০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩

‘আমরা তার কাছে ঋণী', সাবেক সহকর্মীদের শোকগাঁথা

“শুধু সাংবাদিকতা নয়, একজন সাংবাদিক হিসেবে কীভাবে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে হয়, তার কাছ থেকেই শিখেছি।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 02 Oct 2026, 11:29 PM

Updated : 03 Oct 2026, 12:03 AM

শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের বার্তাকক্ষে একে একে ভিড় করতে শুরু করেন সাবেক কর্মীরা। সবার মুখ থমথমে, কারও কারও চোখ জলে ভেজা। কমবেশি সবার কথাই ছিল এমন-এ খবর বিশ্বাস করা যায় না, মেনে নেওয়া অসম্ভব!

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই বার্তাকক্ষে ছুটে আসেন অনেক। তারা বলেছেন, তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সঙ্গে তাদের কিছু কথা, যেসব কথা এখন কেবল স্মৃতি।

গভীর শোক প্রকাশ করে বিডিনিউজ টো‌য়ে‌ন্টি‌ফোর ডটকমের সা‌বেক কর্মী মকফুল হো‌সেন সাদের কথায়, তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সঙ্গে তার কাজের অভিজ্ঞতা ছিল ‘স্মরণীয়’।

সাদ বলতে শুরু করেন এভাবে, “তৌ‌ফিক ভাই আজীবন নিষ্ঠার স‌ঙ্গে পেশাদার সাংবা‌দিকতা চর্চা ক‌রে‌ছেন। আমার ম‌ত বহু তরুণ‌কে তি‌নি সাংবা‌দিকতায় অনুপ্রা‌ণিত ক‌রে‌ছেন। তার প্রতি আজীবন ঋণী। আমার ম‌ত বহু তরুণ‌কে তি‌নি সাংবা‌দিকতায় অনুপ্রা‌ণিত ক‌রে‌ছেন। তার প্রতি আজীবন ঋণী। যে কজ‌নের কা‌ছে সাংবা‌দিকতা শি‌খে‌ছি, ত‌াঁ‌দের ম‌ধ্যে তি‌নি অন্যতম। তাঁ‌কে ভীষণ মিস করব।"

পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিলেন সুলাইমান নিলয়, আব্দুল মান্নান দীপ্তসহ অনেকে।

সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সঙ্গে দেখা হওয়ার প্রথম দিনের স্মৃতিচারণ করে নিলয় বলেন, ২০০৯ সালে ঢাকায় এসে তিনি যখন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে কাজ করার জন্য ইন্টারভিউ দেন, তখন প্রথমবারই মুখোমুখি হন তার সঙ্গে।

নিলয় বলেন, “উনিই আমার ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন। প্রথম প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেও দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিনি। আর তৃতীয় প্রশ্নটি করার পর আমি বুঝতে পারি, এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ভাইভা পাশ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

"তখন আমি উনাকে সোজা বললাম, 'ভাই, আমি সাংবাদিকতা করার জন্যই ঢাকায় এসেছি এবং সেই কারণে সাংবাদিকতা বিভাগেও ভর্তি হয়েছি। কিন্তু ভর্তি হওয়ার পর আমার মনে হয়েছে, সাংবাদিকতা শিখতে হলে ভালো কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করা উচিত। আমি আপনার প্রতিষ্ঠানকে সেই ভালো প্রতিষ্ঠান মনে করেই এখানে কাজ ও সাংবাদিকতা শিখতে এসেছি। যদি সুযোগ পাই, আমি সেই সুযোগের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করার চেষ্টা করব।”

এরপর কী হল জানতে চাইলে নিলয় বলেন, "এরপর উনি আমাকে আর কোনো প্রশ্ন করেননি, শুধু বললেন, 'ঠিক আছে, তুমি শেখা শুরু করো।'"

বিডিনিউজে সাড়ে ১৩ বছর কাজ করেছেন নিলয়। তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সঙ্গে সম্পর্কের কথা তুলে ধরে তিনি।

“উনার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা কেবল বস আর কর্মীর ছিল না; উনি আমার মেন্টর, গাইড এবং অভিভাবক ছিলেন। একবার আমাদের এক মিটিংয়ে অপরপক্ষ বলছিল যে আমি রুম থেকে চলে গেলে তারপর তারা কথা শুরু করবে। তখন তৌফিক ভাই স্পষ্ট বলে দিয়েছিলেন—'ও আমার ছেলে, ও থাকবে।' আমাদের সম্পর্কটাই ছিল এমন।"

নিলয় আরও বলেন, "সাংবাদিকতায় আমি জীবনে যা কিছু শিখেছি, আমার মনে হয় না সাংবাদিকতা বিভাগের পুরো কোর্সও আমাকে অতটা শেখাতে পেরেছে, যতটা আমি উনার থেকে শিখেছি। যতবারই দেশের বাইরে অ্যাসাইনমেন্টে গেছি, উনি সফরসূচিসহ কোন দেশ থেকে কী শিখে আসতে হবে, সেসব সুন্দরভাবে গাইড করে দিতেন। আমরা তার কাছে ঋণী। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা তার কাছে ঋণী। উঁচু মানের সাংবাদিকতার চর্চার মাধ্যমে তিনি ও তার প্রতিষ্ঠান বহুদিন বাংলাদেশের সাংবাদিকতার এজেন্ডা সেট করেছেন।

“সংবাদের মান সম্পর্কে আমাদের নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছেন। অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি যে ব্যবসায়িক মডেলে প্রতিষ্ঠানটিকে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন, সেটিও ছিল অনন্য। বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় সংবাদের মানকে নতুন পর্যায়ে উন্নীত করা এবং সাংবাদিকতায় প্রযুক্তির ব্যবহারকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তার অবদান কেউ ভুলতে পারবে না।”

আরেক কর্মী সা‌জিয়া আফ‌রিন বলেন তিনি স্নাতক শেষ করেই বিডিনিউজে কাজ শুরু করেন।

“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ার সময় ক্লাসে ভালো বা প্রপার নিউজের উদাহরণ দেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষকরা বেশিরভাগই বিডিনিউজের রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা করতেন। সেই থেকে তৌফিক ভাইয়ের নামটা জানি। সদ্য কাজ শুরু করা আমি যেমনটা তখন ভাবতাম, এখনও মনে করি উতকৃষ্ট মানের সাংবাদিকতা মানেই বিডিনিউজ আর তার পেছনে তৌফিক ভাইয়ের আত্মবিশ্বাস - সাহস এবং নির্ভুল সংবাদ পরিবেশনের চর্চা। তৌফিক ভাই এই চর্চা নিউজরুমের সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন বলেই আমার বিশ্বাস।"

অল্প কিছুদিন আগে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ছেড়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়া ফয়সাল আতিক বলেন, "তিনি তো সাংবাদিকতায় আমার শিক্ষকের ভূমিকায় ছিলেন। বিশুদ্ধ সাংবাদিকতা নিয়ে অনেক খুঁটিনাটি হাতে কলমে শেখাতেন। উনার এমন হঠাৎ প্রস্থানের খবরে আমি স্তম্ভিত।"

আব্দুল মান্নান দীপ্ত বলেন, "বিডিনিউজ ছেড়েছি ২০১৯ সালে। কিন্তু বিডিনিউজের সঙ্গে সম্পর্কটা কখনোই যেন শেষ হয়নি। বিডিনিউজের প্রতিটি অনুষ্ঠানে তিনি ব্যক্তিগতভাবে আমাকে আমন্ত্রণ জানাতে বলতেন। সেই আন্তরিকতাটা সবসময়ই আমাকে ছুঁয়ে যেত। গত বছরের অক্টোবরে বিডিনিউজের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শেষবারের মত দেখা হয়েছিল ভাইয়ার সঙ্গে। সাংবাদিকতার অনেক কিছুই তার কাছে শিখেছি। এমন অনেক কিছু, যা হয়ত আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়ানো হয়নি। শুধু সাংবাদিকতা নয়, একজন সাংবাদিক হিসেবে কীভাবে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে হয়, সেটাও তার কাছ থেকেই শিখেছি। তিনি আমার কাছে ছিলেন একজন আদর্শ সাংবাদিক। এমন একজন সাংবাদিক, যিনি কখনো আপস করেননি। তার সততা, সাহস ও সাংবাদিকতার প্রতি দায়বদ্ধতা আমার কাছে সবসময়ই অনুপ্রেরণার হয়ে থাকবে।"

আবু নোমান সজীব বলেন, "তৌফিক ভাই আমার আড়াই দশকের সাংবাদিকতা জীবনের সেরা শিক্ষক। বাংলাদেশের মতো জায়গায় সব চাপ উপেক্ষা করেও সাংবাদিকতার বৈশ্বিক মানদণ্ড মেনে চলা সম্ভব—তা তৌফিক ভাইয়ের কাজ দেখলেই বোঝা যেত।"

২০০৭-০৮ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপট টেনে তিনি আরও বলেন, "'ওয়ান-ইলেভেন'-এর সংকটের সময় বার্তাকক্ষে সরাসরি তার দিকনির্দেশনায় কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। তখনই শিখেছি কীভাবে একটি স্পর্শকাতর সংবাদকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও নির্মোহভাবে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করতে হয়।"

গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, "গত দুই দশকে বহু প্রভাবশালী সাংবাদিককে চাপের কাছে বা ক্ষমতালিপ্সায় নীতি থেকে বিচ্যুত হতে দেখলেও তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে কখনো আদর্শিক জায়গা থেকে একচুল নড়তে দেখেননি। সেই নীতি ও আদর্শের স্পষ্ট ছাপ দেশের প্রথম অনলাইন সংবাদপত্র 'বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম'-এ শুরু থেকেই বিদ্যমান রয়েছে।"

তার এই অসময় চলে যাওয়া সংবাদমাধ্যমকে 'বহুকাল ভোগাবে' তুলে ধরে তিনি বলেন, যখন সংবাদমাধ্যমের প্রতি পাঠক ও দর্শকের আস্থা স্মরণকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখন তার মত একজন দক্ষ নিউজম্যান ও নিউজ ম্যানেজারের অনুপস্থিতি আমাদের বহুকাল ভোগাবে।

হ্যালো ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাবেক কর্মী সৈয়দা মৌ জান্নাত শোক প্রকাশ করে বলেন, "খবরটি শুনে মনে হয়েছে আমার পরিবারেরই কেউ চলে গেলেন। আমি এখনো এটা বিশ্বাস করতে পারছি না।"

দীর্ঘ সাড়ে ১২ বছর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের শিশু সাংবাদিকতার প্ল্যাটফর্মে কাজ করার স্মৃতি টেনে তিনি তার পেশাগত স্বাধীনতার একটি ঘটনা স্মরণ করেন।

তিনি জানিয়েছেন, শিশুদের একটি প্রশিক্ষণ চলাকালে অনাকাঙ্ক্ষিত এক পরিস্থিতিতে সেশনটি স্থগিত করার তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল তাকে। বিষয়টি তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিলয়কে জানানো হলে তিনিও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে মৌকেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে সেশনটির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি তৌফিক ইমরোজ খালিদীর কাছে এ নিয়ে আপত্তি জানালে, খালিদী স্পষ্টভাবে তার কর্মীর পাশেই দাঁড়ান।

ঘটনাটির তুলে ধরে তিনি বলেন, "তৌফিক ভাই তাকে সরাসরি জানিয়ে দিয়েছিলেন, 'মৌ সেখানে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটাই সঠিক সিদ্ধান্ত।' পেশাগত জীবনে কর্মীদের ওপর তার এই আস্থা ও সমর্থনের এমন কত ঘটনাই তো আজ মনে পড়ছে।"

আরেক কর্মী পাভেল রহমান বলেন, "পথ হাঁটেন সবাই, পথ তৈরি করেন কেউ কেউ। বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় তৌফিক ইমরোজ খালেদি পথিকৃৎ। তিনি পথ তৈরি করেছেন, সেই পথে হেঁটেছি। তৌফিক ইমরোজ খালেদি সম্পাদনায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে আমি সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছি, এটা আমার জন্য ভীষণ গর্বের। বাংলাদেশের সাংবাদিকতার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ঝরে গেল। অনন্তলোকে ভালো থাকুন তৌফিক ভাই। সাংবাদিকতার উজ্জ্বল অধ্যায়ে আপনি চিরজাগরুক।"

ব্যক্তিগত সফরে লন্ডনে ছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। সেখানে হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েন।

মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণের কারণে বৃহস্পতিবার রাতে তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে লন্ডনের সেইন্ট বার্থোলমিউ’স হাসপাতালে নেওয়া হয়। স্থানীয় সময় শুক্রবার বেলা ২টা ২৩ মিনিটে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

তার মরদেহ কবে দেশে আনা হবে তা এখনো ঠিক হয়নি। জানাজা ও দাফনের স্থান ও সময় চূড়ান্ত হলে পরিবারের তরফে তা জানিয়ে দেওয়া হবে।