বাংলা গান নিয়ে গোলাম মুরশিদের ধারাবাহিক রচনা: টপ্পা
ধ্রুপদ অথবা খেয়ালের মতো টপ্পার কোনো আভিজাত্য নেই। ছোটো ঘরে তার জন্ম। বয়সেও কম। কিন্তু তেজ বেশি। গোটা উনিশ শতক জুড়ে এর বেশ প্রভাব ছিলো বাংলা গানের দরবারে। এমন কি, বিশ শতকের প্রথম ভাগেও, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের ওপর। আর, রবীন্দ্রনাথ তো একাই এক শো।
টপ্পার জন্ম কোথা থেকে, তাই নিয়ে নানা রকমের গালগপ্পো চালু আছে। কিন্তু এর উদ্ভাবক গোলাম নবী শোরী মিয়াঁ—এ নিয়ে বিশেষ কোনো বিতর্ক নেই। শুনে অবাক লাগে যে, উটের সঙ্গে এর একটা যোগাযোগ আছে। তাই বলে উটের ডাকের সঙ্গে নয়। যোগাযোগটা উটচালকদের সঙ্গে। উটের বহর নিয়ে যাবার সময়ে উটচালকরা এক রকম গান গাইতো। এ গান প্রচলিত ছিলো পাঞ্জাব আর সিন্ধু প্রদেশের উটচালকদের মধ্যে। আর শোরী মিয়াঁর দেশ ছিলো পাঞ্জাব। কাজেই তাঁর পক্ষে সেই গান থেকে টপ্পার ধারণা পাওয়া মোটেই অসম্ভব নয়। উর্বরমস্তিষ্ক পণ্ডিতদের কেউ কেউ আবার বলেছেন, এই উটচালকরা পাঞ্জাবের নয়—এরা আরব দেশের। উটের পিঠে পণ্য আর সওদাগরদের নিয়ে এরা গান গাইতে গাইতে আসতো ভারতবর্ষে।
এই গানে উটচালকরা প্রধানত প্রেম ও বিরহের কথা বলতো। যেমন, গাড়িয়াল ভাইরা উত্তরবঙ্গের নারীদের বিরহের কথা বলে। কিন্তু শোরী মিয়াঁ এ গানের বিষয়বস্তু দিয়ে কতোটা প্রভাবিত হয়েছিলেন, বলা যাচ্ছে না। তবে নিশ্চিতভাবে তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন উটচালকদের গলা কাঁপিয়ে গান গাইবার বিশেষ ভঙ্গি দিয়ে। শোরী মিয়াঁ এমনিতে খেয়াল গান গাইতেন। খেয়াল হলো তান-প্রধান গান। আর তিনি দ্রুত তান দিতে খুব পছন্দ করতেন। তাই উটচালকদের গলা কাঁপিয়ে গান করার ভঙ্গিটা তাঁর মনে ধরেছিলো। তিনি গলা-কাঁপানোর কৌশল প্রয়োগ করে খেয়াল থেকে টপ্পা উদ্ভাবন করেন।
টপ্পা নামটা এলো কোথা থেকে? ভারতীয় পাঞ্জাবের বার্নালা জেলায় টপ্পা নামে একটি ছোটো শহর আছে। অনেকের মতে, সেই শহরের নাম থেকে এসেছে এ গানের নাম। কিন্তু কারও কারও মতে, শহরটার নাম টপ্পা নয়—টপা। কারও আবার ধারণা, নামটা এসেছে 'ধাপা' শব্দ থেকে। মোট কথা, টপ্পা কথাটা কোথা থেকে এসেছে, ঠিক জানা যায় না। তবে বনেদি ভাষা সংস্কৃত অথবা ফারসি থেকে নয়। আগেই বলেছি, টপ্পার জন্ম অভিজাত পরিবারে নয়।
পাঞ্জাবের লোক হলেও শোরী মিয়াঁ তাঁর টপ্পা গান আবিষ্কার করেন লাখনৌতে বসে। আসফ-উদ-দৌলা নবাব হওয়ার পর (১৭৭২-১৭৯৫) শোরী মিয়াঁ তাঁর সভা-গায়ক হন। তারপর দ্রুত এ গানের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। এ সময়ে রামনিধি গুপ্ত ওরফে নিধুবাবু বিহারের ছাপরা কালেক্টরিতে কেরানীর কাজ করতেন। তাঁর জন্ম হুগলিতে, ১৭৪১ সালে। কিন্তু পৈতৃক নিবাস কলকাতার কুমারটুলিতে। সেই সুবাদে তিনি লেখাপড়ার ভালো সুযোগ পেয়েছিলেন। তখনও ইংরেজ রাজত্ব শুরু হয়নি। রাজভাষা ছিলো ফারসি। তিনি বাংলা ছাড়া সংস্কৃত এবং ফারসি শেখেন। এমন কি, এক মিশনারির কাছ থেকে খানিকটা ইংরেজিও শেখেন। সেই সূত্রেই কালেক্টরিতে কাজ পেয়েছিলেন। এ কাজে তিনি যোগ দিয়েছিলেন ১৭৭৬ সালে।
শোরী মিয়াঁ মারা যাবার দু বছর পরে, ১৭৯৪ সালে, নিধুবাবু ছাপরা থেকে কলকাতায় ফিরে আসেন। সেখানে তিনি টপ্পা গানের প্রচলন করেন। তখন কলকাতার লোকেদের কাছে টপ্পা কথাটা প্রায় অজানা ছিলো। অনেকের ধারণা যে, নিধুবাবু শোরী মিয়াঁর কাছ থেকে টপ্পা গান শিখে এসেছিলেন। কিন্তু কথাটা ঠিক নয়। কারণ ছাপরা থেকে লাখনৌয়ের দূরত্ব ঠিক আড়াই শো মাইল। তখনও ভারতবর্ষে রেলগাড়ি ছিলো না। ভারতবর্ষে কেন, বিশ্বের কোথাও ছিলো না—কারণ রেলগাড়ি তখনও আবিষ্কারই হয়নি। ছাপরা থেকে লাখনৌ যাওয়া কয়েক দিনের ব্যাপার ছিলো। নিধুবাবুর পক্ষে শোরী মিয়াঁর শিষ্য হওয়া তাই সম্ভব ছিলো না। তবে মাঝেমধ্যে লাখনৌতে গিয়ে শোরী মিয়াঁর গান শুনে আসা সম্ভব।
বস্তুত, বঙ্গদেশে টপ্পা প্রচলনের প্রথম কৃতিত্ব নিধুবাবুর নয়, সে কৃতিত্বের দাবিদার কালী মীর্জার। তাঁর আসল নাম কালিপদ চট্টোপাধ্যায় (আনু ১৭৫০-১৮২০)। তিনিও শোরী মিয়াঁর শিষ্য ছিলেন না। তবে তাঁর ওপর শোরী মিয়াঁর প্রভাব পড়েছিলো। সে কথায় পরে আসছি। তাঁর জন্ম কলকাতায় নয়, হুগলির এক গ্রামে। বালক বয়সে তিনি সংস্কৃত, ফারসি ও বাংলা শেখেন। উনিশ বছর বয়সে বারাণসীতে যান সংস্কৃত এবং দর্শন শিখতে। কতো দূর শিখেছিলেন, জানা যায় না। তবে সেখানে গান শিখতে শুরু করেন এক ওস্তাদের কাছে। এই ওস্তাদ আবার টপ্পা শিখেছিলেন শোরী মিয়াঁর সবচেয়ে নাম-করা শিষ্য ওস্তাদ মিয়াঁ গুম্বারের কাছে। অতঃপর কালিপদ যান লাখনৌ শহরে। সেখানে গিয়েছিলেন সম্ভবত শোরী মিয়াঁর কাছে টপ্পা শিখতে। তবে তিনি শোরী মিয়াঁর শিষ্য হয়েছিলেন বলে কেউ লেখেননি।
লাখনৌ থেকে কালিপদ দিল্লিতে যান। লাখনৌ এবং দিল্লিতে কতোদিন ছিলেন, তাও আমাদের জানা নেই। তবে বারাণসী, লাখনৌ আর দিল্লি মিলে মোট বছর বারো পশ্চিমে বসবাস করে তিনি দুটি জিনিশ আয়ত্ত করেছিলেন। তিনি হুগলিতে ফিরে আসেন সেই দুটি জিনিশ নিয়ে—চলনে-বলনে, পোশাকে-আশাকে, খানা-পিনায় পশ্চিমা মুসলমানী সংস্কৃতি, আর শাস্ত্রীয় সংগীত নিয়ে। তাঁর ফেরার সময় ১৭৮০-র দশকের প্রথম দিকে।
নিজের গ্রামে ফিরে আসার পরও তিনি পশ্চিমের টান এড়াতে পারেননি। তাই পুব দিকে কলকাতায় না-গিয়ে তিনি যান পশ্চিম দিকে, বর্ধমানে। সেখানে তিনি রাজার দরবারে গায়ক হন। ওস্তাদ ছাড়া এ সময়ে তিনি পরিচিত হন কালী মীর্জা নামে। নামটা ওপর থেকে বর্ধমানরাজ দিয়েছিলেন, নাকি তিনি যাদের মধ্যে বাস করতেন, সেই সাধারণ মানুষরা দিয়েছিলো, বলতে পারবো না। তবে নামটা বিশেষ গৌরব অথবা সত্যিকার খ্যাতি নিয়ে আসেনি। অবশ্য এই নামকে সম্বল করেই তিনি অবশেষে কলকাতায় বাসা বাঁধেন। রামমোহন রায়-সহ কয়েকজন নাম-করা লোক তাঁর শিষ্যত্বও বরণ করেন। কিন্তু ততোদিনে নিধুবাবুর নাম হয়ে গেছে বঙ্গদেশে টপ্পা গানের প্রবর্তক হিসেবে। শুধু টপ্পা গানের নয়, মার্জিত আখড়াই গানের প্রবর্তক হিসেবেও—টপ্পা ১৭৯৪ সালে আর হাফ আখড়াই ১৮০৪ সালে।
কালী মীর্জা নাকি চার শোরও বেশি টপ্পা রচনা করেছিলেন। তা সত্ত্বেও টপ্পার রাজা হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন নিধুবাবু। মৃত্যুর আগে প্রকাশিত নিধুবাবুর একমাত্র গানের সংকলন 'গীতরত্নে' গান ছিলো দেড় শোরও কম। কম গান রচনা করেও বেশি খ্যাতি লাভের কারণ কী? আপাতদৃষ্টিতে কারণ হলো: নিধুবাবুর গানে কাব্যগুণ ছিলো বেশি। বিষয়বস্তুও আকর্ষণীয়। তাঁর গানের বিষয়বস্তু ছিলো, যা চিরদিন পাঠক-শ্রোতাদের আকৃষ্ট করে এসেছে—প্রেম ও বিরহ।
নিধুবাবু কলকাতায় ফেরার পর এক বাইজির প্রেমে পড়েছিলেন। ছোট্টো নাম তাঁর, কিন্তু সে নাম চিরন্তন নারীর প্রতীক—'শ্রীমতী'। রূপবতী এবং নানা গুণে গুণান্বিতা। নিধুবাবুর বহু গান রচনার পেছনে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিলো শ্রীমতীর সৌন্দর্য আর তাঁর প্রতি নিধুবাবুর ঐকান্তিক প্রেম। ঈশ্বর গুপ্ত তাঁর কবিজীবনীতে এ সম্পর্কে লিখেছেন যে, রোজই রাতের বেলা নিধুবাবু তাঁর কাছে যেতেন এবং সেখানে গান-বাজনা হতো। এমন একদিন তিনি রচনা করেছিলেন তাঁর একটি বিখ্যাত গান:
ভালবাসিবে বলে ভালবাসিনে
আমার স্বভাব এই
তোমা বই আর জানিনে
বিধু মুখে মধুর হাসি
দেখতে বড় ভালবাসি
সেই তোমারে দেখতে আসি
দেখা দিতে আসিনে
মধ্যযুগের কাব্যের দিকে তাকালে সর্বত্র তার একটি বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই: তার বিষয়বস্তু ধর্মীয়, দেবদেবীকে নিবেদিত। কোনো কবি ব্যক্তিগত প্রেমের কথা লিখতে গেলেও তা লিখতেন দেবদেবীর ভনিতায়। যেমন, বৈষ্ণব পদাবলীতে নিজে কৃষ্ণ সেজে প্রেমিকাকে রাধা সাজিয়ে নিজের গোপন কথাটি নিবেদন করতেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর তুলনাহীন ভাষায় যা বলেছেন: দেবতারে যাহা দিতে পারি, দিই তাই / প্রিয়জনে—প্রিয়জনে যাহা দিতে পাই / তাই দিই দেবতারে। নিধুবাবুর সবচেয়ে বড়ো অবদান, তিনি বাংলা সাহিত্যে ইহলৌকিকতা নিয়ে আসেন। এমন কি, স্বদেশের প্রতি ভালোবাসাও দেখতে পাই তাঁর রচনায়। বাংলা ভাষার প্রতি তিনি যে ভালোবাসা দেখিয়েছেন, তা একেবারে নতুন নয়। তাঁর আগে, ধরা যাক, আবদুল হাকিমের রচনায় তা দেখা যায়। কিন্তু নিধুবাবু তা জানতেন না। এমন কি, তিনি আবদুল হাকিমের নামও জানতেন না। বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর প্রেম স্বতঃস্ফূর্ত, তিনি তা নতুন করে প্রকাশ করেন: নানান দেশের নানান ভাষা / বিনে স্বদেশী ভাষা / মিটে কি আশা!
টপ্পা গানেও তাঁর মৌলিক অবদান ছিলো। আগেই বলেছি, শোরী মিয়াঁর আকর্ষণ ছিলো উটচালকদের দ্রুত গতির তানের প্রতি। তাই থেকেই তিনি খটকা, জমজমা, গিটকিরি ইত্যাদি অলংকার দিয়ে দ্রুত গতির তান লাগিয়ে টপ্পা গান উদ্ভব করেন। কিন্তু নিধুবাবু টপ্পা গানের বঙ্গীয়করণ করেন তানের গতি কমিয়ে দিয়ে। তার ফলে টপ্পা গান গাওয়া সহজ এবং জনপ্রিয় হয়। তবে জনপ্রিয়তার বড়ো কারণ টপ্পা গানের বিষয়বস্তু: প্রেম। কালে কালে টপ্পা গানের প্রেম অশ্লীলতায় পরিণত হয়। শুচিবাইওয়ালা লোকেরা তাই টপ্পার নাম শুনলেই সেখান থেকে দূরে থাকতেন, নাক সিটকাতেন।
টপ্পার আর-এক বিকার ঘটেছিলো। আপাত-সিরিয়াস সুরের মধ্যে ইংরেজি শব্দ, এমন কি, ইংরেজি বাক্য মিশিয়ে তাকে হাসির গানে পরিণত করা। রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে এ রকম কয়েকটা গান এখনও শোনা যায়। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ও টপ্পা দিয়ে হাসির গান রচনা করেছিলেন।
অধঃপতন থেকে ট্প্পাকে নতুন করে জাতে ওঠান, বাঙালিরা সক কথাতেই যাঁর দোহাই দেয়—সবে ধন নীলমণি, সেই রবীন্দ্রনাথ। সময়টা উনিশ শতকের শেষ দশক। টপ্পা তার যাত্রা শুরু করেছিলো প্রেমের সওদা নিয়ে। সেখান থেকেও রবীন্দ্রনাথ তাকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তিনি দেশাত্মবোধক এবং পূজাপর্বের গানও রচনা করেছেন টপ্পা দিয়ে। তাঁর টপ্পার চলনও তাঁর আগেকার টপ্পা-রচয়িতাদের টপ্পার তুলনায় ঢিমা লয়ের।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাকে টেনে তুললেও, টপ্পা সেই উচ্চতায় থাকেনি। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ও তাকে ধরে রাখতে পারেননি। এমন কি, টপ্পার জন্মস্থান লাখনৌ-প্রবাসী অতুলপ্রসাদ সেনও। আর, নজরুল ইসলাম কমবেশি তিন হাজার গান রচনা করলেও এবং 'যাহা কিছু মম আছে প্রিয়তমে'র মতো একটি অলৌকিক টপ্পা রচনা করলেও, টপ্পা তাঁর হৃদয় কাড়েনি। দ্বিতীয় বার মৃত্যু বরণ করে টপ্পা প্রমাণ করলো যে, সে সত্যিই মরেছে।
