Published : 09 Oct 2025, 07:49 PM
সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান হেফজুল বারী মোহাম্মদ ইকবাল (এইচ বি এম ইকবাল) ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ‘অবৈধ সম্পদ’ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান শেষ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক।
অনুসন্ধানের ভিত্তিতে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সাবেক এই এমপি ও তার বড় ছেলে ইমরান ইকবালের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন দিয়েছে কমিশন।
এছাড়া, ইকবালের স্ত্রী ও ছোট ছেলে অবৈধ সম্পদ অর্জন করে থাকতে পারেন—এমন সন্দেহে তাদের সম্পদ বিবরণী দাখিলের আদেশ জারির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, “দুদক আইন অনুযায়ী, তাদের বিরুদ্ধে মামলা ও সম্পদ বিবরণী দাখিলের বিষয়ে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।”
অনুসন্ধানের রাতে দুদক বলছে, ডা. ইকবালের ৬২ কোটি টাকার ও তার বড় ছেলে ইমরানের ৫ কোটি টাকার ‘অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রমাণ’ মিলেছে।
দুদকের সহকারী পরিচালক মো. ফেরদৌস রহমানের নেতৃত্বে গঠিত একটি দল এই অনুসন্ধান পরিচালনা করেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ইকবাল, তার স্ত্রী আঞ্জুমান আরা শিল্পী, সন্তান মঈন উদ্দিন ইকবাল, ইকরাম ইকবাল, নওরীন ইকবাল এবং জামাতা জামাল জি আহমেদের সব ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করে।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে, ওই অবরুদ্ধ হিসাব থেকে ২৮৭ কোটি টাকা উত্তোলনের চেষ্টা আটকে দেয় বিএফআইইউ।
দুদক ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, ইকবাল ও তার পরিবারের সদস্যরা বর্তমানে দেশে নেই এবং তারা বিদেশে অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর আর্থিক খাতে সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন শুরু করে।
সে সময় ইকবাল স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগপত্র জমা দেন, যা দুদিন পর গ্রহণ করা হয়। তার সঙ্গে ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ছেলে মঈন ইকবালও কোনো কারণ না দেখিয়ে পদত্যাগ করেন।
পিতা-পুত্র দুজনই পরিচালক পদ থেকেও সরে দাঁড়ান। পরে তার আরেক ছেলে মোহাম্মদ ইমরান ইকবাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে বসেন।
ব্যাংকিং মহলের মতে, ইকবাল নিজের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে কৌশলে ব্যাংক পর্ষদে পরিবারের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চেয়েছিলেন।
তবে ২০২৫ সালের ১৯ আগস্ট, প্রিমিয়ার ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ‘সুশাসনের ঘাটতি’ দেখিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক তা বিলুপ্ত করে দেয়। এর মাধ্যমে সাবেক সংসদ সদস্য ইকবালের পরিবারের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে শেষ হয় প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকে।
অনুসন্ধানের বরাতে দুদক বলছে, ইকবালের নামে মোট ২৯৮ কোটি ৭০ লাখ ৮৩ হাজার ১৫৯ টাকার সম্পদ রয়েছে। এর বিপরীতে তার দায় ১৩৯ কোটি ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৫৯৪ টাকা। দায় বাদে তার নিট সম্পদ দাঁড়ায় ১৫৯ কোটি ৬৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫৬৫ টাকা।
তিনি বিভিন্ন খাতে মোট ১৯০ কোটি ৬৫ লাখ ২৫ হাজার ৫৬২ টাকার আয় প্রদর্শন করেছেন। পারিবারিক ও অন্যান্য খরচ বাদে তার নিট আয় পাওয়া যায় ৯৭ কোটি ৪১ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৩ টাকা। এতে দেখা যায়, ঘোষিত আয়ের তুলনায় ৬২ কোটি ২৪ লাখ ৯৪ হাজার ৭৮২ টাকার সম্পদ ‘জ্ঞাত আয়ের উৎসের বাইরে’ অর্জিত হয়েছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে দুদক আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারা অনুযায়ী ইকবালের বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমোদন দিয়েছে কমিশন।
ইকবালের বড় ছেলে ইমরান ইকবালের নামে ৪৫ কোটি ৭৩ লাখ ১০ হাজার ৩৯৭ টাকার সম্পদ পাওয়া গেছে। তার ঘোষিত মোট আয় ৪৬ কোটি ৯৭ লাখ ৬৯ হাজার ৯১০ টাকা, যার বিপরীতে পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয় ৬ কোটি ২৭ লাখ ৬৮ হাজার ৯৫০ টাকা। সব বাদ দিয়ে তার নিট আয় দাঁড়ায় ৪০ কোটি ৭০ লাখ ৯৬০ টাকা। এর বাইরে তার ৫ কোটি ৩ লাখ ৯ হাজার ৪৩৭ টাকার সম্পদ রয়েছে, যার ‘বৈধ উৎস’ মেলেনি।।
এ ঘটনায় দুদক আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারা অনুযায়ী ইমরান ইকবালের বিরুদ্ধেও পৃথক মামলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানের বরাতে দুদক বলছে, ইকবালের স্ত্রী আঞ্জুমান আরা শিল্পীর নামে ১০ কোটি ৮২ লাখ ২২ হাজার ৮৬৬ টাকার সম্পদ পাওয়া গেছে। তার নিট আয় পাওয়া গেছে ১০ কোটি ৪৪ লাখ ৫৫ হাজার ৪৮৮ টাকা। অর্থাৎ ৩৭ লাখ ৬৭ হাজার ৩৭৮ টাকার সম্পদের ‘অসঙ্গতি’ পাওয়া গেছে।
তার প্রকৃত সম্পদ ও আয়ের উৎস যাচাইয়ে দুদক আইন, ২০০৪-এর ২৬(১) ধারা অনুযায়ী সম্পদ বিবরণী দাখিলের আদেশ জারির অনুমোদন দিয়েছে কমিশন।
ইকবালের ছোট ছেলে মঈন ইকবালের নামে ৪৭ কোটি ৭০ লাখ ২ হাজার ৮৭ টাকার সম্পদ পাওয়া গেছে।
তার মোট আয় ৫৪ কোটি ১৯ লাখ ৪১ হাজার ৩৮৪ টাকা এবং ব্যয় ৬ কোটি ৮০ লাখ ৮৯ হাজার ৭৩৯ টাকা। অর্থা’ ব্যয় বাদে মঈনের নিজ আয় দাঁড়ায় ৪৭ কোটি ৩৮ লাখ ৫১ হাজার ৬৪৫ টাকা।
তার এই বাড়তি ৩১ লাখ ৫০ হাজার ৪৪২ টাকার সম্পদ জ্ঞাত আয়ের উৎসবহির্ভূত হিসেবে প্রমাণ পাওয়ার তথ্য দিয়ে দুদক বলেছে, এই কারণে তার সম্পদের হিসাব যাচাই করা দরকার।
তাই, দুদক আইন, ২০০৪-এর ২৬(১) ধারা অনুযায়ী মঈন ইকবালের বিরুদ্ধেও সম্পদ বিবরণী দাখিলের আদেশ অনুমোদন দেওয়ার কথা বলেছে কমিশন।
জেম/এসবি
আগের খবর:
প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকে ফের ২৮৭ কোটি টাকা তোলার চেষ্টা ইকবালের, আটকে দিল বিএফআইইউ
২৬ বছর পর প্রিমিয়ার ব্যাংকের পর্ষদ ডা. ইকবালের পরিবার মুক্ত