Published : 12 Aug 2026, 01:40 AM
ছিনতাই করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে এক পা হারিয়ে ধরেন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার হ্যান্ডেল। রিকশা চালানোর আড়ালে শুরু করেন মাদক কারবার।
ধীরে ধীরে পল্লবী-মিরপুরের মাদক কারবারে নিজের প্রভাব বিস্তার করেন রুবেল। এরপর মাদক কারবারের বিরোধে হত্যা ও হত্যাচেষ্টার মামলাতেও নাম জড়ান তিনি।
যে রুবেল একসময় রিকশায় চড়ে মাদক পৌঁছে দিতেন, সেই তিনিই এখন চার চাকার গাড়িতে সিনেমার কায়দায় প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে মুহূর্তেই উধাও হয়ে যান।
পুলিশ আর স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পা হারানোর পর ‘ল্যাংড়া রুবেল’ নামে পরিচিতি পান মো. রুবেল।
গত ৭ অগাস্ট পল্লবীতে মাদক কারবারের বিরোধের জেরে আলমগীর হোসেন (৪৫) নামে এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ ওঠে রুবেল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে।
ওই ঘটনায় আলমগীরের স্ত্রী রিনা খাতুন পল্লবী থানায় মামলা করেন। মামলায় রুবেলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী পাপ্পু ওরফে পাপ্পা ওরফে শাকির আহমেদকেও আসামি করা হয়।
ঘটনার পর গা ঢাকা দেন রুবেল ও তার সহযোগীরা। তিন দিন পর সোমবার রাজধানীর অদূরে আমিনবাজার, সাভার, গাজীপুর ও কুষ্টিয়ায় অভিযান চালিয়ে রুবেলসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) মিরপুর বিভাগ।
গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন পাপ্পা, হামিদুর ওরফে মাখন, পারভেজ ও রাব্বি। তাদের কাছ থেকে একটি পিস্তল, দুই রাউন্ড গুলি, দুটি ম্যাগাজিন, ঘটনার সময় ব্যবহৃত একটি কার, একটি ভক্সওয়াগন গাড়ি এবং এক হাজার ইয়াবা উদ্ধার করে ডিবি। এই ঘটনায় শহীদুল নামে আরও একজন সহযোগী গ্রেপ্তার হয় পল্লবী থানা পুলিশের হাতে।
ডিবির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান মঙ্গলবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ঘটনার পরপরই অভিযুক্তরা ঢাকার বাইরে চলে গিয়েছিলেন।
“ঘটনা ঘটিয়ে তারা কেউই ঢাকার ভেতরে ছিল না। গাজীপুরের কিছু জায়গা থেকে আমরা প্রথমে একজনকে ধরেছি; তারপরে একজনকে আমিনবাজার থেকে, একজনকে সাভার থেকে। এমনকি একজনকে কুষ্টিয়া থেকেও পিক করা হয়েছে।”
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গুলি করার পর রুবেল ও তার সহযোগীরা বিভিন্ন রিসোর্টে অবস্থান করছিলেন বলে তথ্য পেয়েছেন তারা।
চুরি-ছিনতাই থেকে মাদক কারবারে
পুলিশের নথি ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রুবেলের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড শুরু হয় চুরি ও ছিনতাই দিয়ে। ২০১১ সালে চুরি ও দস্যুতার অভিযোগে পুলিশের তালিকায় তার নাম ওঠে। এরপর তার বিরুদ্ধে আরও অন্তত ১০টি মামলা হয়। এসব মামলার অধিকাংশই মাদকসংক্রান্ত।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক বছর আগে পল্লবীর ‘ডি’ ব্লক এলাকায় ছিনতাইয়ের সময় পুলিশের গুলিতে রুবেলের এক পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে তিনি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালাতে শুরু করেন। অটোরিকশা চালকের পরিচয়ের আড়ালে তখন থেকেই মাদক পরিবহন ও সরবরাহে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই সময় থেকেই স্থানীয়ভাবে তিনি ‘ল্যাংড়া রুবেল’ নামে পরিচিতি পান।
পুলিশের হিসাবে, ২০২৪ সালের পর রুবেলের বিরুদ্ধে হত্যা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে দুটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ‘পেপার সানি’ নামে তার এক সময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে হত্যার অভিযোগও রয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয়রা বলেন, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর পল্লবীর মাদক কারবারে রুবেলের প্রভাব আরও বাড়ে।
পাপ্পাকে সঙ্গে নিয়ে মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ
সরজমিন ঘুরে পল্লবীর ৩৯টি বিহারি ক্যাম্প, বাউনিয়া বাঁধ, কাফরুল, মিরপুরের ১০ ও ১১ নম্বর এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে দুই শতাধিক মাদক বিক্রির ‘স্পট’ দেখা গেছে।
ইয়াবা, হেরোইন ও গাঁজার মতো মাদক এসব এলাকায় সরবরাহের ক্ষেত্রে রুবেলের একটি নেটওয়ার্কও রয়েছে। রুবেলের ভাই পাপ্পা ওই নেটওয়ার্কের ‘ম্যানেজার’ হিসেবে কাজ করেন। বিভিন্ন স্পটে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে মাদক পৌঁছে দেওয়া ও সেসবের হিসেব রাখার কাজটি মূলত পাপ্পাই করেন।
মিল্লাত ক্যাম্পের মাদক কারবারের স্পটগুলো দেখভাল করেন পারভেজ।
মাখনসহ আরও কয়েকজন রুবেলের হয়ে বিভিন্ন ধরনের কাজ করেন বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন। তাদের কাজের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী মাদক কারবারীদের গতিবিধির তথ্য সংগ্রহ এবং রুবেলের কাছ থেকে মাদক না নিয়ে অন্য সরবরাহকারীর কাছ থেকে মাদক নেওয়া কারবারীদের ওপর চাপ তৈরির অভিযোগ রয়েছে।
পল্লবীর মাদক কারবারের সঙ্গে একসময় যুক্ত ছিলেন, এমন তিনজন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পেয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
তাদের কেউ নাম প্রকাশ করে কথা বলতে চাননি। ওই তিনজনের একজন বর্তমানে পলাতক। তিনি সোমবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, একসময় পল্লবীর এডিসি ক্যাম্পে ভাড়া থাকতেন রুবেল। তার দাবি, হকি সুমন ও রিয়াজ নামে দুজন তাকে (রুবেল) আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন।
“যদি রুবেলের মাদক কোনো কারবারী বিক্রি না করে, তাহলে তাদের ওপর ব্যাপক অত্যাচার করে রুবেল ও তার লোকজন।”
ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোস্তাক সরকার বলেন, পল্লবীর বিভিন্ন ঘটনায় রুবেল ও তার সহযোগীদের নাম বারবার এসেছে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরেই তাকে ধরার চেষ্টা করছিলাম। প্রযুক্তিগতভাবে নিজেকে আড়াল করে রাখা ও কোনো সিম ব্যবহার না করায় আমাদের সক্ষমতা অনুযায়ী তাকে ধরা সম্ভব হচ্ছিল না। মাদক ব্যবসা করে রুবেল বিপুল টাকার মালিক হয়েছেন। সেই টাকা দিয়ে নানা ‘লিংক-লবিং’ করে বারবার পুলিশের হাত থেকে বেঁচে গেছে এই চিহ্নিত মাদক কারবারী ও কিলার।”
সরজমিনে পল্লবীর মাদক কারবারের চিত্র
মিরপুর-১১ নম্বরের ‘বি’ ব্লকের ৪ নম্বর সড়কের পশ্চিম পাশে মিল্লাত ক্যাম্প। ক্যাম্পের ভেতরের সরু গলিগুলো অনেকটা গোলকধাঁধার মতো। সোমবার দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত সরেজমিনে ঘুরে কয়েকটি গলিতে ইয়াবা ও গাঁজার মতো মাদক প্রকাশ্যে বিক্রির দৃশ্য দেখা যায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, হেরোইনও পাওয়া যায়; তবে সেজন্য নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় যোগাযোগ করতে হয়। ক্যাম্পের কয়েকটি ঘরে মাদক সেবনের ব্যবস্থাও রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। নিয়মিত যারা সেখানে যান, তারা কারবারীদের কাছে ‘বান্ধা কাস্টমার’ হিসেবে পরিচিতি।
ক্যাম্পের বাসিন্দাদের ভাষ্য, বিকাল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মাদক কেনাবেচা সবচেয়ে বেশি জমে ওঠে।
পঞ্চাশোর্ধ এক নারী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিক্রি হয়, এটা তো সবাই জানে। পুলিশও জানে। এই একটু আগেই পুলিশ এসে ঘুরে গেল এখান থেকে। তবে এসব নিয়ে কেউ কথা বলবে না।”
কালশীর মোড়েও প্রকাশ্য কেনাবেচা
শুধু মিল্লাত ক্যাম্প নয়, মিরপুরের আরও কয়েকটি ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। পল্লবী থানার কাছাকাছি কালশীর মোড়ে বিকালের পর সড়কের পাশে বসে থাকা মানুষের ভিড়ের মধ্যে মাদক বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
গত সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, ব্যস্ত সড়কের পাশে সারি সারি মানুষ বসে আছেন। তাদের মধ্যে মাদক বিক্রেতারাও মিশে থাকেন। কখনও চোখের ইশারায়, কখনও সরাসরি পথচারীকে জিজ্ঞেস করা হয় মাদক লাগবে কি না। আগ্রহ দেখালে সড়কের পাশেই ইয়াবা সরবরাহ করা হয়।
পুলিশের নথিতে পল্লবীর মাদক কারবারীর চিত্র
সম্প্রতি ঢাকার ৫০ থানার মাদক কারবারীদের তালিকা হালনাগাদ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সদর দপ্তর। ওই তালিকায় ৫০ থানায় মোট ৩৬৩ জন মাদক কারবারীর নাম রয়েছে। পুলিশের ওই তালিকায় ল্যাংড়া রুবেলের মতো মাদক কারবারীর পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতা ও শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্যদের নামও রয়েছে।
তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পল্লবী থানার আওতাধীন ১৭টি এলাকায় ১৭ জনকে মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। তাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ এলাকায় মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
তালিকা অনুযায়ী, মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের ব্লক-বি, মিল্লাত ক্যাম্পের ৪ নম্বর সড়কে ইয়াবা, গাঁজা ও হেরোইনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক কারবার করেন রাজিয়া খাতুন (৪৫)।
পুলিশের নথিতে তাকে ওই এলাকার চিহ্নিত মাদক কারবারী হিসেবে তুলে করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে তিনি ‘ডিলার’ হিসেবে পরিচিত বলে পুলিশ জানিয়েছে। তার অধীনে অন্তত ১০ জন নারী-পুরুষ খুচরা বিক্রেতা হিসেবে কাজ করেন বলেও নথিতে বলা রয়েছে।
সেকশন-১১-এর ব্লক-এ, বাউনিয়া বাঁধ এলাকায় মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত হিসেবে তালিকায় রয়েছে ফাতেমা বেগম ওরফে ফতেহ (৪৩)-এর নাম। একই সেকশনের ব্লক-ই এলাকায় লাভলী বেগম (৫১) এবং সেকশন-১২-এর ব্লক-ই, পূর্ব কুর্মিটোলা ক্যাম্পের শাহ পরান বস্তিতে শাহনাজ (৪৪) মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত বলে পুলিশের তালিকায় বলা হয়েছে।
সেকশন-১২-এর শাহ পরান বস্তিতে হালিমা ওরফে নাজ খাতুন (২৬), সেকশন-১১-এর ব্লক-বি এলাকায় নাদিম (৩৯) এবং একই সেকশনের জল্ল্যাক্যাম্প এলাকায় জুম্মন (৬০)-এর নামও রয়েছে ওই তালিকায়। এছাড়া সেকশন-১১-এর ব্লক-ডি, বাউনিয়াবাদ এলাকায় সাহাজামান ওরফে সাবু (৩১), একই সেকশনের ব্লক-বি, মিল্লাত ক্যাম্প এলাকায় জুম্মন ওরফে নাটা জুম্মন (৩৫) এবং ব্লক-সি, বড় মসজিদের সামনে বট রনি (৩২) মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত বলে পুলিশের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের তালিকায় মাদক কারবারে জড়িত হিসেবে থাকা অন্যদের মধ্যে রয়েছেন রজনী আক্তার (৩০), শারমিন (৩১), শাহিনুর বেগম (৩১), বিনা সুন্দরী (৫৫), রুবেল ওরফে ল্যাংড়া রুবেল (৩৬), আফসানা ওরফে পুতুল (৩৫) এবং রুমা (৪৩)। পুলিশের নথি অনুযায়ী, রুবেল ওরফে ল্যাংড়া রুবেল সেকশন-১১-এর ব্লক-সি, এডিসি ক্যাম্প এলাকায় মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত। আফসানা ওরফে পুতুল একই সেকশনের ব্লক-বি, তালাব ক্যাম্প এলাকায় এবং রুমা সেকশন-১২-এর ব্লক-ই, কুর্মিটোলা ক্যাম্প এলাকায় মাদক কারবারে জড়িত বলে তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, পুলিশের হালনাগাদ তালিকায় পল্লবী থানার আওতাধীন ১৭টি স্পটে ১৭ জনকে মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রুবেল ওরফে ল্যাংড়া রুবেলের নামও রয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে মিরপুর বিভাগের উপ কমিশনার মোস্তাক সরকার বলেন, “আমরা প্রতিনিয়ত এদের ধরছি। তারা জামিনে বেরিয়ে এসে আবার একই কাজে লিপ্ত হচ্ছে।”
মাদকের টাকার দ্বন্দ্বে আলমগীরকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ
গত শুক্রবার বিকালে মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন আলমগীর হোসেন। এ সময় একটি লাল রঙের কার এসে কিছুটা দূরে দাঁড়ায়। গাড়ি থেকে চারজন নেমে আলমগীরকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। প্রায় ২০ সেকেন্ডের মধ্যে গুলি ছুড়ে তারা আবার ওই গাড়িতে করেই ঘটনাস্থল ছাড়েন। হামলাকারীদের ছোড়া তিনটি গুলি আলমগীরের মাথা ও পিঠে লাগে। এ সময় জ্যোৎস্না নামে এক পথচারীর পায়েও গুলি লাগে।
ঘটনার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আলমগীর সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, হামলাকারীদের মধ্যে দুজনকে তিনি চিনতে পেরেছেন। তারা হলেন রুবেল ও পাপ্পা। ঘটনাস্থলের দুটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজেও আলমগীরের বর্ণনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চিত্র পাওয়া গেছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগ ও ডিবির মিরপুর বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, রুবেলের কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকার ইয়াবা নিয়ে বিক্রি করেন আলমগীর। বিক্রির পর সেই টাকার ভাগ রুবেলকে না দেওয়ায় তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।
পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ওই বিরোধের জেরেই প্রতিশোধ হিসেবে আলমগীরকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রুবেল তথ্য দিয়েছেন।
তবে পুলিশের এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন আলমগীরের স্ত্রী ও মামলার বাদি রিনা খাতুন। মঙ্গলবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে রিনা বলেন, “এগুলো সব মিথ্যা কথা। বিভিন্ন সাংবাদিক ও রুবেলের লোকেরা এসব ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। আমার হাসব্যান্ড যেহেতু রাজনীতি করে, সেহেতু তার নামে এসব রটানো হচ্ছে।”
তার দাবি, গত বছর রাকিবুল হাসান সানি ওরফে ‘পেপার সানি’ হত্যার ঘটনায় রুবেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর তার স্বামী এর প্রতিবাদ করেছিলেন। ওই সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারও দিয়েছিলেন আলমগীর।
রিনা বলেন, “‘পেপার সানি’ খুনের অভিযোগ উঠেছিল রুবেলের বিরুদ্ধে। এটার প্রতিবাদ করে সে সময় বিভিন্ন চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন আমার স্বামী। তখন থেকেই রুবেল খ্যাপা। এজন্যই তাকে হত্যা করতে চেয়েছিল।”
চিকিৎসাধীন থাকায় পুলিশের অভিযোগের বিষয়ে আলমগীরের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
মাদক কারবারের বিরোধে পল্লবীতে চার খুন
পল্লবীতে মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য নিয়ে গত কয়েক বছরে একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহতদের মধ্যে মাদক কারবারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তির পাশাপাশি রয়েছেন সাধারণ মানুষও।
এর মধ্যে গত বছরের জুনে মিরপুর-১১ নম্বরের বি ব্লকের ৩ নম্বর লাইন, মিল্লাত ক্যাম্প এলাকায় রাকিবুল হাসান সানি ওরফে ‘পেপার সানি’কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
স্থানীয়ভাবে মাদক কারবারী হিসেবে পরিচিত সানির মা ওই ঘটনায় পল্লবী থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয় ল্যাংড়া রুবেল, বোমা কাল্লু, স্বপন, জিন্দা ও টানা আকাশকে। মিরপুর এলাকার সন্ত্রাসীদের নিয়ে পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, এদের সবাই ল্যাংড়া রুবেল গ্রুপের সদস্য হিসেবে চিহ্নিত।
২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর মিরপুর-১১ নম্বরের লালমাটি টেম্পোস্ট্যান্ডসংলগ্ন এলাকায় মাদক কারবারীদের দুই পক্ষের গোলাগুলির মধ্যে পড়ে প্রাণ হারান আয়েশা আক্তার।
পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য, মাদক কারবারের আধিপত্য নিয়ে সেদিন দুই পক্ষের মধ্যে প্রকাশ্যে গোলাগুলি হয়। এ সময় ঘরের জানালার পাশে থাকা আয়েশা আক্তারের মাথায় গুলি লাগে। ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি। ওই ঘটনায় পল্লবী থানায় হত্যা মামলা হয়। মামলায় মমিন, শাবু, সম্রাট ও শামিমসহ ১৭ জনকে আসামি করা হয়।
একই বছরের ১৬ মার্চ পল্লবীর একটি বিহারি ক্যাম্প এলাকায় প্রকাশ্যে ফয়সাল নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। ঘটনার তদন্তে নামে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, মাদক ব্যবসার টাকা এবং কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্যকে কেন্দ্র করে পেপার সানি গ্রুপ ও সাইমুন গ্রুপের বিরোধের জেরে ফয়সালকে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের নেতা আকাশ, রাব্বি ও ইমরানসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছিল ডিবি।
এর পরের মাসেই পল্লবী থানা এলাকায় পাভেল নামে এক যুবককে হত্যা করা হয়। ডিবির তদন্তে বলা হয়, এলাকায় মাদক ব্যবসা ও অবৈধ চাঁদাবাজি থেকে পাওয়া টাকা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে পাভেলকে হত্যা করা হয়।
এ ঘটনায় পল্লবী থানায় হাবিব, হানিফ ও আনিছসহ ছয়জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করা হয়।
মাদক কারবারীদের তালিকা আছে; কারা হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলো ঘটাতে পারে, পুলিশ সবাইকে চেনে। তবুও এসব ঘটনা এড়ানো যাচ্ছে না কেন?
এসব প্রশ্নের জবাবে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নিয়মিত অভিযানে আমরা সব মাদক কারবারীদের ধরছি। আমার কাছে সাম্প্রতিক যে পরিসংখ্যান, তাতে মার্ডারের মতো ঘটনা তো তেমন দেখছি না। পল্লবীতে যিনি গুলির ঘটনা ঘটিয়েছেন, তিনি অলরেডি গ্রেপ্তার হয়েছেন। মাদক ও খুনোখুনি এড়াতে ডিএমপি সচেষ্ট রয়েছে।”
আরো পড়ুন
মিরপুরে বিএনপি কর্মীকে গুলি: 'ল্যাংড়া' রুবেল, বাপ্পাসহ গ্রেপ্তার ৫