Published : 22 Mar 2026, 04:10 PM
কুমিল্লার পদুয়ারবাজারে যে লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেন ও বাসের সংঘর্ষ হয়েছে, সেখানে অক্ষত আছে ক্রসিং বার। রেল কর্মকর্তাদের ধারণা, দুর্ঘটনার সময় সেখানে গেইটম্যান ‘ছিলেন না’।
শনিবার গভীর রাতে সেই দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই ১২ জনের প্রাণ গেছে। আহত হয়েছেন আটজন। দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া বাসটিকে ঠেলে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে নিয়ে যায় ট্রেনটি।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) মোস্তাফিজুর রহমান ভুঁইয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, ঘটনার সময় গেইটম্যান ছিল না। দুটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্তের পর নিশ্চিত জানা যাবে।”
পূর্ব রেলের অন্য এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “স্টেশন মাস্টার ওই লেভেল ক্রসিংয়ে ফোন করেছিল। কিন্তু যখন গেইটম্যানকে টেলিফোনে পায় ততক্ষণে ট্রেন ওই ক্রসিং অতিক্রম করে গেছে।
“লেভেল ক্রসিংটি অক্ষত আছে। তার মানে ক্রসিংয়ে বার ফেলা হয়নি। এখন পর্যন্ত যে তথ্য, তাতে প্রতীয়মান হয় (দুর্ঘটনার সময়) গেইটম্যান সেখানে ছিলেন না।”
ক্রসিংটিকে অনুমোদিত বলছেন রেলের কর্মকর্তারা।

রেলপথে লেভেল ক্রসিংয়ের নিরাপত্তায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কুমিল্লা অঞ্চলের ঊর্ধ্বতন ও সহকারী প্রকৌশলী (পথ) আনিসুজ্জামান বলেন, “আমার জানা মতে রোস্টার অনুযায়ী যে দুইজন গেইটম্যান থাকার কথা, তারা সেখানে ছিল। তারা গেইট ফেলতে ফেলতে ট্রেন চলে আসে এবং বাসটিও লাইনের উপর উঠে যায়।
“সেখানে গেইটম্যানদের যেমন অবহেলা ছিল, তেমনি বাস চালকেরও অসতর্কতা ছিল। কারণ লেভেল ক্রসিংয়ের সামনেই সংকেত দেওয়া থাকে, সতর্কতার সঙ্গে যেন লেভেল ক্রসিং পারাপার হয়।”
তিনি বলেন, “গেইটম্যান হেলাল ও মেহেদির সঙ্গে এখনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তারা পলাতক রয়েছে ও তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে। যে কারণে লালমাই স্টেশন থেকে তারা লেভেল ক্রসিংয়ের গেইট ফেলতে সিগন্যাল পেয়েছিল কি পায়নি, সেই বিষয়টি তদন্তে বেরিয়ে আসবে।”
নিয়ম অনুযায়ী ট্রেন একটি স্টেশন পার হওয়ার পর পরবর্তী লেভেল ক্রসিংয়ে ফোন করে গেইট ফেলার বিষয়টি জানানো হয়।
পূর্ববর্তী লালমাই স্টেশনের মাস্টার কাজী আব্দুল মান্নান স্টেশনের মাস্টার বলেন, “আমি দুর্ঘটনার সময় ডিউটিতে ছিলাম না। যতটুকু জেনেছি, দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকজন বারবার পদুয়ার বাজার গেইটম্যানকে ফোন দিয়েও পায়নি।”

পদুয়ার বাজারে দুর্ঘটনায় উদ্ধার কাজে নিয়োজিত ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মো. ইদ্রিস বলেন, প্রাথমিকভাবে যেটি বোঝা যাচ্ছে সেটি হল, গেইটম্যানের অবহেলায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। ট্রেনটি এতটাই দ্রুতগতিতে ছিল, যে বাসটিতে ধাক্কা দিয়ে এক কিলোমিটার পর্যন্ত ঠেলে নিয়ে গিয়েছে।
দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ঢাকা মেইল ট্রেনের যাত্রী শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান রহমান বলেন, “লেভেল ক্রসিংয়ের গেইটম্যানের কারণেই এই দুর্ঘটনা। সময়মত গেইট ফেললে বাসটি ট্রেন লাইনের উপর উঠতে পারত না। এভাবে বারোটি প্রাণ ঝরে যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”
রোববার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন খাদ্য ও কৃষিমন্ত্রী আমিনুর রশিদ এবং রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবীব।
পরিদর্শনে গিয়ে কৃষিমন্ত্রী আমিনুর রশিদ বলেন, “সম্ভবত সেখানে রেল গেইটটি (ক্রসিং বার) ছিল না, ওপেন ছিল। এটার ব্যাপারে রেলওয়ের পক্ষ থেকে এবং ডিসি সাহেবের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে দুজনকে সাসপেন্ডও করা হয়েছে। অত্যন্ত দুঃখজনক এ ধরনের দুর্ঘটনা।

“হাইওয়ের উপরে যে সমস্ত রেলক্রসিংগুলো আছে আমরা এটা নিয়ে আগামী দিনে প্রথম অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আলোচনা করব। বিশ্বব্যাপী এখন এই ধরনের রেলগেইটগুলো অটো সিস্টেমে (স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা) নিয়ে আসা হয়েছে। দ্রুত সময়ে চেষ্টা করব হাইওয়ে সংযুক্ত ক্রসিংয়ে অটো সিস্টেম করতে।”
রেল প্রতিমন্ত্রী বলেন, “যে দুজন গেইটম্যানের অবহেলায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে, তাদের ইতোমেধ্যে বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া রেলস্টেশন মাস্টারের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বহিষ্কৃত দুই গেইটম্যান হলেন- হেলাল উদ্দিন ও মেহেদী হাসান।

নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে এক লাখ টাকা করে সহযোগিতা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবীব।
তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যেসব রেল ক্রসিংগুলো আছে, সেগুলোকে ওভারপস বা আন্ডারপাস করে দেওয়া যায় কিনা। আরেকটি সিদ্ধান্ত আলোচনা পর্যায়ে আছে রেলক্রসিংগুলোকে অটোমেটিক করে দেওয়া যায় কিনা। যাতে রেল একটি নির্দিষ্ট সীমায় প্রবেশ করার পর ক্রসিংয়ের বারগুলো অটোমেটিক নেমে যাবে। সে ব্যাপারেও কাজ চলছে। গার্ডও থাকবে এবং অটোমেটিক সিস্টেম থাকবে।”
দুর্ঘটনা থেকে কীভাবে রক্ষা পাওয়া যায়, ক্রসিংগুলোকে কীভাবে আধুনিকায়ন করা যায়, সে বিষয়ে সরকারের ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত আছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
আরও পড়ুন
কুমিল্লায় ১২ মৃত্যু: 'ঈদের খুশিতে নানা বাড়ি যাচ্ছিল তারা, আর দেখা