১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩

সংস্কারের পথে অন্তর্বর্তী সরকারের একমাস

নির্বাচন কবে হবে, সংবিধানের কী ধরনের সংস্কার হবে– সেসব প্রশ্নের উত্তর জানতে আরো অপেক্ষা করতে হবে।

সংস্কারের পথে অন্তর্বর্তী সরকারের একমাস
শপথের পরদিন গত ৯ অগাস্ট উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা জাতীয় স্মৃতিসৌধে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 14 Sep 2024, 09:09 PM

Updated : 26 Aug 2026, 10:26 AM

একটি রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনে অবসানের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে শপথ নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার এক মাস সময় পার করল। 

শুরু থেকেই সংস্কার শেষ করে নির্বাচন দেওয়ার কথা বলে আসা এই সরকারের পরিকল্পনায় দ্রুত নির্বাচন নেই, এটি স্পষ্ট করা হয়েছে। 

এই এক মাসে শেখ হাসিনা সরকারের রেখে যাওয়া প্রশাসনে রদবদল, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল ও গত সরকারের আমলে বঞ্চিতদের পদোন্নতির সিদ্ধান্ত এসেছে একের পর এক। 

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, পুলিশ, আইন-আদালত, সশস্ত্র বাহিনী, হাসপাতাল ও সেবাখাত, জনপ্রশাসন সব জায়গায় পরিবর্তনগুলো হয়েছে এবং হচ্ছে। 

নির্বাচন বিশ্লেষক  ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক আব্দুল আলীম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এক মাস কোনো সময় নয়। তারপরও শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে বিভিন্ন মহল থেকে যেভাবে দাবি দাওয়া তোলা হচ্ছে, উনারা (অন্তর্বর্তী সরকার) পদক্ষেপ নিচ্ছেন। 

"প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পুলিশ, অফিস আদালত যেভাবে রাজনীতিকরণ করা হয়েছে, উনারা এগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছেন। তাই আমি বলব, উনারা সঠিক পথেই আছেন।" 

সরকার পতন আন্দোলনে মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ, সরকার পতনের পর থানায় থানায় হামলায় ভেঙে পড়া পুলিশি ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর যায়নি এখনও। পুলিশ সদস্যদেরকে কর্মস্থলে ফেরানো গেলেও এখনও প্রকাশ্যে সেভাবে সক্রিয় দেখা যাচ্ছে না তাদের। খোয়া যাওয়া অস্ত্র উদ্ধারের অভিযান এখনও চলছে, তবে পুড়িয়ে দেওয়া গাড়িগুলো পুলিশের অভিযানের সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। 

ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের আবদুল আলীম বলেন, “সরকারকে সবার আগে প্রশাসন, পুলিশ ঠিক করে দেশটা স্থিতিশীল করতে হবে। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে নজর দিতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, মিডিয়া- সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।” 

দেশের পূর্বাঞ্চলে বন্যা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

দেশের পূর্বাঞ্চলে বন্যা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ মনে করেন, একটা গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যখন কোনো সরকার পরিবর্তন হয়, তখন যে ধরনের চ্যালেঞ্জ আসে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তেমনটাই হয়েছিল। শুরুতে সরকার না থাকার কারণে দেশে একটা নৈরাজ্যকর অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও একটা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল। 

“সেই রকম একটা অবস্থা থেকে এখন বেশ ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে মোটামুটি একটা স্থিতিশীল অবস্থা ফিরে এসেছে।” 

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ব্যাপক জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারের পরের তিনটি নির্বাচন ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। এই সময়ে রাজনৈতিক বিরোধীদের প্রতি কঠোর হওয়ার অভিযোগও ছিল সরকারের বিরুদ্ধে। 

গত জুলাইয়ের শুরুতে সরকারি চাকরিতে কোটা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের আন্দোলনে মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগের পর আন্দোলন ব্যাপক মাত্রা পায়। ৫ অগাস্ট পতন ঘটে শেখ হাসিনার; তিনি উড়ে যান ভারতে। 

প্রবল গণ আন্দোলনের মুখে গত ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ছাত্র জনতা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবন ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জাতীয় সংসদ ভবনে ঢুকে পড়ে। সেদিন ব্যাপক লুটপাটও হয়।

প্রবল গণ আন্দোলনের মুখে গত ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ছাত্র জনতা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবন ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জাতীয় সংসদ ভবনে ঢুকে পড়ে। সেদিন ব্যাপক লুটপাটও হয়।

এর পর তিনদিন সরকারহীন দেশে সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা, বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা-লুটপাটের ঘটনা ঘটে। ৮ অগাস্ট রাত ৯টায় শপথ নেয় নতুন সরকার। 

সরকার পতন আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পছন্দে সরকারের প্রধান হন নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস। প্রথম দিন শপথ নেন ১৩ জন উপদেষ্টা। পরে দুই দফায় আরও সাত জন শপথ নেওয়ায় সরকারের আকার এখন ২১ জনের। 

এই সরকারের মেয়াদ কত দিনের হবে, সে বিষয়ে কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি। তবে গত ২৫ অগাস্ট জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, “দেশবাসীকে ঠিক করতে হবে, আপনারা কখন আমাদের ছেড়ে দেবেন। আমরা ছাত্রদের আহ্বানে এসেছি। তারা আমাদের প্রাথমিক নিয়োগকর্তা। দেশের আপামর জনসাধারণ আমাদের নিয়োগ সমর্থন করেছে।” 

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “শোনা যাচ্ছে এই সরকারের মেয়াদ তিন মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, এটা বর্ধিত করা হবে। সে ক্ষেত্রে আইনগত বৈধতার বিষয়টি একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা ধারণা করছি, সম্ভবত ২০০৭-০৮ এর অনুকরণে আদালত থেকে উনারা মেয়াদ বাড়াবেন। এই কাজটি দ্রুত করে ফেলা উচিত। তাতে তাদের বৈধতা নিয়ে আর প্রশ্ন থাকবে না।" 

গত ৮ অগাস্ট বঙ্গভবনে শপথের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন মুহাম্মদ ইউনূস।

গত ৮ অগাস্ট বঙ্গভবনে শপথের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন মুহাম্মদ ইউনূস।

গত ২ সেপ্টেম্বর স্পিকারের পদ থেকে শিরীন শারমিন চৌধুরীর পদত্যাগে একটি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। 

আশঙ্কাটি ব্যাখ্যা করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলছেন, “কালকে যদি খোদা নাখাস্তা রাষ্ট্রপতি মারা যান বা অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে কে?” 

শুরুর চ্যালেঞ্জ 

শেখ হাসিনার পতনের পর তিন দিন দেশে যখন সরকার ছিল না, তখন থানায় পুলিশের উপস্থিতি ছিল না। সড়কে ছিল না ট্রাফিক পুলিশও। 

সে সময়ে ডাকাতের উপদ্রব দেখা দেয় রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে। ছাত্র আন্দোলনের কর্মীরা পাড়া মহল্লায় পাহারা বসিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে। সেই সঙ্গে সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করতে থাকে শিক্ষার্থীরা। 

অন্তর্বর্তী সরকার যখন প্রশাসন গুছাতে ব্যস্ত, সেই সময়ে সচিবালয়, জাতীয় প্রেসক্লাব, প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা, শাহবাগসহ বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন দাবি আদায়ের আন্দোলন অস্বস্তি তৈরি করে। 

স্থগিত হওয়া এইচএসসি পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সচিবালয়ে ঢুকে শিক্ষা সচিবকে অবরোধ করে দাবি আদায়ে লিখিত আদেশ জারি করিয়ে ছাড়ে। 

এরপরই শুরু হয় অঙ্গীভূত আনসার সদস্যদের চাকরি জাতীয়করণের দাবি। ২৫ অগাস্ট রাতে আনসার সদস্যরা সচিবালয়ে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করে। পরে সেনাবাহিনী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত ৫০ জন আহত হন, পরে একজনের মৃত্যুও হয়। গ্রেপ্তার ও বিচারের মুখোমুখি হন কয়েকশ আনসার সদস্য। 

ওই ঘটনার পরই সচিবালয় ও রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার আশপাশে ধরনের সভা, সমাবেশ, মিছিল, শোভাযাত্রা, বিক্ষোভ প্রদর্শন নিষিদ্ধ করে পুলিশ। 

এই এক মাসে প্রশাসন সাজানোর মধ্যে সরকারের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে দেশের উত্তর পূর্ব ও পূর্বাঞ্চলে প্রলয়ংকরী বন্যা। সরকারি হিসাবে ৫০ লাখের বেশি মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 

আড়াই সপ্তাহ পরও পানি নেমে যায়নি বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে, ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বাড়িঘর ও সড়ক অবকাঠামোর। উপদ্রুত এলাকার মানুষকে সহায়তা ও পুনর্বাসনে বড় পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। 

সরকারের তরফে বন্যা নিয়ন্ত্রণে ভারতের সঙ্গে নতুন ব্যবস্থাপনায় জোর দেওয়া হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা এ বিষয়ে বাংলাদেশে ভারতের হাই কমিশনার প্রণয় ভর্মার সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি উচ্চ পর্যায়ের একটি সহযোগিতার কথা বলেছেন, বিশেষ পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের কথা বলেছেন। 

সরকার পতনের পর থানায় থানায় আক্রমণে খোয়া গেছে পুলিশের অস্ত্র। সেই অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান শুরু করেছে যৌথ বাহিনী।

সরকার পতনের পর থানায় থানায় আক্রমণে খোয়া গেছে পুলিশের অস্ত্র। সেই অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান শুরু করেছে যৌথ বাহিনী।

এর মধ্যে ঢাকার সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর অঞ্চলে কিছু পোশাক শ্রমিক নতুন নতুন দাবি পূরণে আন্দোলন শুরু করলে অনেক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। তবে এই যৌথ বাহিনীর অভিযানের পর পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসছে। উৎপাদনও শুরু হয়েছে। 

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “উৎপাদন প্রক্রিয়া সচল রেখে দেশের অর্থনীতিকে চাঙা রাখা একটা বড় চ্যালেঞ্জ হবে।” 

তিনি বলেন, " ইতিবাচক পরিবর্তন আনার যে প্রতিশ্রুতি ছিল, সেটা বাস্তবায়নও একটা চ্যালেঞ্জ। কোথাও কোথাও নিয়োগ ভালো হচ্ছে, আবার কোথাও হচ্ছে না। আগের সময়ের চাইতে এখনকার সময় যদি তেমন পার্থক্য না আসে, তাহলে তা জনগণের কাছে বৈধতার সংকট তৈরি করবে।" 

পদোন্নতি, চাকরিচ্যুতি ও নতুন নিয়োগ 

প্রশাসন ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে শেখ হাসিনার বেছে নেওয়া কর্মকর্তাদের প্রভাব কমানোর চেষ্টা করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। 

শুরুতেই সচিব, রাষ্ট্রদূত, বিভিন্ন অধিদপ্তরে ব্যক্তিদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। 

বাদ পড়ার তালিকায় আছেন গত সরকারের আমলের আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রধান সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকিও। 

অন্যদিকে আগের সরকারের সময় অবসরে পাঠানো পাঁচজন কর্মকর্তাকে সিনিয়র সচিব পদমর্যাদায় দুই বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। 

এছাড়া সিনিয়র সহকারী সচিব, উপসচিব, যুগ্মসচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পদে অনেকের পদোন্নতি হয়। 

প্রথম দফায় ১১৫ জনকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দিয়ে উপসচিব করা হয়। নতুন পদোন্নতি পাওয়াদের মধ্য থেকে কয়েকজনসহ মোট ২০১ জন কর্মকর্তাকে করা হয় যুগ্মসচিব। পরের ধাপে আরও ২২ জনকে যুগ্মসচিব করা হয়। 

মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক।

মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক।

১১ দিনের ব্যবধানে তিনটি পদোন্নতি পেয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। 

সরকার পতনের পর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ভিসি, প্রো-ভিসিসহ উচ্চপদের শিক্ষকরা পদত্যাগ করে সরে পড়েন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য পদে নতুন নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। তবে এখনও সব জায়গায় স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। 

বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা নির্বাচন কমিশন থেকেও সব কমিশনার পদত্যাগ করেন। তবে কমিশন পুনর্গঠন বিষয়ে সরকারের তরফে এখনও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। 

বিচার প্রশাসনে রদবদল 

গত ১০ অগাস্ট সুপ্রিম কোর্টে ছাত্রদের বিক্ষোভের মুখে প্রধান বিচারপতির পদ ছাড়েন ওবায়দুল হাসান। পরে পদত্যাগ করেন আপিল বিভাগের আরও পাঁচ বিচারপতি। 

পরে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পান সৈয়দ রেফাত হোসেন। ১২ অগাস্ট নিয়োগ পান আরও চার বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল করিম ও মো. রেজাউল হক, এস এম এমদাদুল হক। 

৭ অগাস্ট ‘ব্যক্তিগত অসুবিধার’ কথা বলে’ পদত্যাগ করেন শেখ হাসিনার সময় নিয়োগ পাওয়া অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। পর দিন নিয়োগ পান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। 

পুরোপুরি ঢেলে সাজানো হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। শেখ হাসিনার সময়ে নিয়োগ পাওয়া প্রধান প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলীসহ ট্রাইব্যুনালের ১৩ জন প্রসিকিউটর পদত্যাগ করেন অগাস্টের তৃতীয় সপ্তাহে। 

মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর করা হয়েছে ট্রাইব্যুনালে জামায়াত নেতাদের পক্ষে আইনি লড়াই চালানো আইনজীবী তাজুল ইসলামকে।

মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর করা হয়েছে ট্রাইব্যুনালে জামায়াত নেতাদের পক্ষে আইনি লড়াই চালানো আইনজীবী তাজুল ইসলামকে।

৮ সেপ্টেম্বর প্রধান প্রসিকিউটরের দায়িত্ব পেয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তিনি এক সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াত নেতাদের আইনজীবী ছিলেন। সেই সঙ্গে আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। সেই পদ থেকে তার পদত্যাগ করার খবর এসেছে সংবাদমাধ্যমে। 

ট্রাইব্যুনালও পুনর্গঠন করা হবে বলে অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানিয়ে রেখেছেন। 

গত জুলাই ও অগাস্টে সংঘাতে মৃত্যুকে ‘গণহত্যা’ বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রিসভার অনেক সদস্য, শরিক দলের নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়েছে। দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের বিরুদ্ধেও অভিযোগ জমা পড়েছে। 

আন্দোলনে প্রাণহানির ঘটনার তদন্তে সহযোগিতা করতে ঢাকায় ঘুরে গেছে জাতিসংঘের একটি অনুসন্ধান দল। 

আর্থিক খাতে পরিবর্তনের হাওয়া 

আওয়ামী লীগ শাসনামলে তুমুল আলোচনায় থাকা আর্থিক খাতে পরিবর্তনের হাওয়া আরও বেশি দৃশ্যমান। আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা আহসান এইচ মনসুর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব পাওয়ার পর আলোচিত এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংকগুলোর পর্ষদ পাল্টে দেওয়া হয়েছে। 

ইসলামী ব্যাংকসহ শরিয়াভিত্তিক অন্যান্য ব্যাংক থেকে ঋণ হিসেবে বের করে নেওয়া টাকা আদায়ে সম্পত্তি বিক্রির ঘোষণা এসেছে। 

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যকে প্রধান করে অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটিও গঠন হয়েছে। 

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন-বিএসইসির নেতৃত্বেও পরিবর্তন এসেছে। শিবলী-রুবাইয়াত-উল ইসলাম অজ্ঞাত স্থান থেকে পদত্যাগ করার পর এই দায়িত্বে এসেছেন ব্যাংকার রাশেদ মাকসুদ। 

সরকার পতনের পর আর্থিক খাতে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই কর্মযজ্ঞের নেতৃত্বে আছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব পাওয়া আহসান এইচ মনসুর।

সরকার পতনের পর আর্থিক খাতে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই কর্মযজ্ঞের নেতৃত্বে আছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব পাওয়া আহসান এইচ মনসুর।

পরে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ফারজানা লালারুখ ও আলী আকবর। আগের কমিশনের দুই সদস্য মোহসিন চৌধুরী ও এটিএম তারিকুজ্জামান এখনও রয়ে গেছেন। 

আলোচিত আরও যেসব সিদ্ধান্ত 

এই এক মাসে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে অন্তত তিন দফায় আলোচনা করেন ইউনূস। 

>> প্রথম দফায় আলোচনার ভিত্তিতে ১৫ অগাস্ট জাতীয় শোক দিবসের ছুটি বাতিল করে ইউনূস সরকার। 

>> স্থানীয় সরকারে ১২ সিটি করপোরেশনের মেয়র, উপজেলায় চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান মিলিয়ে ১ হাজার ৪৮২ জন, ৬০ জন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ৩২৩ পৌর মেয়রকে অব্যাহতি দিয়ে সেখানে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে। 

>> ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান ও সদস্যদের মধ্যে যারা অনুপস্থিত আছেন, তাদের জায়গায় প্রশাসক নিয়োগ করার আদেশ এসেছে। 

>> চলমান এইচএসসির পরীক্ষার স্থগিত বিষয়গুলো বাদ দিয়ে ফলাফল প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

>> প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনকে জাদুঘরে রূপান্তর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

>> ১ জুলাই থেকে ৫ অগাস্ট পর্যন্ত ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় যেসব ফৌজদারি মামলা হয়েছে, সেগুলো প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। 

>> ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে যারা হতাহত হয়েছেন, তাদের পরিবারের সদস্যদের দেখভালের জন্য সরকার একটি ফাউন্ডেশন গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। 

>> ৬ অগাস্ট রাষ্ট্রপতির দণ্ড মওকুফ করে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেন। আওয়ামী লীগের সময়ে জামায়াতে ইসলামী ও এর অঙ্গসংগঠনকে নিষিদ্ধ করে জারি করা প্রজ্ঞাপন বাতিল করা হয় ২৮ অগাস্ট। 

>> পুঁজিবাজারে বেক্সিমকোসহ ১২ প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। বেক্সিমকো গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ ও চৌধুরী নাফিজ সরাফাতের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারে অভিযোগ অনুসন্ধান করছে সিআইডি। 

>> বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য নির্ধারণে গণশুনানির বিধান ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ফলে নির্বাহী আদেশে আর দর ঠিক হবে না নয়। 

>> বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চুক্তি পর্যালোচনায় কমিটি গঠন হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০ বাতিলের কথা জানানো হয়েছে। 

>> ১২ বছর পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড- বিসিবির সভাপতি পদে পরিবর্তন এসেছে। ২১ অগাস্ট পদ ছাড়েন নাজমুল হাসান পাপন। একই দিনে সভাপতি হন জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ফারুক আহমেদ। 

এক মাসে গ্রেপ্তার যারা 

ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী দীপু মনি, আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক গ্রেপ্তার হয়েছেন এই এক মাসে। গ্রেপ্তার হয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর সাবেক বেসরকারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানও। 

সাবেক নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয় মন্ত্রী এ বি তাজুল ইসলামকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। 

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোটের নেতা রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, সংসদের ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুও গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। 

ক্ষমতাচ্যুত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ছাড়াও কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। 

ক্ষমতাচ্যুত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ছাড়াও কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ নেতা আহমদ হোসেন, কক্সবাজারের সাবেক সংসদ সদস্য আলোচিত আব্দুর রহমান বদিও গ্রেপ্তার আছেন। 

বিদায়ী সরকারের আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, সাবেক পুলিশ প্রধান এম শহীদুল হকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। 

তাদের সবাইকেই সরকার পতন আন্দোলনে নিহতের ঘটনায় আসামি করা হয়েছে। শতাধিক মৃত্যুতে আসামি করা হয়েছে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকেও।