ভাষাসৈনিক শিল্পী ইমদাদ হোসেনের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছে শিল্পী, রাজনীতিক, সংস্কৃতিকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ। তার জানাজায়ও অংশ নেয় অজস্র জন।
Published : 14 Nov 2011, 04:49 AM
ঢাকা, নভেম্বর ১৪ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- ভাষাসৈনিক শিল্পী ইমদাদ হোসেনের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছে শিল্পী, রাজনীতিক, সংস্কৃতিকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ। তার জানাজায়ও অংশ নেয় অজস্র জন।
রোববার সকালে রাজধানীর একটি হাসপাতালে মৃত্যু হয় ইমদাদ হোসেনের। তার বয়স হয়েছিলো ৮৫ বছর।
ইমদাদ হোসেনের স্মরণ সভা আগামী ২৫ নভেম্বর বিকাল ৩টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে হবে।
সোমবার সকাল ১০টায় প্রয়াত শিল্পীর মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেওয়া হয়।
আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ফুলেল শ্রদ্ধা জানায় ইমদাদ হোসেনের প্রতি। এছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও তার প্রতি শ্রদ্ধা জানায়।
ভাষাসৈনিক অশীতিপর আব্দুল মতিনও শহীদ মিনারে যান প্রয়াত সহযোদ্ধার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। তিনি বলেন, "অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে তিনি শুধু নগরেই নয় বরং গ্রামাঞ্চলেও সোচ্চার ভূমিকা রেখেছেন।"
১৯৫২ সালে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য ইমদাদ হোসেন চারুকলার ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
প্রয়াত এ শিল্পীর প্রতি আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানান স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ওবায়েদুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল আলম হানিফ প্রমুখ।
কফিনে ফুল দেওয়ার পর ওবায়েদুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, "তার মৃত্যু জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।"
ভাষার অধিকার নিয়ে শুধু সরাসরি লড়াইয়েই নয়, ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিস্মারক শহীদ মিনারের নকশায় মূলস্তম্ভের পেছনে লাল সূর্যটি এসেছিলো শিল্পী ইমদাদ হোসেনের প্রস্তাবেই।
তার এ অবদান স্মরণ করে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, "লাল সবুজের রূপকারের চলে যাওয়া জাতীর জন্য চরম ক্ষতির।"
পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়, সে নামটিও চারুকলা অনুষদের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী ইমদাদেরই দেওয়া।
ইমদাদ স্মরণে শিল্পী হাশেম খান বলেন, "নবান্ন-পহেলা বৈশাখ শহরে উদযাপনের কাজটি তার উদ্যোগেই শুরু হয়েছিলো। যে কোনো প্রগতিশীল আন্দোলনে সবাইকে সম্পৃক্ত করতে ভূমিকা ছিলো তার।"
ইমদাদ ১৯৬৬ সালে প্রধান নকশাবিদ হিসেবে কাজ শুরু করেন পূর্ব পাকিস্তান টেলিভিশন ঢাকা কেন্দ্রে। ১৯৭৬ সালে অবসর নেন বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে।
বাংলাদেশ টেলিভিশনে তার অবদানের কথা তুলে ধরেন শিল্পী মুস্তফা মনোয়ার। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ টেলিভিশনের লোগোর নকশা করার বিষয়টিও জানান তিনি।
সংস্কৃতি সংগঠক কামাল লোহানী বলেন, "গণমানুষের পক্ষে ইমদাদ হোসেনের অবস্থান ছিলো সব সময় আপসহীন।"
শহীদ মিনারে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকেও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। ডেপুটি স্পিকার শওকত আলীও প্রয়াত শিল্পীর কফিনে ফুল দেন।
প্রয়াত এ শিল্পীকে শ্রদ্ধা জানানোর পরে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, তিনি সারা জীবন মুক্ত চিন্তা করেছেন।
শহীদ মিনারে দুপুর ১২টা পর্যন্ত শ্রদ্ধা জানানোর পর সেখানে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হয় সংগ্রামী এ শিল্পীকে। এ সময়ে শিল্পীকে শ্রদ্ধা জানাতে ১ মিনিটের নিরবতা পালন করা হয়।
এরপর মরদেহ নেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। তিনি ছিলেন ঢাকা আর্ট কলেজের প্রথম ব্যাচের ছাত্র, যা এখন চারুকলা অনুষদ।
চারুকলায় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক প্রয়াত শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
জোহরের নামাজের পর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে ইমদাদ হোসেনের জানাজা হয়। এরপর মরদেহ নেওয়া হয় ঢাকার কেরানীগঞ্জের রোহিতপুরে। সেখানে দ্বিতীয় জানাজা শেষে সন্ধ্যায় পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয় তাকে।
ইমদাদ হোসেনের জন্ম ১৯২৬ সালের ২১ নভেম্বর চাঁদপুরে। বাবার নাম মজিদ বক্স, মায়ের নাম সাবেদুন নেসা। তার শৈশব-কৈশোর কেটেছে ঢাকার কেরানীগঞ্জে পৈত্রিক বাড়িতে। স্কুলের লেখাপড়াও সেখানেই।
ভাষা আন্দোলনের পরও নানা সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ ছিলো ইমদাদ হোসেনের। ১৯৬১ সালে ছায়ানট প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই শিল্পী ইমদাদ হোসেন ছিলেন সংগঠনটির একজন সক্রিয় সদস্য। ১৯৬৯ সালে স্বাধিকার আন্দোলনে তুমুল ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের সময়ে প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শিল্পী কামরুল হাসানের সঙ্গে মিলে প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে 'চারু শিল্পী সংস্থা' গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।
ইমদাদ হোসেন ১৯৫৪ সালের ২১ নভেম্বর বিয়ে করেন। তার স্ত্রীর নাম মনোয়ারা বেগম বকুলি। তার চার ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে তিন ছেলেই চারুকলায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণকারী শিল্পী।
শিল্পকলায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১০ সালে একুশে পদক লাভ করেন ইমদাদ হোসেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এএইচএ/এমআই/১৫১৩ ঘ.