Published : 01 Apr 2026, 12:34 AM
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই, সাবেক চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আবদুল্লাহসহ চারজনের বিরুদ্ধে ছাত্রদল ও জাসাসের দুই নেতাকে ‘ক্রসফায়ারে হত্যার’ অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে।
বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে কথিত বন্দুকযুদ্ধের এ ঘটনায় মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনাল-২ চার আসামিকে বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে বলে ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন।
আগামী ১৫ এপ্রিল এ মামলার সূচনা বক্তব্য ও সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে।
চার আসামি হলেন বরিশাল-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ (৮২), বরিশালের তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) এ কে এম. এহসানউল্লাহ (৫৭), জেলার উজিরপুর থানার সাবেক দুই এএসআই মো. মাহবুবুল ইসলাম (৪৩) ও মো. জসিম উদ্দিন (৪৮)।
মামলার নথিপত্র ও প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রধান দুই অভিযুক্ত আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ও সাবেক এসপি এহসানউল্লাহ বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। তবে মাহবুবুল ইসলাম ও জসিম উদ্দিন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আটক আছেন।
‘ক্রসফায়ার’ প্রসঙ্গে প্রধান কৌঁসুলি সাংবাদিকদের বলেন, “এটি একটি ভয়াবহ অভিযোগ। নিহত টিপু হাওলাদার এবং কবির মোল্লা যথাক্রমে ছাত্রদল ও জাসাসের (জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা) রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাদের সঙ্গে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর রাজনৈতিক বিরোধ ছিল। এর জেরেই তিনি ওই দুজনকে 'ক্রসফায়ারে' হত্যার পরিকল্পনা করেন।
“পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ বরিশালের তৎকালীন এসপি এ কে এম এহসানউল্লাহকে নির্দেশনা দেন।”
এরপর একটি গাড়ি পোড়ানোর মামলায় টিপু ও কবিরকে গ্রেপ্তার করে প্রথমে ঢাকায় আনা হয়; সেখান থেকে ‘ক্রসফায়ারের’ উদ্দেশ্যে তাদের বরিশালে নেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি।
আমিনুল ইসলাম বলেন, “পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হলেও শুরুতে কয়েকজন সহকারী ও উপ-পুলিশ পরিদর্শক এই বেআইনি কাজে রাজি হননি। তবে পরবর্তীতে অন্যান্য আসামিদের নির্দেশে তারা রাজি হন।
“রাত দুইটার দিকে আগৈলঝাড়ার ভোদাল নামক স্থানে নিয়ে তাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং ক্রসফায়ারের নাটক সাজানো হয়।”
প্রধান কৌঁসুলি বলেন, ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে পুলিশ নিজেরাই তখন থানায় জিডি করেছিল এবং ময়নাতদন্ত করিয়েছিল। আর সেই নথিপত্রই এখন তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
“মজার বিষয় হল, ক্রসফায়ারে হত্যার পর তারা নিজেরাই জিডি করে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি ইনডাইরেক্টলি নথিপত্রে সংরক্ষণ করে গেছে। পোস্টমর্টেম রিপোর্টেও গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর কথা আছে। এভিডেন্স থেকে স্পষ্ট যে, এই দুজন পুলিশের ধৃত ছিল এবং পুলিশ হেফাজতে তাদের হত্যা করা হয়েছে,” বলেন আমিনুল ইসলাম ।
তিনি বলেন, “যেহেতু পুলিশের হেফাজতে দুইজন মানুষের গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে, অতএব কীভাবে তারা মারা গেল—ট্রাইব্যুনালে সেই ব্যাখ্যা দেওয়ার একক দায়িত্ব পুলিশের।
“আমরা বিশ্বাস করি, পুলিশের রেখে যাওয়া নথিপত্রের ভিত্তিতেই আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাওয়া সাক্ষ্যগ্রহণে এই মামলা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হবে।”
ঘটনার পর তৎকালীন পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, আগৈলঝাড়ায় পিকআপ ভ্যানে পেট্রলবোমা হামলা মামলার আসামি হিসেবে ঢাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে বরিশালে হাসানাত আব্দুল্লাহ মেজো ছেলে সেরনিয়াবাত মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহকে ঢাকার গুলশান থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের গোয়েন্দা (ডিবি)। তবে তার আরেক ছেলে বরিশালের সাবেক মেয়র ও তাকে প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না।
হাসানাত আব্দুল্লাহর ভাই বরিশালের সাবেক মেয়র খোকন সেরনিয়াবাতও আত্মগোপনে রয়েছেন।
সে বছরের নভেম্বরে হাসানাত আব্দুল্লাহসহ ৩৯ জনের বিরুদ্ধে বিএনপির সভায় হামলার অভিযোগ বরিশালে মামলা হয়েছে।
গত বছর অক্টোবরে সাবেক এই সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত’ ১৯ কোটি ৭১ লাখ ৮৩ হাজার ৭৫৯ টাকার সম্পদ অর্জন এবং বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ‘সন্দেহজনকভাবে’ প্রায় ৮০ কোটি ৪৯ লাখ টাকার লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়েছে।