০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

দেশভাগের পর প্রথম: চালু হল আসাম-ঢাকা নৌপথ, ব্রহ্মপুত্র দিয়ে আসছে ৫৪০ টন মিথানল

ব্রিটিশ আমলে কলকাতা হয়ে চা, কাঠ ও কয়লা পরিবহনে ব্যবহার করা হত এই নৌপথ। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর এ পথ বন্ধ হয়ে যায়।

দেশভাগের পর প্রথম: চালু হল আসাম-ঢাকা নৌপথ, ব্রহ্মপুত্র দিয়ে আসছে ৫৪০ টন মিথানল

ডিএলবি পাতকাই ৫৪০ টন মিথানল নিয়ে ঢাকার পানগাঁও বন্দরে আসছে। ছবি: অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ, ভারত

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 06 Oct 2026, 12:44 PM

Updated : 06 Oct 2026, 12:44 PM

দেশভাগের আগে চালু থাকা ভারতের আসামের ডিব্রুগড় থেকে বাংলাদেশের ঢাকার নৌপথ আনুষ্ঠানিকভাবে আবার চালু হয়েছে।

ডেকান হেরাল্ড এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সোমবার ডিব্রুগড়ের বগীবিল থেকে ৫৪০ মেট্রিক টন মিথানল নিয়ে একটি জাহাজের বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরুর মধ্য দিয়ে এই নৌপথ পুনরুজ্জীবিত হল।

ব্রিটিশ আমলে কলকাতা হয়ে চা, কাঠ ও কয়লা পরিবহনে ব্যবহার করা হত এই নৌপথ। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর এ পথ বন্ধ হয়ে যায়।

ভারতের অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান হয়ে যাওয়া নৌপথটি ১৯৪৭ সালে বন্ধ হলেও ডিব্রুগড়ের ব্রহ্মপুত্র নদীবন্দর বন্ধ হয় ১৯৫৬ সালে।

সোমবার বগীবিল থেকে ডিএলবি পাতকাই নামের জাহাজটির যাত্রার উদ্বোধন করেন ভারতের নৌপরিবহন ও জলপথমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠানে যুক্ত হন।

ডিব্রুগড়ে বেড়ে ওঠা সোনোয়াল বলেন, “আমাদের দাদা-দাদিরা ডিব্রুগড় ঘাটে স্টিমারের হুইসেল শুনে বড় হয়েছেন। ৭০ বছর ধরে, যখন ঘাটটি বন্ধ ছিল, সেই হুইসেল আর শোনা যায়নি, জাহাজও আসেনি।

“আজ আবার একটি জাহাজ ডিব্রুগড় থেকে রওনা হচ্ছে। নদী কখনো আমাদের ব্যর্থ করেনি। কয়েক দশক ধরে যা ছিল না, তা হল একে পুনরুজ্জীবিত করার সদিচ্ছা,” বলেন তিনি।

বাংলাদেশে আসছে ৫৪০ টন মিথানল

আসামের নামরূপে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আসাম পেট্রো-কেমিক্যালস লিমিটেডের (এপিসিএল) উৎপাদিত মিথানলের চালানটির গন্তব্য ঢাকার পানগাঁও বন্দর।

জাহাজটি ভারতের ব্রহ্মপুত্র নদে জাতীয় জলপথ-২ ধরে প্রায় ৭৬৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে পৌঁছাবে। এরপর যাবে ভারত-বাংলাদেশ প্রটোকল রুট বা আইবিপিআর দিয়ে।

বগীবিল, ডিব্রুগড় থেকে বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত জাহাজটির মোট যাত্রাপথ প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার।

আসামের নামরূপে উৎপাদিত পণ্য আসামের নিজস্ব নদীপথে আন্তর্জাতিক বাজারে যাচ্ছে—বিষয়টিকে ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ হিসেবে বর্ণনা করেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা।

তিনি বলেন, “উত্তর-পূর্বাঞ্চল আর ভারতের প্রান্তসীমা নয়। এটি পূর্বের দিকে ভারতের প্রবেশদ্বার।”

পণ্য পরিবহনের করিডোর হিসেবে ব্রহ্মপুত্র

ডেকান হেরাল্ড লিখেছে, উত্তর-পূর্ব ভারতকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে ব্রহ্মপুত্রকে বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর পণ্য পরিবহন করিডোর হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না, এই যাত্রাকে তার একটি পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন ভারতীয় কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশে নিয়মিত মিথানল পাঠানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। সম্প্রতি বগীবিল ও ধুবরিতে শুল্ক ও অভিবাসন-সংক্রান্ত অবকাঠামো স্থাপনের পর এই চালান পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সোনোয়াল বলেন, “ভারতের চা-রাজধানী হিসেবে পরিচিত ডিব্রুগড় একসময় যে গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর ছিল, সেই গৌরব ফিরে পাচ্ছে। ঐতিহ্যকে ধরে রেখে বিশ্বমানের অবকাঠামো গড়ে তুলছি আমরা। ১৯৫৬ সালে যে স্টিমারের হুইসেল থেমে গিয়েছিল, তা আবার শোনা যাচ্ছে।”

ভারত ও বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের মধ্যকার সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যে এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন কর্মকর্তারা।

ডিব্রুগড়ের পুরনো নৌপথ

একসময় পূর্ব ভারতের অন্যতম ব্যস্ত নদীবন্দর ছিল ডিব্রুগড়। ১৮৫৬ সালের মধ্যে তৎকালীন কলকাতা থেকে সরকারি স্টিমার ডিব্রুগড়ে যাতায়াত শুরু করে।

১৮৮২ সালে ডিব্রুগড় স্টিমার ঘাট থেকে ডিব্রু-সাদিয়া রেলপথের যাত্রা শুরু হয়। ১৯১৩ সালেও ব্রহ্মপুত্র দিয়ে ডিব্রুগড় পর্যন্ত প্রতিদিন স্টিমার চলাচল করত। এসব জাহাজে চা, কাঠ ও যাত্রী পরিবহন করা হত।

১৯৪৭ সালের দেশভাগে এই নৌপথ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এর ফলে আসামের পণ্য কলকাতায় নিতে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের ওপর দিয়ে যেতে হত।

১৯৫০ সালের ভূমিকম্পে ডিব্রুগড়ের কাছে নদীর তলদেশের পরিবর্তন ঘটে। ১৯৫৪ সালে ডিব্রুগড় বন্দর থেকে নিয়মিত পণ্য বুকিং বন্ধ হয়ে যায়। এরপর চা পরিবহন রেলপথে চলে যাওয়ায় ১৯৫৬ সালের ১৫ অক্টোবর ঘাটটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের কারণে দুই দেশের মধ্যে আন্তসীমান্ত নৌবাণিজ্যও বন্ধ হয়ে যায়।

বাংলাদেশ হয়ে ভারতের উত্তর ও পূর্বের মধ্যে নৌবাণিজ্য

নদীপথে বাণিজ্য নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে একটি প্রটোকল সই করে। ১৯৮৮ সালে সাদিয়া থেকে ধুবরি পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের ৮৯১ কিলোমিটার অংশকে ভারতের জাতীয় জলপথ-২ ঘোষণা করা হয়।

তবে ওই জলপথে নিয়মিত পণ্য পরিবহন শুরু হতে আরও কয়েক দশক লাগে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে গুয়াহাটির পান্ডু থেকে আসামের পশ্চিমাঞ্চলের ধুবরি পর্যন্ত সিমেন্ট পরিবহনের মধ্য দিয়ে নিয়মিত পণ্য পরিবহন শুরু হয়। বাংলাদেশের সঙ্গে সড়ক ও নৌপথে সীমান্ত রয়েছে ধুবরির।

সোনোয়াল বলেন, এরপর থেকে এই নৌপথে কার্যক্রম বেড়েছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ হয়ে টাটা স্টিলের বার্জ পান্ডুতে পৌঁছায়।

২০২৩ সালে ভারতের বারাণসী থেকে বাংলাদেশ হয়ে ডিব্রুগড়ে যায় প্রমোদতরী এমভি গঙ্গা বিলাস।

বগীবিল যাত্রী ও পণ্য টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল ২০২৩ সালের জুলাইয়ে। এটি চালু হয় ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে।

সোনোয়ালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারতের জাতীয় জলপথে পণ্য পরিবহন ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১ কোটি ৮০ লাখ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২১ কোটি ৮০ লাখ মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে।

ডেকান হেরাল্ড লিখেছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জলপথ উন্নয়নে ৭৭ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এর মধ্যে জাতীয় জলপথ-২-এর উন্নয়ন, পান্ডুতে জাহাজ মেরামতের সুবিধা এবং পান্ডু বন্দরের সঙ্গে শেষ ধাপের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়ন রয়েছে।

সোনোয়াল বলেন, “নদীপথে আমরা যে প্রতি টন পণ্য পরিবহন করি, তার অর্থ হলো কম জ্বালানি পোড়ানো এবং মহাসড়কে কম ট্রাক চলাচল।”

ভারত আঞ্চলিক নৌপথ সংযোগ গড়ে তুলতে বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের সঙ্গে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।