১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

সংসদ নির্বাচন: এবার ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র কত?

ভোটের আগে-পরে আট দিন আইন শৃঙ্খলাবাহিনী মোতায়েনের প্রস্তাব এসেছে। এবার ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১৩ থেকে ১৮ জন সদস্য থাকতে পারে।

মঈনুল হক চৌধুরী

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 08 Nov 2025, 08:41 AM

Updated : 26 Aug 2026, 02:37 PM

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে যে ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণের পরিকল্পনা করেছে নির্বাচন কমিশন, তার মধ্যে দুই তৃতীয়াংশই ‘ঝুঁকিপূর্ণ’বলে প্রাথমিক তথ্য দেওয়া হয়েছে আইন শৃঙ্খলা সভায়। 

ইসি বলছে, মাঠে আইন শৃঙ্খলাবাহিনী কতদিন থাকবে, কোন ধরনের কেন্দ্রে কত জন করে দায়িত্বে থাকবে, এসব বিষয়ে প্রস্তাব এবং ম্যাপিং কমিশন সভায় চূড়ান্ত হবে।

তফসিল ঘোষণার আর বাকি এক মাস। এরই মধ্যে বিএনপি, জামায়াত, নতুন দল এনসিপিসহ দলগুলো প্রার্থী ঘোষণার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। 

অন্তর্বর্তী সরকারও ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করতে প্রচারাভিযান শুরু করছে। নির্বাচন আয়োজনকারী সাংবিধানিক সংস্থাটির প্রস্তুতির কাজ রয়েছে শেষ ধাপে।

বর্তমানে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল রয়েছে অর্ধশতাধিক; এসব দলের পাশাপাশি স্বতন্ত্র ও জোট মনোনীত প্রার্থীরা অংশ নেবেন ভোটে।

নিবন্ধন স্থগিত থাকা আওয়ামী লীগবিহীন এ নির্বাচনে গুজব ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর মতো নানা প্রতিবন্ধকতা নিয়েও ইসির উদ্বেগ রয়েছে।

ভোটকেন্দ্রের অবস্থান, প্রার্থীর বাসস্থানের দূরত্ব, গোলযোগের শঙ্কাসহ কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে মহানগর এলাকায়, মহানগরের বাইরের এলাকা ও বিশেষ এলাকায় (পার্বত্য ও দুর্গম) সাধারণ ও ঝুঁকিপুর্ণ কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।মোতায়েনের ক্ষেত্রে ‘ঝুঁকিপূর্ণ ও অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ কেন্দ্রগুলোকে ইসি ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে বর্ণনা করে।

কেন্দ্রে নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েনের সুবিধার্থে ২০ অক্টোবরের আইন শৃঙ্খলা সভায় একটি ধারণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। সেখানে আগের ৪২ হাজারের মত ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৮,২২৬ টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, ২০,৪৩৭টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১৩,৪০০টি সাধারণ ভোটকেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, পুলিশের বিশেষ শাখা সাধারণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরে। অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ এবং সাধারণ ভোটকেন্দ্রকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে ভোটকেন্দ্রের ভৌত অবকাঠামো, থানা থেকে দূরত্ব, কেন্দ্রের নিকটবর্তী প্রভাবশালীদের বাসস্থান ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। 

এছাড়া, সীমান্তবর্তী ভোটকেন্দ্র, সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী অধ্যুষিত ভোটকেন্দ্রের বিষয়গুলোও বিবেচনা করা হয়েছে।

 এবারের নির্বাচনের জন্য প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত করে রেখেছে ইসি, ভোটের অন্তত ২৫ দিন আগে সেই তালিকার গেজেট হবে।

ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র সংখ্যা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, “ফাইনাল ম্যাপিংটা এখনও আমরা করিনি। আরেকটু সময় আছে আমাদের হাতে। এটা নিয়ে আমরা কমিশন সভায় বসব।”

তফসিল ঘোষণার আগে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে তৎপর রয়েছে সরকার। আচরণবিধি প্রতিপালন ও ভোটের পরিবেশ ঠিক রাখতে তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশনের বাড়তি পদক্ষেপ থাকবে।

ইতোমধ্যে বিভিন্ন বাহিনীর শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে এক দফা বৈঠক করেছে ইসি। তফসিল ঘোষণার পর আইন শৃঙ্খলাবাহিনী মোতায়েন পরিকল্পনা নিয়ে ফের বসবে কমিশন। 

নির্বাচন কমিশনের অনুমোদনের পর আইন শৃঙ্খলা মোতায়েন সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ আইন শৃঙ্খলা সভা শেষে জানিয়েছিলেন, ভোটের আগে-পরে আট দিন আইন শৃঙ্খলাবাহিনী মোতায়েনের প্রস্তাব এসেছে। এবার ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১৩ থেকে ১৮ জন সদস্য থাকতে পারে।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ৭ লাখের বেশি সদস্য ভোটে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন। ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বে আনসার-ভিডিপি সদস্যদের সংখ্যাই হবে সাড়ে ৫ লাখের মত। সশস্ত্রবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ৯০ হাজারের বেশি। এছাড়া পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ড রয়েছে।

জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ বলেন, “আইন শৃঙ্খলা সভায় প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। এটা প্রস্তাব, এখনও ফাইনাল হয়নি। (আইন শৃঙ্খলাবাহিনী ভোটের সময় মাঠে) কয়দিন থাকবে, (নিরাপত্তা সদস্যরা কেন্দ্রে) কতজন থাকবে, তা চূড়ান্ত করতে হবে। আমরা চেষ্টা করব এ মাসের ভেতরে কমপ্লিট করে দিতে।”

কেন্দ্রের তালিকা চূড়ান্ত করে ২৭ অক্টোবর ইসি সচিব জানান, এবার মোট ৬৪টি জেলার ৩০০টি সংসদীয় আসনে কেন্দ্রের সংখ্যা ৪২,৭৬১টি। পুরুষদের জন্য ১ লাখ ১৫ হাজার ১৩৭টি এবং নারীদের জন্য ১ লাখ ২৯ হাজার ৬০২টি কক্ষ নির্ধারণ করা হয়েছে। মোট ভোটকক্ষের সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৯টি।

 কোন বাহিনীর কত সদস্য থাকতে পারে

ভোটে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী মূলত তিনটি পর্যায়ে কাজ করে। তফসিল ঘোষণার আগে, তফসিল ঘোষণা থেকে নির্বাচন পর্যন্ত এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং প্রাসঙ্গিক বিষয়ে মতবিনিময় ও প্রাক প্রস্তুতি সভা হয় ২০ অক্টোবর। সেই সভায় বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের সম্ভাব্য সংখ্যা তুলে ধরা হয়।

>> সেনাবহিনীর ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে। নৌবাহিনীর ৩ হাজার সদস্য থাকতে পারেন।

>> নির্বাচনি কাজে জরুরি প্রয়োজনে আর্মি এভিয়েশনও প্রস্তুত থাকবে। অঞ্চলভেদে কমান্ডো বাহিনী মোতায়েন থাকবে।

>> পার্বত্য অঞ্চলের জন্য নির্বাচনি মালামাল ও নির্বাচনি কর্মকর্তাদের পরিবহনের জন্য হেলিপ্যাড প্রস্তুত থাকবে।

>> সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে নির্বাচনে ব্যবহারের জন্য পরিবহন বিমান প্রস্তুত থাকবে।

>> সীমান্তে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বজায় রেখে নির্বাচনে বিজিবি মোতায়েন থাকবে। এবার ৪৯২টি উপজেলায় ১১,০৬০ প্লাটুন (প্রতি প্লাটুনে ২৫ থেকে ৩০ জন) বিজিবি মোতায়েন করা সম্ভব হবে।

>> ৯টি জেলার ১৭টি উপজেলায় কোস্টগার্ডের কার্যক্রম রয়েছে। এ কাজে কোস্টগার্ডের ৩ হাজার লোকবল রয়েছে। নির্বাচনি দায়িত্ব পালনে তাদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে।

>> নির্বাচনে র‌্যাব মোবাইল টিম হিসেবে কাজ করে। নির্বাচনি কার্যক্রমের জন্য র‌্যাবের ড্রোন, হেলিকাপ্টারসহ অন্যান্য রিসোর্স ব্যবহার করা হবে। নির্বাচনে ৫ হাজার ৫০০ র‌্যাব মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

>> এবারের নির্বাচনে অন্তত ৫ লাখ ৪৫ হাজার আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। অভিজ্ঞ ও দক্ষ আনসার সদস্যদের বাছাই করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রে নজর 

স্বরাষ্ট্র ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে গত ৯ জুলাই বৈঠক করে নির্বাচন প্রস্তুতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেন প্রধান উপদেষ্টা।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কীভাবে দায়িত্ব পালন করবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে শান্তি বজায় রাখার বিষয়ে এ বৈঠকে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, “ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে কীভাবে হবে, কতজন আনসার থাকবেন, কতজন পুলিশের সদস্য থাকবেন, বিজিবি বা সেনাবাহিনী কীভাবে থাকবেন, স্ট্রাইকিং ফোর্স কীভাবে থাকবেন, সেগুলো নিয়ে মিটিংয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। 

“সেখানে বলা হয়েছে, (আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর) ৮ লাখের মধ্যে ৫ লাখ ৭০ হাজার হচ্ছেন আনসার এবং ১ লাখ ৪১ হাজার হচ্ছেন পুলিশের সদস্য। বলা হয়েছে ৪৭ হাজারের মত পুলিশ ভোট কেন্দ্রে থাকবে এবং তারা অ্যাসেসমেন্ট করে দেখেছেন যে ১৬ হাজারের মত ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।''

প্রেস সচিব জানান, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে কীভাবে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট নেওয়া যায়, সেই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা। 

“তার মধ্যে কিছু মেজর চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। সেটা হচ্ছে যে, পুলিশের বডি ক্যাম রাখা এবং প্রত্যেকটা কেন্দ্র যাতে সিসিটিভির আওতায় আসে, সেটা একটা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

গেল ১ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধান সাক্ষাৎ করেন, যেখানে আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতি এবং শান্তিপূর্ণ ভোট আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে আলোচনা হয়।

প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় সংবাদবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নির্বাচন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ৯০ হাজার সেনা, আড়াই হাজার নৌবাহিনী এবং দেড় হাজার বিমানবাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবে। প্রতিটি উপজেলায় এক কোম্পানি সেনা মোতায়েন থাকবে। 

নির্বাচন যেন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা থাকে, সেজন্য তিন বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন প্রধান উপদেষ্টা।

পুরনো খবর

নির্বাচনে 'বড় চ্যালেঞ্জ' নিরাপত্তা: সিইসি

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে তিন বাহিনী প্রধানের সাক্ষাৎ, নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা

প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রে হবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন

ভোট: প্রশিক্ষণ পেলেন ৪৮ হাজার পুলিশ সদস্য

ভোটের পর ব্যারাকে ফিরবে সেনাবাহিনী, 'আশায়' সেনাসদর

'নির্বাচন বানচালের সর্বোচ্চ চেষ্টা হবে', সতর্ক করলেন ইউনূস

নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে 'উদ্বেগ নেই': ইসি সচিব

নির্বাচন: প্রিজাইডিং কর্মকর্তার নিরাপত্তায় থাকবে একজন সশস্ত্র আনসার

ভোটের কর্মযজ্ঞ: দলগুলোর সঙ্গে বসার অপেক্ষোয় ইসি

নির্বাচনের ওপর 'নির্ভর করছে' দেশ কোন দিকে যাবে: সিইসি