Published : 03 Feb 2026, 09:23 PM
দেশে নতুন করে শিক্ষা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে আইন কার্যকর হওয়ার তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে কোচিং, নোটগাইড ও শিক্ষকদের টিউশনি ‘স্থায়ীভাবে’ বন্ধের কথা বলা হচ্ছে।
খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, এ আইন প্রবর্তনের পর সরকার কোচিং সেন্টার, নোট-গাইড ও প্রাইভেট টিউশনি ‘নিয়ন্ত্রণে’ বিধিমালা করবে এবং সংশ্লিষ্টদের ধারবাহিকভাবে নিরুৎসাহিত করার মাধ্যমে তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে এসব স্থায়ীভাবে বন্ধের কাজ শুরু করবে।
একইসঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীকে ‘শারীরিক শাস্তি’ দেওয়া এবং ‘মানসিক নিপীড়ন’ নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। যদিও ‘মঙ্গল বিবেচনায়’ ও ‘শৃঙ্খলা রক্ষায়’ যৌক্তিক ক্ষেত্রে শিক্ষক অনুশাসন করতে পারবেন বলে খসড়ায় বরঅ হয়েছে।
রোববার রাতে ওয়েবসাইটে শিক্ষা আইনের খসড়া প্রকাশ করে মতামত আহ্বান করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৫টার মধ্যে ই-মেইলে ([email protected]) এ মতামত চাওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের যুগ্মসচিব (নিরীক্ষা ও আইন অনুবিভাগ) জহিরুল ইসলাম সোমবার রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সবার মতামত সংগ্রহের পর আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার মাধ্যমে খসড়া আইনটি চূড়ান্ত করা হবে। এরপর ধাপে ধাপে তা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের জন্য পাঠানো হবে।”
২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নের পর পরের বছর শিক্ষা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু দীর্ঘ দেড় দশকেও তা আলোর মুখ দেখেনি।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, আইনের খসড়া কয়েকবার চূড়ান্ত করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছিল। মন্ত্রিসভার বৈঠকে কয়েক দফা উপস্থাপিত হলেও বিভিন্ন পর্যবেক্ষণসহ বরাবরই তা ফেরত পাঠানো হয়।
সবশেষ ২০১৮ সালে শিক্ষা আইনের খসড়া মন্ত্রিপরিষদে পাঠানো হলে শিক্ষা সংক্রান্ত সব আইন সমন্বয় করে নতুন করে আইনের খসড়া তৈরির পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল মন্ত্রিসভা। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শিক্ষা আইনের খসড়া প্রস্তুত করল শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
বর্তমানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করে নির্দিষ্ট কোনো আইন কার্যকর নেই। তবে ২০১১ সালের ২১ এপ্রিল জারি করা এক পরিপত্রে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি না দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর পরও শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে হরহামেশাই।
শিক্ষা আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষক কোনো শিক্ষার্থীকে কোনো ধরনের শারীরিক শাস্তি দিতে বা মানসিক নিপীড়ন করতে পারবেন না। এ বিধান লঙ্ঘন করলে তা অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
তবে শিক্ষার্থীর মঙ্গল বিবেচনায় কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার স্বার্থে শিক্ষক শিক্ষার্থীকে যৌক্তিক ও মানবিক শৃঙ্খলামূলক ‘অনুশাসন’ দিতে পারবেন। সেক্ষেত্রে বিষয়টি অভিভাবককেও জানাতে পারবেন।
খসড়া আইনে বলা আছে, আইন প্রবর্তনের তিন অথবা পাঁচ বছরের মধ্যে কোচিং সেন্টার স্থাপন এবং সহায়ক বই (নোট বা গাইড বই) প্রকাশের কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর আগে কোচিং সেন্টার, সহায়ক বই ও প্রাইভেট টিউশন নিয়ন্ত্রণে বিধিমালা প্রণয়ন করে এসব কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে নিরুৎসাহিত করা হবে।
খসড়া আইনে প্রাথমিক শিক্ষা প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ঠিক করা হয়েছে। যদিও জাতীয় শিক্ষানীতি–২০১০–এ প্রাথমিক স্তর প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত রাখার সুপারিশ ছিল। খসড়ায় সব শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা এবং এ শিক্ষাকে শিশুর অধিকার হিসেবে গণ্য করার কথাও বলা হয়েছে।
মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা বিষয়ে খসড়ায় বলা হয়েছে, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি হবে মাধ্যমিক স্তর এবং একাদশ–দ্বাদশ শ্রেণি হবে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর। মাধ্যমিক শিক্ষায় তিনটি ধারা থাকবে—সাধারণ শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা।
কওমি শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকার কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা কার্যক্রমের মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলেও খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে।
শিক্ষা আইন–২০২৬ বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় শিক্ষা অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠা করার কথা খসড়ায় বলা হয়েছে। এ অ্যাকাডেমি শিক্ষার গুণগতমান উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, শিক্ষা গবেষণা, উদ্ভাবন, নীতিগত সহায়তা প্রদান, পাঠ্যক্রম মূল্যায়ন এবং শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে সরকারকে পরামর্শ দেবে।
এ ছাড়া খসড়া আইনে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া) পরিদর্শন ও তদারকি, ব্যবস্থাপনা বা পরিচালনা কমিটির পাঠদানে হস্তক্ষেপ না করা, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি মেলার আয়োজন, মাতৃভাষার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি নম্বর চালুর কথা বলা হয়েছে।
আইনের খসড়ায় বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষকদের জন্য নিজ নিজ ক্ষেত্রে গবেষণা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগে কেন্দ্রীয় গবেষণাগার ও জাতীয় গবেষণা পরিষদ গঠনের কথাও বলা হয়েছে।
পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থানের চেতনা, সৎসাহস ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধকরণ, সামাজিক ও ধর্মীয় চেতনা এবং নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত করার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার কথা খসড়া আইনে বলা হয়েছে।