১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

ঢাকার সড়কে ছিনতাইয়ের ‘ওত পাতা’ আতঙ্ক, সম্পদের সঙ্গে যাচ্ছে প্রাণও

“ছিনতাই ছিল না, এমন নয়। কিন্তু এখন যেটা হচ্ছে, সেটা বাড়াবাড়ি,” বলেন মিরপুরের বাসিন্দা রাইসুল ইসলাম।

ঢাকার সড়কে ছিনতাইয়ের ‘ওত পাতা’ আতঙ্ক, সম্পদের সঙ্গে যাচ্ছে প্রাণও
ছবি: চ্যাটজিপিটি

বিডিনিউজ২৪

প্রশান্ত মিত্র

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 03 Sep 2026, 01:57 AM

Updated : 17 Sep 2026, 02:53 AM

বগুড়ার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভিন ঢাকায় এসেছিলেন চোখের চিকিৎসক দেখাতে। পরিকল্পনা ছিল চিকিৎসা শেষে পরের দিন সকালেই স্কুল ধরবেন।

রনজিলা পরের দিন স্কুলে ফেরেন ঠিকই, কিন্তু লাশ হয়ে। অ্যাম্বুলেন্সে করে তার নিথর দেহ যখন রোববার স্কুলমাঠে পৌঁছে, তখন কোমলমতি শিশুরাও বিশ্বাস করতে পারছিল না, তাদের প্রিয় রনজিলা ম্যাডাম আর নেই!

আগের দিন ভোরে ঢাকার সংসদ ভবন সংলগ্ন সড়কে ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে রিকশা থেকে সড়কে পড়ে প্রাণ হারান ৫৭ বছর বয়সী রনজিলা। শুক্রবার রাতে স্বামীর সঙ্গে ডাক্তার দেখানোর জন্য ঢাকার পথে রওনা দিয়েছিলেন রনজিলা।

ভোরে বাস থেকে নেমে ফার্মগেটের ইস্পাহানি ইসলামীয়া চক্ষু হাসপাতালে যাওয়ার জন্য রিকশায় চড়েছিলেন স্বামী-স্ত্রী। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগ মুহূর্তে বাইকে আসা ছিনতাইকারী ব্যাগ ধরে টান দিলে সড়কে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান রনজিলা। তড়িঘড়ি করে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা জানান, তিনি মারা গেছেন।

ঘটনার পর থেকে শোকে বিহ্বল তার স্বামী আব্দুল মতিন কারো সঙ্গে তেমন কোন কথাই বলছিলেন না। স্ত্রীর ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়া শেষ করে শনিবার রাতেই ধরেছেন বাড়ির পথ। রোববার তিনি বলেন, “চিকিৎসার জন্য স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় গেলাম, ফিরলাম লাশ নিয়ে। আর কি বলার আছে!”

রনজিলা পারভিন। 

রনজিলা পারভিন।

শনিবার ভোরেই কাছাকাছি সময়ে ঢাকার আরেক প্রান্ত কদমতলী ভাঙা ব্রিজের পাশে ছিনতাইকারীর হাস ফসকানো ছুরিকাঘাতে জনি নামে আরেক ছিনতাইকারী মারা যায়।

কদমতলী থানার পরিদর্শক সজীব কুমার বাড়ৈ বলেন, দুই পথচারীকে ঘিরে ফেলে তিন ছিনতাইকারী। এর মধ্যে এক পথচারীকে জাপটে ধরে তার কাছ থেকে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে তারা। 

তারা চিৎকার করলে এক পর্যায়ে সুইচ গিয়ার দিয়ে পথচারীকে আঘাত করতে গেলে তাকে জাপটে ধরা পেছনে থাকা জনির হাতের নিচ দিয়ে বুকের পাশে ছুরির আঘাত লাগে। সে সময় দুই ছিনতাইকারী পালিয়ে গেলেও আহত অপর ছিনতাইকারী মারা যান। 

কর্মব্যস্ত ঢাকায় ‘ছিনতাই আতঙ্ক’ এখন সাধারণ মানুষের মধ্যে বেড়ে গেছে। দিনদুপুরে বা রাতের আঁধারে কখনো অস্ত্রসহ পথ আগলে দাঁড়াচ্ছে, কখনো হ্যাঁচকা টানে মূল্যবান জিনিসপত্র কেড়ে নিচ্ছে।

বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক ছিনতাই ও হামলার ঘটনায় চাপা ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে নাগরিকদের মধ্যে। 

রাইসুল ইসলাম নামে মিরপুরের এক বাসিন্দা বলেন, “একসময় রাত-বিরাতে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে বা কোথাও ঘুরতে বের হয়ে যেতাম। এখন ঘুরতে যাওয়া অনেক দূরের হিসাব, অফিসে যেতে-আসতেই আতঙ্কে থাকতে হয়। রিকশায় উঠলে আতঙ্ক, বাসে উঠলেও আতঙ্ক। এখন আর কোনো নির্ধারিত সময় লাগে না, কখন যে ছিনতাইকারীর সামনে পড়তে হয়, সেটা নিয়ে আতঙ্কে থাকি।”

ঢাকার উত্তরা এলাকায় অফিস করা এই বেসরকারী চাকরিজীবী বলেন, “ছিনতাই ছিল না, এমন নয়। কিন্তু এখন যেটা হচ্ছে, সেটা বাড়াবাড়ি। আর দিনের পর দিন একই পরিস্থিতি চলছে, এভাবে আর কত?”

সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ছিনতাইয়ের ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা এবং রাত ১০টার পর বাস, ট্রেন বা লঞ্চ থেকে নামা দূরপাল্লার যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন।

নির্জন স্থানে ভয় দেখিয়ে টাকা-পয়সা নেওয়ার প্রবণতা থাকলেও এখন কৌশলেও এসেছে পরিবর্তন। 

চলন্ত মোটরসাইকেল বা কার থেকে পথচারীর ব্যাগ বা মোবাইল ধরে হ্যাঁচকা টান দিচ্ছে ‘টানা পার্টি’। এতে অনেক সময় ভুক্তভোগীরা রাস্তায় ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হচ্ছেন, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।

তবে মামলার পরিসংখ্যান সামনে এনে ‘ছিনতাই বেড়েছে’ বলতে নারাজ পুলিশ কর্মকর্তারা।

ডিএমপি বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্রথম ৬ মাসে ঢাকার বিভিন্ন থানায় ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১৭২ টি মামলা হয়েছে; গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪০২ জনকে।

যেখানে গেল বছর ৫৩১টি মামলার বিপরীতে ১ হাজার ৪৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। সে হিসাবে গেল বছরের তুলনায় এ বছরের প্রথম ৬ মাসে গ্রেপ্তার ও মামলা অর্ধেকেরও কম।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পযর্ন্ত প্রথম সাত মাসে ডিএমপির ৫০টি থানায় ১৮৯টি মামলার তথ্য দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

প্রচলিত আইনে ছিনতাইয়ের ঘটনায় দস্যুতা ও ডাকাতির ধারায় মামলা হয়। আসামির সংখ্যা এক থেকে চারজন হলে দস্যুতা এবং চারজনের বেশি হলে তা ডাকাতি হিসেবে গণ্য হয়।

গত ১০ অগাস্ট উত্তরায় ব্যাংকে টাকা জমা দিতে যাওয়ার পথে একটি পেট্রোল পাম্পের কর্মীদের বহন করা গাড়ি থামিয়ে ১ কোটি ২১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারীরা। এ ঘটনায় ডিবি ও র‍্যাব অভিযান চালিয়ে ৮ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানায়।

ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মো. আকতার হোসেন বলেন, পুলিশের প্রধান মনযোগ এখন ছিনতাইয়ে। তারা প্রধানত ছিনতাই প্রতিরোধে কাজ করেন, তারপরেও যেগুলো ঘটছে, সেসব ‘অনাকাঙ্খিত’।”

ছিনতাইয়ের মামলায় অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয় দাবি করে তিনি বলেন, “আমাদের টহল দল, ফুট পেট্রোল পার্টি দিন-রাত বিভিন্ন জায়গায় কাজ করছে। সেই সঙ্গে আমাদের এসি, এডিসি এবং ডিসি যারা, তারা কিন্তু সব সময় সেগুলো মনিটরিং করছেন। আমাদের দিক থেকে আমরা তৎপর আছি, সেই সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেও কার্যক্রম পরিচালিত হয়। আমাদের তৎপরতা আছে।”

যেসব ঘটনা ‘রিপোর্টেড হচ্ছে’, সেগুলো নিয়মিত মামলা হচ্ছে এবং আসামি গ্রেপ্তার হচ্ছে বলেও ভাষ্য এই কর্মকর্তার।

ছিনতাই বেড়ে যাওয়ার পেছনে পুলিশের ব্যর্থতার তুলনায় ‘রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা’ এবং ছিনতাইয়ের ধরন পাল্টে যাওয়াকে ‘বড় ব্যাপার’ বলে মনে করছেন কোনো কোনো বিশ্লেষক।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, “আগে ছিন্নমূল মানুষরা ছিনতাই করতো বা মাদকের সঙ্গে যারা ছিল, তারা ছিনতাই করেছে। এখন যেটা দেখা যাচ্ছে, ভোরবেলা অথবা সকালবেলা করছে। এখন হচ্ছে প্রকাশ্যে। এটা এখন সুসংঘঠিত বা ‘অর্গানাইজ ক্রাইম’ হিসেবে আমি মনে করি। এখন ‘অর্গানাইজ ফর্মে’ এটা হচ্ছে।”

ছিনতাইকারীকে ধরা হয়, তারপর আবার জামিনে বের হয়ে যাওয়ার পেছনে ‘ক্ষমতাধর ব্যক্তিবর্গের’ নিয়ন্ত্রণ থাকার ইঙ্গিত দেন এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ।

ছিনতাইয়ের অভিযোগে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার মোশাররফ হোসেন পনি (ডানে) ও সেড্রিক।

ছিনতাইয়ের অভিযোগে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার মোশাররফ হোসেন পনি (ডানে) ও সেড্রিক।

পুলিশের তালিকায় ১৩৮৭ ছিনতাইকারী

বর্তমানে ডিএমপির আট বিভাগে তালিকাভুক্ত ১ হাজার ৩৮৭ ছিনতাইকারী রয়েছে। এর মধ্যে রমনা বিভাগে ১৫২, লালবাগে ১৫৯, ওয়ারীতে ৩০৮, মতিঝিলে ১৬৮, তেজগাঁওয়ে ২৪০, মিরপুরে ৫৩, গুলশানে ৬৭ ও উত্তরায় ২৪০ জন ছিনতাইকারী রয়েছেন।

এদের ৮০ শতাংশই একাধিক মামলার আসামি। একাধিকবার গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে আবার ছিনতাইয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন।

পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, “মামলা ধরে একটা তালিকা করা হয়, যেটি প্রতিনিয়তই আপডেট করা হয়। যেখানে নতুন নতুন নামও যুক্ত হয় প্রতিনিয়ত। সুনির্দিষ্ট করে কতজন ছিনতাইকারী এক এলাকায় রয়েছে, এটা বলা দুরূহ। আর এক এলাকার ছিনতাইকারী যে শুধু ওই এলাকাতেই ছিনতাই করে, বিষয়টি এমনও নয়। দেখা গেছে মোহাম্মদপুর থানার তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী, কিন্তু উত্তরা গিয়ে ছিনতাই করছে।”

তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীদের বাইরেও অনেক বেশি ছিনতাইকারী ঢাকায় সক্রিয় রয়েছে বলে মত এই কর্মকর্তার।

তিনি বলেন, “ধরেন পথে একজনকে আটকে ধরে মোবাইল মানিব্যাগ হাতিয়ে নিল কয়েকজন ছিনতাইকারী। কিছুক্ষণ আগে সেখানে পুলিশের টহল টিম গিয়ে তাদেরকে তল্লাশি করে চলে এসেছে। তাদের কাছে কোনো অস্ত্র নেই, কিছু নেই। সেজন্য পুলিশ তাদেরকে গ্রেপ্তার করতে পারল না। কিছুক্ষণ পরে তারাই গ্রুপ হয়ে ছিনতাই করছে। এমন ভাসমান ছিনতাইকারীর সংখ্যা প্রচুর।”

পুলিশ বলছে, তাদের চিহ্নিত করা ঢাকায় অন্তত ৩ শতাধিক ছিনতাই স্পট রয়েছে, যার মধ্যে হটস্পট শতাধিক।

ছিনতাই মামলার পরিসংখ্যান বলছে, এ বছরের প্রথম ৬ মাসে সবচেয়ে বেশি ৩৮ টি মামলা হয়েছে ওয়ারী বিভাগে, গ্রেপ্তার হয়েছে ৯৮ জন। এরপরেই ৩৪টি মামলা হওয়া তেজগাঁও বিভাগে সর্বোচ্চ ১৩৮ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। আর ৬ মাসে সবচেয়ে কম ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে লালবাগে। পাঁচটি মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৭ জনকে।

বাইরে থেকে এসেও ঢাকায় ছিনতাই

ঈদের ছুটি কাটিয়ে গেল ৩০ মে গভীর রাতে ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরেছিলেন দুই বোন। পরে রিকশায় করে নূরজাহান রোডের বাসার সামনে গেলে তারা ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন।

এ বিষয়ে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বাসায় ঢোকার মুহূর্তে লুঙ্গি পরা এক যুবক চাপাতি হাতে তাদের দিকে এগিয়ে আসেন। তার পেছনে আসেন আরেক যুবক।

হাতে চাপাতি থাকা যুবক কিছু একটা বলে প্রথম রিকশাচালককে ধাক্কা দেন। পরে চাপাতির ভয় দেখিয়ে ব্যাগ, লাগেজ ও মোবাইল নিয়ে নেন তারা। নারীদের অলঙ্কার ও মোবাইল ফোন নিতে তাদের তল্লাশি করতে দেখা যায়।

এ ঘটনা নিয়ে ব্যপক আলোচনার মুখে ২ জুন গভীর রাতে নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকা থেকে জুয়েল ওরফে আরিফ এবং আনোয়ার হোসেন নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের তরফে বলা হয়, জড়িতরা পেশাদার ছিনতাইকারী। তারা একসময় মোহাম্মদপুরে থাকত, পরে নারায়ণগঞ্জে নতুন আস্তানা গড়ে তোলে। সেখান থেকে এসে তারা নিয়মিত ছিনতাই করছিল।

এদের মধ্যে আনোয়ার মোহাম্মদপুর এলাকার চাঞ্চল্যকর ‘সিরিজ ছিনতাইয়ের ঘটনায় অভিযুক্ত’ বলেও দাবি করেছিল পুলিশ।

হামলার শিকার হচ্ছে পুলিশও

গেল ১১ জুন রাতে জিয়া উদ্যানের সামনের সড়কে ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে আহত হন পুলিশের এসআই সামসুজ্জোহা ও কনস্টেবল মোহাম্মদ হৃদয় হোসেন।

পুলিশ বলেছিল, অটোরিকশায় করে তিন ছিতাইকারী পালিয়ে যাওয়ার সময় লোকজনের চিৎকার শুনে টহলরত পুলিশ সদস্যরা ধরতে গেলে এ ঘটনা ঘটে।

পুলিশের দুই সদস্যের কাঁধে ছুরিকাঘাত করা হলেও হাতেনাতে দুই ছিনতাইকারীকে ধরতে সক্ষম হয় পুলিশ।

গেল ১৬ জুন সকালে আদাবরে এক এমএফএস এজেন্টকে কুপিয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা লুট করে ছিনতাইকারীরা।

অভিযোগ পেয়ে বিকালে আসামি ধরতে ঢাকা উদ্যান এলাকায় গেলে আদাবর থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম এবং এস আই তরুণকে কুপিয়ে আহত করে ছিনতাইকারীরা। পরে পুলিশ গুলি চালালে দুই ছিনতাইকারী গুলিবিদ্ধ হয় এবং গ্রেপ্তার করা হয় চারজনকে।

এর আগের মাসে ১১ মে সকালে মোহাম্মদপুরের টাউনহল এলাকায় ছিনতাইকারী ধরতে গেলে হামলার শিকার হয় ধানমন্ডির পুলিশ।

পুলিশ বলেছিল, ছিনতাইকারী গ্রেপ্তারে অভিযান চালালে ছিনতাইকারীদের দলটি ‘চাইনিজ কুড়াল, চাপাতি নিয়ে আক্রমণের চেষ্টা করে’। এ সময় ‘আত্মরক্ষার্থে’ এক পুলিশ সদস্য পিস্তল থেকে চার রাউন্ড গুলি করে।

এ সময় পুলিশের কয়েকজন সদস্য আহত হন। এক ছিনতাইকারী পায়ে গুলি লাগে। ঘটনাস্থল থেকে দুইজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়েছিল পুলিশ। দলটি বাইকে করে ঘুরে ধানমন্ডি এলাকায় ছিনতাই করত বলে জানিয়েছিল পুলিশ।

গত ৩০ মে রাত ৩টার দিকে মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোড এলাকায় বাসার সামনে ছিনতাইয়ের শিকার হন দুই নারী।

গত ৩০ মে রাত ৩টার দিকে মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোড এলাকায় বাসার সামনে ছিনতাইয়ের শিকার হন দুই নারী।

টানা পার্টির দৌরাত্ম্য চলছেই, বেশির ভাগই মামলা হয় না

ঢাকার বিভিন্ন এলাকার সড়কে পথচারী বা রিকশা আরোহীদের কাছ থেকে নিয়মিতই হ্যাঁচকা টানে মোবাইল, ব্যাগ বা অন্যান্য সামগ্রী ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা ‘মামলার ঝামেলায়’ না গিয়ে ‘হারিয়ে গেছে’ মর্মে জিডি করেন বলে পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য।

তবে অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, ‘পুলিশ যেভাবে বলে’ তারা সেভাবেই করতে ‘বাধ্য হন’।

গেল ৯ জুলাই রাত ১১ টার দিকে ধানমন্ডির আবাহনী মাঠের সামনে টানা পার্টির খপ্পরে পড়েন সুমন মাতুব্বর নামে এক রিকশা আরোহী। পেছন থেকে আসা একটি বাইকে এসে একজন তার হাত থেকে মোবাইল ফোন ছোঁ মেরে নিয়ে পালিয়ে যায়।

পরে তিনি ধানমন্ডি থানায় গিয়ে ‘আবাহনী মাঠ সংলগ্ন এলাকায় পকেট থেকে পড়ে হারিয়ে যায়’ মর্মে একটি জিডি করেন।

তিনি বলেন, “দুয়েকদিন পরে আমি তদন্তকারী কর্মকর্তাকে নিয়ে তার সহায়তায় একটি ভিডিও ফুটেজ উদ্ধার করতে সক্ষম হই। কিন্তু এরপরও ওই মোটরসাইকেলের নম্বর প্লেটটি ক্লিয়ার বোঝা যায়নি এবং আশপাশে অনেক বাড়ি খুঁজেও সেই ধরনের কোনো ভিডিও ফুটেজ পাইনি।”

তার অভিযোগ, “প্রাণ না গেলে অথবা ভাইরাল না হলে সাধারণত ছিনতাইকারী ধরা পড়ে না। আমার ফোন ছিনিয়ে নেওয়া ছিনতাইকারী ধরা পড়ল না, সে নিশ্চই পরের ছিনতাই করার সুযোগ পাবে। তার টানে কেউ পড়ে গিয়ে হয়তো মারাও যাবে।”

ছিনতাই হলেও মামলা না করে জিডি করলেন কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমাকে পুলিশ যেভাবে বলেছে সেভাবেই করেছি।”

টানা পার্টির হাতে মোবাইল বা অন্যান্য সামগ্রী খোয়ালে মামলা না নিয়ে ভুক্তভোগীকে জিডি করতে বাধ্য করা হচ্ছে, এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার আকতার হোসেন বলেন, “এই কথাটা সঠিক নয়। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ নিজে থেকেই ছিনতাই হলে মামলা করতে ইচ্ছুক হয় না। কারণ সে মনে করে, মামলা করলে তাকে সাক্ষ্য দিতে হবে।”

এরপরেও কাউকে ছিনতাইয়ের ঘটনা গোপন করতে বলা হলে, সেটা ঊর্দ্ধতন কাউকে বলা হলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলেন তিনি।

দিনে-দুপুরে ছিনতাই

ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। গেল ১০ দিনে এমন অন্তত ৫টি ঘটনায় লোকজনের চিৎকারে এগিয়ে গিয়ে ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করেছেন ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা।

সবশেষ শনিবার বিকালে মিরপুর ১২ নম্বর এলাকায় এক পথচারীর ‘চোর চোর’ চিৎকারে এগিয়ে যান সড়কে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের সদস্য। এর সময় ধাওয়া করে ছিনতাইকারী জসীমকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গেল ২৬ অগাস্ট বিকালে যাত্রাবাড়ী মোড়ে দায়িত্ব পালনকালে এক নারীর চিৎকার শুনে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা দেখতে পান, এক ব্যক্তি ছিনতাই করে দৌড়ে পালাচ্ছে। পরে ধাওয়া করে সেলিম নামে ওই যুবককে আটক করা হয়, যিনি ওই নারীর কানের দুল ছিনিয়ে নিয়ে পালাচ্ছিলেন।

তার আগের দিন ২৫ অগাস্ট জুরাইন রেলগেট এলাকায় এক নারীর ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে পালানোর সময় শাহজালাল নামে এক ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করে সেখানে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট।

২৪ অগাস্ট কমলাপুর এলাকায় বাস থেকে নামার সময় এক যাত্রীর পকেটে হাত দিয়ে ছিনতাইয়ের চেষ্টাকালে মোহাম্মদ রাশেদ নামে এক ছিনতাইকারীকে আটক করেন সেখানকার ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা।

গেল ২০ অগাস্ট সকালে কমলাপুর বাস কাউন্টারের সামনের সড়কে সাহেদ নামে এক ছিনতাইকারী এক নারী পথচারীর কান থেকে দুল ছিনিয়ে নিয়ে গিলে ফেলার চেষ্টা করে। এ সময় দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট স্থানীয়দের সহায়তায় তাকে আটক করে পুলিশে হস্তান্তর করে।

হ্যাঁচকা টানে গৃহবধূর মৃত্যু, চার মাস শনাক্ত হয়নি কেউ

চলতি বছরের গেল ১৯ মার্চ সকালে উত্তরা দক্ষিণ মেট্রো স্টেশনের নিচে মুক্তা আক্তার নামে এক গৃহবধূ ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে প্রাণ হারান।

রোজার ঈদের আগ মুহূর্তে দক্ষিণখানের ভাড়া বাসা থেকে কেনাকাটা করতে মিরপুর যাচ্ছিলেন তিনি। মেট্রো স্টেশনের নিচে মুক্তার ব্যাগ ধরে টান দেয় কারে থাকা ছিনতাইকারী।

এ সময় হ্যাঁচকা টানে সড়কে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। এরপর তিনটি হাসপাতাল ঘুরে দুপুরে স্বজনরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।

বরগুনার বাসিন্দা মুক্তার সঙ্গে বছর দুয়েক আগে বিয়ে হয়েছিল গার্মেন্টকর্মী লিমন হোসেনের। স্বামীর সঙ্গে দক্ষিণখানের ফায়দাবাদ এলাকার ভাড়া বাসায় থাকতেন।

এ ঘটনায় অজ্ঞাত ৩-৪ জনকে আসামি করে তুরাগ থানায় মামলা করেন লিমন। ঘটনার পর থেকেই ‘চেষ্টার’ কথা বললেও চার মাস পেরিয়েও ঘটনায় জড়িত কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।

তুরাগ থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “মামলাটি এখন ডিবির কাছে আছে। আমাদের কাছে থাকাকালীন তেমন কোনো অগ্রগতি ছিল না। পরে কোনো অগ্রগতি রয়েছে কি না, ডিবি বলতে পারবে।”

লিমন বলেন, “না, এখনো জানতে পারলাম না আমার স্ত্রীকে কারা মেরেছে। কেউ গ্রেপ্তার হয় নাই। অনেক দিন আমাকে কোনো আপডেটও জানানো হয় নাই।”

এ বিষয়ে ডিবি উত্তরা বিভাগের উপ কমিশনার ইলিয়াস কবির বলেন, “যে গাড়িটা দেখা গেছিল, সেটার নম্বর স্পষ্ট দেখা যায়নি, ফলে শনাক্ত করা যায়নি। আমরা একটি মোবাইল নম্বর শনাক্ত করে সেটা ধরে এগোচ্ছি।”

অনেক ক্ষেত্রে জানে না পুলিশও

দিনাজপুরের পার্বতীপুরে ঈদের ছুটি কাটিয়ে কলেজপড়ুয়া মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় ফিরছিলেন এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসের বিক্রয় কর্মকর্তা সোহেলী ইসলাম সোমা। গত ৭ জুন ভোরে বাস থেকে নেমে ব্যাটারিচালিত রিকশায় চেপে সেন্ট্রাল রোডের বাসায় ফিরছিলেন মা-মেয়ে।

পথে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের সামনে মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারীরা সোমার হাতব্যাগ ধরে টান দিলে তিনি রাস্তায় আছড়ে পড়েন, তার মাথা গিয়ে লাগে সড়ক বিভাজকের সঙ্গে।

গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১১ জুন সকালে সোমা মারা যান।

মারা যাওয়ার পরেও পাঁচ দিনে ঘটনার বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেনি থানা পুলিশ। তাদের ভাষ্য ছিল, তাদের কাছে কেউ অভিযোগ করেনি।

এ ঘটনায় সোমার মামা নাজমুল মওলা লিটন ১৩ জুন শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন। তার পরের দিনই নয়ন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠিয়েছিল পুলিশ। পরে তিন দিনের রিমান্ড শেষে তাকে কারাগারে পাঠায় আদালত।

বর্তমানে ছিনতাই নিয়ে নানা আলোচনার মুখে ঢাকায় পুলিশি তৎপরতা বাড়ানোর কথা বলেছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম। 

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের যেসব পেট্রোল পার্টি ছিল, সেগুলো বাড়ানো হয়েছে। আমরা কাজ করতেছি।”

তবে শনিবার ভোরে ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে নিহত রনজিলার স্বামী ঘটনার দিন অভিযোগ করেছিলেন, ভোর সাড়ে ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে রিকশায় করে যাওয়ার সারাটা পথে কোথাও তারা পুলিশের উপস্থিতি দেখতে পাননি।

ভোরে টহলে কোনো ঘাটতি রয়েছে কিনা জানতে চাইলে উপকমিশনার আকতার বলেন, “না, এই সময়টাতে কোনো ঘাটতি থাকে না, কোনো সময়ই ঘাটতি থাকে না। তবে কেউ যদি কোনো সময় তার দায়িত্বে গাফিলতি করেন এবং সেটি যদি প্রমাণিত হয়, সেগুলোর ব্যাপারে কিন্তু প্রতিনিয়ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

“আর টহল পার্টির যেটা, তারা এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যাতায়াত করে। স্বাভাবিকভাবেই এক প্রান্ত থেকে যখন অন্য প্রান্তে যায়, একই সময় তো সকল জায়গায় উপস্থিতিটা সম্ভব হয় না। এটা দেখার জন্য কিন্তু আমাদের সিনিয়র কর্মকর্তারা প্রতিনিয়তই মাঠে থাকেন।”

অপরাধবিজ্ঞানী অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, “সর্বোপরি আমি যেটা মনে করি, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে ছিনতাই বেড়েছে। আর রাজনৈতিকভাবে এটাকে মোকাবেলা করা যেতে পারে। সরকারের যদি সদিচ্ছা হয় এবং এটা মোকাবেলার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে, তাহলে এটা সম্ভব।”

আরও পড়ুন

ছিনতাকারীর হ্যাঁচকা টানে সড়কে পড়ে শিক্ষকের মৃত্যু: গ্রেপ্তার ২

ছিনতাইকারীর হাত ফসকে ছুরিকাঘাত, প্রাণ গেল আরেক ছিনতাইকারীর

ধানমন্ডিতে ৩৯ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগে গ্রেপ্তার ৩