১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

জুলাই সনদ অনুষ্ঠান ঘিরে ‘রণক্ষেত্র’: চার মামলায় আসামি ৯০০

সংরক্ষিত এলাকায় জোরপূর্বক প্রবেশ, পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি ভাঙচুর ও নিয়ন্ত্রণকক্ষ পোড়ানোর অভিযোগে এসব মামলা হয়েছে।

জুলাই সনদ অনুষ্ঠান ঘিরে ‘রণক্ষেত্র’: চার মামলায় আসামি ৯০০
সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শুক্রবার দুপুরে জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আগে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে বানানো অস্থায়ী তাঁবু পুড়িয়ে দেন জুলাই যোদ্ধারা। ছবি: আব্দুল্লাহ আল মমীন

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 18 Oct 2025, 03:32 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:30 PM

জুলাই সনদ সইয়ের আগে অনুষ্ঠানস্থলে অবস্থান নেওয়া ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ সরিয়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় চারটি মামলা করেছে পুলিশ।

এসব মামলায় অজ্ঞাতনামা অন্তত ৯০০ জনকে আসামি করা হয়েছে, আর একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শেরেবাংলা নগর থানার ওসি ইমাউল হক।

গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম রিমন চন্দ্র বর্মন, তাকে শুক্রবার ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয়েছিল। পরে যাচাই-বাছাই শেষে তাকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ।

সংরক্ষিত এলাকায় জোরপূর্বক প্রবেশ, পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি ভাঙচুর ও নিয়ন্ত্রণকক্ষ পোড়ানোর অভিযোগে মামলাগুলো করা হয়। এর মধ্যে একটি মামলার বাদী ট্রাফিক পুলিশের একজন সদস্য, বাকি তিনটি মামলার বাদী থানা পুলিশ।

ওসি ইমাউল বলেন, “চার মামলার সব আসামিই অজ্ঞাত, সবমিলিয়ে অন্তত ৮০০-৯০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।”

গ্রেপ্তার ব্যক্তির কোনো রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে কি না, এ প্রশ্নের উত্তরে ওসি বলেন, “আমাদের কাছে মনে হয়েছে সে অনিষ্টকারী, সে হামলাকারী। সেজন্য তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিস্তারিত তদন্তের পর এ বিষয়ে জানা যাবে।”

শুক্রবার দুপুরে সংসদ ভবনের সামনের ওই ঘটনায় পুলিশের অন্তত পাঁচটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। সড়কে পুলিশ ও র‌্যাবের অস্থায়ী নিয়ন্ত্রণকক্ষে ভাঙচুর চালিয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

এছাড়া বিক্ষোভকারীদের ঢিলের আঘাতে পুলিশের পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের উপকমিশনার তানভীর আহমেদসহ ১০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান জানিয়েছিলেন।

ঘটনাস্থল থেকে দুইজনকে আটকের তথ্যও দিয়েছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা মিজান, যাদের মধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হল।

জুলাই অভ্যুত্থানে আহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, আইনি সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের দাবিত এদিন দুপুরে ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয়ে কয়েকশ মানুষ জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের মঞ্চের সামনে অবস্থান নেন।

শুক্রবার সকালে তারা জাতীয় সংসদ ভবনের প্রবেশের ফটক টপকে ভেতরে ঢুকে দক্ষিণ প্লাজায় সনদ স্বাক্ষর মঞ্চের সামনে পৌঁছে যান।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বাধা উপেক্ষা করে তারা মঞ্চের সামনে অতিথিদের জন্য রাখা চেয়ারে বসে পড়েন। আরেকটি গ্রুপ গেইটের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ দেখানো অব্যাহত রাখে।

আয়োজকরা বিভিন্নভাবে তাদের বুঝিয়ে শান্ত করার এবং সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।

এক পর্যায়ে ঐকমত্য কমিশনের সহ সভাপতি আলী রীয়াজ মঞ্চে এসে জুলাই যোদ্ধাদের প্রতি দুঃখ প্রকাশ করেন এবং দাবি পূরণের আশ্বাস দেন।

তাদের দাবির মুখে সনদের অঙ্গীকারনামার পাঁচ নম্বর দফার সংশোধিত সংস্করণ পড়েও শোনানো হয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা এলাকায় বাড়ানো হয় সেনা, পুলিশ সদস্যদের সংখ্যা। মোতায়েন করা হয় বিজিবি, এপিবিএন, র‌্যাব ও ডিএমপির সোয়াত টিমের সদস্যদের।

কারও কথাতেই ‘জুলাই যোদ্ধারা’ মঞ্চ ছাড়তে রাজি না হলে বেলা দেড়টার দিকে বিপুল পরিমাণ পুলিশ ও এপিবিএন সদস্য বেষ্টনী দিয়ে বলপ্রয়োগ করে তাদেরকে দক্ষিণ প্লাজা থেকে বের করে আনেন। এ সময় লাঠিচার্য ও ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে।

ভেতরে অবস্থান নেওয়া গেইটের কাছাকাছি এলে বাইরে অবস্থানরতরা পাল্টা ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করে। তবে আইনশঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বাধায় সবাই গেইটের বাইরে বের হয়ে যেতে বাধ্য হয়।

এ সময় ‘জুলাই যোদ্ধারা’ সংসদ ভবনের বাইরে কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করে। পরিস্থিতি বিবেচনায় পুলিশ তাদেরকে ধাওয়া দিয়ে ও লাঠিপেটা করে তাদেরকে সরিয়ে দেয়।

তাদের ছত্রভঙ্গ করতে সাউন্ড গ্রেনেডও ব্যবহার করে পুলিশ। ধাওয়া খেয়ে একটি গ্রুপ খামারবাড়ির দিকে ও আরেকটি গ্রুপ আড়ংয়ের দিকে সরে যেতে থাকে। আন্দোলনকারীরা ইট পাটকেল ছুড়তে ছুড়তে এগিয়ে আসতে চাইলে পুলিশ পাল্টা টিয়ারশেলও ছোড়ে।

পুলিশের ধাওয়া খেয়ে ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ আড়ংয়ের দিকে যাওয়া গ্রুপটি সেচ ভবনের সামনে তাঁবু দিয়ে বানানো পুলিশ ও র‌্যাবের দুটি অস্থায়ী নিয়ন্ত্রণক্ষ এবং টায়ার ও কাঠ একসঙ্গে করে আগুন ধরিয়ে দেন।

এর আগে নিয়ন্ত্রণ কক্ষে থাকা নানা আসবাব, সিসিটিভি ক্যামেরা, ফ্যান, এসিসহ প্রায় সবকিছু ভাংচুর করা হয়।

পুলিশের লাঠিপেটায় আহত কয়েকজনকে এ সময় হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখা যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধাওয়ায় বিক্ষোভকারীরা খামারবাড়ি মোড় ও আসাদ গেটের দিকে অবস্থান নেন।

বেলা ২টার দিকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের পুরো সড়কের নিয়ন্ত্রণ নেয় পুলিশ। জুলাই যোদ্ধারের একটি গ্রুপ আড়ংয়ের দিকে, আরেকটি গ্রুপ খামার বাড়ির দিকে অবস্থান নেয়।

তখনও থেমে থেমে সাউন্ড গ্রেনেডের বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এ সময় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়; সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান শেষ হওয়া পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে রাখে পুলিশ।