১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

শিশুর বিচার

কেন মায়ের কাছে যেতে চায় না জানতে চাইলে শিশুটি বলে, “মা আমাকে মারে। মা নিজেই আমারে দিয়ে দিছে।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

মামুন খান

Published : 15 May 2025, 01:40 AM

Updated : 01 Sep 2026, 11:46 AM

এক নজরে

কেন মায়ের কাছে যেতে চায় না জানতে চাইলে শিশুটি বলে, “মা আমাকে মারে। মা নিজেই আমারে দিয়ে দিছে।”

আদালত সিদ্ধান্ত দিয়েছিল, শিশুটি থাকবে মায়ের কাছে; কিন্তু আট বছর বয়সী শায়ান তাতে রাজি নয়। শেষমেষ সবাইকে এজলাস থেকে বের করে দিয়ে তার সঙ্গে একা কথা বলেন বিচারক। তাতে সিদ্ধান্ত পাল্টে যায়। মাকে অশ্রুতে ভাসিয়ে শায়ান এক মাসের জন্য তার বাবার কাছে চলে যায়। ঢাকার পঞ্চম অতিরিক্ত সহকারী জজ ও পারিবারিক আদালতের বিচারক নুসরাত জাহান খান বুধবার শায়ানকে ১৮ জুন পর্যন্ত তার বাবার জিম্মায় রাখার সিদ্ধান্ত দেন। শায়ান শিশুটির আসল নাম নয়। শিশুদের নিয়ে সংবাদ প্রকাশের নীতিমালা অনুযায়ী এই প্রতিবেদনে তার নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। তার বদলে শায়ান ছদ্মনামেই লেখা হচ্ছে। শায়ানের বাবা ও মায়ের বিয়ে হয়েছিল ২০১৫ সালের ১৫ জুন। আর শায়ানের জন্ম ২০১৭ সালে। বাবা ঢাকার উত্তরায় পোশাকের ব্যবসা করতেন। পারিবারিক অশান্তি থেকে স্ত্রীর সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয়। শায়ানের বাবার আইনজীবী ব্যারিস্টার সজীব মাহমুদ আলম জানান, বিচ্ছেদের পর পটুয়াখালীতে মায়ের সঙ্গে নানাবাড়িতে থাকছিল শায়ান। দিন পঁচিশেক আগে মা ৬০ টাকা হাতে দিয়ে তাকে বাসা থেকে ‘বের করে দেন’। একটি চিরকুটে বাবার ফোন নম্বর লিখে দিয়ে বলেন ‘চলে যা’। পটুয়াখালী শহরে গিয়ে শায়ান তার বাবাকে ফোন করে। পরে বাবা তার বোনকে সেখানে পাঠিয়ে শায়ানকে তার বাসায় নিয়ে যান। পর বাবা পটুয়াখালীতে গিয়ে সন্তানকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। এর পর থেকে শায়ান বাবার কাছেই ছিল। এর মধ্যে মা আদালতে গিয়ে বাচ্চাকে নিজের জিম্মায় ফেরত নিতে মামলা করেন। গত ১২ মে বিচারক আদেশ দেন, শায়ানকে তার মায়ের জিম্মায় ফেরত দিতে হবে। ব্যারিস্টার সজীব বলেন, “আদালত যেহেতু আদেশ দিয়েছে বাচ্চাকে মায়ের জিম্মায় ফেরত দিতে হবে, সেহেতু বাচ্চার বাবা আজ তাকে আদালতে নিয়ে আসে। বাচ্চার মাও আসে তাকে জিম্মায় নিতে। কিন্তু বাচ্চাটা মায়ের কাছে যেতে চায় না। “কোনোভাবে সে মায়ের কাছে যাবে না। আমরা বিপাকে পড়ে গেলাম। তখন আমরা আবেদনটা পুনর্বিবেচনার আবেদন করি। আদালত ক্যামেরা ট্রায়ালে বসে শুধু বাচ্চাকে নিয়ে। তার সাথে একা কথা বলে। বাচ্চাটা বলে, সে বাবার সাথে থাকতে চায়। তখন আদালত আগের আদেশ পুর্নবিবেচনা করে আগামী ১৮ জুন পর্যন্ত তাকে বাবার জিম্মায় রাখার আদেশ দেন।” এমন আদেশ শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন শায়ানের মা। ছেলেকে ‘সোনা, সোনা’ বলে ডাকতে থাকেন। বলেন, “আমি কত দিন ঘুমাইনি জানো? তুমি কতদিন আমার ঠোঁটে চুমো দেও না।” এ সময় ছেলেকে কাছে নিতে চান তার মা। কিন্তু শায়ান যেতে চায়নি। কেন যেতে চায় না জানতে চাইলে সে বলে, “মা আমাকে মারে। মা নিজেই আমারে দিয়ে দিছে।” কাঁদতে কাঁদতে মা বলেন, “২৫ দিনে আমার ছেলেটা চেইঞ্জ হয়ে গেছে। ওর বাবার শেখানো কথা বলতেছে।” শায়ান তখন বলে, “তুমিই তো আমাকে দিয়ে দিছ। বাবা কিছু শিখায়ে দেয়নি।” কান্নাজড়িত কণ্ঠে মা বলেন, “তোরে ছাড়া আমি ঘুমোতে পারি না। তুই আমার শরীরে পা না দিলে, জড়ায়ে না ধরলে ঘুমোতে পারি না। তুই মাকে আর এই জীবনে দেখবি না। আমি ওকে ছাড়া পটুয়াখালী যাব না। যাওয়ার সময় গাড়ির নিচে লাফ দেব।” মায়ের কথায় ভয় পেয়ে দূরে সরে যায় শায়ান। ছেলেটির বাবা বলেন, “ঢাকায় আসার পর থেকে ও আমাকে বলত, বাবা তুমি আমাকে আর মায়ের কাছে পাঠাবে না। আমাকে ফেলে দিও না। আমার মা আমাকে ফেলে দিছে, মারছে। দেখেন ওরে কেমনে মারছে। মাইরে পাঠায়ে দিছে।”