০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

ঢাকার চারপাশের নদী: দূষণের উদ্বেগজনক চিত্র সংসদীয় কমিটিকে দেখাল ওয়ারপো

শিল্প, বিভিন্ন সংস্থা, সাধারণ মানুষ ও হাটবাজার থেকে ফেলা বর্জ্যে দূষণ ঘটছে, বলেন ওয়ারপোর ডিজি।

ঢাকার চারপাশের নদী: দূষণের উদ্বেগজনক চিত্র সংসদীয় কমিটিকে দেখাল ওয়ারপো

ঢাকার শ্যামপুরে কলকারখানার রাসায়নিক মিশ্রিত পানিতে দূষিত হচ্ছে বুড়িগঙ্গা নদী। ফাইল ছবি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 07 Oct 2026, 10:38 PM

Updated : 07 Oct 2026, 10:38 PM

ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যার পানির মান পরীক্ষায় দূষণের উদ্বেগজনক চিত্র পেয়েছে পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা-ওয়ারপো।

চার নদীর ৩৬টি স্থান থেকে চার মৌসুমে পানির নমুনা নিয়ে করা পরীক্ষায় দেখা গেছে, শুষ্ক মৌসুমে অধিকাংশ স্থানে পানির মান ‘খারাপ’ পর্যায়ে থাকছে। বর্ষায় পানির মানের উন্নতি হলেও কোনো নদীর কোনো নমুনা সংগ্রহস্থলের মানই ‘চমৎকার’ পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির তৃতীয় বৈঠকে দেওয়া ওয়ারপোর উপস্থাপনায় এ চিত্র উঠে আসে।

বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যার নয়টি করে স্থান থেকে শুষ্ক মৌসুম, বর্ষার আগে, বর্ষা এবং বর্ষার পর পানির নমুনা নিয়ে ‘ওয়াটার কোয়ালিটি ইনডেক্স’ বা ডব্লিউকিউআই তৈরি করেছে সংস্থাটি।

ওয়ারপোর মহাপরিচালক মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান বলছেন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সঙ্গে গত দুই বছর ধরে এ গবেষণা করছেন তারা। এখন পর্যন্ত পাওয়া ফলকে তারা ‘প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ’ হিসেবে দেখছেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে লুৎফুর রহমান বলেন, “চারটা নদীর মোট ৩৬ পয়েন্টে আমরা কন্টিনিউয়াস ডেটা কালেকশন করছি। ১৬টা প্যারামিটার আমরা টেস্ট করছি। ১৬টা প্যারামিটার নিয়ে আমরা একটা ইনডেক্স বানিয়েছি, যেটাকে আমরা বলছি ওয়াটার কোয়ালিটি ইনডেক্স।”

গবেষণার ফল নিয়ে তিনি বলেন, তারা যে শ্রেণিবিন্যাস করেছেন এবং সেখানে যে মানগুলো পেয়েছেন সেগুলো আন্তর্জাতিক মানের অনেক নিচে।

পানির মান নির্ধারণে তাপমাত্রা, পিএইচ, বৈদ্যুতিক পরিবাহিতা, ঘোলাভাব, মোট কঠিন পদার্থ, মোট দ্রবীভূত কঠিন পদার্থ, মোট ভাসমান কঠিন পদার্থ, দ্রবীভূত অক্সিজেন, জৈব রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা বা বিওডি, রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা বা সিওডি, ক্লোরাইড, টোটাল কলিফর্ম, ই-কোলাই, নাইট্রেট, ফসফেট ও অ্যামোনিয়াসহ ১৬টি সূচক পরীক্ষা করা হয়।

ওয়ারপোর সমন্বিত ডব্লিউকিউআই ফলাফলে চার নদীতেই মৌসুমের সঙ্গে পানির মানের বড় পার্থক্য দেখা যায়।

বুড়িগঙ্গার নয়টি নমুনা সংগ্রহস্থলে শুষ্ক মৌসুমের ডব্লিউকিউআই প্রায় ৩০ থেকে ৪০-এর মধ্যে রয়েছে। বর্ষা ও বর্ষার পর বেশিরভাগ স্থানে সূচকের উন্নতি হয়েছে; কয়েকটি স্থানে তা ৬০-এর ওপরে উঠেছে।

তুরাগেও শুষ্ক মৌসুমে নয়টি নমুনা সংগ্রহস্থলের পানির মান ‘খারাপ’ পর্যায়ে দেখা গেছে। বর্ষা এবং বর্ষার পর সূচকের উন্নতি হয়েছে।

বালু নদীর ক্ষেত্রেও একই ধরনের মৌসুমি পরিবর্তন দেখা গেছে। শুষ্ক মৌসুমে নমুনা সংগ্রহস্থলগুলোর পানির মান ‘খারাপ’ পর্যায়ে থাকলেও বর্ষা ও বর্ষার পরে ডব্লিউকিউআই বেড়েছে।

চার নদীর মধ্যে শীতলক্ষ্যার বেশ কয়েকটি নমুনা সংগ্রহস্থলে তুলনামূলকভাবে বেশি ডব্লিউকিউআই পাওয়া গেছে। তবে শুষ্ক মৌসুমে সেখানকারও কয়েকটি স্থানে পানির মান ‘খারাপ’ পর্যায়ে নেমেছে।

বুড়িগঙ্গায় অক্সিজেনের ঘাটতি

বুড়িগঙ্গার পানির তিনটি সূচকের আলাদা ফলও উপস্থাপনায় তুলে ধরেছে ওয়ারপো। নদীটির নয়টি নমুনা সংগ্রহস্থলে জৈব রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা চার মৌসুমেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতি লিটারে প্রায় ২০ থেকে ৩৫ মিলিগ্রামের মধ্যে দেখা গেছে। ওয়ারপোর গ্রাফে মাছের জন্য এর মান প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ৬ মিলিগ্রাম এবং পানীয় জলের জন্য সর্বোচ্চ ২ মিলিগ্রাম দেখানো হয়েছে।

Image

জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির বৈঠক হয়।

অন্যদিকে বুড়িগঙ্গার দ্রবীভূত অক্সিজেন বা ডিও সব নমুনা সংগ্রহস্থলেই মাছের জন্য দেখানো প্রতি লিটারে ৫ মিলিগ্রাম মাত্রার অনেক নিচে রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে কয়েকটি স্থানে তা শূন্যের কাছাকাছি নেমেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের নথিতেও মাছের জন্য উপযোগী পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন অন্তত ৫ মিলিগ্রাম এবং জৈব রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা বা বিওডি সর্বোচ্চ ৬ মিলিগ্রাম প্রতি লিটার থাকার কথা বলা হয়েছে।

বুড়িগঙ্গার নাইট্রেটের মাত্রায় স্থান ও মৌসুমভেদে বড় পার্থক্য দেখা গেছে। ওয়ারপোর গ্রাফে কয়েকটি নমুনায় তা মাছ ও পানীয় জলের জন্য দেখানো মাত্রা ছাড়িয়ে যেতে দেখা যায়।

‘দূষণের উৎস বন্ধ করতে হবে’

চার নদীর দূষণের পেছনে শিল্প, বিভিন্ন সংস্থা, সাধারণ মানুষ ও হাটবাজার থেকে নদীতে ফেলা বর্জ্যকে দায়ী করছেন ওয়ারপোর মহাপরিচালক।

লুৎফুর রহমান বলেন, “প্রচুর ময়লা আমরা ফেলছি। সেটা হয় শিল্প, না হয় বিভিন্ন সংস্থা, না হয় জনগণ, না হয় হাটবাজার। আমাকে উৎসগুলো বন্ধ করতে হবে।”

দূষণের উৎস বন্ধ না করে অন্য ব্যবস্থা নিয়ে নদীর পানির মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে আনা সম্ভব হবে না বলে মনে করেন তিনি।

“আমাকে যে কোনো মূল্যে পলিউশন সোর্স বন্ধ করতে হবে,” বলেন ওয়ারপোর মহাপরিচালক।

করণীয় নিয়ে তিনি বলেন, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের পরিমাণ কমানোর পাশাপাশি পানির ব্যবহার কমাতে হবে। ব্যবহৃত পানি পুনঃব্যবহার ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করার ব্যবস্থাও করতে হবে।

সমীক্ষা দ্রুত শেষ করার তাগিদ

বৈঠকে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং এর আওতাধীন পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ওয়ারপোর চলমান কার্যক্রম, সমস্যা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা পর্যালোচনা করা হয়।

ওয়ারপোর চলমান সমীক্ষাগুলো দ্রুত শেষ করা এবং সংস্থাটির গবেষণা সক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে সংকটপূর্ণ এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপন কমানো, ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানো, ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানো এবং পানি পুনঃব্যবহারের নীতি অনুসরণের ওপরও গুরুত্ব দেয় কমিটি।

সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি নূরুল ইসলাম মনি বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।

এতে উপস্থিত ছিলেন কমিটির সদস্য মিয়া নূরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, মো. আখতারুজ্জামান মিয়া, তাহসিনা রুশদীর, খোন্দকার আবু আশফাক, মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ, বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম, মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া ও মোহাম্মদ কামাল হোসেন।