প্রকৃতি ও পশুপাখির প্রতিও শিশুদের মানবিক হতে হবে: প্রধানমন্ত্রী
“শুধু মানুষের প্রতি মানুষ দয়া করবে না। মানুষ প্রকৃতির প্রতি দয়া করবে। মানুষ দয়া দেখাবে প্রকৃতির সৃষ্টির সবকিছুর প্রতি এবং আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি তোমরা সেটি করতে সক্ষম হবে।”
শিশুদের শুধু পড়াশোনা, খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতি বা ভাষাজ্ঞানে দক্ষ করে তুললেই হবে না, তাদের মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে শিশু অধিকার দিবস-২০২৬ এবং একাডেমির ৫০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, প্রকৃতি ও পশুপাখির প্রতিও শিশুদের মানবিক হতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “তোমাদেরকে অনেক দায়িত্ব পালন করতে হবে। শুধু পড়ালেখা শিখলে হবে না, শুধু খেলাধুলায় ভালো হলেই হবে না। শুধু আর্ট, কালচারে ভালো হলেই হবে না। শুধু দুটির বদলে তিনটি বা তিনটির বদলে চারটি ভাষা জানলেই হবে না।
“তোমাদের কিন্তু মানবিক হতে হবে। তোমাদেরকে এই দেশের প্রকৃতি, এই দেশের পশুপাখির প্রতিও মানবিক হতে হবে।”
তিনি বলেন, “আমরা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাশা করি, আমরা এই বাংলাদেশকে একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়তে চাই। শুধু মানুষের প্রতি মানুষ দয়া করবে না। মানুষ প্রকৃতির প্রতি দয়া করবে। মানুষ দয়া দেখাবে প্রকৃতির সৃষ্টির সবকিছুর প্রতি এবং আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি তোমরা সেটি করতে সক্ষম হবে।”
গাছের যত্ন, পশুপাখির প্রতি সদয় হওয়ার আহ্বান
শিশুরা যাতে তাদের আশপাশের গাছপালা ও পশুপাখির যত্ন নেয়, সেই আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “তোমরা যখন বড় হচ্ছ, চেষ্টা করবে তোমার আশপাশে যে প্রকৃতি আছে, অর্থাৎ তোমার আশপাশে যে গাছপালা আছে—তোমার বাড়ির আশপাশে হোক কিংবা স্কুলের মধ্যে হোক, তুমি যেখানে যে জায়গাটি পছন্দ করো, সেই জায়গাটির আশপাশেই হোক—যদি কোনো গাছ থাকে যেটি তোমার মতো ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে, আজকে হয়তো শিশু আছে তোমার মত, গাছটি যাতে তোমার মত বড় হতে পারে তুমি গাছটিকে সাহায্য করো, তুমি গাছটিকে পানি দাও, তুমি গাছটির যত্ন নাও, যাতে সেটি বড় হতে পারে।”
তারেক রহমান শিশুদের উদ্দেশে বলেন, “তুমি যেখানে থাকো, তোমার বাসায় হোক, তোমার স্কুলে হোক, সেখানে কোনো না কোনো পশুপাখি তোমার আশপাশে আছে। তুমি চেষ্টা করো এই পশুপাখিও কিন্তু এই দেশের সম্পদ, অর্থাৎ তোমার দেশের সম্পদ, অর্থাৎ তোমার সম্পদ। তুমি চেষ্টা করো পশুপাখির প্রতি কাইন্ড হওয়ার জন্য, তুমি চেষ্টা করো সেই পশুপাখির প্রতি দয়া দেখানোর জন্য, তাকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করার জন্য।”
শিশুদের অভিভাবকদেরও এ বিষয়ে সচেতন করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
“আপনাদের প্রতি আমার অনুরোধ থাকবে একান্তভাবে যে, আপনার সন্তান, আপনার শিশুকে এই অনুভূতিটুকু, এই বোধটুকু দিন, যাতে করে সে প্রকৃতির প্রতি কাইন্ড হয়, যাতে করে সে প্রকৃতির সৃষ্টি পশুপাখির প্রতি কাইন্ড হয়।”
তিনি বলেন, “আমরা যদি সকলে মিলে চেষ্টা করি আমাদের শিশুদের মধ্যে এই অনুভূতিটা, এই বোধশক্তি দিতে, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী, ইনশাআল্লাহ আমরা একদিন একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়তে সক্ষম হব। আমরা যদি প্রকৃতির প্রতি সদয় হই, অবশ্যই প্রকৃতিও আমাদের প্রতি সদয় হবে।”
যত্রতত্র ময়লা না ফেলতে বড়দের সতর্ক করার আহ্বান
পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে শিশুদের ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “তোমাদের কাছে আমার একটি সাহায্য চাওয়া আছে। তোমরা যদি সাহায্য করো, তোমরা যদি এ ব্যাপারে সতর্ক হও, তোমরা যদি এ ব্যাপারে সচেতন হও, তাহলে আমরা একটা সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব, সুন্দর একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে পারব।”
তিনি বলেন, “তোমরা যখন রাস্তায় হাঁটাচলা করো, নিশ্চয়ই তোমরা খেয়াল করে দেখেছ যে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকম আবর্জনা বা ময়লা পড়ে থাকে। যেভাবেই হোক, আমাদের দেশের অধিক মানুষ অসচেতন। যেকোনো ময়লা, যেকোনো আবর্জনা, যেকোনো জিনিস ব্যবহার হয়ে গেলে সেটি যদি কোনো প্যাকেট থাকে বা কিছু থাকে, আমরা অসচেতনভাবে ফেলে দিই।”
শিশুদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “তুমি যেহেতু বড় হচ্ছ, তোমার সামনে কোনো বড় মানুষ যদি কোনো একটি ময়লা বা আবর্জনা বা অব্যবহৃত কোনো জিনিস যত্রতত্র ফেলে দিয়ে পরিবেশের ক্ষতি করে, পরিবেশকে নষ্ট করে, পরিবেশকে ময়লা করে, তুমি ছোট হিসেবে কিন্তু তাকে লজ্জা দিয়ে বলতে পারো যে, ময়লাটি সঠিক জায়গায় ফেলুন।
“আপনি যদি পরিবেশটিকে নষ্ট করেন, আপনি যদি পরিবেশকে ময়লা করেন, তাহলে আমি আজকের শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হব। আমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া মানে বাংলাদেশের লক্ষ কোটি শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।”
অভিভাবকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আসুন আমরা শিশুদের মধ্যে এই বোধটুকু দেওয়ার চেষ্টা করি, যাতে করে তারা নিজেরা সচেতন হয় এবং সেই সচেতনতার মাধ্যমে আমরা একটি পরিষ্কার, সুন্দর পরিবেশ গড়ে তুলতে পারি।”
তিনি বলেন, “আজকে যদি আমরা একটি পরিষ্কার, সুন্দর পরিবেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হই, যত্রতত্র আমাদের পরিবেশকে যদি ময়লা না করি, আবর্জনা ভরে না দিই, তাহলে আপনার শিশুটি একটি সুস্থ পরিবেশে বড় হবে।”
পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, সংস্কৃতির চর্চা
শিশুদের শুধু পড়াশোনায় মনোযোগ না দিয়ে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার আহ্বানও জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “আজকে আমি তোমাদের বলব না, পড়ো, পড়ো, পড়ো। আজকে আমি বলব, তোমাদেরকে খেলাধুলা করতে হবে। তোমাদের মধ্যে অনেকের অনেক রকম প্রতিভা আছে। কেউ তোমরা ভালো আঁকতে পার, কেউ তোমরা কবিতা আবৃত্তি করতে পার।”
গিটার বাজানোর প্রতি নিজের আগ্রহের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “তোমাদের মধ্যে এরকম অনেকে আছ, গিটার বাজাতে পার। আমি শেষ করতে পারিনি। আমি শুরু করেছিলাম গিটার বাজানো। আমার খুব শখ ছিল গিটার বাজানোর।”
শিশুদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমি চাই তোমরা যারা গিটার বাজাতে পছন্দ কর অথবা হারমোনিয়াম বাজাতে পছন্দ কর, অথবা বাঁশি বাজাতে পছন্দ কর, এরকম যার যেটা আছে, আমি চাই তোমরা সেটি শেষ কর। আমি যেটা শেষ করতে পারিনি, তোমরা সেটা শেষ কর।”
গান, নাচ ও কোরআন তেলাওয়াতের চর্চার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “যারা তোমরা নাচ করতে পছন্দ কর, তোমরা শিখে সেটি সম্পন্ন কর। তোমরা যারা কেরাত, কোরআন তেলাওয়াত করতে পছন্দ কর, তোমরা সেটা সুন্দরভাবে রপ্ত কর, যাতে সুন্দরভাবে তোমরা তেলাওয়াত করতে পার। অর্থাৎ আমি চাই যে, তোমাদের ভেতরে যে কোয়ালিটিগুলো আছে, যে গুণগুলো আছে, সেই গুণগুলো সুন্দরভাবে তোমরা ফুটিয়ে তুলতে পার।”
শিশুদের বিকাশে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “আমাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামের শিশুরা যাতে এই সুযোগগুলো পায়, সেজন্য আমরা সরকারের পক্ষ থেকে স্কুল লেভেল থেকেই আর্ট বলেন, কালচার বলেন, স্পোর্টস বলেন, মিউজিক বলেন—এই ফ্যাসিলিটিগুলো আমরা তৈরি করার চেষ্টা করছি, যাতে প্রত্যেকটি বাচ্চা তার পছন্দমতো সাবজেক্ট বেছে নিতে পারে।”
তিনি জানান, “ইনশাআল্লাহ ২৭ বা ২৮ সাল থেকে আমরা পুরো প্রক্রিয়াটা শুরু করতে পারব। প্রত্যেকটি বাচ্চা, সেটি প্রাইমারি হোক, সেটি সেকেন্ডারি স্কুল হোক, প্রত্যেকটি বাচ্চা যে গান শিখতে চাইবে, তাকে হয়তো গান শেখার সুযোগ আমরা করে দিতে পারব।”
‘নস্টালজিয়া’
শিশু একাডেমিতে নিজের শৈশবের স্মৃতিও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “এখানে আসার পরে আমাকে ডাক্তার আমান উল্লাহ বলছিলেন... একটু আগে নিশ্চয় কেউ কেউ খেয়াল করেছেন, আমি মোবাইল চেক করছিলাম। দেখলাম যে আমান আমাকে মেসেজ পাঠিয়েছে যে, স্যার, আপনি কি অনেক পেছনে চলে গিয়েছেন কিনা? মানে নস্টালজিয়ার একটা অবস্থার মধ্যে আমি আছি কিনা।”
তিনি বলেন, “সময়টা ‘৭৬/৭৭ সাল হবে। একদিন বিকেলবেলা... যখন এই শিশু একাডেমি তার কাজ শুরু করে, উদ্বোধনের দিন আমি, আমার ছোট ভাই এবং অবশ্যই আমার আব্বু এবং আম্মা—অর্থাৎ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া—আমরা চারজন এসেছিলাম সেদিন এখানে এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে।”
নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা এসেছিলাম সেদিন, নিজেও মোটামুটি শিশুই ছিলাম। সেদিন বয়স হিসেবে শিশুই ছিলাম, আমার ছোট ভাই আরও ছোট ছিল। অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে আমরা বসেছিলাম... দেখছিলাম বাচ্চারা কী করছে।”
শিশু একাডেমি থেকে একসময় প্রকাশিত শিশুদের ম্যাগাজিন ‘শিশু’-তে নিজের লেখা ছড়া ও গল্প প্রকাশের কথাও বলেন তারেক রহমান।
“শিশু নামে একটি ম্যাগাজিন বের হতো বাচ্চাদের জন্য। এই শিশু ম্যাগাজিনটাতে সেই সময় আমরা যারা ছোট ছিলাম, এরকম বিভিন্ন বাচ্চারা কেউ ছড়া লিখত, কেউ কবিতা লিখত, কেউ গল্প লিখত—সেই জিনিসগুলো সেই শিশু ম্যাগাজিনটাতে ছাপা হত।”
তিনি বলেন, “এরকম কয়েকটি গল্প এবং ছড়া আমিও লিখেছিলাম। দেখলাম যে একটি গল্প, যেখানে ডিসপ্লে করা আছে একটি বোর্ডের মধ্যে। আমার ছোট ভাইও তার একটি ঘটনা লিখেছিল, সেটিও দেখলাম। আমাদের দুই ভাইয়ের লেখা সেখানে ডিসপ্লে করা।”
শিশুদের ভবিষ্যৎ হোক সুরক্ষিত: জুবাইদা
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, “স্নেহের ছোট বন্ধুরা, সকল বাধা-বিপত্তি ছিন্ন করে তোমরা প্রস্ফুটিত হবে, আশা-আকাঙ্ক্ষার সার্থকতার আলোকরশ্মি দুই হাতে বরণ করবে। প্রতিটি শিশুর মধ্যে ঘুমিয়ে আছে অপার সম্ভাবনা। সেই প্রতিভাকে প্রকাশ করতে দিতে হবে নতুন উদ্যমে, নতুন উদ্যোগে।”
তিনি বলেন, “ইনশাআল্লাহ তোমরা সফল হবেই। প্রতিটি শৈশব হোক নিরাপদ, প্রতিটি শিশুর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত—এই আমাদের কামনা।”
জুবাইদা রহমান বলেন, “আজ থেকে ৫০ বছর আগে শিশু একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সম্ভাবনার ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য। তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে শত বাধা বিপত্তি সত্বেও শিশু একাডেমি নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
“এই একাডেমির আঙিনায় ছবি আঁকা, সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি ও সাহিত্য চর্চায় অগণিত প্রতিভা একটি অভাবনীয় প্রতিষ্ঠান। শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদান জাতি চিরদিন স্মরণ রাখবে।”
শিশু অধিকার দিবস এবং বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এবারের আয়োজনে প্রতিপাদ্য ছিল: ‘শিশুর ভবিষ্যৎ হোক সুরক্ষিত’।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান সকালে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছালে ১৫০ শিশু তাকে বরণ করে নেয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরে শিশু একাডেমির শিশুদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অতিথি সারিতে বসে উপভোগ করেন প্রধানমন্ত্রী ও তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান।
অনুষ্ঠানে শিশুদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, স্মারক উপহার প্রদান এবং স্মরণিকা ‘শৈশব’-এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিশুদের সঙ্গেও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
পরে প্রধানমন্ত্রী শিশু জাদুঘর ভবনের নিচতলায় সোলার প্যানেল ও সাব-স্টেশন উদ্বোধন করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মহিলা, শিশু ও সমাজকল্যাণবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব রওশন আরা বেগমসহ অন্যরা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।
