১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

ব্লগার নিলয় হত্যার ১১ বছর: ‘মানুষটা তো ফিরে আসবে না, বিচারটা হলে শান্তি পেতাম’

বাসা দেখার কথা বলে ২০১৫ সালের ৭ অগাস্ট জুমার নামাজের পর চারজন এসে নিলয়কে কুপিয়ে হত্যা করে চলে যায়; এরপর কেটে গেছে ১১ বছর।

ব্লগার নিলয় হত্যার ১১ বছর: ‘মানুষটা তো ফিরে আসবে না, বিচারটা হলে শান্তি পেতাম’
নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয় ও তার স্ত্রী আশা মনি। আশা মনির ফেইসবুক থেকে নেওয়া।

বিডিনিউজ২৪

মামুন খান

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 07 Aug 2026, 01:05 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:48 PM

ঢাকার গোড়ানে নিজ বাসায় ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় ওরফে নিলয় হত্যার বিচারকাজ শেষ হয়নি ১১ বছরেও; আলোচিত এ হত্যা মামলা ঝুলে আছে সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে।

বিচারের অপেক্ষায় থাকা নিলয়ের স্ত্রী আক্ষেপ করে বলছেন, “নতুন করে আর কিছু বলার নাই। ১১ বছর তো হয়ে গেল। বিচারের কোনো কিছু দেখলাম না।”

তার কথায়, “মানুষটা তো আর ফিরে আসবে না, বিচারটা হলে শান্তি পেতাম। আমরা বিচার চাই।”

২০১৫ সালের ৭ অগাস্ট খিলগাঁওয়ের গোড়ানে নিজ বাসায় খুন হন ব্লগার নিলয়। সেদিন রাতেই খিলগাঁও থানায় কারো নাম তুলে না ধরে চারজনকে আসামি করে মামলা করেন তার স্ত্রী আশা মনি।

পাঁচ বছর পর তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ৪ অক্টোবর অভিযোগপত্র দেন তদন্ত কর্মকর্তা রমনা জোনাল টিমের পুলিশ পরিদর্শক শাহ মো. আক্তারুজ্জামান ইলিয়াস। সেখানে বহিষ্কৃত মেজর সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক ওরফে মেজর জিয়াসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়। ২০২২ সালের ১৮ জানুয়ারি বিচার শুরু হয়।

ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় ওরফে নিলয়।

ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় ওরফে নিলয়।

মামলাটি এখন সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায় রয়েছে ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আলমগীর হোসেনের আদালতে।

সবশেষ গত ২১ জুন মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ ছিল। সেদিন কোনো সাক্ষী না আসায় আগামী ১৭ অগাস্ট নতুন দিন ধার্য করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী শাহাদাৎ আলী তথ্য দিয়েছেন।

১৫ জনের মধ্যে সাক্ষ্য দিয়েছেন ৫ জন

অভিযোগ গঠনের চার দিন পর ২০২২ সালের ২২ এপ্রিল মামলার বাদী, নিলয়ের স্ত্রী আশা মনি সাক্ষ্য দেন।

এর প্রায় তিন বছর পর ২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি সামছুল কবির ও মোসা. সানজিদা খানম নামে দুজন সাক্ষ্য দেন। ৩ ফেব্রুয়ারি শামীম হোসেন আরেকজন সাক্ষ্য দেন। এর পাঁচা মাস পর সে বছরের ৩০ জুলাই খিলগাঁও থানার তৎকালীন ইন্সপেক্টর আনোয়ার হোসেন খান সাক্ষ্য দেন। সেদিনেই অপর সাক্ষীদের সাক্ষ্য দিতে জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।

২০২৬ সালের ৯ নভেম্বর মো. খোকন, তন্নী, নুরজাহান বেগম ওরফে মুকুল ও সেলিনা নামে চার সাক্ষীকে ১ ডিসেম্বর সাক্ষ্য দিতে তাদের আদালতে হাজিরে পুলিশকে নির্দেশ দেয় আদালত। এরপর চারটি ধার্য তারিখ ১ ডিসেম্বর, চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি, ৮ এপ্রিল ও ২১ জুন পার হলেও তাদের আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি।

আদালতের নথি অনুযায়ী, মামলাটিতে এখন পর্যন্ত ১৫ জন সাক্ষীর মধ্যে পাঁচজনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে।

ব্লগার নিলয় খুন হওয়ার পর স্ত্রীর আহাজারি।

ব্লগার নিলয় খুন হওয়ার পর স্ত্রীর আহাজারি।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সংশ্লিষ্ট আদালতের অ্যাডিশনাল পাবলিক প্রসিকিউটর মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, “রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টায় আছি মামলাটা শেষ করার জন্য। কিন্তু সাক্ষীরা আসছেন না। তাদের হাজির করা যাচ্ছে না।

“পুলিশের ওপর নির্ভর করে সাক্ষী হাজির করার বিষয়। পুলিশ সাক্ষীদের হাজির করতে পারছে না। এ জন্য সাক্ষ্য হচ্ছে না। আমরা রাষ্ট্রপক্ষ থেকে বিচার শেষ করতে প্রস্তুত আছি।”

মামলার অভিযোগপত্রে আসামি তালিকায় রয়েছেন- সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক ওরফে মেজর জিয়া, মো. মাসুম রানা, সাদ আল নাহিন, মো. কাওসার হোসেন খান, মো. কামাল হোসেন সরদার, মুফতি আব্দুল গফ্ফার, মো. মর্তুজা ফয়সাল সাব্বির, মো. তরিকুল আলম ওরফে তারেক, খাইরুল ইসলাম ওরফে জামিল ওরফে রিফাত ওরফে ফাহিম ওরফে জিসান, আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব ওরফে সাহাব, মোজাম্মেল হোসেন সায়মন, আরাফাত হোসেন সিয়াম ও মো. শেখ আব্দুল্লাহ আল জুবায়ের।

আসামিদের মধ্যে মেজর জিয়া ও কাওসার হোসেন পলাতক। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। অন্য আসামিদের কেউ কারাগারে, কেউ জামিনে।

আসামি তারিকুল আলমের আইনজীবী আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, “মামলার সাক্ষ্য চলছে। এটা হত্যা মামলা। অনেক রাজনৈতিক মামলা সরকারের সিদ্ধান্তে বাতিল করা হয়েছে। হত্যা মামলাটা সাক্ষীর মাধ্যমে শেষ হয়।”

এ আইনজীবী বলেন, “তারিকুলের বাড়ি চট্টগ্রামে। গ্রেপ্তারের পর তাকে ছয়-সাত দিন গুম করে রাখা হয়। পরিবার সংবাদ সম্মেলন করে। পরে তাকে এ মামলায় সন্ধিগ্ধ আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

“তার বাড়ি চট্টগ্রামে, দেখানো হল খিলগাঁও থানার মামলায়। আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেই। এখন পর্যন্ত পাঁচজন সাক্ষ্য দিয়েছে। তার বিরুদ্ধে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কিছু আসেনি। ভিকটিম মারা গেছে, কেউ মেরে ফেলেছে। প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী নেই। তার স্ত্রী দেখেছে হয়ত হত্যার পর। আসামিদের দেখলেও শনাক্ত করেননি। এখনো সাক্ষী বাকি আছে। দেখা যাক কী হয়। আমরা ন্যায়বিচার চাই।”

নিলয় হত্যাকাণ্ডের ১১ বছর হলেও বিচারের আশা ছাড়েননি তার স্ত্রী আশা মনি।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে লেখক-ব্লগার হত্যার ঘটনাগুলো নিয়ে তিনি বলেন, “বিচার আদৌ হবে কি না জানি না। ওই সরকারের (আওয়ামী সরকার) আমলে হত্যাকাণ্ডগুলো হয়েছে, কিন্তু বিচার করেনি। নতুন সরকার আসছে। নিলয়ের মত যাদের হত্যা করেছে, তাদের মামলাগুলোর বিচার যেন করেন।”

কফিনবন্দি ব্লগার নিলয়ের লাশ।

কফিনবন্দি ব্লগার নিলয়ের লাশ।

কী হয়েছিল সেদিন

দিনটি ছিল শুক্রবার। সেদিন জুমার নামাজ শেষ হওয়ার পরপরই খিলগাঁওয়ের পূর্ব গোড়ান টেম্পোস্ট্যান্ডের কাছে ৮ নম্বর রোডের ১৬৭ নম্বরের পাঁচতলা ভবনের পঞ্চমতলায় নিলয়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

ঘটনার বর্ণনায় নিলয়ের স্ত্রী আশা মনি বলেছিলেন, জুমার নামাজের পরপর দুই দফায় চারজন লোক বাসা দেখার কথা বলে প্রবেশ করে। তারা নিলয়কে কুপিয়ে হত্যা করে চলে যায়। কোপানোর সময় এক হামলাকারীর পা জড়িয়ে ধরেছিলেন আশা মনি। এরপর তাকে চুল ধরে টেনে নিয়ে বারান্দায় আটকে রাখা হয়।

আশা মনির ছোট বোন ইশরাত তন্বীও ঘটনার সময় সেই বাসায় ছিলেন। চিৎকার করায় তাকেও আটকে ফেলা হয় আরেক পাশের বারান্দায়। ঘাড় ও গলায় কুপিয়ে পাঁচ থেকে সাত মিনিটের মধ্যে নিলয়ের মৃত্যু নিশ্চিত করে হামলাকারীরা।

হত্যার পেছনে আল কায়েদা?

হত্যাকাণ্ডের ঘণ্টা চারেক পর আল কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশের (একিউআইএস) বাংলাদেশ শাখা, আনসার আল ইসলামের নামে সংবাদপত্র অফিসে ই-মেইল পাঠিয়ে দায় স্বীকার করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের খবর সংবাদমাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে প্রতিবাদ শুরু হয়। তখনকার গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা শাহবাগে মিছিল করে নিলয়ের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানান।

হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক রবার্ট ওয়াটকিনস এক বিবৃতিতে খুনিদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছিলেন। এ ধরনের হত্যা বন্ধে বাংলাদেশ সরকারকে ‘কঠোর হওয়ার’ আহ্বান জানিয়েছিল অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

যুদ্ধাপরাধের বিচার দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরণ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন ব্লগার নিলয়। ‘ইস্টিশন’ ব্লগে লিখতেন নিলয় নীল নামে। হত্যাকাণ্ডের সময় তার বয়স ছিল ২৭।

খুন হওয়ার কিছু দিন আগে হুমকি পাওয়ার কারণে ফেইসবুক থেকে নিজের সব ছবি সরিয়ে ফেলার পাশাপাশি ঠিকানার জায়গায় বাংলাদেশের বদলে লিখেছিলেন ভারতের কলকাতার নাম। নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে নিলয় হত্যাকাণ্ডের আড়াই মাস আগে জিডি করতে গেলেও থানা তা নেয়নি বলে ফেইসবুকে এক পোস্টে লিখেছিলেন তিনি।

নিলয়ের বাড়ি পিরোজপুর জেলার চাল্লিশা গ্রামে। বাবা তারাপদ চট্টোপাধ্যায় নিজের কৃষি জমি দেখাশোনা করতেন। নিলয় কাজ করতেন একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায়।

পুরনো খবর

নিলয় হত্যা সহিষ্ণুতার উপর আঘাতজাতিসংঘ

ভিন্নমতের কণ্ঠ রোধে হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হবে: অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল

ব্লগার নিলয় হত্যার বিচার চেয়ে ব্রিটিশ প্রতিমন্ত্রীর ট্যুইট

খুনগুলো সব একই কায়দায়

নিরাপত্তা চাইলে নিলয়কে ‘দেশ ছাড়তে’ বলেছিল পুলিশ

নিলয় হত্যার পেছনে আল কায়েদা?

হত্যাকারীদের ধরে ফেলব: মন্ত্রী

ঢাকায় ভর দুপুরে বাসায় ঢুকে ব্লগার হত্যা