হামের রোগীর মৃত্যু ঝুঁকি বাড়াচ্ছে সহসংক্রমণ?
“এডিনো বা কিছু ভাইরাসের সরাসরি সেভাবে কোনো প্রতিষেধক নেই। আর একাধিক ভাইরাসের আক্রমণে শরীরে জটিলতা তৈরি হয়।”
ভাইরাসজনিত ছোঁয়াচে রোগ হামে মৃত্যু থামছে না কেন? হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে যে শিশুরা হাসপাতালে আসছে, তারা কী অন্য কোনো কারণে আরও মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়ছে?
ঘুরেফিরে যখন এসব প্রশ্ন উঠছে, তখন চিকিৎসকরা বলছেন, হাম রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে অন্য ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া। এরই মধ্যে এডিনো ভাইরাস সংক্রমণের তথ্য মিলেছে।
বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ঝুঁকির অন্য কারণগুলোও দুর্বল হয়ে পড়বে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতোমধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া তিন শতাধিক মৃত্যুর বিস্তারিত তথ্য পেয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তাদের নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কোনিউমোনিয়া, সেপসিস, মেনিনজাইটিস ও এনসেফালাইটিস সংক্রমণের মতো জটিলতাও ছিল।
এসব রোগ প্রধানত ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক বা অন্য পরজীবীর সংক্রমণের কারণে হয়।
এ বিষয়ে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এডিনো বা কিছু ভাইরাসের সরাসরি সেভাবে কোনো প্রতিষেধক নেই। আর একাধিক ভাইরাসের আক্রমণে শরীরে জটিলতা তৈরি হয়।
“তবে মূল যে কারণে রোগীর অবস্থা খারাপ হচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে অর্থাৎ বর্তমানে সবার আগে হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এটি করলে অন্যগুলো স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই মূল সমস্যা বা রোগ নিয়ন্ত্রণের ফোকাস হারিয়ে ফেললে চলবে না।”
দেশে প্রথম জানুয়ারি মাসে হামের রোগী শনাক্ত হলেও সরকারিভাবে ১৫ মার্চ থেকে তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে।
হামের টিকা দেওয়া সত্বেও সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে নিশ্চিত হামে মৃত্যৃ ১০০ ছুঁইছুঁই। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৮ শ’র বেশি শিশু। প্রতিদিনেই হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু মারা যাচ্ছে। হামও শনাক্ত হচ্ছে পরীক্ষায়।
হামের প্রাদুর্ভাব ও মৃত্যু বেড়ে যাওয়ায় সমালোচনার মধ্যে সরকার জরুরি ভিত্তিতে দেশের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি উপজেলায় ৫ এপ্রিল থেকে ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বা পাঁচ বছর বয়সি টিকা দেওয়া শুরু করে। এরপর ১২ এপ্রিল শুরু হয় চার সিটি করপোরেশন এলাকায়।
২০ এপ্রিল সারা দেশে একই বয়সি শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার, যা শেষ হয় ২০ মে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সবশেষ তথ্য অনুসারে, এবছর ১ কোটি ৯৩ লাখ ৬৩ হাজার ৯১২ জন টিকা পেয়েছে। যদিও ক্যাম্পেইনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ জন।
ক্যাম্পেইনে দেশের শতভাগের বেশি শিশু হামের টিকা পেয়েছে বলে সরকার যে দাবি করে আসছিল, তাতে আগে থেকেই দ্বিমত প্রকাশ করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা।
জুনে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল কর্মসূচিতে হামের টিকার মতোই ছয় থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, সেখানে শিশুর সংখ্যা দাঁড়ায় ২ কোটি ৪০ লাখ। সে সময় পর্যন্ত দুই কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রায় প্রায় ৫৫ লাখের ফারাক ছিল।
এ হিসাবে তখন হামের টিকার কাভারেজ মাত্র ৭৬ দশমিক ৬৬ হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম এ বারী।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, “‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জনের ক্ষেত্রে ৯৫ শতাংশ টিকার কাভারেজ প্রয়োজন, তা থেকে আমরা প্রায় ১৮ শতাংশ দূরে আছি। এ জন্য হামের সংক্রমণ কমছে না। দ্রুত শিশুদের টিকা দিতে হবে।”
সরকারের তরফে বাদ পড়া শিশুদের হামের টিকা দেওয়া কথা বলে আসছে, এরই মধ্যে টিকা যে দেওয়া হচ্ছে, তা বলছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য।
রোববার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে টিকাবিষয়ক আন্তসংস্থা সমন্বয় কমিটি (আইসিসি) দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাদ পড়া ১৬ লাখ শিশুকে হামের টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ পর্যন্ত ৩৬১ জন রোগীর যে বিস্তারিত তথ্য পেয়েছে, তা বিশ্লেষণে দেখা গেছে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন শিশুদের সহসংক্রমণের জটিলতাও ছিল।
পরীক্ষায় হাম শনাক্ত না হওয়া রোগীদের ‘সন্দেহজনক’ হাম রোগী হিসেবে নথিবদ্ধ করছে অধিদপ্তর। তবে এসব রোগীর মৃত্যুকে ‘সন্দেহজনক’ মৃত্যু হিসেবে নথিবদ্ধ করার বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে বিশেষজ্ঞরা হামে মৃত্যু নথিবদ্ধ করার পক্ষে মত দেন।
মারা যাওয়া ওই রোগীদের বয়সভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ৬ থেকে ১১ মাস বয়সি শিশুদের। এ বয়সসীমার মোট ১৮৯ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা মারা যাওয়া ওই শিশুদের প্রায় ৫২ দশমিক ৪ শতাংশ। এর মধ্যে আছে ৬ মাস বয়সি ৪০ জন, ৭ মাসের ৩৭ জন, ৮ মাসের ৩৬ জন, ৯ মাসের ৩৮ জন, ১০ মাসের ২৭ জন এবং ১১ মাস বয়সি ১১ জন।
এরপর সবচেয়ে বেশি মারা গেছে শূন্য থেকে ৫ মাস বয়সি শিশু। ৩৬১ শিশুর ১০০ জন এ বয়সসীমার, যা প্রায় ২৭ দশমিক ৭ শতাংশ। এর মধ্যে ১ মাস বয়সি ৬ জন, ২ মাসের ৭ জন, ৩ মাসের ২২ জন, সাড়ে ৩ মাসের ১ জন, ৪ মাসের ২৮ জন এবং ৫ মাস বয়সি ৩৬ জন রয়েছে।
এছাড়া ১২ থেকে ২৩ মাস বয়সি শিশুদের মধ্যে ৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, অর্থাৎ মারা যাওয়া সেসব শিশুর প্রায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশই এই বয়সীমার।
হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া যে ৩৬১ শিশুর বিস্তারিত তথ্য সাস্থ্য অধিদপ্তর পেয়েছে, তাদের প্রায় ৮০ শতাংশই দুই বছরের কম বয়সি।
মৃত্যুর কারণ এবং জটিলতার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, হামের উপসর্গ নিয়ে আসা এসব শিশুর মধ্যে ১২৪ জন হাম শনাক্ত না হলেও সন্দেহ করা হয়েছে। এছাড়া নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কোনিউমোনিয়ায় ১২১ জন, শ্বাসকষ্ট ও শ্বাসযন্ত্রের ব্যর্থতায় ৫৪ জন, হার্ট ফেইলিউর ও কার্ডিওরেসপিরেটরি ফেইলিউরে ৪৩ জন, সেপসিস ও সেপটিক শকে ১৮ জন, মেনিনজাইটিস, এনসেফালাইটিস ও খিঁচুনিতে ২২ জন, ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতায় ১৭ জন, অপুষ্টিতে ২১ জন মারা গেছে।
|
বয়স |
মৃত্যু সংখ্যা |
মোটের শতাংশ |
প্রধান কারণ/জটিলতা |
অন্যান্য বড় কারণ |
|
০–৫ মাস |
১০০ |
২৭.৭% |
হাম/সন্দেহজনক হাম, নিউমোনিয়া |
ডায়রিয়া, সেপসিস ও অন্যান্য জটিলতা |
|
৬–১১ মাস |
১৮৯ |
৫২.৪% |
হাম/সন্দেহজনক হাম, নিউমোনিয়া |
শ্বাসকষ্ট, সেপসিস, ডায়রিয়া ও অন্যান্য জটিলতা |
|
১২–২৩ মাস |
৪৯ |
১৩.৬% |
হাম/সন্দেহজনক হাম, নিউমোনিয়া |
ডায়রিয়া, সেপসিস ও অন্যান্য জটিলতা |
|
২৪–৪৮ মাস |
১৭ |
৪.৭% |
হাম/সন্দেহজনক হাম, নিউমোনিয়া |
সেপসিস, ডায়রিয়া ও অন্যান্য জটিলতা |
|
৬০ মাসের বেশি |
৫ |
১.৪% |
হাম/সন্দেহজনক হাম |
নিউমোনিয়া, সেপসিস ও অন্যান্য জটিলতা |
এডিনো ভাইরাস শনাক্ত
দেশে হাম প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে এ রোগে আক্রান্ত ২ হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নিয়েছে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে। তাদের মধ্যে ৬৬ জন মারা গেছে।
শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় ৩০ জন শিশুর ‘রেসপিরেটরি প্যানেল টেস্ট’ করা হয়, তাতে ৫০ শতাংশ শিশুর শরীরে এডিনো ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়।
শিশু হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসক বলেছেন, গত ২৩ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক সভায় শিশু হাসপাতালের পরিচালকের পক্ষে উপস্থিত একজন চিকিৎসক হাম ও এডিনো ভাইরাসের সহসংক্রমণের বিষয়টি উপস্থাপন করেন।
ওই সভায় স্বাস্থ্য বিভাগের বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসক, হাম বিশেষজ্ঞ, ইউনিসেফের প্রতিনিধি এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ- আইসিডিডিআর,বির প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যেসব শিশুর শারীরিক অবস্থা ক্রমাগত জটিল হয়েছে বা উন্নতি হচ্ছে না তাদের আমরা বিশেষ ওই পরীক্ষা করেছি। আমরা এক ধরনের ফলাফল পেয়েছি।
“তবে এই টেস্ট সব জায়গায় করা সম্ভব নয় এবং এটা কিছুটা ব্যয়বহুলও বটে। আমরা দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় নতুন কিছুর কারণ খুঁজতে গিয়েই এডিনো ভাইরাস পেয়েছি।”
তিনি বলেন, “পুষ্টিহীনতা এবং হামের কারণে শিশুদের ইমিউনিটি (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা) একেবারে শেষ হয়ে যায়। এই কারণে বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়া সহজে শরীরে প্রবেশ করতে পারে এবং ব্রঙ্কোনিউমোনিয়া, সেপসিসসহ বিভিন্ন জটিলতা তৈরি করে।”
ডা. জিয়াউল ইসলাম বলেন, বর্তমানে হামের সঙ্গে এডিনো ভাইরাস শিশুদের জটিলতা তৈরি করছে ৷ এমনিতে এডিনো ভাইরাস নিরীহ একটি ভাইরাস, কিন্তু হামে আক্রান্ত রোগীর শরীরে প্রবেশ করে নানা জটিলতা তৈরি করতে পারে। এছাড়া হিউম্যান বোকা বা বোকা ভাইরাস, সাইটোমেগালো ভাইরাসও জটিলতা তৈরি করছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) জাহিদ রায়হানের দাবি, “আমরা হামের প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকে যাদের পরীক্ষা করে হাম নিশ্চিত হওয়া যায়নি তাদের সন্দেহজনক হিসেবে উল্লেখ করেছি। তবে বর্তমানে এই ধরনের মৃত্যু আর নেই।”
ডা. জাহিদ বলেন, “বর্তমানে প্রায় শিশু ‘পিউর’ নিউমোনিয়ায় মারা যাচ্ছে। কিন্তু অনেক সময় ডাক্তাররা পরিবারের কাছ থেকে হাসপাতালে যাওয়ার আগের অবস্থা সেভাবে না জানতে পারায় তাদের সন্দেহজনক হাম হিসেবে উল্লেখ করছে। এই সন্দেহজনক হামের এই ঘরটা আমরা আর রাখতে চাই না তেমন আলোচনা হয়েছে। তবে এটা বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।”
তবে আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেন, “শুধু নিউমোনিয়া বা জ্বর, সর্দিতে নয়, বরং হাম হয়ে আরও বিভিন্ন জটিলতায় রোগী মারা যাচ্ছে।’’
তার মতে, “মহামারীর সময় তথ্য গোপন বা ভিন্ন তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়। এটি ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর এবং প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্বাসযোগ্যতার জায়গা হারায়।”
