Published : 12 Aug 2026, 04:05 PM
গ্যাসের ঘাটতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় জনজীবনে তীব্র দুর্ভোগের মধ্যে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত আশার বাণী শুনিয়েছেন।
বুধবার সন্ধ্যা থেকে পরিস্থিতির ‘কিছুটা উন্নতি হবে’ বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “আমরা একটা কৌশল নিয়েছি। সেই কৌশলটা গতকাল সন্ধ্যা থেকে নিয়েছি। আমরা আশা করছি আজকে সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা হলেও উন্নতি হবে, ইনশাল্লাহ।”
এদিন সচিবালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তিনি; বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সামাল দিতে কী ধরনের কৌশল নেওয়া হয়েছে তা জানতে চাইলে বিস্তারিত বলেননি প্রতিমন্ত্রী।
তার কথায়, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও ‘পর্যাপ্ত গ্যাস দিতে না পারায়’ অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, “গ্যাস যদি আপনি পর্যাপ্ত সাপ্লাই না করতে পারেন, তাহলে বিদ্যুতের সংকট হবে। পাওয়ার প্ল্যান্টকে গ্যাস দিতে না পারলে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে না।”
গরমের মধ্যে তীব্র লোডশেডিংয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। এ ছাড়া জরুরি সেবা ব্যাহত হচ্ছে, প্রভাব পড়েছে ব্যবসায়ও।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ১০ অগাস্ট দেশের সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে উঠেছিল।
১১ অগাস্ট বিকাল ৩টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৪৬৫ মেগাওয়াট। গ্যাসের সংকটের সঙ্গে কয়লাভিত্তিক কয়েকটি কেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়াও বিদ্যুৎ ঘাটতি বাড়িয়েছে।
গ্যাসের সংকট সামাল দিতে মালয়েশিয়ার সঙ্গে আলোচনা এগিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় চিঠি পাঠানোর পর তিনি ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ দেশটির সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেছেন। পরে বাংলাদেশের একটি দল মালয়েশিয়া গেছে।
“তার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের অফার নিয়ে আমরা কাজ করছি। তার ধারাবাহিকতায় তাদের কাছ থেকে আমরা আশা করছি অ্যাটলিস্ট এক কার্গো এলএনজি আমরা পাব।”
এর আগে ২৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে চিঠি দেন এবং তার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। গ্যাস সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দেয় মালয়েশিয়া।
মালয়েশিয়া থেকে আইএসও ট্যাংক, অর্থাৎ বিশেষ শীতল ট্যাংক-কনটেইনারে এলএনজি আনার বিষয়েও কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন অমিত।
তবে এটি তাৎক্ষণিক সমাধান নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, “আইএসও ট্যাংকের মাধ্যমে যদি এলএনজি আনতে হয়, এটি একটি প্রক্রিয়ার ব্যাপার আছে। কারণ আপনারা জানেন, আইএসও ট্যাংক এটা অ্যাভেইলেবল না। মার্কেট থেকে এটা একটা মধ্যমেয়াদি সমাধানের ব্যাপার। সেটা নিয়ে আমরা কাজ করছি।”
মালয়েশিয়া থেকে আইএসও ট্যাংকে এলএনজি আনার সম্ভাবনা নিয়ে বাংলাদেশ কাজ করছে বলে এর আগে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও খবর আসে। বর্তমান সংকটে সরকার ‘হাতে থাকা সব বিকল্প’ নিয়ে কাজ করছে বলে দাবি করেন প্রতিমন্ত্রী।
মঙ্গলবার ঢাকা ক্লাবে জ্বালানি খাত নিয়ে সেমিনারে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমাদের হাতে যতগুলো বিকল্প ছিল, আমরা সকল বিকল্প নিয়ে কাজ করছি।”
ওই সেমিনারে অধ্যাপক এম তামিম, অধ্যাপক ইজাজ হোসেন ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলমসহ বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছেন।
ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও সরকার পরামর্শ নিচ্ছে জানিয়ে অমিত বলেন, “তাদের কোনো বুদ্ধি আছে কি না, তাদের কোনো পরামর্শ আছে কি না, আমরা জানতে চাচ্ছি। ইভেন আপনাদের কাছেও যদি কোনো বুদ্ধি-পরামর্শ থাকে, আমরা ওয়েলকাম করছি।”
দুই এলএনজি টার্মিনালেই সমস্যা
বর্তমান গ্যাস সংকটের পেছনে সাগরের বৈরী আবহাওয়া এবং একটি এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার কথা তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী।
“প্রকৃতির হাতে আমাদের আসলে কিছু নেই। প্রকৃতির সঙ্গে আপনি-আমি যুদ্ধ করে টিকে থাকতে পারি, কিন্তু একটি সময় আপনাকে-আমাকে আত্মসমর্পণ করতে হয়।”
তিনি বলেন, সামিটের টার্মিনালে এলএনজি খালাস করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে দুর্ঘটনার পর এক্সেলারেট এনার্জির টার্মিনালও পুরো সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।
গত ২১ জুলাই আগুনে এক্সেলারেট এনার্জির মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। পরে একটি ইউনিট চালু হলেও টার্মিনালটি এখনও পুরো সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি। অন্যদিকে সোমবার নতুন এলএনজি কার্গো এলেও উত্তাল সাগরের কারণে সামিটের টার্মিনালে তা খালাস করা যায়নি। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ২১৩ কোটি ঘনফুটে।
দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন দ্রুত বাড়ানোর সুযোগও নেই বলে মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী।
“দেশি উৎপাদন রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব না। এটা আপনারা জানেন। একটা দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপার।”
বুধবার ইউএস-বাংলাদেশ চেম্বারের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও সরকারের বৈঠক হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এলএনজি সরবরাহে তাদের কাছেও সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
‘ভুল নীতির মাসুল দিতে হয়’
বর্তমান পরিস্থিতির জন্য আগের সরকারগুলোর জ্বালানি নীতিকে দায়ী করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, “দেখেন, যখন ভুল নীতি আপনি গ্রহণ করবেন, একটি সময় তার মাসুল দিতে হবে। বিগত সরকারগুলো কোনো মধ্যমেয়াদি, কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সূত্র খোঁজেননি। তাৎক্ষণিক পথে গেছেন বলে আজকে হঠাৎ করে একটি সংকট হয়েছে।”
এই সংকট কোনো না কোনো সময়ে সামনে আসত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন “সংকটের সময়টা হয়তো আজকে এসেছে। আজকে না হলে হয়তো আগামীকাল আসত, আগামীকাল না হলে হয়তো পরশুদিন আসত। একটি সময় এ পরিস্থিতির মুখোমুখি আপনাকে-আমাকে হতেই হত।”
গরমের সময় সংকটটি সামনে আসায় মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে বলে স্বীকার করেন অমিত।
“জনদুর্ভোগকে বিবেচনায় নিয়ে আমরা প্রাণান্তকর চেষ্টা করছি। আমার ধারণা জনগণ বোঝেন, আপনারাও বোঝেন, আমাদের চেষ্টার ন্যূনতম কোনো ত্রুটি নেই।”
কবে বিদ্যুৎ ও গ্যাস পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময় দেননি প্রতিমন্ত্রী।
বিদ্যুৎ স্থাপনার নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশকে চিঠি দেওয়ার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় এ ধরনের কোনো চিঠি দেয়নি।
“আমরা দেইনি। আপনি আমার কাছে যদি বলেন, আমি মন্ত্রণালয়কে রিপ্রেজেন্ট করছি,” বলেন তিনি।
গোপালগঞ্জে ঘন ঘন লোডশেডিংকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য অপ্রীতিকর ঘটনা ও নাশকতা এড়াতে বিদ্যুৎ স্থাপনা ও উপকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা জোরদারে পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড-ওজোপাডিকো।
মঙ্গলবার ওজোপাডিকো গোপালগঞ্জ বিদ্যুৎ সরবরাহ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাঈন উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে পুলিশ সুপারের কাছে এ অনুরোধ জানানো হয়।
লোডশেডিংয়ের কারণে গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ ও হামলার আশঙ্কায় জেলা প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি দিয়েছে নেত্রকোণা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিও।
ঘন ঘন লোডশেডিং, বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার শঙ্কায় নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশকে চিঠি
নেত্রকোণায় লোডশেডিং: নিরাপত্তা চেয়ে ডিসিকে পল্লী বিদ্যুতের চিঠি
গ্যাস কম, তেলের বিদ্যুৎ বাড়াচ্ছে ব্যয়; লোডশেডিংয়ে হাঁসফাঁস