Published : 18 Aug 2025, 10:08 PM
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ ইমাম হাসান তায়িম ভূঁইয়ার মৃত্যুদৃশ্যের ভিডিও দেখে কান্নায় ভেঙে পড়লেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে আসা বড় ভাই রবিউল আওয়াল ভূঁইয়া।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নতকোত্তরের ছাত্র রবিউল (২৫) সোমবার ট্রাইব্যুনাল-১ এ সাক্ষ্য দেন এবং ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনার বিবরণ শোনান।
নারায়ণগঞ্জের সরকারি আদমজী নগর এমডব্লিউ কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র ইমাম হাসান তাইম ভূঁইয়া ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা ফুটব্রিজের কাছে পুলিশের গুলিতে নিহত হন।
বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের এ ট্রাইব্যুনালে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং তখনকার আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এদিন তিন জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়।
সাক্ষ্যে আওয়াল বলেন, গত বছর তিনি সিলেটে এবং তার ছোট ভাই ইমাম হাসান তায়িম ভূঁইয়া ঢাকার যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন।
“১৬ থেকে ১৯ তারিখ পর্যন্ত সে সারাদিন আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। আমার মা তার ব্যাগ নিয়ে কাছাকাছি বসে থাকত। ১৯ জুলাই রাত্রে সরকার কারফিউ জারি করে। ২০ জুলাই দুপুর ১২টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল ছিল।”
এর মধ্যে চা খাওয়ার কথা বলে তায়িম বাইরে গিয়ে আন্দোলনে যোগ দেয় জানিয়ে আওয়াল বলেন, “ওই সময় তাকে আমি দুইবার কল দিয়েছি, কিন্তু সে রিসিভ করেনি। আনুমানিক ১২টা ৩১ এর দিকে তার ফোনে কল দিলে ফোনটি বন্ধ পাই। আনুমানিক ১২টা ৫০ এর দিকে আমি আম্মুকে ফোন দিলে তিনি জানান, বাড়িওয়ালা তায়িমের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর দিয়েছে।
“আমার আম্মা ঘটনাস্থল অর্থাৎ কাজলা ফুটব্রিজের পাশে তায়িমের জুতা এবং রক্ত দেখতে পান। সেখানে উপস্থিত লোকজন আমার মাকে বলেন – ‘আপনার ছেলেকে ভ্যানে করে পুলিশ যাত্রাবাড়ী থানার দিকে নিয়ে গেছে’।”
তায়িমের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর শুনে আওয়াল তার খালা শাহিদা আক্তারকে জানালে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান। সেখানে খোঁজাখুঁজির পর তায়িমকে না পেয়ে একজন সাংবাদিককে তায়িমের ছবি দেখালে তিনি বলেন, যে তায়িমকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
পরদিন তার বাবা লাশ গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় নিয়ে যান। আওয়ালও সিলেট থেকে কুমিল্লায় গ্রামের বাড়িতে যান। সেখানে ২১ জুলাই রাতে তায়িমকে দাফন করা হয়।
আওয়াল বলেন, “আমার আব্বার কাছ থেকে জানতে পারি, আমার ছোট ভাইয়ের শরীরে দুইশর মত ছররা গুলি লেগেছিল।”
তাদের বাবা ময়নাল হোসেন ভূঁইয়া পুলিশের একজন জ্যেষ্ঠ সাব ইন্সপেক্টর বলে জানান সাক্ষী আওয়াল।
ওইদিন ঘটনার বিবরণ দিয়ে আওয়াল বলেন, তায়িমের বন্ধুদের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন পুলিশ টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলি করলে সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। তায়িম তার দুইজন বন্ধুসহ কাজলা ফুটব্রিজের পাশে লিটনের চায়ের দোকানে আশ্রয় নেন।
“পুলিশ সেখান থেকে তাদের তিনজনকে টেনে বের করে এবং বেধড়ক মারধর করে। পুলিশ তাদের গালি দিয়ে দৌড় দিতে বলে। তায়িম প্রথমে দৌড় দেয়। তখন তায়িমের পায়ে একজন পুলিশ সদস্য গুলি করে। সে পিছন ফিরে তাকালে তখন তার শরীরের নিম্নাংশে আরেকটি গুলি করা হয়। গুলিটি সামনের দিকে প্রবেশ করে পিছন দিয়ে বের হয়ে যায়।”
তায়িমকে শটগান দিয়ে আরও অনেক গুলি করা হয় জানিয়ে আওয়াল বলেন, তার বন্ধু রাহাত তাকে পিছন দিয়ে ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল তাকে বাঁচানোর জন্য। তখন পুলিশ রাহাতকেও গুলি করে এবং তাকে বাধ্য করে তায়িমকে ফেলে রেখে যেতে।
“রাহাত চলে যাওয়ার পরও আধাঘণ্টা পর্যন্ত তায়িম ওখানে পড়ে ছিল। তায়িম ওখানে পড়ে কাতরাচ্ছিল এবং আকুতি করছিল ‘আমাকে বাঁচান, বাঁচান’ বলে।
“সাংবাদিকসহ উপস্থিত অনেকেই তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু পুলিশ সদস্যরা তাকে নিতে দেয়নি। বরং তারা তার মৃত্যু উপভোগ করছিল। ওখান থেকে ২০ গজের মধ্যে রাস্তার দুপাশে দুটি হাসপাতাল ছিল। আধা ঘণ্টা পরে পুলিশ ভ্যানে করে তাকে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে নিয়ে ভ্যান থেকে মাটিতে নামিয়ে ৫/৬ জন পুলিশ বুট জুতা দিয়ে তাকে মাড়িয়ে তার চেহারা বিকৃত করে ফেলে।”
ওই পুলিশদের মধ্যে এডিসি শামিম, এডিসি মাসুদুর রহমান মনির, এসি নাহিদ ছিলেন বলে আওয়ালের ভাষ্য।
তিনি বলেন, “যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন সাব-ইন্সপেক্টর সাজ্জাদুজ্জামান প্রথম পায়ে গুলি করেন। পরে এডিসি শামিম আরেকজনের হাত থেকে অস্ত্র নিয়ে তায়িমের শরীরের নিম্নাংশে গুলি করেন। তারপর ওসি তদন্ত জাকির হোসেন অনেকবার গুলি করেন।”
ঘটনাস্থলে তখন ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, যুগ্ম কমিশনার প্রলয়, ডিসি ইকবাল, এডিসি মাসুদুর রহমান মনির, এসি নাহিদ, এসি তানজিল, ওসি আবুল হাসান, ওসি অপারেশন ওয়াহিদুল হক মামুনসহ ১০/১৫ জন পুলিশ সদস্য থাকার তথ্য পেয়েছেন বলে আদালতকে জানান আওয়াল।
তিনি বলেন, পরে কেউ একজন ভ্যানে করে তায়িমকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ সময় ২৬ জুলাই সংঘটিত ওই ঘটনার ভিডিও ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শন করা হয়। আওয়াল এ সময় তার ভাইকে দেখিয়ে শনাক্ত করেন এবং দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকেন।
তিনি বলেন, “২৮ জুলাই আমরা প্রথমে পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমানের কাছে গিয়েছিলাম মামলা করার জন্য। তিনি আমাদের সাথে দেখা করেননি। তারপর যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা করতে গিয়েছিলাম, থানায় মামলা নেয়নি। বলেছে পুলিশ মামলা করবে। তখন আমি বলেছি, পুলিশ মামলা করলে সে মামলা করার দরকারে নেই।”
গত ১০ জুলাই এ মামলায় শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
আন্দোলন দমনে ১৪০০ জনকে হত্যার উসকানি, প্ররোচনা ও নির্দেশ দান, ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসেবলিটি’ এবং ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজের’ মোট পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে এ মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে।
তিন আসামির মধ্যে কেবল সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। তিনি রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন করায় আদালত তা মঞ্জুর করেছে।
শেখ হাসিনা এবং আসাদুজ্জামান খান কামালকে পলাতক দেখিয়ে মামলার বিচার চলছে।