Published : 25 Oct 2022, 02:39 PM
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে প্রবল বর্ষণে সোমবার বিকালে যখন ঘরে পানি ওঠা শুরু করল, তড়িঘড়ি করে স্বামীকে ফোন করে বাসায় ডাকলেন শাহীনুর; বসুন্ধরা এলাকার যানজট পেরিয়ে তার স্বামী যখন ফিরলেন, ততক্ষণে ঘরে কোমর পানি।
এগারো বছরের ছেলে আর আড়াই বছরের মেয়েকে নিয়ে পাশের ভবনের গাড়ি রাখার জায়গায় আশ্রয় নেন শাহীনুর, তার ঘরে রাখা জিনিসপত্র সব ভিজে একাকার।
গাড়ি চালক স্বামী মো. শাকিল ও দুই সন্তান নিয়ে ঢাকার শ্যামলীর কাজী অফিস এলাকায় কল্যাণপুর খাল ঘেঁষা টিনশেড বাসায় থাকেন এই নারী। স্থানীয় বিভিন্ন বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করেন।
তিনি জানালেন, দুদিন আগে হাসপাতাল থেকে অসুস্থ মেয়েকে বাসায় এনেছেন। এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেনি। এর মধ্যেই এ দুর্ভোগ।
বহুতল একটি ভবনের গাড়ি রাখার জায়গায় সন্তানদের নিয়ে তোশক পেতে বসেছিলেন শাহীনুর। ঘরের জিনিসপত্র যা এনেছেন তাও সব ভেজা।
শাহীনুরের স্বামী শাকিল জানান, সোমবার সন্ধ্যায় ভিজতে ভিজতে এসে দেখেন, ঘর তলিয়ে গেছে। টানাটানি করে ফ্রিজ, আলমারি, কিছু কাপড়চোপড় বের করেছেন। খাটসহ অন্যান্য জিনিসপত্র ঘরেই রয়ে গেছে। পাশের এক বাড়ির দোতলায় স্ত্রী-সন্তানদের রাখতে পেরেছেন। আর তিনি নিজে গাড়ির ভেতর বসে রাত কাটিয়েছেন।
ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে সোমবার সারাদিন প্রবল বর্ষণ হয়েছে সারাদেশে। রাতে ঘূর্ণিঝড় দেশের স্থলভাগের উপর দিয়ে বয়ে গেলে উপকূলীয় এলাকাসহ রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় গাছপালা উপড়ে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। রাতদিন টানা বর্ষণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার নিচু অংশ তলিয়ে গেছে।
মঙ্গলবার সকালে শ্যামলীর কাজী অফিস এলাকায় দেখা যায়, টিনশেড বাড়িগুলোতে কোমর সমান পানি। দোকান, মসজিদ সব তলিয়ে গেছে। জিনিসপত্র নিয়ে লোকজন আশ্রয় নিয়েছেন আশপাশের বহুতল ভবনগুলোতে।
ওই এলাকায় এক বাড়ির মালিক আশ্রয় নেওয়া কিছু মানুষের রাতের খাবারের ব্যবস্থা করেন। মঙ্গলবার দুপুরেও খাওয়াবেন বলে আশ্রয় নেওয়াদের জানিয়েছেন।
অনেক বহুতল ভবনের ভূগর্ভস্থ গাড়ি রাখার গ্যারেজও পানিতে ডুবে গেছে। সড়কে হাঁটু ও কোমর সমান পানি। টিনশেড বাড়িগুলোর টয়লেট তলিয়ে গেছে। ড্রেনের ময়লা-আবর্জনা ভাসছে সেই পানিতে। পানি থেকে আসছে দুর্গন্ধ।
একটি বাড়ির ভেতরে হাঁটুপানিতে দাঁড়িয়েই রান্না করছিলেন আশরাফ আলী। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বললেন, ঘরে পানি ঢুকলেও পেট তো আর বসে থাকবে না। তার স্ত্রী সকালেই কাজে গেছেন। বাচ্চাদের খাইয়ে নিজেও কাজে যাবেন বলে চুলায় ভাত বসিয়েছেন।
নিজের ঘরের ভেতর খাটের ওপর চৌকি পেতে বসেছিলেন হাবিবুর রহমান। বললেন, ঘরের জিনিসপত্র তেমন সরাতে পারেননি। খালি তোশক-বালিশ নিয়ে পাশের ভবনে রাতটা কাটিয়ে এসেছেন।
জিনিসপত্র নিয়ে একটি বহুতল ভবনের পার্কিংয়ে বসে ছিলেন ভাসমান ব্যবসায়ী মোশাররফ হোসেন, চোখে-মুখে দুঃশ্চিন্তার ছাপ।
বিমর্ষ হয়ে তিনি বললেন, “পানি কবে নামব, ঘরে কবে যাইতারুম আল্লাই জানে। খাবার-দাবার, বাথরুমের কুনো ঠিক-ঠিকানা নাই। আবার কামেও তো কামাই দেওয়া যাইব না। কী করুম, বুইজ্জা পাইতাছি না।”
আরেকটি ভবনের কেয়ারটেকার সোলায়মান আলীকে দেখা গেল পানির মোটর নিয়ে টানাটানি করছেন। ভবনের নিচতলা তলিয়ে যাওয়ায় পানির পাম্পও ডুবে গেছে। ফলে রাত থেকে পানি নেই। সকালে মিস্ত্রী নিয়ে এসে উঁচু টেবিলের ওপর মোটর বসাচ্ছেন তিনি।
পানিতে ডুবে যাওয়ায় রান্না হয়নি শ্যামলীর কাজী অফিস এলাকার অনেক বাড়িতে। সকালের খাবারের জন্য স্থানীয় রেস্তোরাঁগুলোতে ভিড় দেখা যায়।
মঙ্গলবার সকালে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চারটি পরোটা ও হালুয়া কেনেন শরীফা বেগম। জিজ্ঞাসা করতেই বললেন, “আমরা তো তাও চলতে পারি। পোলাপাইনগুলার লাইগা সমস্যা। এগুলা খিদা লাগলে হাইকাউ করে, পরিস্থিতি বুঝবার চায় না। আধঘণ্টা হোডেলে খাড়ায় চাইরটা পরোটা পাইছি।”