Published : 24 Sep 2024, 02:35 AM
বর্ষার শেষে শরতের শুরুতে সম্প্রতি দেশের পূর্বাঞ্চলের ১১টি জেলা, যার মধ্যে বিশেষ করে ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালীতে যে ভয়াবহ বন্যা দেখা গেল, সেই পরিস্থিতির এখনও অবসান হয়নি।
এসব অঞ্চলের খাল-বিল আর শাখা নদীগুলো তথা সব ধরনের জলাধারের বেশিরভাগই দখল হয়ে যাওয়ায় প্রায় মাস পেরিয়ে গেলেও পানি নামেনি পুরোপুরি।
বন্যা উপদ্রুত ১১ জেলাজুড়ে এখন ভেসে উঠেছে ক্ষতচিহ্ন; যা আছে তাই নিয়ে, সরকারি-বেসরকারি সহায়তা যতটুকু মিলছে, সেসবের ওপর ভর করে সেখানকার মানুষ ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে। তবে পানি পুরোপুরি মেনে গেলে হয়ত এতদিনে আরেকটু কর্মচাঞ্চল্য বাড়তো বানভাসা বিস্তৃর্ণ জনপদে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আগেও বন্যা ছিল। এটা আনকমন না, আনকমনটা হল- এবার বন্যার এতদিন পরেও পানি আটকে থাকাটা। এর মূল কারণ হচ্ছে, জলাধারগুলোর ন্যাচারাল প্রবাহ বা আন্তঃসংযোগ নষ্ট হয়ে গেছে।”
বন্যা উপদ্রুত জেলার বাসিন্দারাও এই অধ্যাপকের সুরেই বলছেন, বন্যার পানি এত দিন আটকে থাকার জন্য খাল, শাখা নদী ও জলাধারগুলো ভরাট হওয়া এবং সেগুলোর আন্তঃসংযোগ বন্ধ হওয়ায়ই কারণ। এ জন্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও ধারণার চেয়ে বেশি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বীর প্রতীক ক্ষয়ক্ষতির একটি হিসাব মঙ্গলবার তুলে ধরে বলেন, সাম্প্রতিক বন্যায় ১১ জেলায় ১৪ হাজার ২৬৯ কোটি ৬৮ লাখ ৩৩ হাজার ৫২২ টাকা সমমূল্যের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বন্যায় ক্ষতির শিকার হওয়া মানুষের সংখ্যা ৯ লাখ ৪২ হাজার ৮২১ জন, যাদের মধ্যে মারা গেছেন ৭৪ জন, আহত হয়েছেন ৬৮ জন।
২,৩০৮ কোটি ৬ লাখ ২৯ হাজার ৭৪০ টাকার ফসল বন্যায় সম্পূর্ণভাবে এবং ৭১৮ কোটি ৫৭ লাখ ৫৬ হাজার ৬১০ টাকার ফসল আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
২৮ হাজার ৩৮৬টি ঘর সম্পূর্ণরূপে এবং ৩ লাখ ১৯ হাজার ২১৯টি ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; ক্ষতির পরিমাণ যথাক্রমে ৪২৬ কোটি ১১ লাখ ২০ হাজার টাকা ও ১৯৮১ কোটি ১৯ লাখ ৪৮ হাজার ৫০০ টাকা।
এবারের বন্যায় ২ হাজার ২৩২ দশমিক ৯২ কিলোমিটার পাকা রাস্তা সম্পূর্ণভাবে এবং ৩ হাজার ৯৮৪ দশমিক ৩৪ কিলোমিটার আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ক্ষতি হয়েছে যথাক্রমে ১ হাজার ৬৬৯ কোটি ৯০ লাখ ৬২ হাজার ১২৩ টাকা এবং ১ হাজার ৮৭৩ কোটি ৪৪ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ টাকা।
ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতে এখনও বেশ খানিকটা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে আটকে পড়া বন্যার পানি। পানি নেমে যাওয়ার সব পথেই রয়েছে বাধা।
দখল-দূষণের কবলে ফেনীর ২৪৪টি খাল ও শাখা নদী
চলতি বছরের অগাস্টের মাঝামাঝিতে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ফেনীতে ২৯ জনের প্রাণহানি ঘটে। জেলা প্রশাসনের হিসাবে জনস্বাস্থ্য, অবকাঠামো, শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, মোবাইল টাওয়ার, মসজিদ-মন্দিররসহ বিভিন্ন স্থাপনার নিরিখে বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে।

যে ভয়াবহ বন্যায় এই বিপুল ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে, তার মূলে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে ফেনীর ছয় উপজেলার অন্তত ২৪৪টি খাল ও শাখা নদীর দখল-দূষণ। এবারের বন্যায় দুর্ভোগে পড়েছে জেলার অন্তত ১৭ লাখ মানুষ।
শুধু এবারের বন্যাই নয়, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ভারী বর্ষণ ও ভারতীয় উজানের পানিতে সৃষ্ট বন্যায় মানুষজনের পাশাপাশি ক্ষতির শিকার হয় ঘর-বাড়ি, কৃষিজমি, পুকুর-খামার ও গবাদিপশু।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পৌর কর্তৃপক্ষ দফায় দফায় উদ্যোগ নিয়েও খাল ও শাখা নদীগুলোর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে পারেনি, খালও সংস্কার করতে পারেনি বলে তথ্য দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ফেনী সদর শহর ঘুরে দেখা যায়, দাউদপুর খাল ও পাগলিছড়া খালের পাশে প্রতিনিয়ত ময়লা-আবর্জনা ফেলে খাল দখল করা হয়েছে। আঁড়তের ময়লায় শুধু খালের পানি দূষণই হচ্ছে না, সেই সঙ্গে বন্ধ হচ্ছে পানি প্রবাহ।

স্থানীয় বাসিন্দা নজির আহমেদ বলেন, “গত কয়েক বছর আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পৌরসভা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে খালের পাড়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করলেও খালের নাব্যতা বাড়াতে ড্রেজার দিয়ে আবর্জনা অপসারণ করেনি। এতে সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবে যায় পেট্টোবাংলা, আরামবাগ, পশ্চিম উকিলপাড়া। এবার বন্যায় পেট্টোবাংলা এলাকা প্রায় ৭ ফুট পানিতে তলিয়ে যায়।"
দমদমা খাল সংলগ্ন শহরের গোডাউন কোয়ার্টার এলাকার বাসিন্দা ফখরুদ্দিন আলী আহমেদ বলেন, “এক সময়ের দীর্ঘ খালটি এখন নালায় পরিণত হয়েছে। গত বছর খালের গাজি ক্রস রোড অংশে পৌরসভা আরসিসি স্ল্যাব বসিয়ে খালটিকে ড্রেন বানিয়ে ফেলেছে। পানি প্রবাহের গতি রোধ হওয়ায় এতে সামান্য বৃষ্টিতে একাডেমি এলাকার নিম্নঞ্চল ডুবে যায়।"
দীর্ঘদিন পানিবন্দি ছিল দাগনভূঞার রাজাপুর ইউনিয়ন। এ ইউনিয়নের রাজাপুর বাজার-সংলগ্ন ‘দত্তের খাল’টি দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় এবং আশপাশের ময়লা-আবর্জনা ফেলায় এবং দখল-দূষণের কারণে বর্তমানে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে।
স্থানীয় মাদ্রাসা শিক্ষক শাহজালাল ভূঞা বলেন, “রাজাপুর বাজারটি একটি ঐতিহ্যবাহী বাজার। বাজারে প্রতিদিনের জন্য আবর্জনা ও প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম না থাকায় সেগুলো খালের মধ্যে ফেলা হচ্ছে। এতে খালের পানি প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।"
দাগনভূঁঞার এমন আরেকটি খাল হল ‘দাদনা খাল’। দাগনভূঞা অঞ্চলে ১৯ কিলোমিটার বিস্তৃত খালটি স্থানীয় প্রভাবশালী, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের পেটে চলে গেছে। দাদনা খালের প্রশস্ত ৬৫ ফুট হলেও এখন ১০ ফুট বা কোথাও ১৫ ফুট টিকে আছে। উপজেলা প্রশাসন আর পৌরসভার ‘ঠেলাঠেলির' সুযোগে পাল্লা দিয়ে দখলদাররা দখল করে রেখেছে খালটি।

স্থানীয় বাসিন্দা ইউনানী চিকিৎসক আলমগীর ননী বলেন, ‘দাদনা খালে’র আশপাশের প্রায় ৩০ গ্রাম ও পৌরসভার মধ্যকার কৃষকরা খালের পানি দিয়ে চাষাবাদ করতেন। বর্তমানে মনুষ্য সৃষ্ট সমস্যার কারণে খালটি পানি প্রবাহের স্বাভাবিক গতি হারিয়েছে।"
দাগনভূঁঞা উপজেলা নির্বাহী অফিসার নিবেদিতা চাকমা বলেন, “দাদনা খালের বিষয়টি পৌরসভা নয়, বিএডিসি দেখবে; এটি নিয়ে সমস্যা রয়েছে। অবৈধ দখলের বিষয়ে উপজেলা পরিষদ সবসময় কঠোর অবস্থানে থাকে।”
দাদনা খাল ও দত্তের খাল ছাড়াও ছোট ফেনী নদীর সঙ্গে সংযোগ থাকা একাধিক শাখা খাল তাদের নাব্যতা হারানোয় বন্যার পানি ধীরগতিতে নামছে বলে মনে করেন স্থানীয় স্কুল শিক্ষক এস এম ইউসুফ আলী। পানির প্রবাহ বাড়াতে নদীর শাখা খালগুলো ড্রেজার দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে খনন করা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন এই শিক্ষক।
ফেনীর আরেক উপজেলা সোনাগাজীর বুক চিরে বয়ে গেছে ‘ডাঙ্গি খাল’। ৪০ বছর আগেও এই খালে নৌকা চললেও এখন সেটি নালায় পরিণত হয়েছে। খালের চারপাশে ও উপরে বিভিন্ন সময় প্রভাবশালীরা স্থাপনা নির্মাণ করে দখল করায় উপজেলার পানিপ্রবাহ কমে গেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা বাসিন্দারা।
ফেনীতে সোনাগাজীর ৫৬টি, দাগনভূঞার ৫২টি, সদর উপজেলার ৩৯টি, পরশুরামের ৪টি, ছাগলনাইয়ার তিনটি ও ফুলগাজীর সবকটি খালই দখল-দূষণে মৃতপ্রায়।
ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ রাশেদ শাহারিয়ার বলেন, “ফেনী জেলায় ও মুহুরী প্রজেক্ট (চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর কিছু অংশ) এলাকায় ২৪৪টি খাল ও শাখা নদী রয়েছে। এসব খাল ও নদীর ৭১৯ কিলোমিটার অংশের মধ্যে বিগত পাঁচ বছরে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হয়েছে। মূলত ইরিগ্রেশন স্বাভাবিক করতে খাল খনন করা হয়েছে।”

শহরের খালগুলো খনন বা সংস্কার না করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “মেট্রোপলিটন বা সিটি করপোরেশন কিংবা পৌর এলাকার খালগুলোতে নিয়মিত বর্জ্য ফেলা হয়। এসব এলাকার খাল সংস্কার করবে স্ব স্ব কর্তৃপক্ষ। তবে পৌর মেয়রের অনুরোধে গত বছর শহরের আশপাশে খালগুলোর ৪-৫ কিলোমিটার খনন করা হয়েছে।”
খাল দখলের ‘কুফল’ নোয়াখালীতে ভয়াবহ বন্যা ও জলাবদ্ধতা
নোয়াখালীতে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা ও জলাবদ্ধতায় প্রায় এক মাস ধরে পানিবন্দি হয়ে ছিল অন্তত ১৩ লাখ মানুষ। নিরুপায় হয়ে অর্ধলক্ষ মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয় নেয় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। এক মাস হতে চললেও বাড়িঘর থেকে পানি না নামার কারণে আশ্রয়কেন্দ্রও ছাড়তে পারছেন না বন্যা কবলিত বিপুল সংখ্যক মানুষ।
এমন দুর্ভোগের জন্য স্থানীয় বাসিন্দারা খাল, নদী দখলকে দায়ী করছেন। নোয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলায় যে খালগুলো দিয়ে বৃষ্টি অথবা বন্যার পানি মেঘনা নদীতে যায়, সেসব খালের বিভিন্ন জায়গা দিনের পর দিন দখল করে রেখেছে প্রভাবশালী চক্র। খালের ওপর এবং এর দুই পাশে নির্মাণ করা হয়েছে বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা। ফলে বন্যার পানি সরতে সময় লাগছে বলে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
বেগমগঞ্জ উপজেলার ভবানী জীবনপুর গ্রামের কফিল উদ্দিন বলেন, “বন্যার পানি গত ১৮ অগাস্ট ঘর-বাড়িতে উঠেছে। নামার নাম নাই। ঘরে এখনও হাঁটুপানি।"
তিনি বলেন, “জীবনপুর গ্রামের পাশে বেগমগঞ্জ-লক্ষ্মীপুর সড়কের সঙ্গে একটি খাল আছে। স্থানীয়ভাবে এটি ‘গাবুয়া খাল’ নামে পরিচিতি। খালটি বসিরহাট, ছয়ানী রাজগঞ্জ ও মাইজদী হয়ে লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীতে পড়েছে। ১০ বছর আগে ভবানী জীবনপুর থেকে সামনের দিকে তিন কিলোমিটার দূরে একটা স্লুইস গেট নির্মাণ করা হয়েছে। স্লুইসগেটটি নির্মাণের শুরু থেকেই এ খাল দিয়ে পানি নিষ্কাশন কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে বন্যার পানি কমছে না।"

সেনবাগ উপজেলার বড় সর্দারপাড়ার মো. সেলিম বলেন, এক মাস ধরে তাদের গ্রামের সব রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে আছে। এলাকার সব খাল ভরাট হয়ে আছে। যে যেভাবে পেরেছে, খালগুলো দখল করে রেখেছে।
“অন্য কোনো সহযোগিতার দরকার নেই। কেবল খালগুলো যেন পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।”
নোয়াখালী থেকে প্রকাশিত সাপ্তহিক চলতিধারা সম্পাদক এমবি আলম বলেন, “নোয়াখালী সদর পশ্চিমাঞ্চলের ইসলামিয়া খালের মধ্যে কচুরিপানা ভর্তি হয়ে আছে। মাইজদীসহ নোয়ান্নই ইউনিয়ন, দাদপুর ইউনিয়নের পানি নামে এই খাল দিয়ে। খালটি দখল ও সংস্কারের উদ্যোগ না থাকায় পানি দ্রুত নামছে না।"
নোয়াখালীর একসময়ের খরস্রোতা ‘মহেন্দ্র খাল’ দখল-দূষণে বিলুপ্ত হওয়ার পথে। এ খাল দিয়ে মেঘনা-ডাকাতিয়া নদী হয়ে ছোট-বড় ট্রলার ও নৌকা করে পণ্যসামগ্রী বিভিন্ন হাট-বাজারে আনা-নেওয়া করত ব্যবসায়ীরা। কিন্তু খালটি এখন নামে মাত্র টিকে আছে।
চাটখিলের স্থানীয়দের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, চাটখিল পৌরসভা অংশে বিভিন্ন সময় দখল করার কারণে খালটির অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার পথে। চাটখিল পৌর বাজারের প্রবেশপথের সেতুর নিচের অংশে আবর্জনা ফেলায় ভরাট হয়ে গেছে খালের চাটখিল পৌর এলাকা, দশঘরিয়া বাজার, কচুয়া বাজারসহ অনেক এলাকা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, চাটখিলের ১১ নম্বর পুল থেকে সিঅ্যান্ডবি রোডের দক্ষিণ পাশে মহেন্দ্র খালের ওপর বিভিন্ন স্থানে প্রভাবশালীরা খাল দখল করে ভবন নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি ও কৃষক। খাল ভরাট হওয়ায় ফসলি জমিতে কখনও জলাবদ্ধতা আবার কখনও খরা দেখা দিচ্ছে। এতে জমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে। খাল ভরাট হওয়ার কারণে ফসলের ক্ষেতে সময়মত সেচও দিতে পারছে না কৃষক।
নোয়াখালী রুরাল ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক আব্দুল আউয়াল বলেন, “নোয়াখালীতে আগে বৃষ্টির পানি ধারণের জন্য শত শত দীঘি খনন করা হয়েছিল। পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক ব্যবস্থা ছিল। ছিল নোয়াখাল, বেগমগঞ্জের অবদা খাল, ভুলুয়া খালসহ ছোট-বড় অসংখ্য খাল। এই খালগুলোর মধ্যে যে আন্তঃসংযোগ ছিল, সেটা নষ্ট হয়ে গেছে। মাছ চাষের জন্য বিভিন্ন জায়গায় দখল নিয়ে পানি প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে ভাটির পানি খাল বেয়ে নেমে যাওয়ার আর পথ নেই।
“আজকের মাইজদী শহর গড়ে উঠে খালের ওপর। ওই খালটির নাম ছিল ছাগলমারা খাল। এর পাশেই ছিল নোয়াখাল। দখলদারদের কবলে পড়ে এসব খাল এখন অস্তিত্ব সংকটে।”

বিদ্যমান সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য এখন থেকে আগামী এক মাস ধরে স্যাটেলাইট থেকে এই অঞ্চলের পানি নামার পথগুলোকে চিহ্নিত করার তাগিদ দেন আব্দুল আউয়াল। পরে সে অনুসারে প্রতিবন্ধকতাগুলো অপসারণের ওপর জোর দেন তিনি।
নোয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুন্সী আমির ফয়সাল বলেন, “জেলার চাটখিল, সোনাইমুড়ী, বেগমগঞ্জ ও সদর উপজেলার পানি লক্ষ্মীপুর জেলার রহমতখালী খালের মাধ্যমে রহমতখালী রেগুলেটর হয়ে মেঘনা নদীতে পড়ে। কিন্তু রহমতখালী খালের লক্ষ্মীপুর অংশ দীর্ঘদিন ধরে খনন করা হয়নি। যে কারণে আবর্জনা জমে খালের নাব্যতা কমে গেছে। পানি নামছে ধীর গতিতে।”
তিনি বলেন, ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে নোয়াখালী সদর, কবিরহাট ও বেগমগঞ্জ উপজেলায় ১৬১ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়। ১৯৬৪ সালে সদর উপজেলার মান্নাননগর থেকে আটকপালিয়া (হারিছ চৌধুরীর বাজার) পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার এলাকায় ক্রস ড্যাম নির্মাণ করা হয়। এর ফলে সুবর্ণচর উপজেলার ৭১ হাজার হেক্টর জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়া থেকে রক্ষা পেলেও ক্রসড্যামের কারণে সুবর্ণচর উপজেলা সদর উপজেলার চেয়ে উঁচু ভূমিতে পরিণত হয়। ফলে সদরের পানি বের হওয়ার পথ কঠিন হয়ে পড়ে।
দখল-দূষণে কুমিল্লাতেও সর্বনাশ
“আমার বয়স এখন প্রায় ১১০ বছর। দীর্ঘ এই জীবনে কখনও এত বড় বন্যা বা এত পানি দেখিনি। আমার বাবার কাছেও কখনও শুনিনি এমন ভয়াবহ বন্যার কথা। গত ১২-১৩ দিন ধরে আমাদের এলাকার প্রায় সকল বাড়ি-ঘর পানির নিচে। মানুষ অনেক কষ্টে আছে, চারদিকে এখনও মানুষের দুর্ভোগ আর হাহাকার।”
কথাগুলো বলছিলেন কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার পিপড্ডা গ্রামের শতবর্ষী আরিফুর রহমান মজুমদার।

দেশের যে ১১টি জেলা সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যার আঘাতে ধুকছে, সেগুলোর মধ্যে কুমিল্লাও রয়েছে। জেলার গোমতী নদীর বাঁধ বিভিন্ন পয়েন্টে ভেঙে জেলার ১৭টি উপজেলার মধ্যে ১৪টিতেই বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কিন্তু অন্যাবারের মত পানি দ্রুত নামছে না।
সে প্রসঙ্গে টেনে আরিফুর রহমান বলেন, “গত কয়েকদিন দিন ধরে পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে। তবে যেভাবে পানি কমছে, অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে; মানুষের এই দুর্ভোগ সহজে শেষ হবে না। বিগত সময়ে প্রভাবশালীরা অবাধে নদী ও খাল দখল করেছেন। অনেকে বুঝে বা না বুঝেই খাল ভরাট করে পরিবেশের বারোটা বাজিয়েছেন। এসব কারণে পানি নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত হয়ে এসেছে। যার কারণে পানি দ্রুত নামছে না।”
অন্যান্য উপজেলাগুলোর তুলনায় কুমিল্লার দক্ষিণাঞ্চলের তিন উপজেলা মনোহরগঞ্জ, লাকসাম ও নাঙ্গলকোটে বানের পানি সেভাবে নামছে না। এ তিন উজেলায় এখনও ৫ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি।

সরেজমিনে ঘুরে কুমিল্লার দক্ষিণ অঞ্চলের এই তিন উপজেলার বানভাসি মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিগত সরকারের সময়ে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন ও প্রভাবশালীরা বিভিন্নভাবে এই তিন উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ডাকাতিয়া নদী ও নদীর শাখা খালগুলো দখল করেছেন।
ডাকাতিয়া নদী গড়ে ২২০ ফুট প্রস্থ থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে এ অঞ্চলের অনেক স্থানে নদীর প্রস্থ ৩০ ফুটও খুঁজে পাওয়া যায় না। গ্রামীণ ছোট-বড় খালগুলোও অনেক প্রভাবশালীরা দখল ও ভরাট করেছেন। অনেক স্থানে খালের মধ্যে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে রাস্তা করা হয়েছে। কোথাও আবার নদী ও বিভিন্ন খালে বাঁধ দিয়ে ভেসাল জালসহ বিভিন্নভাবে মাছ ধরছে এক শ্রেণির মানুষ। এতে পানি নামার পথ সংকুচিত হয়ে ধীরগতিতে সরছে বন্যার পানি।
শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তি ও প্রভাবশালীরাই নন, বিগত সময়ে খাল ভরাট করে এই অঞ্চলের মানুষ ও কৃষির বারোটা বাজিয়েছে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও। ‘খাল কেটে’ নয় বরং ‘খাল ভরাট করে কুমির আনার মত সর্বনাশা’ কাজ করছে কুমিল্লা সড়ক ও জনপথ বিভাগ।

২০২০ সালের শুরু থেকেই কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়ক চার লেন প্রকল্পে কোনো নিয়মের তোয়াক্কা না করে ভরাট করা হয়েছিল শত বছরের প্রাচীন ‘বেরুলা’ খালটি।
বেরুলা খালটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৬০ কিলোমিটার। ডাকাতিয়া নদীর কুমিল্লার লাকসামের দৌলতগঞ্জ বাজারের দক্ষিণাংশের ফতেপুর গ্রামে এর উৎসমুখ। লাকসাম, নাঙ্গলকোট ও মনোহরগঞ্জ হয়ে খালটি মিশেছে নোয়াখালীর চৌমুহনী খালে গিয়ে। এরপর সেখান থেকে এই পানি যেত বঙ্গোপসাগরে।
কিন্তু ভরাটের ফলে এ অঞ্চল থেকে পানি নামতে তীব্র সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় কয়েক হাজার একর কৃষিজমি ও কৃষকেরও সর্বনাশ হয়েছে। সেই সঙ্গে বন্যার পানি সরতে পারছে না বলে অভিযোগ করেছে বানভাসি মানুষ।
লাকসাম পৌর এলাকার বাসিন্দা আবুল কালাম বলেন, “ডাকাতিয়া নদী গড়ে ২২০ ফুট প্রস্থ থাকার কথা। কিন্তু লাকসাম দৌলতগঞ্জ বাজার এলাকায় নদীর অস্তিত্ব ৪০ ফুটও নেই। সব দখল করে দোকানপাট নির্মাণ করা হয়েছে। নদী-খাল দখল ও ভরাটের কারণে বর্ষায় বন্যা আর সেচ মৌসুমে নদীতে খরা হচ্ছে- এটাই সত্য কথা। বিগত সময়ে নদী ও খাল দখলকারী প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের তেমন কোন অভিযান দেখা যায়নি । এসব কারণেই আজকের এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।"

মনোহরগঞ্জ উপজেলা সদরের বাসিন্দা হারুনুর রশিদ বলেন, “অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলেও বন্যার পানি নামছে ধীর গতিতে। মনোহরগঞ্জ-হাসনাবাদ সড়কের লৎসর, শাকতলাসহ কয়েকটি স্থানে আগে কালভার্ট ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরে সড়ক সংস্কারের সময় কালভার্টগুলো ভেঙে খাল ভরাটের পর রাস্তা বানিয়ে ফেলা হয়েছে। এসব কারণে কয়েকটি ইউনিয়নের পানি নামতে সমস্যা হচ্ছে। এ জন্য বন্যা পরিস্থিতর তেমন উন্নতি হচ্ছে না।"
মনোহরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উজালা রানী চাকমা বলেন, “আসলে এই উপজেলাটি আগে থেকেই ভাটি বা জলামগ্ন এলাকা। বছরের এই সময় এখানে বর্ষার পানি থাকে। নদী-খাল দখল এবং বাঁধ দিয়ে মাছ শিকারের কারণে পানি নামতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে, এটাও সত্য কথা। তবে আমরা প্রতিটি খাল ও নদীতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা অব্যাহত রেখেছি। এখন পর্যন্ত অর্ধশতাধিক বাঁধ অপসারণ করে পানির প্রভাব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। কয়েকদিন ধরে বৃষ্টি নেই, পরিস্থিতি এমন থাকলে দ্রুতই বন্যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করছি।"
নাঙ্গলকোট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুরাইয়া আক্তার লাকী বলেন, “এবারের ভয়াবহ বন্যায় এ উপজেলা পুরোপুরি প্লাবিত হয়েছে। বর্তমানে বন্যা পরিস্থিতি উন্নতির দিকে। পানি নামতে শুরু করেছে। নদী ও খালের যেসব স্থানে বাঁধ দিয়ে মাছ শিকার করা হচ্ছে, সেসব স্থানে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। তবে বিগত সময়ে নদী ও খাল দখলের কারণে পানি নামতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে, এটাও সত্য। আমরা এসব বিষয় নিয়ে কাজ করছি।”
পানি ধীরে নামার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মত
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বলেন, “পানি কমার এই হারকে ধীর থেকে মাঝারি বলা যায়। অন্যান্যবারের আকস্মিক বন্যার তুলনায় এবার পানি কমার হার ধীর।”
কেন এতদিন পরেও পানি নামছে না- জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বাংলাদেশ নদীবিধৌত এলাকা। এ দেশে আগেও বন্যা ছিল। এটা আনকমন না কিন্তু, যেটা আনকমন- এবার বন্যার এতদিন পরেও পানি আটকে থাকাটা। এর মূল কারণ হচ্ছে, জলাধারগুলোর ন্যাচারাল প্রবাহ বা আন্তসংযোগ নষ্ট হয়ে গেছে। এর কারণ ভরাট এবং দূষণ। যে ওয়াটার চ্যানেল আছে, পানি বের হওয়ার ক্ষেত্রে সেগুলোরও একই অবস্থা।
“আর, এগুলো যারা ভরাট করেছে, তাদের পিছনে পলিটিক্যাল প্রশ্রয়ে রয়েছে। গেল এক দশকে সারা দেশে বন্যার প্রকোপ কমে গিয়েছিল। কিন্তু, দখল-দূষণে সেটা আবার ফিরে এসেছে। আমরা দেখেছি, আমাদের যে জলাধার সংরক্ষণ আইন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন আছে, সেগুলো কাগজে-কলমে। ফলে, যা হবার তাই হয়েছে।"
এখন তাহলে উপায় কী? ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের এই সভাপতি বলেন, “এখন উপায় একটাই। একটা মহাপরিকল্পনা দরকার। অন্তত ৫ বছরের জন্য। যেখানে পুরাতন চ্যানেলগুলো দখলমুক্ত করতে হবে। সেগুলোতে স্থায়ী স্থাপনা হলেও ভাঙতে হবে। জলাধারগুলোর মধ্যে আন্তঃসংযোগ তৈরি করতে হবে।
“আর, দখলদার যারা, তাদের শায়েস্তা করতে বিচারের আওতায় আনতে হবে। এই ধারাটা এখনি শুরু করতে হবে, তাহলে পরেও চলমান থাকবে। কারা নদী দখল করছে, নদী রক্ষা কমিশনের কাছে তাদের তালিকাও আছে। এই ব্যবস্থা এখনই না নিলে ভবিষ্যতে বন্যার কারণে আবারও বিপদে পড়তে হবে।”
[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন ফেনী প্রতিনিধি নাজমুল হক শামীম, নোয়াখালী প্রতিনিধি আবু নাছের মঞ্জু, কুমিল্লা প্রতিনিধি আবদুর রহমান]