সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার রায়ের অপেক্ষা

সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ ১১ আসামির বিরুদ্ধে ফারমার্স ব্যাংক (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) থেকে চার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাতের মামলার রায় ঘোষণা হবে মঙ্গলবার। 

আদালত প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 8 Nov 2021, 08:06 AM
Updated : 9 Nov 2021, 03:19 AM

ঢাকার ৪ নম্বর বিশেষ জজ আদালত বিচারক শেখ নাজমুল আলম আলোচিত এই মামলার রায় পড়ে শোনাবেন।

এর আগে গত ৫ ও ২১ অক্টোবর এ মামলার রায় ঘোষণার তারিখ থাকলেও বিচারক ছুটিতে থাকায় এবং রায় প্রস্তুত না হওয়ায় দুইবারই তা পিছিয়ে যায়।

দুদকের প্রধান আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল সোমবার বলেন, মঙ্গলবার ধার্য দিনেই রায় হবে বলে এখন পর্যন্ত তারা জানেন।

গত ২৯ অগাস্ট আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন বিচারের মুখোমুখি হওয়া সাত আসামি। তারা আদালতের কাছে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন।

এই সাতজন হলেন- ফারমার্স ব্যাংক লিমিটেডের (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) অডিট কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক চিশতী (বাবুল চিশতী), ফারমার্স ব্যাংকের সাবেক এমডি এ কে এম শামীম, ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বপন কুমার রায়, ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. লুৎফুল হক, সাবেক এসইভিপি গাজী সালাহউদ্দিন, টাঙ্গাইলের মো. শাহজাহান ও একই এলাকার নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা। তাদের মধ্যে বাবুল চিশতী কারাগারে আছেন, বাকিরা জামিনে।

সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা, ফারমার্স ব্যাংকের সাবেক ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট সাফিউদ্দিন আসকারী, টাঙ্গাইলের বাসিন্দা রনজিৎ চন্দ্র সাহা ও তার স্ত্রী সান্ত্রী রায়কে পলাতক দেখিয়ে এ মামলার বিচার চলে।

গতবছর ১৩ অগাস্ট এই ১১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দিয়েছিলেন ঢাকার ৪ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক শেখ নাজমুল আলম।

অভিযোগপত্রে নাম থাকা ২১ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয় গত ২৪ আগস্ট। এরপর ১৪ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়।

আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. শাহীনুর ইসলাম অনি সে সময় বলেছিলেন, মামলায় ২১ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হলেও তাদের জবানবন্দির মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণে ‘ব্যর্থ হয়েছে’ রাষ্ট্রপক্ষ।

“জেরার সময় সাক্ষীরা তাদের বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণ করতে পারেন নাই। তাই আশা প্রকাশ করছি এই মামলায় আসামিরা ন্যায় বিচার ও খালাস পাবেন।”

অপরদিকে রাষ্ট্রপক্ষে দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেছিলেন, “আসামিদের অপরাধ প্রমাণে আমরা সক্ষম হয়েছি, তাই তাদের সর্বোচ্চ সাজা হবে বলে প্রত্যাশা করছি।”

দণ্ডবিধি, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের যেসব ধারায় এ মামলার অভিযোগ গঠন করা হয়েছে, তাতে অপরাধ প্রমাণিত হলে আসামিদের সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন শাস্তি হতে পারে।

মৃত্যুদণ্ডের কোনো ধারা না থাকায় এস কে সিনহাসহ পলাতক আসামিদের পক্ষে কোনো আইনজীবীকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

কী নিয়ে মামলা

নানা নাটকীয় ঘটনার মধ্যে বিচারপতি সিনহা তিন বছর আগে বিদেশে পাড়ি জমানোর পর দুদক অভিযোগ পায়, তিনি ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ব্যবসায়ী পরিচয়ে দুই ব্যক্তির নেওয়া ঋণের চার কোটি টাকা নিজের অ্যাকাউন্টে নিয়েছিলেন।

বিচারপতি এসকে সিনহা (ফাইল ছবি)

অভিযোগ পেয়ে ওই বছরই তদন্তে নামে দুদক। দীর্ঘ তদন্তের পর ২০১৯ সালের ১০ জুলাই সিনহাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন।

মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর আসামি শাহজাহান ও নিরঞ্জন চন্দ্র ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখায় আলাদা দুইটি অ্যাকাউন্ট খোলেন। ব্যবসা বাড়ানোর জন্য পরদিন তারা ওই ব্যাংক থেকে দুই কোটি টাকা করে মোট চার কোটি টাকা ঋণের আবেদন করেন।

তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং ঋণের আবেদনে উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টরের ১২ নম্বর রোডের ৫১ নম্বর বাড়ির ঠিকানা ব্যবহার করা হয়, যার মালিক ছিলেন তখনকার প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা।

ঋণের জামানত হিসেবে আসামি রনজিৎ চন্দ্রের স্ত্রী সান্ত্রী রায়ের নামে সাভারের ৩২ শতাংশ জমির কথা উল্লেখ করা হয় ঋণের আবেদনে। ওই দম্পতি এস কে সিনহার পূর্ব পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ বলে উল্লেখ করা হয়েছে মামলার এজাহারে।

দুদক বলছে, ব্যাংকটির তৎকালীন এমডি এ কে এম শামীম কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই, ব্যাংকের নিয়ম-নীতি না মেনে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঋণ দুটি অনুমোদন করেন।

মামলার এজাহারে বলা হয়, ৭ নভেম্বর ঋণের আবেদন হওয়ার পর ‘অস্বাভাবিক দ্রুততার’ সঙ্গে তা অনুমোদন করা হয়। পরদিন মোট চার কোটি টাকার দুটি পে-অর্ডার ইস্যু করা হয় এস কে সিনহার নামে। ৯ নভেম্বর সোনালী ব্যাংকের সুপ্রিম কোর্ট শাখায় এস কে সিনহার অ্যাকাউন্টে জমা হয়।

পরে বিভিন্ন সময়ে ক্যাশ, চেক ও পে-অর্ডারের মাধ্যমে ওই টাকা উত্তোলন করা হয়। এর মধ্যে এস কে সিনহার ভাইয়ের নামে শাহজালাল ব্যাংকের উত্তরা শাখার অ্যাকাউন্টে দুটি চেকে দুই কোটি ২৩ লাখ ৫৯ হাজার টাকা স্থানান্তর করা হয় ওই বছরের ২৮ নভেম্বর।

এজাহারে বলা হয়, “আসামি রনজিৎ চন্দ্র ঋণ দ্রুত অনুমোদনের জন্য প্রধান বিচারপতির প্রভাব ব্যবহার করেন। রনজিৎ চন্দ্রের ভাতিজা হলেন ঋণ গ্রহীতা নিরঞ্জন এবং অপর ঋণ গ্রহীতা শাহজাহান ও রনজিৎ ছোটবেলার বন্ধু। ঋণ গ্রহীতা দুইজনই অত্যন্ত গরিব ও দুস্থ। তারা কখনও ব্যবসা-বাণিজ্য করেননি।”

পাঁচ মাসের তদন্ত শেষে দুদক কর্মকর্তা বেনজীর আহমেদ ২০১৯ সালের ৯ ডিসেম্বর ১১ জনকে আসামি করে এ মামলার অভিযোগপত্র দেন। তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে এস কে সিনহার ব্যাংক হিসাবের চার কোটি টাকা জব্দ করা হয়।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে অসৎ উদ্দেশ্যে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ফারমার্স ব্যাংকে ভুয়া ঋণ সৃষ্টি করে সেই টাকা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর, উত্তোলন ও পাচার করেছেন, যা দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/১০৯ ধারা, ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং ২০১২ সালের মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৪(২)(৩) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

দুদকের করা এই মামলার এজাহারে বাবুল চিশতীর নাম না থাকলেও অভিযোগপত্রে তাকে নতুন করে আসামি করা হয়। আর এজাহারে ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক মো. জিয়া উদ্দিন আহমেদকে আসামি করা হলেও অভিযোগপত্রে মামলার দায় থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করেন তদন্ত কর্মকর্তা।

সেই অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে ঢাকার ৪ নম্বর বিশেষ জজ আদালত ২০২০ সালের ১৩ অগাস্ট সাবেক প্রধান বিচারপতি সিনহাসহ ১১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।

বাংলাদেশের ইতিহাসে সিনহাই প্রথম সাবেক প্রধান বিচারপতি, যিনি দুর্নীতিতে অভিযুক্ত হয়েছেন।

এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২১ জন সাক্ষীর সবার সাক্ষ্য শুনেছে আদালত, তাদের মধ্যে এস কে সিনহার আপন বড় ভাই নরেন্দ্র কুমার সিনহা এবং মামাতো ভাইয়ের ছেলে শঙ্খজিৎ সিনহাও রয়েছেন।

তারা দুজনেই বলেছেন, ‘এস কে সিনহার কথাতেই’ তাদের নামে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের উত্তরা শাখায় হিসাব খোলা হয়েছে। পরে সেই হিসেবে সোয়া দুই কোটি টাকা স্থানান্তরের বিষয়ে তারা ‘জানতেন না’।

গত ২৪ আগস্ট আলোচিত এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের পরিচালক বেনজীর আহমেদকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। ওইদিন তার জেরা শেষ হওয়ায় আদালত আসামিপক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য ২৯ আগস্ট দিন ধার্য করেন।

এরপর দুই পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে মামলাটি রায়ের পর্যায়ে আসে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক