Published : 30 Aug 2026, 01:58 AM
শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারির একটি দেয়ালজুড়ে সাজানো ১৮টি ছবি। কোনোটিতে এক নারী ঘোমটার আড়াল থেকে হাতে ধরে আছেন স্বামীর ছবি, কোনোটিতে মা তুলে ধরেছেন সন্তানের সাদা-কালো পাসপোর্ট আকারের প্রতিকৃতি।
আবার কোনটিতে রাজপথে পুলিশের সাঁজোয়া ব্যারিকেডের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণের উঁচু করে ধরা প্ল্যাকার্ডে নিখোঁজ স্বজনের ছবি।
পুরো গ্যালারিজুড়ে এমন বহু ছবি নিয়ে শুরু হয়েছে আলোকচিত্র প্রদর্শনী ‘যতদিন না তারা ফিরছে’। প্রতিটি ছবিতে যেন জমে আছে ‘গুম’ হয়ে যাওয়া প্রিয়জনকে হারানোর যন্ত্রণা আর দীর্ঘ অপেক্ষার আক্ষেপ।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস ঘিরে শনিবার থেকে জাদুঘরে শুরু হয়েছে এ প্রদর্শনী, যা চলবে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। গত দেড় দশকে ‘গুম’ হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের স্মরণে এ আয়োজন হওয়ার কথা বলছেন আয়োজকরা।
প্রতিদিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রদর্শনীটি দেখা যাবে।
আলোকচিত্রী জীবন আহমেদ ও মোশফিকুর রহমান জোহানের তোলা ছবি নিয়ে সাজানো হয়েছে এ প্রদর্শনী।
বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালন করা হয় ৩০ অগাস্ট। এদিন বাংলাদেশেও বিভিন্ন আয়োজন রয়েছে।
‘যতদিন না ফিরছে’ শীর্ষক এ প্রদর্শনীর দেয়ালে লেখা রয়েছে, “এই প্রদর্শনীর প্রতিটি ছবি একটি অসমাপ্ত গল্প। একটি থেমে যাওয়া জীবন, প্রিয়জনদের বয়ে বেড়ানো এক জীবন্ত স্মৃতি, এমন একজন মানুষের প্রতিচ্ছবি, যার জন্য আজও অপেক্ষা, শোক, অনুসন্ধান চলছে।"
প্রদর্শনীর আয়োজনে ছিল ‘গুমের’ শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ এবং সমন্বয়ে ছিল অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ‘নেত্র নিউজ’। প্রদর্শনীর প্রোডাকশনে ছিলেন মো. আল ফরিদ ও পরিকল্পনায় হাদী উদ্দীন।
“স্কুল শেষ হয়ে যাচ্ছে, বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি”
প্রদর্শনীর উদ্বোধনী আয়োজনে বক্তব্য দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে গুমের শিকার পারভেজ হোসনের মেয়ে ঋদ্ধি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সে বলে, “এক যুগের বেশি হয়ে গেছে, এখন পর্যন্ত আমি আমার বাবার কোনো খোঁজ পাইনি। আমি জানি না বাবার খোঁজ পাব কি না। এ কথাটা বলতে বলতে আমার স্কুল জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আমার বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার স্বপ্নটা ছিল¬–এটা এখন পর্যন্ত পূরণ হয়নি। আমি জানি না এটা পূরণ হবে কি না।”
গুমঘরের বর্ণনা টেনে ঋদ্ধি বলে, “আয়নাঘর এটা কোনো ঘর না, এখানে মানুষ বেঁচে থাকা অসম্ভব। আমি জানি না আমার বাবা ওইখানে কীভাবে ছিল। আমাদের এইটুকু অধিকার আছে যে আমাদের বাবার, আমার বাবার শেষ পরিণতি কী হয়েছিল এটা জানার। আমরা এই গুম খুনের বিচার চাই! আমি জানি না আমার বাবা এখনও বেঁচে আছে কি না, কিন্তু আমি আমার বাবাকে ফেরত চাই। আমি আমার বাবার লাশ ফেরত চাই না!”
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গুম প্রতিরোধে নতুন আইন প্রণয়নের রূপরেখা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, প্রস্তাবিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ গুমের শিকার ব্যক্তিদের সরাসরি আদালতে গিয়ে ন্যায়বিচার ও প্রতিকার পাওয়ার পথ সুগম করবে।
তিনি বলেন, বলপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে না ফেলে সরাসরি আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ আমলে নিজের ‘গুমের’ অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন নয় বছর ভারতে থাকা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, “আমাদের স্বাধীনতা ও লড়াই ছিল মানুষের সাম্য, শান্তি ও আইনের শাসনের জন্য। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকেই গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছে। একদলীয় মানসিকতা ও বিরোধী দলকে সহ্য না করার রাজনৈতিক দর্শনই বিগত সরকারকে ফ্যাসিবাদী করে তুলেছিল “
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী, ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাসেম আরমান, মায়ের ডাকের অন্যতম সমন্বয়ক ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, আলোকচিত্রী শহীদুল আলম।