১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

কী ঘটেছিল আদাবরে? পুলিশের ধারণা ‘হানি ট্র্যাপ’

গ্রেপ্তার ১০২ জনের মধ্যে ৩০ বছর বয়সী ওই নারীও আছেন, যাকে ‘জিম্মি’ হওয়া যুবকের প্রেমিকা বলা হচ্ছিল।

কী ঘটেছিল আদাবরে? পুলিশের ধারণা ‘হানি ট্র্যাপ’
পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় মোট ১০২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 02 Sep 2025, 09:55 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:13 PM

এক প্রেমিক যুগলকে ‘জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের’ খবর পেয়ে রাজধানীর আদাবরে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছিল পুলিশ, কিন্তু তদন্তকারীরা এখন অন্য ধারণা করছেন।  

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান মঙ্গলবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "প্রাথমিকভাবে আমরা ধারণা করছি, ছেলেটি হানি ট্র্যাপে পড়েছিল। তবে আমরা আরো তদন্ত করে দেখব।"

সোমবার রাতে আদাবরে অভিযানে গিয়ে হামলার মুখে পড়ার পর সারা রাতে মোট ১০২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে রীনা বেগম নামে ৩০ বছর বয়সী ওই নারীও আছেন, যাকে ‘জিম্মি’ হওয়া মোহাম্মদ পলাশের প্রেমিকা বলা হচ্ছিল। 

পুলিশ বলছে পলিটেকটিকের ছাত্র পলাশ (২০) আদাবরের সুনিবিড় হাউজিংয়ে তার ‘প্রেমিকার’ সঙ্গে দেখা করতে গেলে স্থানীয় কয়েকজন তাদের আটকে রেখে মোটা অংকের টাকা দাবি করে। 

ওই টাকা নিয়ে দীর্ঘ দেন দরবার চলে। দুজনকে এক বাসা থেকে আরেক বাসায় সরিয়ে নেওয়া হয় নিরাপত্তার কথা বলে।

এই দেন দরবারের এক পর্যায়ে পলাশের মোবাইল থেকে মুক্তিপণের জন্য তার বাবাকে ফোন করা হয়। তার বাবা তখন ৯৯৯ এ ফোন করে পুলিশে খবর দেন। 

মোহাম্মদপুর আদাবর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মেহেদী হাসান বলেন, “খবর পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ শোনে, এক প্রেমিক যুগলকে জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করছে স্থানীয় কিছু সন্ত্রাসী। এরপর তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে পুলিশ বাধার মুখে পড়ে।”

পুলিশ সেখানে পৌঁছানোর আগেই পলাশের কিছু বন্ধুবান্ধব তাকে উদ্ধার করতে ওই এলাকায় গিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। বেশ কিছুক্ষণ ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে কয়েকজন আহত হন।

আদাবর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুল মালেক বলেন, খবর পেয়ে সংঘর্ষ থামানোর পাশাপাশি যুবকটিকে উদ্ধারের চেষ্টা চালান তারা। 

স্থানীয় যারা মুক্তিপণ চেয়েছিল, পুলিশ দেখে তারা ওই যুবক এবং নারীকে নিয়ে এ বাসা থেকে ও বাসা ঘুরতে থাকে। পুলিশকেও তখন এ ছাদ থেকে ও ছাদে ছুটাছুটি করতে হয়। 

পলাশকে উদ্ধারের জন্য তার বাবা তারা মিয়া, মা পলি বেগম এবং ছোট ভাই মোহাম্মদ তাহসানও (১৫) সেখানে ছুটে গিয়েছিলেন। 

তারা মিয়া বলছেন, খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে তারা এক বাসায় গিয়ে দেখতে পান, সেখানে তার ছেলেকে মারধর করা হচ্ছে। তারা ঠেকাতে গেলে ‘সন্ত্রাসীরা’ পলাশ ও তাহসানকেও কোপায়। পরে তাদের রেখে ওই বাসা থেকে পালিয়ে যায়।

যাবার সময় রাত ১০টার দিকে অপহরণকারীরা পুলিশের গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে থাকা চালক আল আমীনকে চাপাতি দিয়ে কোপায় এবং ভাংচুর করে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালায়।

পুলিশ বলছে, ওই এলাকায় একটি কিশোর গ্যাং রয়েছে, যাদের নেতা ‘কব্জিকাটা রাজু’ নামে পরিচিত। সেই রাজুর নেতৃত্বে পুলিশের ওপর হামলা হয়। রনি ও জনি নামে দুই ভাই রয়েছে ওই গ্রুপে।

পলাশকে উদ্ধারের পর পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন আদাবর থানার এসআই ইব্রাহিম খলীল। রাতভর অভিযান চালিয়ে মোট ১০২ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। 

তাদের মধ্যে ছয়জনকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। বাকিদের ডিএমপি অ্যাক্টে গ্রেপ্তার দেখিয়ে মঙ্গলবার আদালতে তোলা হয়।

মঙ্গলবার যোগাযোগ করা হলে তারা মিয়া বলেন, তার দুই ছেলেকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

আসলে কী ঘটেছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, "সন্ত্রাসীরা পলাশকে আটকে রেখে তার মোবাইল দিয়ে আমাকে ফোন করে এক লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। তারপরেই পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।"

পলাশকে ‘পরিকল্পিতভাবে’ আটকে রেখে মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল অভিযোগ করে তার বাবা বলেন, "আমার ছেলের সাথে ওই মেয়ের (রীনা বেগম) ফেইসবুকে সম্পর্ক। এই সম্পর্কের সূত্র ধরে মেয়েটা পলাশকে ডেকে নিয়ে আটকে রেখে মুক্তিপণ দাবি করেছিল।"  

এর আগেও তাদের মধ্যে দুবার দেখা হয়েছিল দাবি করে তারা মিয়া বলেন, "গতরাতের ঘটনাটা ছিল একেবারেই পরিকল্পিত। তাছাড়া পলাশ পলিটেকনিক পড়ে, আর মেয়েটার বয়স তার চেয়ে অনেক বেশি।" 

এ ঘটনায় অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির অভিযোগে মামলা করার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলেছেন তারা মিয়া। 

পুলিশ উপকমিশনার ইবনে মিজান বলেন, “আমরা জানতে পেরেছি রীনা বেগম বিবাহিত।তাকেও গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। আমাদের মনে হয়েছে, এটা হানি ট্র্যাপের ঘটনা।”

পুলিশ কোপানোর মামলায় ৬ আসামি কারাগারে 

ঢাকার আদাবরে পুলিশের গাড়ি চালক আল আমিনকে কুপিয়ে আহত করার মামলায় ছয় আসামিকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

তারা হলেন–মিজান মাতব্বর, মো. রাব্বি, রবিউল ইসলাম, জুয়েল সরদার, সবুজ মিয়া ও রীনা বেগম।

প্রসিকিউশন পুলিশের এসআই মিজানুর রহমান জানান, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদাবর থানার এসআই রাকিবুল ইসলাম মঙ্গলবার তাদের আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন।

আসামিদের মধ্যে রীনা বেগমের পক্ষে তার আইনজীবী তিন বছরের শিশু সন্তানকে দেখিয়ে জামিন আবেদন করেন। অপর আসামিদের পক্ষেও জামিন আবেদন ছিল না। 

ঢাকার মহানগর হাকিম মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম শুনানি শেষে রীনা বেগমের জামিন নামঞ্জুর করেন এবং ছয় আসামির সবাইকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।