Published : 27 Apr 2026, 12:21 AM
বিরোধী দলকে সতর্ক করে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী বলেছেন, এমন কাজ করবেন না, যাতে আবার সেই ‘ফ্যাসিস্টরা’ ফিরে আসতে পারে।
রোববার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় প্রতিমন্ত্রী বলেন, “খাল কেটে কুমির আনবেন না, এমন কাজ করবেন না, যাতে বাংলাদেশের জনগণের মাথার ওপর আবার সেই ফ্যাসিস্টরা চড়ে বসতে পারে।”
এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
ছাত্রদের আন্দোলনের পথ ধরে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারে পতন ঘটানোর পর রাষ্ট্র সংস্কারে জুলাই সনদ গ্রহণ করা হয়।
গণভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে জনমত পেলেও সংস্কার নিয়ে টানাপড়েন চলছে।
ময়মনসিংহ-৯ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির সদস্য ইয়াসের খান বলেন, জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় স্বাক্ষর করা জুলাই জাতীয় সনদ বিএনপি বাস্তবায়ন করবে।
তার ভাষায়, “বিএনপি যে প্রতিশ্রুতি দেয়, সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে। যে জুলাই সনদ দক্ষিণ প্লাজায় বিএনপি স্বাক্ষর করেছিল, তা বাস্তবায়ন হবে। এর মধ্যে কোনো ‘ইফস অ্যান্ড বাটস’ নাই।”
তবে জুলাই সনদ নিয়ে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানোর চেষ্টা হলে তা ‘আত্মঘাতী হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আওয়ামী লীগ যেভাবে একাত্তরকে নিজেদের দলের সম্পত্তি মনে করেছিল, কেউ যদি মনে করে জুলাই সনদ তাদের নিজস্ব সম্পত্তি, সেটি হবে ভুল। সেটি হবে আত্মঘাতী। বাংলাদেশের জনগণ সেটা মেনে নেবে না।”
বিরোধী দলকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আপনারা একত্রিতভাবে কাজ করার কথা মুখে বলেন। মুখে মধু, অন্তরে বিষ রেখে লাভ হবে না।”
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান রেখে ইয়াসের খান বলেন, “আমরা যদি একত্রিতভাবে কাজ না করি, তাহলে খাল কেটে কুমির আনা হবে। কাজেই আমি আপনাদের দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে আহ্বান জানাতে চাই, আমরা যেন বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা না করি।”
জুলাই আন্দোলনে নিহতদের সংখ্যা নিয়ে সংসদে ওঠা বিতর্কের কথাও বলেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “একাত্তরের ৩০ লাখ, ৩ লাখ নিয়ে এখনও বিতর্ক চলছে। আমরা জুলাইকে নিয়ে বিতর্ক করতে চাই না। ৫০ বছর, ১০০ বছর পরে জুলাই শহীদদের নিয়ে আমরা কোনো বিতর্ক রেখে যেতে চাই না।”
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতার কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করেন ইয়াসের খান।
তিনি বলেন, “কাঙালের ধন চুরি করতে করতে এমন পর্যায়ে তারা চলে গিয়েছিল, তাদেরকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে। গোটা সংসদ, তথাকথিত ক্যাবিনেট এবং প্রশাসনের কিছু লোককে নিয়ে, আঞ্চলিক ভাষায় বলতে হয়, তারা ভাগছে, দেশ থেকে পালায় গেছে।”
এ সময় বিরোধী দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে সমর্থন দেন।
তখন বিরোধী দলকে উদ্দেশ করে ইয়াসের খান বলেন, “এমন পরিণতি যেন আমাদের না হয়, সেদিকে আপনাদেরও খেয়াল রাখতে হবে। আপনারা তালি দিচ্ছেন, কথাটা শেষ করতে দেন। আপনাদেরও পরিণতি যেন এরকম না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।”
‘এই সংসদ জুলাই আন্দোলনের ফসল’
বিরোধী দলের সদস্য ঢাকা ১৬ আসনের জামায়াতে ইসলামীর মো. আব্দুল বাতেন বলেন, বর্তমান সংসদ জুলাই আন্দোলনের ফসল।
তার ভাষায়, “যদি জুলাই আন্দোলন সফল না হত, তাহলে আমরা হয়ত এইভাবে এই সময়ে এই সংসদে বসতে পারতাম না।”
তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে জনগণের দাবি ছিল ‘ইনসাফভিত্তিক সমাজ’ প্রতিষ্ঠা। কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর সরকারি দল ‘ব্রুট মেজরিটি’ পাওয়ার পর সেই স্বপ্ন ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে বলে মানুষ মনে করছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন এ সদস্য।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে দাবি করে জামায়াতে ইসলামীর এ সদস্য বলেন, “প্রতিদিন অসংখ্য খুন ও ধর্ষণ হচ্ছে। একজন সংসদ সদস্যের ওপর হামলা হচ্ছে। ডাকসুর নির্বাচিত সদস্যদের থানায় গিয়ে মদদ দিয়ে তাদের ওপর হামলা করা হয়েছে।”
পল্লবী ও রূপনগর এলাকার ২৬০০ বাস্তুহারা পুনর্বাসন প্রকল্পের জমি দখলের অভিযোগ তুলে তিনি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রীর কাছে দ্রুত তদন্ত করে সরকারি সম্পত্তি রক্ষার দাবি করেন।
পল্লবীর বিহারি জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসনের দাবি জানিয়ে আব্দুল বাতেন বলেন, “একটি পরিবার ‘১০ বাই ১০ ফুটের’ রুমের মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করে। তাদের নিয়ে অতীতে অনেক রাজনীতি হয়েছে, কিন্তু তাদের সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।”
‘অতীত ইতিহাস দেখুন’
সাতক্ষীরা-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সদস্য মোহাম্মদ ইজ্জত উল্লাহ বলেন, সরকারি দলের কয়েকজন সদস্য জামায়াতকে ‘কটাক্ষ’ করে বক্তব্য দিয়েছেন। তাদের অতীত ইতিহাস জানা উচিত।
তিনি বলেন, “প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সাহেবের নির্বাচনে কিন্তু জামায়াতে ইসলামী ভোট দিয়ে সহযোগিতা করেছিল। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীও শরিক ছিল। ১৯৯১ সালে বিএনপি তো জামায়াতের সমর্থন নিয়েই সরকার গঠন করল।”
চার দলীয় জোটের প্রসঙ্গ টেনে ইজ্জত উল্লাহ বলেন, “১৯৯৯ সালে যখন চার দলীয় জোট গঠন হল, একসঙ্গে আন্দোলন, একসঙ্গে নির্বাচন, একসঙ্গে সরকার গঠন, তখন জামায়াতে ইসলামী কি খুব ভালো হয়ে গিয়েছিল, আর এখন খুব খারাপ হয়ে গেল?”
তিনি বলেন, ২০০৮ ও ২০১৮ সালেও বিএনপি ও জামায়াত একসঙ্গে নির্বাচন করেছে।
তার ভাষায়, “ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে জামায়াতে ইসলামী একসঙ্গে ইলেকশন করেছিল। আজকে যে বন্ধুরা কটাক্ষ করছেন, নির্মূল করার কথা বলছেন, তারা কি একটু অতীতের ইতিহাসটা দেখবেন না?”
গণভোটের দাবিতে আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে বিরোধী দলের এই সদস্য বলেন, “আজকে কেন আমাদের আন্দোলন সংগ্রামে ঠেলে দিচ্ছেন? ১৯৯১ সালেও এভাবেই আমাদের আন্দোলন সংগ্রামে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।”
গণভোটে ৭০ শতাংশ হ্যাঁ ভোট পড়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেই রায় বাস্তবায়ন না করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করলে মানুষ বিশ্বাস করবে কীভাবে?
‘বক্তৃতায় লাভ নেই’
হবিগঞ্জ-১ আসনের বিএনপির সদস্য রেজা কিবরিয়া বলেন, জুলাই সনদ ও জুলাই বিপ্লব নিয়ে অনেক কথা শুনেছেন, কিন্তু এসব কথার আন্তরিকতা নিয়ে তার সন্দেহ আছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রী প্রয়াত শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ছেলে রেজা কিবরিয়া বলেন, “এতদিনে বিপ্লবের পর একটা মানুষকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে ওই খুনগুলোর জন্য? আওয়ামী লীগের মন্ত্রীরা জেলে বসে আছেন। তাদেরকে ‘নিউরেমবার্গ স্টাইলে ওয়ার ক্রাইমসের’ আদালতে নিতে হবে।”
তার মতে, জুলাই শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে হলে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
রেজা কিবরিয়া বলেন, “আমাদের জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়ে কোনো লাভ নেই। তাদের বিচার, তাদের ওপর আক্রমণের বিচার আমাদের দিতে হবে। এটা না দিলে মানুষ কোনো পাত্তা দেবে না।”

‘চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি’
খুলনা-৬ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সদস্য মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ বলেন, সরকার গঠনের দুই মাসেও চাঁদাবাজি, দখলদারি ও হামলা বন্ধ হয়নি।
তার দাবি, “এই সরকার প্রমাণ করতে পারেনি দুই মাসের মধ্যে যে চাঁদাবাজি দূর হল, দখলদারি দূর হল, হামলা বন্ধ হল এবং জাতির কাছে যে ওয়াদা করেছিল সেটা পূরণ হচ্ছে।”
“মুনাফেক” শব্দ ব্যবহারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “আল্লাহর রাসুল বলেছেন, যার মধ্যে আমানতের খেয়ানত, মিথ্যা কথা বলা এবং ওয়াদা খেলাফির বৈশিষ্ট্য থাকে, সে মুনাফেক।
“বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তার সকল স্তরের লোকদের কোরআন ও হাদিসের আলোকে তৈরি করে। আমাদের দিকে আঙুল নির্দেশ করে এই মুনাফিক শব্দটি বলা যায় না। নিজেদের চেহারা নিজেদের আয়নায় দেখুন।”
জাতীয় সংকট দূর করতে ঐক্যের আহ্বান জানান তিনি।
জুলাই শহীদ ও আহতদের অ্যাপার্টমেন্ট
পিরোজপুর ২ আসনের বিএনপির সদস্য আহম্মদ সোহেল মঞ্জুর বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারের জন্য গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ১৫৪০টি অ্যাপার্টমেন্ট তৈরির প্রস্তুতি নিয়েছে।
তিনি বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের জন্য এবং যারা আহত হয়েছেন, তাদের জন্য আমাদের গণপূর্ত মন্ত্রণালয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ১৫৪০টি অ্যাপার্টমেন্ট তৈরির প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।”
গত দুই মাসে সরকারের গৃহীত কার্যক্রম জনগণের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, “অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা প্রমাণ করতে পেরেছি, সৎ ইচ্ছা, দক্ষ নেতৃত্ব এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলে পরিবর্তন সম্ভব।”
‘রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ দিতে পারছি না’
সাতক্ষীরা-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল খালেক বলেন, রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ জানানো তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি, “যে কথা তিনি ধারণ করেন না, যে আদর্শ তিনি লালন পালন করেন না, সেই বক্তব্যের জন্য তাকে আমি ধন্যবাদ দিতে পারব না।”
তিনি বলেন, “বাঘের দুধ রাখতে গেলে সোনার বাটির প্রয়োজন। অতএব সেই ধরনের পাত্র তিনি নন। এইজন্য আমি তাকে ধন্যবাদ দিতে পারছি না।”
পূর্বাচলের প্লট
নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের বিএনপির সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া রূপগঞ্জের জামদানি পল্লী, পূর্বাচল, শিল্পাঞ্চল ও চনপাড়ার সমস্যার কথা বলেন।
পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে আদি বাসিন্দাদের জন্য প্লট দাবি করে তিনি বলেন, ১৯৯৫ সালে পূর্বাচল প্রকল্পের জন্য স্থানীয়রা প্রতি কাঠা পাঁচ হাজার টাকায় জমি দিয়েছিলেন। তাদের আশা ছিল, প্রত্যেককে একটি করে প্লট দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, “শেখ হাসিনার আমলে ১৩ এর ‘এ’ ধারায় টুঙ্গিপাড়ার বিভিন্ন সন্ত্রাসী বাহিনী ও হেলমেট বাহিনীকে প্লট দেওয়া হয়েছে।”
তার দাবি, ওই প্লট বাতিল করে রূপগঞ্জের আদি বাসিন্দা ও জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যদের প্লট দেওয়া হোক।
চনপাড়ার প্রসঙ্গ তুলে সরকারি দলের এ সদস্য বলেন, “ওখানে একটি স্কুল আছে, যে স্কুলে একজন শিক্ষার্থীও এখন পর্যন্ত পাস করেনি। কারণ কেউ যেতে রাজি হয় না। জায়গাটি সন্ত্রাসীদের জায়গা হয়ে গেছে।”
তিনি চনপাড়া রাজউকের অধিগ্রহণে নিয়ে পরিকল্পিত পুনর্বাসন দাবি করেছেন।