Published : 17 Jul 2024, 11:52 PM
সরকারি চাকরিতে কোটা থাকবে কি থাকবে না, এই চিন্তা করার ফুরসত ছিল না শাহজাহানের। কোন কাজটি করলে দুটি টাকা বেশি আসবে, এই ছিল তার নিত্য ভাবনায়।
মায়ের পরামর্শ ছিল, “বাবা তোর যহন এত অভাব, লজ্জা রাইখা করবি কী?”, তার মানে কোনো কাজকে ছোট ভাবা বা কোনো কাজ নিয়ে লোক লজ্জার কিছু নেই, যেখানে যা পাওয়া যায়, তাই করতে হবে।
মায়ের সেই উপদেশ মেনেই কাজ করতেন শাজহাজান, নিউমার্কেট এলাকায় হকারি করতেন। তবে সেই কাজটিও হারিয়ে ফেলেন। চিন্তা করেছিলেন অটোরিকশা চালাবেন। কিন্তু তার জীবন আর আগাতে দিল না সংঘাত। কোটা নিয়ে আন্দোলনকারী এবং ছাত্র ও যুবলীগের মধ্যে সংঘর্ষের মাঝে হারায় ২৫ বছর বয়সী একটি তাজা প্রাণ।
মা ও স্ত্রীকে নিয়ে কামরাঙ্গীরচরে চান মসজিদের পাশে একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতেন শাহজাহান। পরিবারের আয়ের উৎস ছিলেন তিনিই। তাকে হারিয়ে অথৈ সাগরে পড়ে যাওয়া পরিবারটির সামনে এখন কেবলই অনিশ্চয়তা।
বুধবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের ভিড় এড়িয়ে একপাশে চুপচাপ বসে ছিলেন শাহজাহানের মা আয়শা বেগম। মাঝে মাঝে মৃদুস্বরে দুই হাত ছড়িয়ে বিলাপ বকছিলেন, “পোলাডা আমার না খায়া গেল গা।”
শাহজাহান আগে নিউমার্কেটের সামনে পাপোস বিক্রি করতেন।তার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা ছিলেন। তিনমাস আগে গর্ভের সন্তানটি মারা যায়, স্ত্রীর চিকিৎসা বাবদ অনেক টাকা খরচ হয় তার। ঋণ করতে হয় অনেক। সেই টাকা শোধ দিতে না পারায় নিউমার্কেটের আগের জায়গায় আর দোকান বসাতে পারছিল না, একমাস ধরে বলা যায় বেকারই ছিল।
আয়েশা বেগম বিলাপ করে বলছিলেন, “পোলাডার আমার কাম আছিল না। ঠিকমত খাওনও জুটাইতে পারতাছিল না। মরার তিনদিন আগে আমারে কইল, ‘মা অটো চালামু’। আমি কইলাম ‘বাবা তোর যহন এত অভাব, লজ্জা রাইখা করবি কী’?”
মঙ্গলবার একটি ভবনে বিদ্যুতের কাজ করতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন শাহজাহান। তার মা বলেন, “ওয় ইলেকট্রিকের কাম, ওয়ার্কশপের কামও জানত। ওর এক মামায় কইছে ধানমন্ডিতে বিল্ডিংয়ের কামে জয়েন দিতে। মঙ্গলবার সকালে উইঠা বাইরাইছে।
“ওর বউয়ে ভাত সাধছে, ও খায় নাই। সকাল থিকা কাম করছে। দুপুরের পর খাওয়ার জন্য সবাই বাইর হইছে আর ও বাড়ির দিকে হাঁটা দিছে। শরীরটা বলে খারাপ লাগতাছিল। এরপর কারা ওরে এমনে মারল, কী হইল আমরা কিছু জানি না। আমরা হাসপাতালে আইয়া পোলার লাশ পাইলাম।”
শাহজাহানের মায়ের কান্না দেখে তার সঙ্গে কথা বলতে আসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান।
মর্গে এসে নিহতদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান।
শাহজাহানের মা তাকে বলেন, “স্যার আমার পোলাডা প্যাটের দায়ে কাম করতে বাইর হইছিল। কে ওরে এ্যামনে মারল?”
আগের দিন সংঘর্ষের মধ্যে ঢাকা কলেজের অদূরে মিরপুর সড়কে সিটি কলেজের সামনে রাস্তায় পড়ে ছিলেন শাহজাহান। সন্ধ্যা ৭টার দিকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকেও মৃত ঘোষণা করেন।
তখনও অবশ্য তার নাম জানা ছিল না। পরিদর্শক বাচ্চু মিয়া বলেছিলেন, তার মাথায় গুরুতর জখম ছিল। পরে তাকে শনাক্ত করেন তার স্বজনরা।
শাহজাহান কী করে ওই সংঘর্ষের মধ্যে গেলেন তা স্পষ্ট নয়।
মঙ্গলবারের এই সংঘাতে ঢাকা কলেজের সামনে পড়েছিল ছাত্রলীগ কর্মী সবুজ আলীর মরদেহও, যার পরিবারও হতদরিদ্র। রংপুরে প্রাণ হারানো আবু সাঈদের পরিবারেরও একই অবস্থা।
চট্টগ্রামে প্রাণ হারানো মোহাম্মদ ফারুক ছিলেন দোকান কর্মচারী। অন্য দুই জন চলেন চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ওয়াসিম আকরাম, যিনি ছাত্রদলের একটি ইউনিটের নেতা ছিলেন। অপরজন ফয়সাল আহমেদ শান্ত। তিনি চট্টগ্রাম বাকলিয়া সরকারি কলেজের ছাত্র।