Published : 22 Nov 2025, 11:51 PM
ছুটির দিনের সকালে মাঝারি মাত্রার যে ভূমিকম্প পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়ে গেল, তাকে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে উৎপত্তি হওয়া সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প বলছেন ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার।
তিনি বলছেন, “দুটো প্লেটের সংযোগস্থলে এ ভূমিকম্পটি হয়েছে, ইন্দো-বার্মা টেকটোনিক প্লেটে। কম্পনের তীব্রতা ছিল বেশ। প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।”
শুক্রবার ছুটির দিনের সকালে ১০টা ৩৮ মিনিটে এ ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫.৭; উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার পাশে নরসিংদীর মাধবদীতে।
২৬ সেকেন্ড স্থায়ী এ ভূমিকম্পে প্রাথমিকভাবে আতঙ্ক ছড়ায়, বাড়িঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসে মানুষ। এরপর আসতে থাকে প্রাণহানি আর ক্ষয়ক্ষতির তথ্য।
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার বলেন, “যে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি অনুভূত হয়েছে, দেশের পটভূমিতে সাম্প্রতিক সময়ে সর্বোচ্চ।”
বাংলাদেশের উত্তরে আছে ইন্ডিয়ান প্লেট এবং ইউরেশিয়ান প্লেটের সংযোগস্থল; পূর্বে বার্মিজ প্লেট ও ইন্ডিয়ান প্লেটের সংযোগস্থল। প্লেটগুলো গতিশীল থাকায় বাংলাদেশ ভূখণ্ড ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।
হুমায়ুন আখতার ভূমিকম্প নিয়ে কাজ করেছেন কয়েক দশক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপিত আর্থ অবজারভেটরির তত্ত্বাবধায়কও ছিলেন।
তিনি বলেন, “শক্তি লকড অবস্থায় ছিল, আটকে ছিল। এটা আনলকিং শুরু হয়েছে। এখন পরবর্তীকালে গ্যাপ দিয়ে আবার ভূমিকম্প হতে পারে।
“সেক্ষেত্রে একমাত্র উপায় হচ্ছে মহড়া। ভূমিকম্পের সময় দুয়েক কদমের মধ্যে নিরপদ জায়গায় চলে যাওয়া, প্রশিক্ষণ নেওয়া। দেশের যে অবকাঠামোম তা তো পরিবর্তন করা যাবে না। একমাত্র উপায় মহড়া।”
অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে ঢাকায় ঝুঁকির মাত্রা সবসময় বেশি জানিয়ে হুমায়ুন আখতার বলেন, “ঢাকার এত কাছে গত কয়েক দশকে বড় ভূমিকম্প হয়নি। কয়েক জেনারেশন এরকম ভূমিকম্প দেখেনি।”
দেশের ইতিহাসে বড় ভূমিকম্প
দেশে সাম্প্রতিক সময়ে হালকা ও মাঝারি মাত্রার বেশ কয়েকটি ভূমিকম্প হলেও সেগুলোর কোনোটিই মাত্রার দিক দিয়ে শক্তিশালী বা প্রলয়ঙ্করী ছিল না।
তবে গত তিনশ বছরে সেরকম কয়েকটি ভূমিকম্প ঘটেছে, সেগুলোর উৎপত্তিস্থল দেশের ভেতরে বা আশপাশের এলাকায় ছিল।
১৭৬২ সাল, টেকনাফ
টেকনাফ থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত প্রায় ৪০০ কিলোমিটার বিস্তৃত ফল্ট লাইনে ১৭৬২ সালে ৮.৫ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়।
ওই ভূমিকম্পেই সেন্টমার্টিন দ্বীপ প্রায় তিন মিটার ওপরে উঠে আসে; আগে সেটি ছিল ডুবন্ত দ্বীপ।
সেবার সীতাকুণ্ডে পাহাড়ে নিচ থেকে কাদা–বালুর উদগীরণ ঘটে, বঙ্গোপসাগরে বিশাল আকারের ঢেউ তৈরি হয়ে বহু ঘরবাড়ি ভেসে যায়, প্রায় ২০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
সেই ভূমিকম্প ব্রহ্মপুত্র নদীর গতিপথ বদলে দেয়।
১৮৬৯ সাল, শিলচড়
রিখটার স্কেলে ৭.৫ মাত্রার এ ভূমিকম্প ‘কাচার আর্থকোয়াক’ নামে পরিচিতি পায়। এর উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেটের খুব কাছে জৈন্তা পাহাড়ের উত্তরাংশে অবস্থিত শিলচড়ে।
সেই ভূমিকম্পে শিলচড়, নওগাং ও ইম্ফল এলাকায় বহু স্থাপনা ধসে পড়ে। তবে প্রাণহানির সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি।
১৮৮৫ সাল, মানিকগঞ্জ
১৮৮৫ সালের ১৪ জুলাই এ ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৭, উৎপত্তিস্থল ছিল মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায়।
ভারতের সিকিম, বিহার, মনিপুর ও মিয়ানমার পর্যন্ত এর কম্পন অনুভূত হয়। ঢাকা, বগুড়া, ময়মনসিংহ, শেরপুর এবং পাবনায় প্রাণহানি ঘটে।
১৮৯৭ সাল, শিলং
‘গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক’ নামে পরিচিত এ ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৮.৭। উৎপত্তিস্থল ছিল মেঘালয়ের শিলং অঞ্চল।
সেই ভূমিকম্পে দেড় হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়, সিলেটেই প্রাণহানির সংখ্যা ছিল পাঁচ শতাধিক। সিলেটের বহু বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়, ময়মনসিংহ এবং দেশের উত্তরাঞ্চলেও ব্যাপক ক্ষতি হয়।
সেবার বিভিন্ন এলাকায় ফাটল দেখা দেয় এবং সুরমা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর গতিপথে প্রভাব পড়ে।
১৯১৮ সাল, শ্রীমঙ্গল
১৯১৮ সালের এ ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৭.৬, উৎপত্তিস্থল ছিল শ্রীমঙ্গলের বালিছড়া।
সেবার শ্রীমঙ্গল ও ভারতের ত্রিপুরা অঞ্চলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়, তবে প্রাণহানির সংখ্যা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
১৯৯৭ সাল, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামে ৬.১ মাত্রার এ ভূমিকম্পে ২৩ জনের মৃত্যু হয়, তবে ক্ষয়ক্ষতি খুব বেশি হয়নি।
১৯৯৯, মহেশখালী
মহেশখালীতে এ ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫.২, সেবার অন্তত ছয়জনের মৃত্যু হয়।