মোশতাক আহমেদ
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম প্রতিবেদক
ঢাকা, মার্চ ২৫ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- কামরুলের বয়স যখন এক বছর, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন আজিজুল বারী হেলাল। ১৯৮৪ সালে জন্ম নেওয়া কামরুল হাসান খান গত জানুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। কিন্তু হেলাল এখনো ছাত্রদলের সভাপতি! মোশতাক আহমেদের কলমে বিস্তারিত।
সংগঠনের গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে হেলালের মতো ছাত্র নামধারী বুড়োদের নেতৃত্বে চলছে প্রধান বিরোধীদল বিএনপি সমর্থিত ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। কমিটির নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলেও সম্মেলনের উদ্যোগ নেই।
এ পরিস্থিতিতে মাঠ পর্যায়ের ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সম্মেলন দিয়ে ছাত্রদের দিয়ে নতুন কমিটি গঠনের দাবি তুলেছে।
এ বিষয়ে জাতায়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শফিউল বারী বাবু বুধবার টেলিফোনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি দুই বছরের জন্য গঠিত হয়। ২০০৫ সালে বর্তমান কমিটি গঠনের পর ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির কারণে সাংগঠনিক কাজকর্ম চালানো সম্ভব হয়নি। এখন নতুন সম্মেলনের মাধ্যমে সারা দেশের ছাত্রদলকে আরো শক্তিশালী করা হবে।"
ছাত্রদলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দুই বছর পর পর জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি গঠন করার কথা।
তবে কোন কারণে যথা সময়ে কাউন্সিল করা না গেলে দলীয় (বিএনপি) চেয়ারপারসনের অনুমতি নিয়ে তিন মাসের মধ্যে জাতীয় কাউন্সিল করার বিধানও রয়েছে গঠনতন্ত্রে।
ছাত্রদলের বর্তমান কমিটি গঠন হয় ২০০৫ সালের জানুয়ারি মাসে। সে সময় আজিজুল বারী হেলালকে সভাপতি ও শফিউল বারী বাবুকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি গঠন করা হয়।
এ হিসেবে ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যকারিতা শেষ হয়েছে দু'বছর আগে।
ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির শীর্ষ নেতাদের কারোরই ছাত্রত্ব নেই। একজন ছাত্রদল কর্মী জানান, এদের অনেকেই বিয়ে করে সংসার ও ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত।
ছাত্রদলের বর্তমান সভাপতি আজিজুল বারী হেলাল ২৪ বছর আগে ১৯৮৫-৮৬ সেশনে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। তখন অনার্স ছিল তিন বছরের এবং এক বছরের মাস্টার্স। সেই হিসেবে তার ছাত্রত্ব শেষ হয়েছে বহু আগেই।
গত ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও হেলাল বিএনপির হয়ে অংশ নেন। তিনি ঢাকা-১৮ আসনে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের কাছে পরাজিত হন।
ছাত্রদলের সভাপতির কারাগারে থাকার সময় দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালনকারী সিনিয়র সহ-সভাপতি সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুও টাঙ্গাইল-২ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আওয়ামী লীগের খন্দকার আসাদুজ্জামানের কাছে পরাজিত হন। তারও ছাত্রত্ব নেই। তিনিও নিয়মিত ভাবে ছাত্রদলের কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন।
ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেছেন, সাধারণত ছাত্র রাজনীতি থেকে বিদায় নিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়। কিন্তু এ দ্ইু জনের এখনো নেতৃত্বে থাকার বিষয়টি 'হাস্যকর' বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
শুধু এই দু'নেতাই নন ছাত্রদলের শীর্ষ পর্যায়ের বেশির ভাগ নেতারই ছাত্রত্ব নেই।
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক শফিউল বারী বাবু ১৯৯০ এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে ভর্তি হন। ছাত্রত্ব নেই তারও ।
এছাড়াও সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল কাদের জুয়েল, সহ-সভাপতি নুরুল ইসলাম নয়ন, জয়ন্ত কুমার কুণ্ডু, শহিদুল ইসলাম বাবুল, যুগ্ম সম্পাদক আমিরুল ইসলাম আলিম, সহ-সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ থেকে শুরু করে সম্পাদক পর্যায়ের বেশিরভাগেরই নেই ছাত্রত্ব। কেউ কেউ আছেন যারা পরীা না দিয়ে অনিয়মিত হিসেবে ছাত্রত্ব ধরে রেখেছেন।
এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শীর্ষ নেতারও ছাত্রত্ব নেই। সভাপতি হাসান মামুন ও সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ দু'জনেরই অনার্স সেশন ১৯৯০-৯১। কেন্দ্রীয় কমিটির পরপর করা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কমিটির মেয়াদও শেষ হয়েছে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হাসান মামুন বলেন, "গত দুই বছর জরুরি অবস্থা ছিল, যে কারণে সম্মেলন করা সম্ভব হয়নি। জরুরি অবস্থা না থাকলে ২০০৭ সালেই সম্মেলন হতো এবং নতুন নেতৃত্ব আসতো। তবে আমাদের প্রত্যাশা শিগগিরই সম্মেলন হবে এবং নতুন নেতৃত্ব আসবে।"
ছাত্রদলের জেলা শাখাগুলোতেও চলছে বেহাল দশা। বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের আগে (২০০৫'র আগে) একবার জেলা কমিটিগুলো গঠন করা হয়েছিল।
কেন্দ্রীয় কমিটির এক সম্পাদক জানান, এরপর আর সম্মেলন হয়নি।
মেয়াদোত্তীর্ণ ঢাকা মহানগর উত্তর ও দেিণর কমিটির শীর্ষ নেতারাও ছাত্রত্ব শেষ করে বিয়ে করে সংসারি হয়েছেন। তারপরও তারা পদ আঁকড়ে রেখেছেন।
ঢাকা মহানগরের উত্তরের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম, সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন আলী দেিণর সভাপতি রফিকুল আলম মজনু ও সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান হাবিব কারোরই ছাত্রত্ব নেই। তারা সবাই ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সমাজ সেবা সম্পাদক আহসান উদ্দিন খান শিপন বলেন,"আমরা চাচ্ছি আমাদের সাংগঠনিক নেত্রী খালেদা জিয়া শিগিগিরই একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করবেন। যারা সারা দেশের সাংগঠনিক জেলাগুলো নতুনভাবে গঠন করবে এবং সংগঠনের সদস্য সংগ্রহ অভিযান চালাবে। আমরা তার ( খালেদা জিয়া) যেকোন সিদ্ধান্ত মেনে নিতে প্রস্তুত।"
ছাত্রদলের আরেকজন কেন্দ্রীয় নেতা শিগশিগরই সম্মেলনের দাবি জানিয়ে বলেন, "৩০ কিংবা ৩২ হোক বয়সের একটি নির্ধারিত সময় ধরে বেশি বয়স্কদের বাদ দিয়ে নতুনদের হাতে নেতৃত্বে তুলে দেওয়া দরকার।"
তিনি আরও বলেন, "প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ যেখানে নেতা নির্বাচনের েেত্র ২৯ বছর সময় বেঁধে দিয়েছে সেখানে আমাদের সংগঠনে বয়স্কদের হাতে নেতৃত্ব্ থাকার বিষয়টি সাধারণ শিার্থীদের মাঝেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তাই সংগঠনের স্বার্থে পরিবর্তন আনা দরকার।"
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহ-সম্পাদক মনিরুজ্জামান রেজিন বলেন,"ছাত্রদলকে ঠিক রাখতে চাইলে শিগগিরই সম্মেলন দিয়ে নতুন কমিটি গঠন করতে হবে।"
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এমএ/এএল/জিএনএ/১৯২৫ ঘ.
bdnews24