১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

মার্চেন্ট সৌরবিদ্যুতের ইউনিট ৬ টাকা ৪৮ পয়সা করার প্রস্তাব

বিতরণ কোম্পানিগুলোর ভয়, এই দর নির্ধারণ হলে বড় শিল্পগ্রাহকের একটি অংশ মার্চেন্ট বিদ্যুতের দিকে চলে যেতে পারে।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 24 Aug 2026, 12:05 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:53 PM

নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে সরকারি বিতরণ সংস্থার কাছে বিক্রি করা সৌরবিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ৬ টাকা ৪৮ পয়সা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি।

বেসরকারি ক্রেতার কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে সরকারি বিতরণ ব্যবস্থা ব্যবহারের জন্য গড়ে ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ১৭ পয়সা চার্জেরও সুপারিশ করেছে কমিটি। তবে এ ব্যবস্থা চালু হলে বড় শিল্পগ্রাহকের একটি অংশ মার্চেন্ট বিদ্যুতের দিকে চলে যেতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও কয়েকটি বিতরণ কোম্পানি। 

তাদের বক্তব্য, এতে তুলনামূলক বেশি দামের শিল্পগ্রাহক হারিয়ে রাজস্ব কমতে পারে।

রোববার ঢাকার সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে মার্চেন্ট পাওয়ারের বিদ্যুতের দাম ও ‘ওপেন অ্যাকসেস ট্যারিফ’ নিয়ে গণশুনানি করে বিইআরসি।

মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে ঘোষিত মাসিক উৎপাদনের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ কিনতে পারবে সরকারি বিতরণ সংস্থা। ওই বিদ্যুতের জন্যই ৬ টাকা ৪৮ পয়সার ট্যারিফ প্রস্তাব করা হয়েছে। বাকি বিদ্যুৎ বড় গ্রাহকের কাছে সরাসরি বিক্রি করতে পারবেন উদ্যোক্তারা। 

সেখানে বিদ্যুতের দাম উৎপাদক ও ক্রেতা নিজেরা ঠিক করবেন। তবে বিদ্যুৎ পাঠাতে সরকারি সঞ্চালন বা বিতরণ লাইন ব্যবহার করলে আলাদাভাবে ওপেন অ্যাকসেস ট্যারিফ দিতে হবে।

কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি মো. দিদারুল আলম বলেন, ৫০ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র ধরে ৬ টাকা ৪৮ পয়সার ট্যারিফ হিসাব করা হয়েছে। বিদ্যুতের সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতার ১০ থেকে ২০ শতাংশ ক্ষমতার ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা রাখারও সুপারিশ করেছে কমিটি।

যেভাবে এলো ৬ টাকা ৪৮ পয়সা

কারিগরি কমিটির হিসাবে, ৫০ মেগাওয়াটের একটি নমুনা সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বছরে নিট ৯ কোটি ১৮ লাখ ৪০ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। কেন্দ্রটির নিট রাজস্ব প্রয়োজন হিসাব করা হয়েছে ৫৯ কোটি ৪৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা। সম্ভাব্য উৎপাদন দিয়ে এই অর্থ ভাগ করে প্রতি ইউনিটের ট্যারিফ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ টাকা ৪৮ পয়সা।

এই হিসাবে বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা, জনবল, প্রশাসন, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ, অবচয় এবং বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফাসহ বিভিন্ন ব্যয় ধরা হয়েছে। বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফার হার ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ।

গণশুনানিতে এই দামের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম। 

তার হিসাবে, ডলারের বিনিময় হার ১২৩ টাকা ধরলেও ভারতে সৌরবিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি দাম প্রায় ৩ টাকা ৮০ পয়সা এবং পাকিস্তানে প্রায় ৩ টাকা ৯০ পয়সা। তিনি বলেন, “এরচেয়ে বেশি দাম নির্ধারণ করতে হলে তার যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে হবে।”

অতীতে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের দামের ওপর ভিত্তি করে নতুন বেঞ্চমার্ক তৈরি করা নিয়েও আপত্তি জানান তিনি। 

শামসুল আলম বলেন, “অতীতে যখন হয়েছে সেটাই লুণ্ঠনমূলক, সেটি প্রকৃত বেঞ্চমার্ক হতে পারে না।”

বিইআরসির কর্মকর্তারা বলেন, নির্দিষ্ট কিছু ব্যয় ও অনুমানের ভিত্তিতে ৬ টাকা ৪৮ পয়সা হিসাব করা হয়েছে। এসব অনুমান বদলালে ট্যারিফও পরিবর্তন হতে পারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেবউননেছা দাম নির্ধারণে স্বাধীনভাবে উৎপাদন খরচ এবং দেশ-বিদেশের তুলনামূলক তথ্য যাচাইয়ের ওপর জোর দেন।

বুয়েটের অধ্যাপক আব্দুল হাসিব চৌধুরীও সঞ্চালন, বিতরণ ও অন্যান্য চার্জ নির্ধারণে স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য বেঞ্চমার্ক রাখার কথা বলেন।

বড় গ্রাহক হারানোর শঙ্কা

শুনানিতে বিপিডিবি ও নেসকোর প্রতিনিধিরা বলেন, বড় শিল্পগ্রাহকরা দিনের বেলায় মার্চেন্ট সৌরবিদ্যুৎ কিনে রাতে আবার বিতরণ কোম্পানির বিদ্যুৎ নিতে পারেন। 

তাদের মতে, এতে দিনের বেলায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি অংশ বসিয়ে রাখতে হলেও রাতে চাহিদা মেটাতে তুলনামূলক ব্যয়বহুল পিকিং বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে হতে পারে। এতে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।

শিল্পগ্রাহকের বিদ্যুতের দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ায় তাদের হারালে বিতরণ কোম্পানিগুলোর রাজস্বেও প্রভাব পড়তে পারে বলে শুনানিতে বলা হয়।

এ উদ্বেগের জবাবে শামসুল আলম বলেন, বিদ্যমান সঞ্চালন ও বিতরণ চার্জের চেয়ে বেশি চার্জ চাওয়ার যৌক্তিকতা সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো দেখাতে পারেনি।

গ্রিড ব্যবহারে আলাদা খরচ

মার্চেন্ট পাওয়ারের ক্ষেত্রে ‘ওপেন অ্যাকসেস ট্যারিফ’ হবে বিদ্যুতের দামের বাইরে আরেকটি খরচ। 

কোনো বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র সরকারি গ্রিড ও বিতরণ লাইন দিয়ে নিজের ক্রেতার কাছে বিদ্যুৎ পাঠালে নেটওয়ার্ক ব্যবহারের জন্য যে অর্থ দেবে, সেটিই ওপেন অ্যাকসেস ট্যারিফ।

বিপিডিবি ১ এপ্রিল বিইআরসির কাছে পাঠানো প্রাথমিক প্রস্তাবে সঞ্চালন লাইন ব্যবহারের চার্জ ভোল্টেজভেদে ইউনিটপ্রতি ৪৬ দশমিক ৫৭ পয়সা থেকে ৭৮ দশমিক ৯১ পয়সা চেয়েছিল। বর্তমানে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য ইউনিটপ্রতি ৩১ পয়সা নেওয়া হয় বলে শুনানিতে জানানো হয়।

বিপিডিবির এপ্রিলের প্রস্তাবে বিতরণ সংস্থা ও ভোল্টেজভেদে ক্রস-সাবসিডিসহ রিসিভিং চার্জ ছিল ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ১৪ পয়সা থেকে ২ টাকা ৯০ পয়সা। 

বিদ্যুতের হিসাব ও ব্যবস্থাপনার জন্য আরও ৫ পয়সা প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে গণশুনানিতে কারিগরি কমিটি গড় বিতরণ চার্জ ১ টাকা ১৭ পয়সা করার সুপারিশ করেছে।

ফ্লোসোলারের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা আজিম কাসেম খান বলেন, সঞ্চালন, বিতরণ ও অন্যান্য চার্জ বেশি হলে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। একই ভোল্টেজে বিভিন্ন বিতরণ সংস্থার ভিন্ন চার্জের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

কর ছাড় চায় ব্যবসায়ীরা

বিজিএমইএ ভাইস প্রেসিডেন্ট ভিদিয়া অমৃত খান নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে বিনিয়োগ বাড়াতে আগামী ১০ বছর সৌরবিদ্যুৎ করমুক্ত রাখার দাবি জানান। 

তিনি বলেন, ইউরোপের বাজারে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের চাপ বাড়ছে। ভারত ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশ এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে।

বাংলাদেশ সাসটেইনেবল রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদও নীতি সহায়তা সহজ করার পাশাপাশি সোলার প্যানেল ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি আমদানিতে কর সুবিধা চেয়েছেন।

২০২৫ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে মার্চেন্ট পাওয়ার নীতিমালা করা হয়। এ ব্যবস্থায় একটি এলাকায় স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্র সরকারি সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা ব্যবহার করে অন্য এলাকার বড় গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারবে।

গণশুনানি শেষে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, “আমরা সবার মতামত শুনলাম। এরপরও যদি কেউ আর কোনো মতামত দিতে চান, তাহলে লিখিত আকারে দিতে পারেন। আমরা যাচাই করে সিদ্ধান্ত দেব।”

আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যে লিখিত মতামত নেওয়ার পর প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে কমিশন।