Published : 04 Aug 2025, 02:01 AM
শ্রাবণের ঘনঘটার মধ্যে ১৭ বছরের নাফিসাকে হারাতে হবে- বাবা আবুল হোসেনের মত কোনো পিতার ভাবনাতেও তা আসার কথা নয় । আক্ষেপ করে বলছিলেন, মেয়ের আন্দোলনে যাওয়ার খবর জানলে হয়তো ঘরে তালা দিয়ে আটকে রাখতেন। আসলেই কি তারুণ্যের দ্রোহকে আটকে রাখা যায়? সতীর্থের মৃত্যুতে কি কেউ ঘরে বসে থাকে?
কিশোরী নাফিসা হোসেন মারওয়া জুলাই আন্দোলনে যেতেন লুকিয়ে, পরিবারের অগোচরে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিশে সাভারে তিনি হয়ে ওঠেন আন্দোলনের সক্রিয় মুখ।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন ৫ অগাস্ট দুপুরের পর সাভারের মডেল মসজিদ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন নাফিসা। দ্রুত সাভারের ‘ল্যাবজোন’ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
সেই ঘটনার এক বছর হতে চললেও শোকের ধকল এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি মা-বাবা।
চোখে জল নিয়ে আবুল হোসেন বললেন, “তার এইচএসসি পরীক্ষা চলমান থাকা অবস্থায় সে (পরীক্ষার) হল থেকে আন্দোলনে যাওয়া শুরু করল। এটা আমি অনেক পরে জানতে পারলাম। আগে জানলে তাকে তালাবদ্ধ করে রাখতাম।”

দ্রোহের জুলাইয়ে সন্তানদের আটকে রাখতে পারেননি হাজারো মা-বাবা। তারা প্রাণ দিয়ে কেবল শাসকগোষ্ঠীই বদলাননি, গড়েছেন নতুন ইতিহাস। তাদের হাত ধরে এসেছে দেশ গড়বার নতুন সুযোগ।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার নিয়ে শুরু হওয়া এ আন্দোলন একপর্যায়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ডেকে আনে, যাতে ৮৩৪ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তালিকায়।
নিহতদের সেই তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়- আন্দোলনে আবু সাঈদ, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধসহ অন্তত ২৬৯ জন ছিলেন শিক্ষার্থী, যা এই আন্দোলনে মোট নিহতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা ৩৩ শতাংশ।
সরকারি ওই তালিকার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের মধ্যে ৭৯ শতাংশের বয়স ছিল ৩৫ বছরের নিচে- সংখ্যায় যা ৬৩৮ জন। নিহতদের প্রায় ১৭ শতাংশই ছিল ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোর।
স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার এ কিশোর শিক্ষার্থীরাই আন্দোলনের সম্মুখসারিতে ছিল। সেই রক্তাক্ত অভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে, অন্য অনেকের মতোই গুলিবিদ্ধ হয়ে চিরতরে হারিয়ে যান নাফিসা।
তার স্মৃতিতে সাভারের কোটবাড়ি এলাকায় একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে।
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ ঝরেছে মোট ১০ নারীর, যাদের মধ্যে পাঁচজন শিক্ষার্থী। বাকিদের মধ্যে দুজন কর্মজীবী, দুজন গৃহবধূ এবং একজন যিনি কোনো শিক্ষা বা প্রাতিষ্ঠানিক কাজে যুক্ত ছিলেন না। তাদের মধ্যে নাফিসাই একমাত্র সরাসরি আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছিলেন।
ভরসা করার কেউ রইল না কুলসুমের
২০২২ সালে নাফিসার মা কুলসুম বেগম পারিবারিক আর আর্থিক টানাপড়েনের কারণে দুই মেয়েকে নিয়ে টঙ্গী থেকে চলে যান সাভারে। দক্ষিণ বক্তারপুরের কোটবাড়ি এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকছিলেন তারা।
পরে মেয়েদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে কুয়েতে পাড়ি জমান কুলসুম। নাফিসাকে তখন ভর্তি করানো হয় সাভারের বেসরকারি ল্যাবরেটরি কলেজে।
পরের বছরের সেপ্টেম্বরে টঙ্গীতে বাবার কাছে চলে আসেন নাফিসা। এরপর বাবা আবুল হোসেন টঙ্গীর সাহাজউদ্দিন সরকার আদর্শ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেন নাফিসাকে।
সেই প্রতিষ্ঠানের হয়ে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছিলেন নাফিসা। এর মধ্যে আন্দোলনে প্রাণ গেছে তার।
কুয়েত প্রবাসী মা কুলসুম বেগম বুধবার হোয়াটসঅ্যাপে সেই সময়ের কথা স্মরণ করে বললেন, নাফিসা তার বাবার সঙ্গে টঙ্গীতে থাকলেও অধিকাংশ সময় সাভারে মামা হযরত আলীর বাসায় থাকতেন। আন্দোলনের মধ্যে ২৮ জুলাই ধামরাইয়ে বড় মামার বাসায় যান এবং পরে ৩০ জুলাই ছোট মামা হযরতের বাসায় ফেরেন। এরপর থেকে বন্ধুদের সঙ্গে সাভারে আন্দোলনে অংশ নিতে শুরু করেন।
তিনি বলেন, “অগাস্টের ৩ তারিখে সে আমাকে বলল, ‘মা, আমি আন্দোলনে যাইতে চাই, তুমি আমাকে না করো না।’ আমি তাকে বলেছিলাম বাবার কাছে জানিয়ে যেতে। পরের দিন ৪ অগাস্টেও সে ফোন দিয়েছিল।
“সেদিন ওর নানি ওকে আন্দোলনে যেতে বাধা দিয়েছিল। পরে আমাকে ফোন দিয়ে বলল, ‘নানু যাইতে দেয় না’। পরে আমি বুঝিয়ে বলার পর আন্দোলনে যায়। বিকেল ৩টায় ফিরে এসে ফোন দিল আমাকে।”

ঘটনার দিন মামা হয়রতের বারণ মানেননি নাফিসা, পালিয়ে যোগ দিয়েছিলেন আন্দোলনে।
ঘটনার বর্ণনায় দূরপরবাসিনী মা কুলসুম বলছিলেন, “৪ তারিখ রাত ১০টায় আমাকে ফোন করে বলেছে, ‘কাল শেষদিনের মতো যামু আমি’। আমি না করার পর সে বলল, ‘আমরা গণভবনে মার্চে যাব। সেনাবাহিনী কথা দিয়েছে, কিছু করবে না। আর আমরাও তো কিছু করব না, শুধু ঢাকার দিবে যাব।’
“ওর কথায় খুব স্পিরিট ছিল তখন, আমিও তাকে নিরুৎসাহিত করিনি। দেশকে প্রচণ্ড ভালোবাসত নাফিসা। ৫ অগাস্ট সকালে নাফিসা আর আমাকে বলে যায়নি। বাংলাদেশ সময় বিকাল ৪টায় ছোট মেয়ে (নাফিসার ছোট বোন) কল দিয়ে বলল, নাফিসা আপু গুলি খেয়েছে।”
কথা বলার এপর্যায়ে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না মা কুলসুম।
অঝোরে কাঁদতে-কাঁদতে বললেন, “ও তো ছিল আমার বড়ো মেয়ে। চলায়-বলায় সব সময় ওকে মনে পড়ে। ওর মৃত্যুর খবরটা যখন জানতে পারলাম, আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না।
“ওর সঙ্গে অনেক কিছুই বলতে ইচ্ছা করে, পরামর্শ চাইতে ইচ্ছে করে আমার। কিন্তু, ও তো নেই।”
মায়ের কষ্ট দূর করতে চেয়েছিলেন নাফিসা। এইচএসসি শেষ করে তাই অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং করার ভাবনা মাকে জানিয়েছিলেন।
“ও আমার কষ্ট বুঝতে পেরেছিল। ও বড়ো হয়ে কম্পিউটার কিনে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করতে চেয়েছিল। ও মানুষটা ছোট হলেও সবসময় আমাকে ভরসা দিত। সবকিছু নিয়ে পরামর্শ করতাম ওর সঙ্গে। আমাকে ওই পরামর্শ দিয়েছিল বিদেশে যাওয়ার জন্য,” বলছিলেন মা কুলসুম।
আক্ষেপ করে তিনি বললেন, “এখন যখন কোনো পরামর্শ দরকার হয়, আমি কাউকে বলতে পারি না। আমার ভরসা দেওয়ার নাফিসা হারিয়ে গেছে।”

নাফিসা বাবার সঙ্গে যে বাসায় থাকতেন, সেটির অবস্থান টঙ্গীর চাংকিরটেক এলাকার উত্তর দত্তপাড়ায়। দুই রুমের সেমিপাকা বাসায় তারা থাকতেন। রোববার সেই বাসায় গিয়ে দেখা গেল, ঘরে এখনো রয়েছে নাফিসার পড়ার টেবিল।
টেবিলে থরেথরে সাজানো রয়েছে নাফিসার বইগুলো। ঘরের দেওয়ালে এখনো সাঁটানো তার হাতে লেখা জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন অধ্যায়ের সংক্ষিপ্ত নোট। ঘরের কোণায় একটি টেবিল আছে।
সেই টেবিলে বসে পড়তে মেয়ের কষ্ট হয় বলে বাবা বানিয়ে দিয়েছিলেন জলচৌকির মতো আরেকটি টেবিল, যেটি বিছানার ওপর রেখে পড়াশোনা করতেন তিনি। টেবিলটার উপরে নিজ হাতে নাফিসার নাম লেখা।
সেই ঘরে বসে মেয়ের স্মৃতিচারণ করলেন বাবা আবুল হোসেন। দেখালেন মেয়ের স্কুলের ভর্তি পরীক্ষার প্রবেশপত্র, রেজিস্ট্রেশন কার্ড, রেজাল্ট শিট, বইপত্র ইত্যাদি।
৫ অগাস্ট আন্দোলনের ফাঁকে আবুল হোসেনের মোবাইলে একটি ছবি পাঠান নাফিসা। সেই ছবিও লেমেনেটিং করে সযত্নে রেখেছেন বাবা।

মারা যাওয়ার পর বিকালে অ্যাম্বুলেন্সে করে লাশ নেওয়া হয় সাভারে নাফিসার মামার বাসায়। রাত ৯টার দিকে সাভারে জানাজা শেষে প্রথমে সেখানেই দাফনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও পরে টঙ্গীতে বাসার কাছেই কবরস্থানে তাকে দাফন করেন বাবা। সম্প্রতি সেই কবরস্থান বাঁধাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
নাফিসার এইচএসসির ফল প্রকাশিত হয়েছে ১৫ অক্টোবর। সাত বিষয়ের পরীক্ষায় অংশ নিতে পেরেছিলেন নাফিসা। টঙ্গীর সাহাজউদ্দিন সরকার আদর্শ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ ৪ দশমিক ২৫ পেয়ে পাস করেছেন।
মুগ্ধর প্রিয় পুডিং আর বানাবেন না মা
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ১৮ জুলাই উত্তরার আজমপুরে শিক্ষার্থী ও পুলিশের সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন মুগ্ধ। তিনি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনলাসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী ছিলেন।
মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার ঠিক আগে মুগ্ধ এর বিস্কুট ও পানি বিতরণের একটি ভিডিও সেসময় আন্দোলনের আগুনে ‘ঘি’ ঢেলেছিল। তার মৃত্যু ঘিরে তোলপাড় হয়েছিল দেশজুড়ে।
মুগ্ধ মারা যাওয়ার পর তার যমজ ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ ফেইসবুকে সেই ভিডিও পোস্ট করলে সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া হলেও মুগ্ধরা ঢাকায় আছেন অনেক দিন ধরে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে মুগ্ধ এমবিএ করছিলেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিউপি)। মুগ্ধ বেঁচে থাকতে পরিবারটি ঢাকার যে বাসায় থাকত, সেখানে এখন আর থাকছে না।
সোমবার নতুন বাসায় পৌঁছানোর পর তার বড় ভাই মীর মাহমুদুর রহমান দীপ্ত বলছিলেন, “আব্বু-আম্মু ট্রমাটাইজড হয়ে গেছেন আগের বাসায় থেকে। সেখানে মুগ্ধর স্মৃতি রয়ে গেছে বলে। তাই বাসাটা পাল্টেছি আমরা।”
দিয়াবাড়ি এলাকার নতুন বাসায় যে কক্ষে বসার ব্যবস্থা হল, সেখানে মুগ্ধর কম্পিউটারটি চোখে পড়ল। পেশায় ফ্রিল্যান্সার ছিলেন তিনি, তার মৃত্যুর পর মার্কেটপ্লেস ‘ফাইভার’ তার কথা স্মরণ করে স্বীকৃতিও দিয়েছে। তবে তার বসার সেই চেয়ারটি এখন ফাঁকা।
বাসাভর্তি তার মেডেল, স্কাউটিংসহ নানারকম কাজে জন্য পাওয়া সনদ, তার ছেলেবেলার ছবি, খেলাধুলায় অংশ নিয়ে পাওয়া ট্রফি, জামা এখনো রয়েছে সযত্নে গোছানো।
চিত্রশিল্পী মাসুক হেলালের আঁকা তার হাসিমাখা মুখের একটি চিত্রকর্ম বাঁধাই করা আছে ড্রইংরুমে। ছবির ফ্রেম থেকে তাকিয়ে থাকা হাসিমাখা মুখ নিয়ে মুগ্ধ যেন আশপাশেই কোথাও আছেন।

মুগ্ধ মারা গেছে- এ খবর কীভাবে জেনেছিলেন?
উত্তরে বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান বললেন, “মুগ্ধ যেদিন মারা যায়, ১৮ জুলাই, সেদিন আমরা ছিলাম কক্সবাজারে; বড়ো ছেলের শ্বশুরবাড়িতে। খবরটা প্রথম এল দীপ্তর কাছে। কিন্তু সে বলেনি।
“শুধু এটুকু বলল, মুগ্ধ গুরুতর আহত হয়েছে। বলে ওর মা আর আমার ফোন নিয়ে গেল তার কাছে। বলল, অনেকেই ফোন দিতে পারে, তাই।”
অনেকেই মুগ্ধর মৃত্যু নিয়ে জানতে চাইতে পারেন, সেই শঙ্কা থেকে মা-বাবার ফোন নিজের কাছে নিয়েছিলেন দীপ্ত।
সেই বেদনাবিধুর দিনের কথা বলতে গিয়ে ধরা গলায় বাবা মোস্তাফিজুর বললেন, “পরদিন সকালে বিমানে করে আমরা ঢাকায় পৌঁছাই। এসে দেখি, সব নীরব-নিস্তব্ধ।
“হাজার-হাজার মানুষ অপেক্ষায় আমাদের; তখন তো আর বুঝবার বাকি রইল না যে- আমার ছেলে নেই। তখন আমার আর কোনো হিতাহিত জ্ঞান ছিল না। দমবন্ধ হয়ে আসতেছিল।”
তিনি বলেন, “আমি প্রায় একবছর পর্যন্ত কাঁদার চেষ্টা করেও কাঁদতে পারিনি। গতবারের আগেরবার কোরবানির ঈদে ওকে নিয়ে গরু কিনেছিলাম, নামাজের পর ওর সাথে কোলাকুলি করেছিলাম।
“এই স্মৃতি যখন মনে পড়ল, এক বছর পর গত কোরবানির ঈদে আমি বাসায় এসে কাঁদতে বসেছিলাম।”
মুগ্ধর বড়ো ভাই দীপ্তও স্মরণ করছিলেন প্রিয় ছোটভাইকে। ভাই হারানোর শূন্যতা ফুটে উঠছিল চোখেমুখে।

দীপ্ত বললেন, “আমাদের তিন ভাইয়ের মধ্যে মুগ্ধ ছিল মায়ের সবচেয়ে কাছের। ওর আহত হওয়ার সংবাদটা পাওয়ার পর মা ডুকরে উঠে বলছিলেন, ‘আমার এই নামাজি ছেলেটা, আল্লাহ নিশ্চয় এত নিষ্ঠুর হবেন না। ও আছে, বেঁচে আছে’।
“আমি তখন চুপ করে সামনে তাকিয়ে ছিলাম, আমি তো জানতাম- ও নেই।”
দীপ্ত বললেন, “আমার মা হার্টের রোগী। কানেও কম শোনেন। যখন আজান হত, মুগ্ধ এসে মাকে বলত, ‘মা দেখো তো আজান দিয়েছে নাকি, নামাজের সময় হয়েছে নাকি।’ অথচ, ও আজান শুনেই আসত।
“মা যাতে আহত না হয়, সেজন্য সে সরাসরি বলত না, মাকে ঘুরিয়ে সেটাও মনে করিয়ে দেওয়া যে- নামাজের সময় হয়েছে। এগুলো এখন শুধুই স্মৃতি।”

অনুজের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে দীপ্ত বললেন, “মুগ্ধ পুডিং খুব পছন্দ করত। মা এজন্য ও খুলনা থেকে আসার দুদিন আগেই পুডিং রেডি করে বসে থাকত।
“ও মারা যাওয়ার পর আর কখনো পুডিং বানাননি। এও বলেছেন, উনি আর পুডিং বানাবেন না।”
যে মুগ্ধ রক্ত দেখে কেঁপে উঠতেন, দাফনের সময় তার নিজের মাথা থেকেই গড়িয়ে পড়ছিল রক্ত।
সেই বিভীষিকা স্মরণ করে দীপ্ত বলেন, “মুগ্ধ মারা যাওয়ার ৩ দিন আগে স্নিগ্ধ বাইক অ্যাক্সিডেন্ট করেছিল। তার আঙুলে পাঁচটা সেলাই লেগেছিল। আমি হাসপাতালে পৌঁছানোর পর, মুগ্ধ কাঁদো-কাঁদো হয়ে আমাকে এসে বলছিল, ‘ভাইয়া স্নিগ্ধর এত রক্ত বের হয়েছে, আমি তো সহ্যই করতে পারছিলাম না’; বলে কাঁপছিল।
“এর ৩ দিন পরে ও যখন গুলিবিদ্ধ হয়, ওর সমস্ত শরীরের রক্ত একেবারে রাস্তায় গড়িয়ে পড়ল। ওকে কবর দেওয়া পর্যন্ত রক্ত পড়ছিল। আমার পাঞ্জাবি ভিজে গিয়েছিল ওর রক্তে।”
উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরের কামারপাড়া বামনারটেক কবরস্থানে চিরকালের মত ঘুমিয়ে আছেন মুগ্ধ।
অবসাদে ‘ভুগছেন’ বিউটি ঘোষ
রিয়া গোপ ছিলেন অভ্যুত্থানের এক কনিষ্ঠ শহীদ। নিজেদের ভাড়া বাসার ছাদে মাথায় গুলি লেগে তার মৃত্যু হয় মাত্র ছয় বছর বয়সে।
২০১৯ সালে নারায়াণগঞ্জে জন্ম তার। রিয়া যখন মারা যায়, তখন তার বাবা দীপক কুমার গোপ একটি স্থানীয় রড-সিমেন্টের দোকানে ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করতেন; মা বিউটি ঘোষ একজন গৃহিণী। দুজনের পাঁচ বছরের দাম্পত্য জীবনের পর ঘরে আসে রিয়া।
নারায়ণগঞ্জ সদরের নয়ামাটি এলাকার দ্বীনবন্ধু মার্কেটের পঞ্চম তলায় বসবাস করতেন দীপকরা। আন্দোলন যখন তীব্র রূপ নিতে শুরু করে- ১৯ জুলাই দুপুরের খাবারের পর রিয়া খেলতে বাসার ছাদে যায়। তাদের বাড়ির নিচে তখন পরিস্থিতি থমথমে ছিল; ছাত্র-জনতা ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ চলছিল।
গোলাগুলির শব্দ শুনে রিয়াকে আনার জন্য বাবা দীপক কুমার গোপ ছুটে যান ছাদে। ঠিক সেই সময় গুলি এসে রিয়ার মাথার পেছনে লাগে।
আহত অবস্থায় রিয়াকে প্রথমে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় এবং সেখানে অস্ত্রোপচার করা হয়।

ডাক্তাররা রিয়াকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিউ) রাখেন। ২৪ জুলাই চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন এবং কারণ হিসেবে লেখেন ‘গানশট ইনজুরি’।
রিয়াকে হারিয়ে হাহাকার কাটেনি বাবা দীপকের। তিনি জানালেন, রিয়ার মা বিউটি ঘোষ এখনো মানসিক অবসাদে ভুগছেন। মেয়ে হারানোর যন্ত্রণা তিনি কাটিয়ে উঠতে পারেননি।
দীপক কুমার গোপ বলেন, “নিজের বাচ্চা হারানোর পর যেমন কাটে, তেমনই কাটছে দিন। মেয়েটা দুপুরে বাড়ির ছাদে গিয়েছিল খেলতে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গুলি এসে মাথায় লাগে।
“প্রতিটি মুহূর্তেই এই যন্ত্রণা ফিল করি। ওর মা মানসিক অবসাদে ভুগছে; অসুস্থ এখনো।”
‘যন্ত্রণা ভাষায় প্রকাশ করার মত না’
‘চলে আসুন ষোলশহর’ স্ট্যাটাস দিয়ে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটাবিরোধী আন্দোলনের মিছিলে গিয়েছিলেন চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম।
সেদিন দুপুর ২টার দিকে স্ট্যাটাস দেন ওয়াসিম, আর বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে তার মৃত্যুর খবর দেয় পুলিশ। সেদিন চট্টগ্রামে ওয়াসিমসহ তিনজনের মৃত্যু হয়।
চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান অনুষদে স্নাতক তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত ওয়াসিম চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি চকবাজার এলাকার একটি মেসে থাকতেন।
কক্সবাজার জেলার পেকুয়া সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ মেহেরনামা বাজার এলাকার প্রবাসী শফিউল আলমের মেজ ছেলে ওয়াসিম। ওয়াসিমের বাবা প্রবাসী, মধ্যপ্রাচ্যের কাতারে একটি কোম্পানিতে চাকুরি করেন।
ছেলে হারানোর শোক নিয়ে তার মা জোৎস্না বেগম বেশি কিছু বলতে পারলেন না। শুধু বললেন, “ছেলেকে হারিয়ে ফেলার এই যন্ত্রণা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না।”

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাই কমিশনারের দপ্তর থেকে প্রকাশিত এক তথ্যানুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে–শেখ হাসিনার সরকার ধারাবাহিকভাবে নৃশংস পদক্ষেপ নিয়ে পদ্ধতিগতভাবে বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা করেছিল। ওই সময়কালে, অর্থাৎ ১৫ জুলাই থেকে ৫ অগাস্ট পর্যন্ত, এক হাজার চারশোরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিক্ষোভ চলাকালে নিহতদের মধ্যে ৬৬ শতাংশ রাইফেলের গুলিতে, ১২ শতাংশ শটগানের গুলিতে এবং ২ শতাংশ পিস্তলের গুলিতে প্রাণ হারান।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আর কোনো গণআন্দোলন বা অভ্যুত্থানে এত মানুষ নিহত হয়নি। শহীদ আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধ, ওয়াসিমের মতো শত শত পরিবারের সদস্যরা বেঁচে আছেন স্বজন হারানোর তীব্র যন্ত্রণা আর স্মৃতি নিয়ে।