তরুণ কুমার বিশ্বাস বলেন, "পুলিশ বলছে হত্যার কোনো ক্লু পায়নি। এজন্য ফাইনাল রিপোর্ট দিয়েছে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা কী, আমরা জানতে চাই। এজন্য নারাজি দাখিল করি। আদালত ডিবি পুলিশকে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা আসে, তদন্ত কর্মকর্তা যায়। তদন্ত আর শেষ হয় না।"
তিনি বলেন, "আমরা চাই কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে যদি এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকে, তাহলে সে আইনের আওতায় আসুক। নির্দোষ কেউ যেন হয়রানি না হয়। এমন ঘটনায় নিজেদের বাঁচাটা স্ট্রাগল হয়ে যাচ্ছে। কীভাবে বেঁচে আছি। কয়েকদিন আগে গুলশানে একজন রড পড়ে মারা গেল। এরআগে মেট্রোরেলের নিচে একজন মারা গেল। দিপু সানার মামলার বিচার করলে হয়ত এমনটা হত না। সবাই কিছুটা হলেও সতর্ক হত।
দীপু মারা যাওয়ার সময় তার ছেলের বয়স ছিল তিন বছর, এখন শিশুটি পাঁচে পড়েছে। তার কিছু সমস্যা তুরে ধরে তরুণ বলেন, “ছেলের স্পিচ ডিলে হচ্ছে। মাইনর অটিজম আছে। আমরা তাকে ভালো রাখার চেষ্টা করছি। ট্রিটমেন্ট চলছে। তারপরও মায়ের একটা অভাব তো থাকে।"

মামলার পর যা হল
দীপু সানার মৃত্যুর ঘটনায় দুই বছর আগে হত্যা মামলা হওয়ার পর প্রথমে থানা পুলিশ ও পরে ডিবি পুলিশ তদন্ত শুরু করে। তদন্ত শেষে গত বছরের ৩০ এপ্রিল প্রতিবেদন দাখিল করেন গোয়েন্দা পুলিশের রমনা বিভাগের এসআই মো. ইরফান খান।
সেখানে বলা হয়, তদন্তকালে দিপু সানাকে ‘হত্যায়’ জড়িত কোনো আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সে কারণে অভিযোগপত্র না দিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়।
ওই প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তি জানিয়ে নারাজি দাখিল করেন দিপুর সানার স্বামী তরুন বিশ্বাস। গত বছরের ৩০ অক্টোবর ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জোনায়েদ ডিবি পুলিশের ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার একজনকে মামলাটি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন।
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমার দিন ধার্য ছিল। কিন্তু ওইদিন তদন্ত সংস্থা ডিবি পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি। তখন তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের শুনানি নিয়ে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা আগামী ৫ মার্চ প্রতিবেদন দাখিলের পরবর্তী দিন দিয়েছেন।
আগের তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ইরফান খান বলেন, "এ ঘটনাকে দুর্ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। তবে কে বা কারা ইট ফেলে ভিকটিমকে খুন করেছে তা আমরা আইডেন্টিফাই করতে পারিনি। সে পাগল বা মাদকসেবীও হতে পারে। দীর্ঘদিন মামলার তদন্ত করেছি। কিন্তু রহস্য উদঘাটন হচ্ছিল না। অজ্ঞাতনামা আসামিদের আইডেন্টিফাই করতে না পারার কারণে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি।"
চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ইরফান খান বলেছেন, “ভিকটিম দিপু সানা বাংলাদেশ ব্যাংক সদরঘাট শাখার সহকারী ব্যবস্থাপক হিসাবে কর্মরত ছিলেন। ২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি ছুটি শেষে অফিস বাসে করে বাসায় ফেরার জন্য শান্তিনগর নেমে নেমে ফুটপাত দিয়ে পায়ে হেঁটে যাওয়ার পথে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে রমনা মডেল থানার ১৭১/১ নিউ সার্কুলার রোড সিদ্বেশ্বরী ফখরুদ্দিন পার্টি সেন্টারের সামনে আসা মাত্র অজ্ঞাতনামা আসামি উপর থেকে সিমেন্ট ও বালু দিয়ে তৈরি একটি ইট হঠাৎ করে দিপু সানার মাথায় ফেললে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তখন স্থানীয় লোকজন তাকে চিকিৎসার জন্য পার্শ্ববর্তী সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
“মামলার তদন্তকালে অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে হত্যার অপরাধের ধারার সত্যতা পাওয়া গেলেও মামলার ঘটনার সাথে জড়িত আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মামলাটি পুরাতন এবং এখন পর্যন্ত ঘটনার সাথে জড়িত আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং ভবিষ্যতেও সাক্ষ্য প্রমাণ প্রাপ্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ। অহেতুক মামলার তদন্ত দীর্ঘায়িত করার কোনো যৌক্তিকতা দেখা যাচ্ছে না।”
খুলনার পাইকগাছার মেয়ে দীপু সানা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজ বিজ্ঞানে পড়েন। বাংলাদেশ ব্যাংকে অফিসার হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। সবশেষ তিনি সহ ব্যবস্থাপক হিসেবে সদরঘাট শাখার জড় সামগ্রী ও মনিহারি শাখায় কর্মরত ছিলেন।
ঘটনা দিন অফিসের কাজ শেষে মৌচাক হয়ে বাসায় ফিরছিলেন দীপু সানা। সদরঘাট থেকে বের হয়ে মৌচাক নেমে বাসার পথটুকু তিনি হেঁটেই যেতেন। প্রতিদিনের মত সিরাজুল ইসলাম হাসপাতালের বিপরীত সড়কের ফখরুদ্দিন বিরিয়ানি ও পার্টি সেন্টারের সামনের ফুটপাত যখন অতিক্রম করছিলেন, তখনই ব্লকটি পড়ে তার মাথায়।
ভিডিওতে দেখা যায়, ইট আকৃতির একটি ব্লক উপর থেকে সরাসরি মাথায় পড়তেই লুটিয়ে পড়েন তিনি। কিন্তু সেই ব্লকটি কোত্থেকে এল, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত নয় পুলিশ।
ওই সময়ে হাই কোর্টে একটি রিট মামলা হয়। ফুটপাতে সাধারণ মানুষের চলাচলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের কেন ‘ব্যর্থ’ বলে ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চায় হাই কোর্ট।
ওই ঘটনার তদন্তে কমিটি গঠন ও ভুক্তভোগীর পরিবারকে ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে রিট আবেদনটি করা হয়েছিল।
এদিকে গুলশানের ১৪০ নম্বর সড়কের ২২ নম্বর ভবনের সামনের ফুটপাতে গত ২২ জানুয়ারি দুপুরে দাঁড়িয়ে সহকর্মীর সঙ্গে কথা বলছিলেন বেসরকারি কোম্পানির কর্মকর্তা আশফাকুজ্জামান চৌধুরী (৪৫)। এসময় উপর থেকে একটি রডের টুকরা পড়ে তার মাথায় ঢুকে যায়।
তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক বলেছিলেন, হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। ওই ঘটনার একটি ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।
ওইদিনই ভবন নির্মাণের দায়িত্বে থাকা কনকর্ড গ্রুপের চেয়ারম্যান এস এম কামাল উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার কামাল এবং এবং প্রজেক্ট ইনচার্জ আল আমিনের বিরুদ্ধে অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগ এনে মামলা করেন আশফাকুজ্জামানের শ্বশুর সিরাজুল ইসলাম তালুকদার। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ১০/১২ জনকে আসামি করা হয়।
গেল বছরের ২৬ অক্টোবর রাজধানীর ফার্মগেইটে মেট্রোরেল স্টেশনের পশ্চিম পাশে ৪৩৩ নং পিলারের ওপর থেকে, বিয়ারিং প্যাড খুলে মাথায় পড়লে ঘটনাস্থলেই মারা যান ৩৫ বছর বয়সী আবুল কালাম আজাদ। ওই ঘটনায় তার স্ত্রী আইরিন আক্তার পিয়া তেজগাঁও থানায় একটি মামলা করেন। সেই মামলাও তদন্তাধীন আছে।
পুরনো খবর