১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

রাজশাহীতে অস্ত্রধারী আওয়ামী লীগ নেতাদের হামলার বর্ণনা ট্রাইব্যুনালে দিলেন জসিম, চাইলেন ‘ফাঁসি’

গুলিবিদ্ধ আলী রায়হানকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াসহ সেসময়কার ঘটনার তিনটি ভিডিও এর একটি পেনড্রাইভ ট্রাইব্যুনালে জমা দেন তিনি।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 19 Aug 2025, 01:43 AM

Updated : 26 Aug 2026, 01:36 PM

এক বছর আগে সরকার পতনের দিন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে রাজশাহীতে আন্দোলনকারীদের ওপর ‘সশস্ত্র’ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নির্বিচার হামলা ও ‘গুলি করার’ বর্ণনা দিলেন জসিম উদ্দিন নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী।

রাজশাহী নগরীতে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট সংঘর্ষের সময়কার এক ছবিতে যাকে দুই হাতে রিভলবার নিয়ে গুলি করতে দেখা যায়, তাকে যুবলীগ নেতা রুবেল বলে তুলে ধরেন তিনি।

সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১ এ ওই দিনকার ঘটনা বর্ণনা করেন ৩৭ বছর বয়সী এই ব্যবসায়ী, যিনি ওইদিন ছাত্রজনতার সঙ্গে আন্দোলনে ছিলেন।

বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের এ ট্রাইব্যুনালে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং তখনকার আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এদিন তিনজনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়।

তাদের একজন জসিম পতনের দিন রাজশাহীতে হামলার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, রাজশাহী শহরে ১৫ জুলাই থেকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন তিনি। ধারাবাহিক এ আন্দোলনের মধ্যে সরকার পতনের দিন ৫ অগাস্ট সকাল ১০টায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেইট ও তালাইমারী চত্বরে পূর্বঘোষণা অনুযায়ী আন্দোলনকারীরা একত্রিত হন।

“আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেইট থেকে আন্দোলনকারীদের একটি মিছিল সাহেব বাজারের দিকে রওনা হয়। আমি নিজেও সে মিছিলে ছিলাম।”

তার অভিযোগ, ”মিছিলটি শাহ মখদুম কলেজ পার হয়ে স্বচ্ছ টাওয়ারে সামনে পৌঁছালে পশ্চিম দিকে কুমার পাড়া থেকে রাজশাহী পুলিশ কমিশনার, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন, রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা রকি কুমার ঘোষ, যুবলীগ নেতা অস্ত্রধারী রুবেল, রাজশাহী কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি রাশেক দত্তসহ অসংখ্য আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী, বোয়ালিয়া থানার তৎকালীন ওসি হুমায়ুনসহ অন্যান্য পুলিশ আমাদের শান্তিপূর্ণ মিছিলের উপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ, ককটেল এবং সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে ও দেশীয় অস্ত্র রামদা, কিরিচ ইত্যাদি দ্বারা তাদের উপর আক্রমণ করে।”

তার ভাষ্য, “রুবেলের হাতে রিভলবার ছিল। নারীসহ প্রায় শতাধিক আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা গুরুতর আহত হয়। তাদের আক্রমণে আমরা নিরস্ত্র আন্দোলনকারীরা পিছু হটতে বাধ্য হই। তখন সন্ত্রাসীরা পেছন থেকে হামলা চালায় এবং গুলি করে, ককটেল, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। সাউন্ড গ্রেনেডের অংশ আমার বাম পায়ে লাগে এবং আমি আহত হই। আমি আমার মোটরসাইকেলে উঠতে যাই। তখন ৪/৫ জন ছাত্রজনতা আন্দোলনের নেতা গুলিবিদ্ধ আলী রায়হানকে আমার দিকে নিয়ে আসছিল। 

”তাকে মোটরসাইকেলে করে বিকল্প পথে অনেকগুলো প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রেখে আমি আবার আন্দোলনে ফিরে আসি এবং জানতে পারি, শাহ মখদুম কলেজ এবং স্বচ্ছ টাওয়ারের পাশে শাকিব আনজুম নামের আরেকজন ছাত্র গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মরে পড়ে আছে।” 

আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের প্রতিবন্ধকতার কারণে তার লাশ কারও নিতে পারার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, “এরপর আমি দেখি শাকিব আনজুমের আত্মীয় স্বজনরা কিছুক্ষণ পর সেখানে এসে ভ্যান যোগে তার লাশ নিয়ে তালাইমারী শহীদ মিনারের নিকট তাদের বাড়িতে নিয়ে যায়।”

পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ আলী রায়হান মারা যান বলে ট্রাইব্যুনালকে বলেন জসিম।

গুলিবিদ্ধ আলী রায়হানকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াসহ সেসময়কার ঘটনার তিনটি ভিডিও সম্বলিত একটি পেনড্রাইভ তিনি ট্রাইব্যুনালে জমা দেন। পরে সেগুলো ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শিত হয়। 

ওই সময় দুই হাতে দুটি অস্ত্রসহ যুবলীগ নেতা রুবেলসহ আরও অনেক আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ নেতাকে শনাক্ত করেন তিনি। সাক্ষী নিজেকে এবং তার মোটরসাইকেল, সশস্ত্র হামলারত পুলিশ এবং আলী রায়হানকে আহত অবস্থায় শনাক্ত করেন। 

এ সময় তিনি রুবেলকে শনাক্ত করে বলেন, “দুই হাতে রিভলবার হাতে দাঁড়ানো এটি যুবলীগ নেতা রুবেল।”

নিরীহ নিরস্ত্র ছাত্র জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দমন করতে দেশব্যাপী ’হত্যাকাণ্ড, আহত ও ক্ষতির জন্য’ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক মহাপুলিশ পরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ডিএমপি এবং আরএমপির পুলিশ কমিশনার, রাজশাহীর তৎকালীন মেয়র খায়রুজ্জামান লিটনসহ অন্যান্য যাদের কথা বলেছেন তাদের ফাঁসি দাবি করেন তিনি।

আরও পড়ুন:

গুলিবিদ্ধ ভাইয়ের মৃত্যুর ভিডিও দেখে ট্রাইব্যুনালে কাঁদলেন বড় ভাই

ট্রাইব্যুনালে ছেলের লাশ পোড়ানোর ভিডিওকাঁদলেন বাবা