কোরবানির বর্জ্য: মেয়াদোত্তীর্ণ আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে দূষণ বাড়ার শঙ্কা
“দেশে এখনো বর্জ্য সংগ্রহ করে এক জায়গায় ফেলে রাখাকেই ব্যবস্থাপনা হিসেবে দেখা হয়।”
কোরবানির ঈদে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় যে বর্জ্য তৈরি হবে, সেই ২০ হাজার টন আবর্জনার গন্তব্য সাভারের আমিনবাজার ল্যান্ডফিল।
বর্জ্যের এই বিশাল চাপ সামলাতে সেখানে নতুন পরিখা খননসহ নানা ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তবে টানা বৃষ্টিতে বর্জ্য নিঃসৃত তরল বা লিচেট ছড়িয়ে পড়ায় পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
২০১৭ সালে মেয়াদ শেষ হওয়া ভাগাড়টি ইতোমধ্যে ধারণক্ষমতা ছাড়িয়েছে। বৃষ্টির মৌসুমে আমিনবাজার ল্যান্ডফিল পরিণত হয়েছে তীব্র দুর্গন্ধের এলাকায়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চারদিকে পচা বর্জ্যের স্তূপের ফাঁকে জমে থাকা কালচে পানি আর কাদা মিশে এক নোংরা পরিবেশ। টানা বৃষ্টিতে বর্জ্যের স্তূপ থেকে লিচেট গড়িয়ে প্রবেশপথেও ছড়িয়ে পড়েছে। পচা বর্জ্যের গন্ধে পুরো এলাকা প্রায় শ্বাস নেওয়ার অনুপযোগী।
ল্যান্ডফিলের গন্ধ ও ধোঁয়ার কারণে আশপাশের বাসিন্দাদের কাশি, শ্বাসকষ্ট ও মাথাব্যথার মত সমস্যা লেগেই থাকে।
আমিনবাজার এলাকার অটোরিকশাচালক রুহুল মিয়া বলেন, “অন্য সময় ধোঁয়ার জন্য কষ্ট বেশি হয়। ইদানীং ধোঁয়া নাই, তবে গন্ধে মাঝে মাঝে মাথা ধরে আসে। কোরবানির পর এখানে এনে যখন ময়লা ফেলবে, তখন গন্ধ আরও ভয়াবহ হবে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী মোক্তার মিয়া বললেন, “এমনিতেই তো গন্ধ, তবে বছরের পর বছর থেকে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। কিন্তু কোরবানির সময় গন্ধের ডাবল অ্যাটাক হয়। তখন কষ্ট বেশি হয়ে যায়।”
ল্যান্ডফিলে দায়িত্বরত আনসার সদস্য আব্দুর রশিদ বলেন, “এখানে আমাদের কাউকে ৬ মাসের বেশি রাখা হয় না। বেশিদিন থাকলে নানা রকম কঠিন রোগবালাই হয়।”
ডিএনসিসির ‘অসহায়ত্ব’
২০০৫-২০০৬ অর্থবছরে ৫০ একর জমির ওপর নির্মিত আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শুরু হয় ২০০৭ সালে। এর মেয়াদ ছিল ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
ডিএনসিসির সহকারী প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আরাফাত হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ঈদের দুদিন আগেই আমিনবাজারে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। অতিরিক্ত বর্জ্য ফেলার জন্য সেখানে দুটি পরীখা (ট্রেঞ্চ) খনন করা হয়েছে।
কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ডিএনসিসির জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, দ্রুত বর্জ্য সরাতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ট্রাক, পেলোডার, ডাম্পার, পানির গাড়িসহ অন্যান্য যান-যন্ত্রপাতি প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে নিজস্ব পরিবহনের সংখ্যা ২৬১টি এবং ভাড়ায় সংগৃহীত ৪০৫টি যানবাহন রয়েছে। সংস্থার মোট ৫৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৬টি ওয়ার্ডে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৮৬টি পরিবহন নিয়োজিত থাকবে।
আরাফাত হোসেন বলেন, “২০১৭ সালেই আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু নতুন জায়গা না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে এখনো সেখানে বর্জ্য ফেলতে হচ্ছে। আমাদের তো আর বিকল্প কোনো জায়গা নেই।”
তিনি বলেন, বর্তমানে সেখানে তিনটি কার্যক্রম একসঙ্গে এগোচ্ছে। বিদ্যমান ল্যান্ডফিলটি ধাপে ধাপে বন্ধ করা হবে। পাশাপাশি ৫০ একর জমিতে সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ চলছে এবং আরও ৩০ একর জমিতে ‘ওয়েস্ট টু এনার্জি’ (বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ) প্ল্যান্ট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ: ছাড়পত্র কেন আটকা?
আমিনবাজারে প্রস্তাবিত বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ প্রকল্পের খসড়া পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিএনসিসি এলাকায় প্রতিদিন ৩,৫০০ টন বর্জ্য তৈরি হয়।
গত ৩ মার্চ আমিনবাজার ল্যান্ডফিল পরিদর্শন শেষে ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন বলেছিলেন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন থাকলেও পরিবেশ অধিদপ্তরের চূড়ান্ত ছাড়পত্রের অপেক্ষায় কাজ শুরু করা যাচ্ছে না।
দীর্ঘদিন ছাড়পত্র আটকে থাকার কারণ জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) জিয়াউল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আমিনবাজারে প্রস্তাবিত বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের জন্য ২০২১ সালে অবস্থানগত ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল।
“তবে পরবর্তী সময়ে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালায় থাকা ইনসিনারেটর প্রযুক্তির মানদণ্ডের সঙ্গে প্রস্তাবিত ডিজাইনের অসামঞ্জস্য দেখা দেয়।”
জিয়াউল হকের ভাষ্য, “চীনারা যে ইনসিনারেশন প্ল্যান্ট ব্যবহার করবে, সেটা আমাদের আইনে যে স্ট্যান্ডার্ড দেওয়া আছে তার সাথে মিলছিল না। এ কারণেই ছাড়পত্র প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়।”
তবে ওই মানদণ্ড সংশোধন করে ইতোমধ্যে গেজেট আকারে বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে জানিয়ে জিয়াউল বলেন, এখন প্রকল্পটির জন্য ছাড়পত্র দিতে আর বাধা নেই। শিগগিরই সংশোধিত সাইট ক্লিয়ারেন্স দেওয়া হতে পারে।
তবে এ প্রকল্প নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, “বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা ধারণাগতভাবে ভালো হলেও এ ধরনের প্ল্যান্ট পরিচালনায় যে নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষা ব্যবস্থা দরকার, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সক্ষমতা ও প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।”
অধ্যাপক মোস্তাফিজ সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের প্ল্যান্টে বিপুল তাপ উৎপন্ন হয়। কুলিং সিস্টেম ঠিকভাবে পরিচালিত না হলে তা পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি
আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের আনসার কমান্ডার মিজানুর রহমান বলেন, ভাগাড়ে মিথেন গ্যাসের কারণে মাঝেমাঝে আগুন জ্বলে ওঠে। এখন বৃষ্টির মৌসুম বলে অনেকদিন যাবত আগুন দেখা যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে পরিবেশ বিজ্ঞানী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, স্তূপে চাপা পড়া পুরনো বর্জ্য পচনের ফলে মিথেন তৈরি হয়, যা অল্পতেই জ্বলে উঠতে পারে।
তবে কিছু ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ নিজেরাই আগুন লাগিয়ে সেটিকে ‘স্বতঃস্ফূর্ত আগুন’ বলে চালিয়ে দেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ অধ্যাপকের গবেষণায় ল্যান্ডফিলের লিচেটের কারণে আশপাশের ভূগর্ভস্থ পানি, পৃষ্ঠের পানি ও উদ্ভিদে দূষণের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “যে ল্যান্ডফিলে কোনো কার্যকর সেইফটি মেজার নেই, সেখানে এ ধরনের দূষণ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ল্যান্ডফিল থেকে নির্গত ব্ল্যাক কার্বন ও ধূলোবালির কারণে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।”
কোরবানির ঈদ সামনে রেখে বর্জ্যের চাপ সামলানো ডিএনসিসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে মন্তব্য করে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, দেশে এখনো বর্জ্য সংগ্রহ করে এক জায়গায় ফেলে রাখাকেই ব্যবস্থাপনা হিসেবে দেখা হয়।
“পুরো সিস্টেমটাকে ঢেলে সাজাতে হবে। কিন্তু ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অভাব আছে। এই খাতে অনেক অনানুষ্ঠানিক ব্যবসাও জড়িয়ে আছে, যেগুলোর কারণে কার্যকর ব্যবস্থাপনা সম্ভব হচ্ছে না।”
