Published : 25 Jun 2026, 01:45 PM
তেতাল্লিশতম বিসিএস পরীক্ষার নন-ক্যাডার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রচলিত আইনের ‘ব্যত্যয়’ ঘটানো হয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি ‘অস্বচ্ছ’ ছিল বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে হাই কোর্ট।
আগামী ৬০ দিনের মধ্যে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের নতুন মেধা তালিকা প্রকাশ করে পুনরায় নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকার ও বিচারপতি উর্মি রহমানের হাই কোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করে।
বিসিএসে চূড়ান্ত ভাইভা দিয়েও নিয়োগ না পাওয়া ৪৬৫ জন প্রার্থীর করা এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালতের এ রায় এল।
আদালতে রিট আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির পল্লব। সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মুনিরুজ্জামান।
রায়ের পর পল্লব বলেন, ২০২০ সালে একটি সার্কুলার দিয়ে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন ক্যাডার ও নন-ক্যাডার পদে নিয়োগের জন্য আবেদনপত্র আহ্বান করে। সেখানে ৪ লাখ ৩০ হাজারের মত আবেদন জমা পড়ে। সেখান থেকে ৯ হাজার ৮০০ এর মত পরীক্ষার্থী সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, তাদের ভাইভায় ডাকা হয়।
রিটকারী ৪৬৫ জন প্রার্থীও সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে চূড়ান্ত ভাইভা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিলেন জানিয়ে তাদের আইনজীবী বলেন, "আমাদের নন-ক্যাডার পদে নিয়োগ বিশেষ বিধিমালা ২০১০ এবং পরবর্তীতে বিধিমালা ২০২৩ অনুযায়ী তাদেরকে একটি মেধা তালিকা প্রকাশ করতে হবে এবং মেধা তালিকার ভিত্তিতে তাদেরকে পছন্দক্রম আহ্বান করতে হবে। পছন্দক্রম আহ্বানের ভিত্তিতে সরকার কর্তৃক যে অধিযাচিত পদগুলো থাকবে, পিএসসির দায়িত্ব হল সেই পদগুলোতে এই কোয়ালিফায়েড ক্যান্ডিডেটদের রিকমেন্ড করা।"
কিন্তু পিএসসি এই আইনি প্রক্রিয়ার ‘সম্পূর্ণ ব্যত্যয় ঘটিয়েছে’ দাবি করে তিনি বলেন, "পুরো বিষয়টি আজকে আদালতের সামনে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, এই ৪৩তম বিসিএস-এ নন-ক্যাডার প্রার্থীদের যেই নিয়োগ প্রক্রিয়া, তাদের এই নিয়োগ প্রক্রিয়াটা অস্বচ্ছ ছিল। এবং আদালত স্পষ্টভাবে মন্তব্য করেছেন, তারা প্রচলিত আইনকে ডেভিয়েট করে ব্যত্যয় ঘটিয়ে এই ৪৩তম বিসিএস নন-ক্যাডার যে নিয়োগ প্রক্রিয়া সেটি করেছেন।"
আইনজীবী পল্লব বলেন, “যেহেতু নন-ক্যাডার পদে প্রার্থীদের মেধা তালিকা প্রকাশ করে তার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার সুস্পষ্ট বিধানের ব্যত্যয় ঘটেছে এবং কার্যক্রম অস্বচ্ছভাবে হয়েছে, সেহেতু এই ৪৩তম নন-ক্যাডার ক্যান্ডিডেটদের যেই তালিকা, অর্থাৎ উত্তীর্ণ প্রার্থীদের তালিকা, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে তা প্রকাশ করে নিয়োগ প্রক্রিয়া পুনরায় সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।”
ইতোমধ্যে নন-ক্যাডারে যে ৬৪২ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে, তাদের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রিটকারীদের আইনজীবী বলেন, "যারা অলরেডি নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের বিষয়টি আমরা এখানে চ্যালেঞ্জ করেছিলাম, বাট আমরা বলেছি তারা যেহেতু জয়েন করেছে, তারা যদি নিয়ম অনুযায়ী পেয়ে থাকে, তাহলে আমাদের কোনো অবজেকশন নাই। তবে যদি স্বচ্ছ প্রক্রিয়া করতে গিয়ে তাদের নিয়োগ বাতিল হয়ে যায়, তাহলে সেই সম্ভাবনা কিন্তু রয়েই গেছে।"
৬৪২ জনের নিয়োগ ‘অস্বচ্ছ’ হয়েছে কিনা—এমন সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাবে আইনজীবী বলেন, "না, ৬৪২ না। টোটাল নিয়োগ প্রক্রিয়াটাই অস্বচ্ছ হয়নি, এইটা বলেছেন (আদালত)।"
যাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই রায়, সেই ৪৬৫ জন প্রার্থীর বিষয়ে আদালত কী বলেছেন জানতে চাইলে আইনজীবী বলেন, "এই অধিযাচিত পদের জন্য যে বিধি-বিধান রয়েছে, সেই বিধি-বিধান অনুযায়ী এবং পরীক্ষায় যদি তারা এলিজিবল হয়, অর্থাৎ তারা কোয়ালিফায়েড হয়, তাদের বিষয়টি এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে পিএসসি কনসিডার করবে, অর্থাৎ বিবেচনায় নেবেন।"
তিনি বলেন, "অন্য যে পোস্টগুলো আছে, এখানে প্রায় ১২ হাজার পোস্ট আছে, সেই ১২ হাজার পোস্টের মধ্যে আমাদের এখানে ৪৬৫ জন হল ক্যান্ডিডেট, পিটিশনার, তাদের বিষয়টি কনসিডার করার জন্য আদালত নির্দেশ দিয়েছেন।"
এই প্রার্থীদের সরকারি চাকরির বয়স ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে বলেও জানান এই আইনজীবী।
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পিএসসির এমন ভূমিকায় মেধাবীরা ‘নিরুৎসাহিত হবে’ মন্তব্য করে আইনজীবী পল্লব বলেন, “সরকারিভাবে এবং সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত একটি প্রতিষ্ঠান যদি এইভাবে অস্বচ্ছভাবে, অন্যায়ভাবে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে, তাহলে আমাদের দেশের মেধার বৃদ্ধি হবে না, মেধা বিকাশ হবে না, মেধাবীরা আমাদের সরকারি চাকরিতে আর আবেদনই করবে না।
“এই বিষয়টি আমরা আদালতে তুলে ধরেছি এবং এটি আজকের মাননীয় আদালতের রায়ে সুস্পষ্টভাবে এসেছে যে, এটি মেধার ভিত্তিতে হয়নি।”
বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) আইনজীবী মনিরুজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আদালত কাউকে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া বা সুপারিশ করার বিষয়ে কিছু বলেননি। আইন অনুযায়ী সুপারিশ করার বিষয়টি পিএসসিকেই করতে বলেছেন।
রায়ের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “হাই কোর্ট রুলটি অ্যাবসলিউট (যথাযথ) বা ডিসচার্জ (খারিজ) করেননি। শুধুমাত্র ৬০ দিনের মধ্যে রেজাল্ট পাবলিশ করার নির্দেশনা দিয়ে রুলটি ডিসপোজড অফ (নিষ্পত্তি) করেছেন।”
রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের বিষয়ে তিনি বলেন, “রায়ের নকল তুলে পিএসসির সাথে আলোচনা করা হবে। এরপর তারা যদি রায়ে সংক্ষুব্ধ হয়, তবে আপিলের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে।”