Published : 07 Mar 2026, 09:02 AM
ঠিক তিন বছর আগের এক বিকালে তীব্র বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে ঢাকার সিদ্দিকবাজারের একটি ভবন; প্রাণ যায় ২৬ জনের।
নর্থসাউথ রোডের সাততলা ‘ক্যাফে কুইন’ ভবনের সেই বিস্ফোরণে দুটি তলা ভেঙে নিচে পড়ে যায়। ভবনের ২৪টি কলামের মধ্যে ৯টিসহ স্ল্যাব-বিম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ভবনে থাকা বিভিন্ন দোকানের কর্মচারীদের পাশাপাশি প্রাণ হারান রাস্তায় থাকা যানবাহনের যাত্রী ও পথচারীও। ঘটনার দিনই বিস্ফোরণের ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৭ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনার দুদিন পর ৯ মার্চ ‘অবহেলাজনিত মৃত্যুর’ অভিযোগে মামলা করেন বংশাল থানার এসআই পলাশ সাহা।
প্রথমে মামলার তদন্ত শুরু করে বংশাল থানা পুলিশ। এরপর ডিবি পুলিশের হাত ঘুরে তদন্তভার পায় কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট।
দুই বছর ৯ মাস পর গেল ডিসেম্বরে তিনজনকে অভিযুক্ত করে মামলার অভিযোগপত্র জমা দেন কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের বোম ডিসপোজাল ইউনিটের পরিদর্শক এস এম রাইসুল ইসলাম।
অভিযোগপত্রে উঠে আসে,কুইনস স্যানেটারি মার্কেটের ভবন মালিক ওয়াহিদুর রহমান ও মতিউর রহমান এবং সেনেটারি দোকানের মালিক আ. মোতালেব মিন্টুর ‘অবহেলা ও লোভের’ কারণে ওই ভবনে আন্ডারগ্রাউন্ডে গ্যাস জমে ভয়াবহ বিস্ফরেণ ঘটে।
সিটিটিসির দেওয়া অভিযোগপত্রটি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নাজমিন আক্তার গত ১৪ জানুয়ারি গ্রহণ করেন। এরপর বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়ায় মামলাটি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রে মো. মোস্তাফিজুর রহমানের কাছে পাঠানো হয়।
তিনি গত ২০ জানুয়ারি মামলাটি মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠিয়ে দেন। ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. আলমগীর হোসেনের আদালতে মামলার বিচার চলবে।
আগামি ১ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানির দিন রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারি শাহাদাৎ আলী।
ঘটনার দিনই গ্রেপ্তার হওয়া অভিযুক্ত তিনজন বর্তমানে জামিনে আছেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, রাইজার হয়ে মূল ভবনের গ্যাসের সংযোগ লাইন ভূমির উপরে দৃশ্যমান থাকার কথা। তবে তা না করে রাইজার থেকে লাইনটি মাটির নিচ দিয়ে নেওয়া হয়।
রাইসুল ইসলাম বলেন,"তিতাসের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে মাটি খুঁড়ে দেখা যায়, রাইজার থেকে ভবন পর্যন্ত বাণিজ্যিক সংযোগের দেড় ইঞ্চি ব্যাসের মোটা পাইপ বিচ্ছিন্ন না করেই আবাসিক সংযোগের পৌনে এক ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ যুক্ত করা হয়েছে।”
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ১৯৮২ সালে ভবনের মালিক ওয়াহিদুর রহমান ও মতিউর রহমানের বাবা রেজাউর রহমান প্রথম তিতাস গ্যাসের আবাসিক সংযোগ নেন। ১৯৮৩ সালে ওই ভবনে ‘ক্যাফে কুইন’ রেস্তোরাঁ যাত্রা শুরু করলে তিতাস গ্যাস থেকে একটি বাণিজ্যিক সংযোগ নেওয়া হয়।
এরপর ২০০২ সালে রেস্তোরাঁটি বন্ধ করে দিয়ে তিতাস গ্যাসে আবেদনের মাধ্যমের বাণিজ্যিক সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করা হয়। ২০০৪ সালে আবার ওই ভবনে আবাসিক ব্যবহারের জন্য গ্যাসের লাইন বর্ধিত করা হয়।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্টিবিউশন কোম্পানির নিয়ম অনুযায়ী কোনো সংযোগ নেওয়া হলে তিতাস থেকে শুধু রাইজার পর্যন্ত সংযোগ দেওয়া হয়।
রাইজার কিংবা রেগুলেটর থেকে ভবন পর্যন্ত গ্যাস সংযোগের কাজ ভবন মালিক নিজ দায়িত্বে তিতাসের নকশা অনুযায়ী তালিকাভুক্ত ঠিকাদারদের মাধ্যসে করে থাকেন।
কিন্তু ভবনটির গ্যাস সংযোগের অনুমোদিত নকশার সঙ্গে সাথে বাস্তবতার মিল পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ঘটনাস্থলে দেখা যায়, রাইজার থেকে আবাসিক সংযোগের গ্যাসের পাইপ মাটির নিচ দিয়ে নেওয়া হয়েছে।
তদন্তে দেখা গেছে, ভবন মালিক বাণিজ্যিক সংযোগের পাইপ না সরিয়ে তার সঙ্গে আবাসিক সংযোগের পাইপ বসিয়ে দেন। আর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে না দিয়ে তিনি কাজটি করান লোহার মিস্ত্রি দিয়ে।
তদন্তে দেখা যায়, রেজাউর রহমান ২০১১ সালে মারা গেলে তার দুই ছেলে ওয়াহিদুর রহমান এবং মতিউর রহমান ভবনটি দেখভালের দায়িত্ব নেন। কিন্তু তারা বাড়তি আয়ের আশায় অনুমোদন না নিয়েই ভবনের নকশা পরিবর্তন করে বেইজমেন্টে দোকানসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করেন।
আরেক আসামি মোতালেব মিন্টু ভবন মালিকের কাছ থেকে দোকান ভাড়া নিয়ে অনুমোদিতভাবে তাতে শীতাতাপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বসান।
‘আসামিদের এ ধরনের অবহেলা এবং অপরাধমূলক লোভী কর্মকাণ্ডের কারণে’ ওই ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডে গ্যাস জমে ভয়াবহ বিস্ফারণ ঘটে বলা তদন্তে উঠে আসে।
আসামিপক্ষের বক্তব্য
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের অ্যাডিশনাল পাবলিক প্রসিকিউটর মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন,"মামলাটি বদলি হয়ে আমাদের আদালতে এসেছে। অভিযোগ গঠন হবে। এরপর সাক্ষ্য শুরু হরে। সাক্ষীদের হাজির করে মামলার বিচার দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করব, যেন ভূক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পায়।”
মতিউর ও জাহিদুরের আইনজীবী আবুল আউয়াল বলেন,"মামলার অভিযোগপত্র এসেছে। দেখা যাক, কী করতে পারি। পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম শুরু হবে। আর উনারাও ভিকটিমাইজড, ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। ভবনটার ক্ষতি হয়েছে।
“ওই ঘটনার পর দীর্ঘদিন ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। এতে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তারপরও যেহেতু অভিযোগপত্র এসেছে, সামনে আইনি লড়াই চালিয়ে যাব।"
মোতালেব মিন্টুর আইনজীবী আনোয়ার হোসেন বলেন, “তিনি ৬০ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়েছিলেন। মাসে দোকান ভাড়া দিতেন ৫০ হাজার টাকা। তিনি ঋণ নিয়ে দুই কোটি টাকার মালামাল উঠিয়েছিলেন। এখানে তো কোনো অপরাধে নেই।”
তিনি বলেন,"সবকিছুর দায়ভার বাড়ির মালিকের। মোতালেব মিন্টু চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ওই দিনের বিস্ফোরণে তার নিকটাত্মীয়সহ তিনজন মারা যান। তাকে নির্দোষ প্রমাণ করতে আইনি লড়াই চালিয়ে যাব।"
এদিকে নিহতদের স্বজনেরা বিচারের দাবির পাশাপাশি ক্ষতিপূরণও দাবি করছেন।
ঘর সাজানোর স্যানিটারি পণ্য কিনতে সেদিন গুলিস্তানের সিদ্দিকবাজারে গিয়েছিলেন মোমিনুল ইসলাম এবং তার স্ত্রী নদী বেগম। কিন্তু বিস্ফোরণে দুজনই মারা যান।
মোমিনুলের চাচা আব্দুর রহিম বলেন,"যাদের কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে, তাদের সাজা চাই। ক্ষতিপূরণও দিতে হবে।"
পুরনো খবর
সিদ্দিক বাজারে বিস্ফোরণ: মৃত্যু বেড়ে ২৬
সিদ্দিক বাজার বিস্ফোরণ: 'ক্ষতিপূরণের' দুই লাখ টাকা পেল না কেউ