Published : 01 Mar 2026, 11:10 PM
টানা দুই দিন সাপ্তাহিক ছুটিতে অমর একুশে বইমেলায় যে সমাগম হয়েছিল, রোববার যেন তাতে কিছুটা ছন্দপতন হল।
তবে মেলা বন্ধের আগের এক ঘন্টা লেখক ও বইপ্রেমীদের ভিড় বাড়তে দেখা যায়।
প্রকাশনা সংস্থা স্বপ্ন ৭১ এর স্বত্ত্বাধিকারী আবু সাঈদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “একুশে বইমেলা ফেব্রুয়ারি মাসেই ঠিক আছে। এর বাইরে একুশে বইমেলা আসলে জমবে না। শুক্র ও শনিবার মেলায় লোক সমাগম ভালোই হয়েছিল, তবে রোববার লোকজন একটু কম এসেছে।”
বিকেলে মেলায় এসে কিছু সময় ঘুরে বন্ধুদের নিয়ে টিএসসিতে গিয়ে ইফতার সেরেছেন ব্যাংক কর্মকর্তা আনিছুর রহমান। ইফতারের পর তিনি আবারও মেলায় আসেন।
আনিছুর রহমান বলেন, “ভেবেছিলাম ইফতারের সময় মেলার মাঠে একটা উৎসবমুখর পরিবেশ থাকবে। সেটা হয়নি।”
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে মুক্তধারা প্রকাশনীতে ব্যবস্থাপক হিসেবে আছেন কামরুজ্জামান। তিনি বলেন, “এবারই প্রথম রোজার মধ্যে বইমেলা হচ্ছে। ইফতারের সময় হতে না হতেই মেলাপ্রাঙ্গণ প্রায় পাঠকশূন্য হয়ে যায়।”
বিকেল ৫টার পর মেলার নিরাপত্তাকর্মী, বিক্রয় প্রতিনিধি, প্রকাশক, দর্শনার্থীদের অনেকে ইফতার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ মেলার ফুড কর্ণারে ভিড় জমান।

কবি, সাংবাদিক ও সম্পাদক মারুফ রায়হান রোববার এসেছিলেন বইমেলায়। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এবার তো রোজার মধ্যে বইমেলা হচ্ছে। আবার ফেব্রুয়ারি মাসের বাইরে মেলা হচ্ছে। ফলে এবার লেখক, প্রকাশক এবং মেলার আয়োজকদের জন্য ব্যাপারটা খুবই চ্যালেঞ্জিং।
“সবাই মিলে চ্যালেঞ্জটাকে জয় করতে হবে। কোনোভাবেই যেন বইমেলাটা ফ্লপ না করে। প্রকাশকদের দিক থেকেও আরো প্রচার বাড়াতে হবে।”
রোববার বইমেলার চতুর্থ দিন। এদিন মেলা দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত উন্মুক্ত থাকে।
নির্বাচন ও রোজার কারণে এবার বইমেলা আয়োজন নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে ২৬ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়।
মার্চের প্রথম দিন মেলার জনসমাগমে কিছুটা ভাটা থাকলেও কবি মারুফ রায়হান মনে করেন ধীরে ধীরে মেলা জমে উঠবে।
নিউমার্কেটে ঈদের কেনাকাটা করে ইফতারের পর মেলায় আসেন রাশিদুল ইসলাম ও তানিয়া দম্পতি। রাশিদুল বলেন, “বইমেলা থেকে এবার ঈদের উপহার দেওয়ার জন্য কিছু বই কিনবো।”
হামিদুজ্জামান খান স্মরণ
বিকাল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণ : হামিদুজ্জামান খান শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নাসিমুল খবির। আলোচনায় অংশ নেন আইভি জামান। সভাপতিত্ব করেন লালারুখ সেলিম।
নাসিমুল খবির বলেন, “হামিদুজ্জামান খান ভাস্কর্য নির্মাণে পরিণত পর্বে ধাতব উপকরণের বাইরেও নানা উপকরণ ব্যবহার করে ভাস্কর্য নির্মাণ করেছেন। বিন্যাসের প্রয়োজনে কখনো কখনো কাঠ, পাথর, প্লাস্টিক, কাঁচ, কংক্রিট ইত্যাদি নানাবিধ উপকরণ ব্যবহার করেছেন। নির্মাণ সংখ্যা, উপকরণ ও গড়নের বৈচিত্র্য এবং উপস্থাপনায় অভিনবত্বে তার নির্মাণ সমসময় ও ভবিষ্যতের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে ও থাকবে।”

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের আধুনিক ধারার ভাস্কর্যচর্চার পথিকৃৎ নভেরা আহমেদ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভাস্কর্যচর্চার সূচনাকারী অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের উত্তরসূরি হিসেবে অধ্যাপক হামিদুজ্জামান খান অর্ধশত বছর জুড়ে যে বিস্তৃত শিল্পসম্ভার রচনা করেছেন তা অসামান্য। জীবনাবসানের পূর্ব পর্যন্ত তিনি ছিলেন কর্মমুখর। একইসঙ্গে ভাস্কর্যের শিক্ষক হিসেবেও ছিলেন অত্যন্ত যত্নশীল।
“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্য বিভাগসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগসমূহের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী তাঁর সংস্পর্শে এসেছেন। ফলে আমরা আশা করতেই পারি তার উত্তরসাধকদের কর্মতৎপরতার মধ্য দিয়ে তিনি হাজির থাকবেন প্রাজ্ঞ পূর্বসাধক হিসেবে।”
আইভি জামান বলেন, “শিল্পী হামিদুজ্জামান খান তার কর্মমুখর জীবনে সৃষ্টিশীলতার মাঝেই সবসময় ডুবে থাকতেন। জীবনাবসানের পূর্ব পর্যন্ত তিনি শিল্পসাধনায় নিমগ্ন ছিলেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে তার সৃষ্টিশীলতার স্মারক তিনি রেখে গেছেন। সেসব সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়েই তিনি সাধারণ মানুষের মনে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকবেন।”
লালারুখ সেলিম বলেন, “আমাদের দেশে ভাস্কর্য শিল্পকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য শিল্পী হামিদুজ্জামান খানের প্রয়াস ছিল লক্ষণীয়। তিনি যেমন মূর্ত ভাস্কর্য নির্মাণ করেছেন, তেমনি বিমূর্ত শিল্প নিয়েও কাজ করেছেন। তার কাজের পরিধি ছিল অত্যন্ত ব্যাপক।”
নতুন বই
বইমেলা পরিচালনা কমিটির জনসংযোগ বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, রোববার মেলার তথ্যকেন্দ্রে নতুন বই জমা পড়েছে ৪২টি।
এদিন ‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন এ বি এম সোহেল রশিদ।
কবি পিয়াস মজিদের ‘নির্বাচিত কবিতা’ প্রকাশ করেছে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স।

‘শতাব্দীর কণ্ঠস্বর তাজউদ্দীন আহমদ কন্যার চোখে পুত্রের চোখে’ বইটি এনেছে ঐতিহ্য প্রকাশনী। একটি বৈঠকে তাজউদ্দীন আহমদকে নিয়ে তার সন্তানদের কথন মলাটবদ্ধ করেছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটি।
ইসরায়েল জাতি নিয়ে রফিকুল ইসলামের বই ‘বনি ইসরায়েল উত্থান-পতন ও বিশ্বরাজনীতি’ প্রকাশিত হয়েছে ঐতিহ্য থেকে।
গান-কবিতার আয়োজন
বিকেল ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেন কবি ইউসুফ রেজা। আবৃত্তি পরিবেশন করেন ফারহানা পারভীন তৃণা। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী আজগর আলীম, আবু বকর সিদ্দিক, নারায়ণ চন্দ্র শীল এবং সামীমা সুলতানা। যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন, সঞ্জয় দাস (তবলা), রবিনস্ চৌধুরী (কী-বোর্ড), মো. হাসান আলী (বাঁশি), অনুপম বিশ্বাস (দোতারা)।
সোমবার যা থাকছে
সোমবার মেলা শুরু হবে দুপুর ২টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘সার্ধশত জন্মবর্ষ: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন হামীম কামরুল হক। আলোচনায় অংশ নেবেন পারভেজ হোসেন। সভাপতিত্ব করবেন সফিকুন্নবী সামাদী। বিকেল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।