Published : 16 Apr 2026, 02:08 PM
দেশের অধস্তন আদালতগুলোতে বিগত বছর নাগাদ ৪০ লাখ ৪১ হাজার ৯২৪টি মামলা বিচারাধীন থাকার তথ্য জাতীয় সংসদকে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান।
বৃহস্পতিবার সংসদে সরকার দলীয় সংসদ সদস্য জাহান্দার আলী মিয়ার প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর টেবিলে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়।
মামলার জট কমাতে ৮৭১টি আদালত এবং ২৩২টি বিচারকের পদ সৃজন করা হয়েছে বলেও সংসদকে জানান আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান।
তিনি বলেন, আরও ৩০৪টি বিচারকের পদ সৃজনের প্রক্রিয়া চলছে। নতুন ১৫০ জন সিভিল জজ নিয়োগ কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে অধস্তন আদালতের স্টেনো-টাইপিস্ট, স্টেনোগ্রাফার, অফিস সহায়ক ও চালকের শূন্য পদে ৭০৮ জন বিচার বিভাগীয় কর্মচারী নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। বিভিন্ন পদে আরও ৫৫৩ জন কর্মচারী নিয়োগের কার্যক্রমও চলছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘব এবং মামলার জট নিরসনে দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সমন জারিতে এসএমএস ও ভয়েস কলের বিধান
বিচারপ্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করতে সাম্প্রতিক আইন সংশোধনের কথা সংসদে তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান।
তিনি বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধি আইন সংশোধনের মাধ্যমে এসএমএস ও ভয়েস কলের মাধ্যমে সমন জারির বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া অ্যাফিডেভিটের মাধ্যমে আরজি ও লিখিত জবাব দাখিল এবং সরাসরি জেরা করার বিধানও আনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
আইনমন্ত্রী বলেন, ডিক্রি জারির জন্য পৃথক মামলা না করে মূল মামলায় সরাসরি দরখাস্ত দাখিলের বিধানও যুক্ত করা হয়েছে।
‘বিচারকদের বদলি-পদায়নে দলীয় আনুগত্য ছিল মানদণ্ড’
বিরোধী দলের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে আসাদুজ্জামান বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বাধীন করার ক্ষেত্রে কোনো আইনি বা প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা ছিল না।
তার ভাষ্য, তখন বিচারকদের বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্যকে প্রধান মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
আইনমন্ত্রী বলেন, সুপ্রিম কোর্টের মাধ্যমে ‘দলের প্রতি অনুগত’ বিচারকদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হতো, আর যারা স্বাধীনভাবে বিচারকার্য পরিচালনার চেষ্টা করতেন, তাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলির মাধ্যমে কার্যত শাস্তি দেওয়া হতো।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার সেই পথে না হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সততা, দক্ষতা এবং বিচারকদের বিচারিক আচরণই হবে মানদণ্ড। সে লক্ষ্যেই আইন মন্ত্রণালয় সুপ্রিম কোর্টে সুপারিশ করবে।
তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের, সরকারের একক ক্ষমতা নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পুরনো আইন সংস্কারে কাজ করছে ল কমিশন
বিএনপির সংসদ সদস্য ফজলে হুদার প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের যেসব আইন বর্তমান প্রেক্ষাপটে অকার্যকর বা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নিয়ে সরকার পর্যায়ক্রমে সংশোধন বা নতুনভাবে প্রণয়নের উদ্যোগ নেবে।
এ লক্ষ্যে ল কমিশন কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, কমিশনের সুপারিশ পাওয়ার পর সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
সরকারদলীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এনামুল হকের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ২০২৫ সালে ৪৬৭ জন বিচারককে পেশাগত দক্ষতা, আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং বিচারকার্য পরিচালনায় সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ৯৩ জন বিচারককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
দুই জেলায় ই-ফ্যামিলি কোর্ট
বিচার ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তর নিয়েও সংসদে কথা বলেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান।
তিনি জানান, বর্তমানে দুই জেলায় ই-ফ্যামিলি কোর্ট চালু রয়েছে। এই ব্যবস্থায় পারিবারিক মামলা দায়ের, শুনানি এবং মামলার অন্যান্য কার্যক্রম অনলাইনে সম্পন্ন হচ্ছে।
এর ফলে মামলা পরিচালনা দ্রুত, স্বচ্ছ ও কম খরচে হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
আইনমন্ত্রী বলেন, বিশেষ করে নারী, শিশু এবং দূরবর্তী এলাকার মানুষ এ ব্যবস্থার মাধ্যমে সহজে বিচারপ্রাপ্তির সুযোগ পাচ্ছেন। পর্যায়ক্রমে দেশের সব জেলায় ই-ফ্যামিলি কোর্ট সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি জানান, বিচার ব্যবস্থাকে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তরের লক্ষ্যে ‘ই-জুডিসিয়ারি’ শীর্ষক একটি প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী ডিপিপি পুনর্গঠনের কাজ চলছে।
মিথ্যা মামলা নিয়ে পরিসংখ্যান নেই
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, মামলা দায়েরের সময় এজাহারে অভিযুক্তের দলীয় পরিচয় উল্লেখ থাকে না।
সে কারণে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কতটি হয়রানিমূলক ও মিথ্যা মামলা হয়েছে, আর তার মধ্যে কতটি তদন্তে বা আদালতের রায়ে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই বলে জানান তিনি।
সরকারদলীয় সংসদ সদস্য মনোয়ার হোসেনের প্রশ্নের জবাবে ্োসাদুজ্জামান বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে বর্তমান সরকার সম্পূর্ণ সচেতন।
তিনি বলেন, এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মামলা প্রত্যাহারের জন্য একটি কমিটি গঠন করেছিল। ওই কমিটির নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোনো হত্যা মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি।
বর্তমান সরকারও রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের জন্য কমিটি করেছে এবং মামলাগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রত্যাহারের কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।
মামলা নিষ্পত্তির গড় সময় নিয়ে সমীক্ষা নেই
সরকারদলীয় সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা নিষ্পত্তিতে গড়ে কত সময় লাগে, তা নিয়ে কোনো সমীক্ষা হয়নি। এ বিষয়ে সরকারের কাছেও কোনো তথ্য নেই।
তিনি এও বলেন, ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৮০ দিন এবং দায়রা আদালতে ৩৬০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে।
দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকলেও ‘কিছু নির্দেশনা’ আছে জানিয়ে তিনি বলেন, মামলার প্রকৃতি ও জটিলতার ওপর সময় নির্ভর করে। কোনো মামলা এক বছরে শেষ হতে পারে, আবার কোনো মামলায় পাঁচ বছর বা তার বেশি সময়ও লাগতে পারে।