১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

আন্দোলনকারীরা বিভক্ত, আন্দোলনে থাকার ঘোষণা দুপক্ষেরই

আপিল বিভাগের আদেশ অনুযায়ী মঙ্গলবার কোটার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 26 Jul 2024, 03:30 PM

Updated : 26 Aug 2026, 10:06 AM

কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। 

কোটা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের পর একজন সমন্বয়ক আট দফা, আরেকজন নয় দফা দাবি পূরণের দাবি জানিয়েছেন। তবে দুই পক্ষই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আন্দোলন এখন আর কোটা সংস্কারে সীমাবদ্ধ নেই। এই আন্দোলনের কনসিকুয়েন্সে অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে। 

“আমাদের অসংখ্য ভাইকে শহীদ করা হয়েছে। শহীদ ভাইদের বিচারিক প্রক্রিয়া এবং হত্যার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তির বিষয়ে যতক্ষণ না উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, যতক্ষণ না আমাদের আট দফার বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে; ততোক্ষণ আমাদের আন্দোলন চলমান থাকবে। আট দফার বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখলে আমরা আন্দোলন ছেড়ে পড়ার টেবিলে ফিরে যাব।”

সারজিস যে ৮ দফার কথা বলছেন, তার মধ্যে আছে-

১. তদন্ত সাপেক্ষে হত্যায় দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে হবে;

২. দায়ীদের গ্রেপ্তার করে দ্রুত বিচার করতে হবে;

৩. শহীদদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা, মাসিক ভাতা এবং পিতামাতার মতামতের ভিত্তিতে পরিবারের একজনকে চাকরি দিতে হবে;

৪. তদন্ত সাপেক্ষে সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে হবে;

৫. বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে প্রশাসনিকভাবে সিট বরাদ্দ, সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধ ও ছাত্র সংসদ চালু করতে হবে;

৬. আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহার করতে হবে;

৭. আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক হয়রানি না করার নিশ্চয়তা দিতে হবে; 

৮. অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠীর জন্য ন্যূনতম মাত্রায় ৫ শতাংশ কোটা রেখে সংসদে আইন পাস করতে হবে। 

আরেক সমন্বয়ক আব্দুল কাদের ৯ দফা দাবি তুলে ধরে বলেছেন, “আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি প্রধানমন্ত্রীর প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া, দুই মন্ত্রীর (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সেতুমন্ত্রী) পদত্যাগ ৯ দফা দাবি অবিলম্বে মেনে নেন। ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানো বন্ধ করুন। ৯ দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কমপ্লিট শাটডাউন চলমান থাকবে।

“চলমান আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে নিহত হওয়া প্রায় তিন শতাধিক শহীদের স্মরণে আগামীকাল (সোমবার) বাদ জোহর দেশব্যাপী গায়েবানা জানাজা হবে।”

তিনি বলেন, “অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আবু বকর মজুমদার, আসিফ মাহমুদকে গুম করে ফেলা হয়েছে। দেশব্যাপী চলমান শাটডাউন কর্মসূচিতে ছাত্র জনতার ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়ে প্রায় তিন শতাধিক নাগরিককে শহীদ করেছে।”

কাদের ঘোষিত ৯ দফা দাবির মধ্যে আছে-

১. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাাকে ছাত্র হত্যার দায় নিয়ে জাতির কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে;

২. দুই মন্ত্রীকে মন্ত্রিসভা ও দল থেকে পদত্যাগ করতে হবে;

৩. ঢাকাসহ যত জায়গায় ছাত্র শহীদ হয়েছে, সেখানকার ডিআইজি, পুলিশ কমিশনার ও পুলিশ সুপারদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে হবে;

৪. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও প্রক্টরকে পদত্যাগ করতে হবে;

৫. যে পুলিশ সদস্যরা গুলি করেছে, ছাত্রলীগ-যুবলীগসহ যেসব ‘সন্ত্রাসীরা’ শিক্ষার্থীদের ওপর নৃশংস হামলা পরিচালনা করেছে; হত্যা মামলা দায়ের করে দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে;

৬. দেশব্যাপী যেসব শিক্ষার্থী ও নাগরিক শহীদ হয়েছেন, তাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে;

৭. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগসহ দলীয় লেজুরবৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে;

৮. অবিলম্বে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হল খুলে দিতে হবে;

৯. যেসব শিক্ষার্থী আন্দোলনে অংশ নিয়েছে, তাদের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক হয়রানি না করার নিশ্চয়তা দিতে হবে।

দুই পক্ষের মধ্যে দাবি-দাওয়ার মধ্যে পার্থক্য হওয়ার কারণ কী, এমন প্রশ্নের উত্তরে সারজিস আলম বলেন, “আব্দুল কাদের শুধু কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে ৯ দফা দাবি দিয়েছে। আর আমরা সবার সঙ্গে কথা বলে ৮ দফা দাবি দিয়েছি। এ বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।”

এ বিষয়ে আব্দুল কাদেরের বক্তব্য জানতে পারেনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের আন্দোলনের মুখে সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরির সব কোটা বাতিল করে ২০১৮ সালে পরিপত্র জারি করে। তবে এক রিট আবেদনের শুনানি শেষে সেই সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করে গত ৫ জুন রায় দেয় হাই কোর্ট।

এরপর জুলাইয়ের প্রথম দিন থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে আন্দোলনে নামেন চাকরিপ্রত্যাশী তরুণরা। প্রথম কয়েক দিন মিছিল, মানববন্ধনের মত কর্মসূচি থাকলেও পরে শুরু হয় তাদের অবরোধ কর্মসূচি, যার নাম দেওয়া হয় ‘বাংলা ব্লকেড’। এই আন্দোলন ঘিরে সহিংসতা শুরু হয় গত সোমবার। এর মধ্যে মঙ্গলবার, বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ও শনিবার ঢাকাসহ সারাদেশে শতাধিক প্রাণহানির খবর মিলেছে।

তবে রোববার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বলেছে, মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা বীরাঙ্গনার সন্তানের জন্য ৫ শতাংশ; ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য ১ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১ শতাংশ এবং কোটা সংরক্ষিত থাকবে। বাকি ৯৩ শতাংশ পদে নিয়োগ হবে মেধার ভিত্তিতে। নির্দেশনার আলোকে সরকারের নির্বাহী বিভাগকে এই মর্মে অনতিবিলম্বে গেজেট বা প্রজ্ঞাপন জারির নির্দেশ দেওয়া হলো।  

রাষ্ট্রপক্ষ এবং আন্দোলনরত দুই শিক্ষার্থীর করা লিভ টু আপিলের শুনানি করে প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে সাত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চ রোববার এ রায় দেয়।

পরে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, রবি ও সোমবার দুই দিন সাধারণ ছুটি থাকায় আগামী মঙ্গলবার কোটার নতুন বিন্যাস নিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হতে পারে।