“যে- দেশে বাকস্বাধীনতা নেই, চিন্তার স্বাধীনতা নেই, অধিকার নেই, যেখানে কয়েকটি দুর্বৃত্ত সর্বশক্তিমান, সেখানে উৎকৃষ্ট প্রতিভা জন্ম নেয়া দূরের কথা, একটি ভালো চর্মকারও জন্ম নিতে পারে না।”
Published : 12 Aug 2023, 12:00 PM
হমায়ুন আজাদ যদি এখনো বেঁচে থাকতেন তাহলে পাগল হয়ে যেতেন। তার মতো সংবেদনশীল এবং সমাজ-রাষ্ট্র সম্পর্কে সচেতন ও দায়িত্ববান মানুষের পক্ষে এ-সময়ে সুস্থভাবে টিকে থাকাটা দুরূহ হয়ে যেত। হয়তো তিনি চিৎকার করে উঠতেন, ক্ষোভে ফেটে পড়তেন, নিজের হাত নিজেই কামড়াতেন, অসহায়ের মতো আর্তনাদ করতেন, কিংবা, একেবারেই চুপ হয়ে যেতেন, অন্ধ ও বধির সেজে ঘরে বন্দি হয়ে থাকতেন, গর্জাতেন বা গোঙাতেন, কিন্তু, আমাদের মতো চুপচাপ সব সয়ে যেতে পারতেন না।
আমাদের সব সয়ে গেছে, গায়ে-গতরে-মনে-মগজে। সব দেখেও এখন আমরা না দেখার ভান করি। কানে তো তালা দিয়েছি কবেই। তা না-হলে আমরা উন্মাদ হই না কেন? আমরা তো সবাই সুস্থ-স্বাভাবিকই আছি, তাই না? যদিও হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, ‘বদমাশ হওয়ার চেয়ে পাগল হওয়া ভালো।’
অথচ এ-দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি-রাজনীতি-অর্থনীতি সবই আজ সমূলে একযোগে ধ্বংস হচ্ছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন ছাড়া আর কিছু হচ্ছে বলে কেউ দাবি করতে পারবে না। সবকিছুর কথা বাদ, সম্প্রতি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মহোদয় যে-অমিয় বানী প্রসব করেছেন, যে, ‘দুর্নীতি আছে বলেই দেশ উন্নতি হচ্ছে’, এ-কথা শুনলেই তো হুমায়ুন আজাদের মাথা খারাপ হয়ে যেত।
এ-কথা যে কোনো ব্যক্তির অভিরুচির প্রকাশ তা কিন্তু না, এটাই আমাদের বর্তমান শিক্ষাদীক্ষা ও সাংস্কৃতিক মানদণ্ড। এর চেয়ে গুরুগম্ভীর, জ্ঞানমার্গের কথা বলার যোগ্যতাই এখন আমাদের নাই। আমাদের মস্তিষ্কভর্তি এখন গোবর। হুমায়ুন আজাদ তো দীর্ঘকাল প্রতিক্রিয়াশীলদের বিরুদ্ধে কথা বলে গেছেন, এখন মাথাগরম হওয়ার জন্য প্রতিক্রিয়াশীলদের কথাও শুনতে হয় না, প্রগতিশীল বলে যারা এক সময় চিহ্নিত ছিলেন তাদের কথা শুনলেও আক্কেলগুড়ম অবস্থা হয়।
এর জন্য ব্যক্তিবিশেষ কাউকে দোষ দিয়ে লাভ নাই। সামগ্রিক পরিস্থিতিটাই ভয়াবহ, পশ্চাদপদ। ক্রমশ আমরা পেছন দিকেই যাচ্ছি। এ-জাতি টিকবে কি-না তা-ই নিয়েই হুমায়ুন আজাদ শংকা প্রকাশ করেছিলেন। প্রায় পঁচিশ বছর আগে এক গল্পে তিনি এ-জাতি ধ্বংসের আলামত প্রকাশ করেছিলেন। ‘আমরা যেভাবে টিকে থাকার চেষ্টা করছি’ নামে তিনি একটা ভয়াবহ গল্প লিখেছিলেন। গল্পের কিছু অংশ উল্লেখ করছি, “আমরা কি টিকে থাকবো, না কি ধ্বংস হয়ে যাবো?-- এমন শীতল সন্দেহ অনেক দিন ধ’রেই ঘন হয়ে উঠছে আমাদের মনে। ঠিক জানি না কতো দিন কতো বছর ধ’রে এটা জমছে, তবে সন্দেহটা যখন তখন উচ্চারিত হ’তে শুনেছি আমার সহজ সরল বাবার মুখে, এবং বাবার কাছে শুনেছি তাঁর বাবা চাচা ও মুরুব্বিরা মাঝেমাঝেই এ-সন্দেহ প্রকাশ করতেন। আমার সন্দেহ হয় বাবার বাবার বাবাও মাঝেমাঝেই প্রকাশ করতেন এ-সন্দেহ। আমি যে সন্দেহটি শুধু বাবার মুখেই শুনেছি, তা নয়; ছেলেবেলায় যে-নাপিতের দুই হাঁটুর ভেতরে মাথা গুঁজে দিয়ে চুল ছাঁটতাম, যার ভেজা লুঙ্গি ও ঘামের গন্ধে আমার দম বন্ধ হয়ে আসতো, তার মুখে শুনেছি, আমার কানের কাছে কাঁচি ক্যাচক্যাচ করতে করতে সে নিজেই নিজেকে শোনাতো যে ‘এই জাইতটা টিকব না’; সন্দেহটা আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হেডমাস্টারের মুখেও শুনেছি-- মাসে একবার তিনি থানায় শিক্ষা অফিসারের কাছে একটা রুইমাছ নিয়ে যেতেন, এবং ফিরে কয়েক দিন ধ’রে সন্দেহটা প্রকাশ করতে থাকতেন; এমন কি ‘জলকাসন্দ কিংবা দই’ বিক্রি করতে আসতো যে-কালিপদ আমাদের বাড়িতে, তার মুখেও শুনেছি এ-জাতটি আর টিকে থাকবে না। কোনো সন্দেহ যখন ধারাবাহিক ও ঐতিহাসিক হয়ে ওঠে, তখন সেটা সম্পর্কে সন্দেহ করার কারণ থাকে না, আমিও করি নি।”
গল্পে-কবিতায় কিছু অতি উচ্চারণ, প্রতীকি ব্যাপার থাকে, কিন্তু, কথা হচ্ছে কেন একজন লেখক বা কবির মনে এমন সন্দেহ দেখা দেয়-- তার জাতি আর টিকবে না!
এ-জাতির সৃজনীশক্তি যে আর বিকশিত হবে না তা বোধহয় স্বাধীনতার পর থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। সৃজনীশক্তি মানে শুধু কতিপয় কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীর গল্প-উপন্যাস-গান-কবিতা-চিত্রকলা না, একটা জাতির সৃজনীশক্তির প্রকাশ হয় তার বিজ্ঞান-যুক্তি-গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়েও। আবার গণতান্ত্রিক চর্চা কেবল ভোটের রাজনীতির মধ্যেও সীমাবদ্ধ না, তা একটা জাতির প্রতিটি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই পালিত, চর্চিত, অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু, আজকে এ- দেশে যে-কোনো প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিই একজন স্বৈরশাসক। যুক্তিবোধের কোনো বালাই নেই। জোর যার মল্লুক তার। ক্ষমতার দাপটই হয়ে গেছে একমাত্র সত্য। এ-কথা কেউ বলতে পারবে না যে আমাদের সমাজের কোথাও আজ সুন্দরের চর্চা হচ্ছে, সহনশীলতার চর্চা হচ্ছে। গত পঞ্চাশ বছরে তা হয়েছে বলেও মনে হয় না। দীর্ঘ সামরিক শাসনামলে যেমন এ-দেশের মননশীল চর্চাগুলো পদদলিত করা হয়েছে, আজও তা বহাল তবিয়তেই আছে। সামরিক শাসনের প্রেক্ষাপটে হুমায়ুন আজাদ লিখেছিলেন ‘ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল’ (১৯৯৪) উপন্যাসটি। ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল উপন্যাসের নায়ক রাশেদ, তার বাল্যকাল আর যৌবন নষ্ট হয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানী সামরিক গ্রাসে, বহুবছর পর তার পাঁচ বছরের কন্যা যখন স্কুলে যায় তখনও সে মুখোমুখি হয় মিলিটারির বন্দুকের; একই সময় ফিরে এসেছে বহু বছরের ব্যবধানে। রাশেদের কাছে প্রশ্ন দেখা দেয় তাহলে এত এত সংগ্রাম, আন্দোলন,স্বাধীনতার কী অর্থ! রাশেদ দেখতে পায় ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়ে আজও প্রতিটি মানুষ বিপন্ন। সামরিক শাসন গেছে, গণতান্ত্রিক পরিবেশ এসেছে, কিন্তু, সেই বিপন্নদশা দূর হয়নি।
২০০৩ সালে মনের দুঃখে, অসহায় হুমায়ুন আজাদ একটা বই লিখেছিলেন। বইটির নাম ‘আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম’। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশের একটা ধারাবাহিক বর্ণনা তিনি দিয়েছেন এ-বইতে। বইয়ের শুরুতেই তিনি লিখেছিলেন, “এ-বইটি হয়তো আমি কখনোই লিখতাম না। এটি লেখার কথা আমার মনে আসতো না, যদি না আমি এখন এ-পরিস্থিতিতে--উদ্ধারহীন, শ্বাসরুদ্ধকর, বদ্ধ অন্ধকারে বাস করতাম। ...
কখনোই অবশ্য ভালো ছিলাম না। যে-মুক্ত, স্বাধীন, সৎ, ব্যক্তির পূর্ণ অধিকারসম্পন্ন, গণতান্ত্রিক দেশে বাসের স্বপ্ন দেখেছি, তা কখনো পূরণ হয় নি; দশকের পর দশক দুঃসহ অবস্থায় বাস ক’রে ক’রে এখন দুঃসহতম অবস্থায় পৌঁছে গেছি। বাস করছি ভয়ের জলবায়ুতে। এখানে শান্তিতে বাস করা যায় না; স্বস্তিতে কোনো সৃষ্টিশীল কাজ করা যায় না।...
রাষ্ট্র আমাদের খাদ্য বস্ত্র বাসস্থান শিক্ষা চিকিৎসার ব্যবস্থা তো করেই নি, এমন কি নিরাপত্তার ব্যবস্থাও করে নি; বরং রাষ্ট্রই হয়ে উঠেছে হিংস্র; আমাদের জন্যে চব্বিশ ঘন্টার আতঙ্ক। রাষ্ট্র দ্বারা আমাদের দেহ বিকল, মনও আক্রান্ত, মগজ বিনষ্ট। দেহ-মন-মগজে আক্রান্ত সন্ত্রস্ত অবস্থায় বাস করা মৃত্যুর থেকেও পীড়াদায়ক।...
প্রতিহিংসা ও পীড়ন হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রনীতি।...
যে- দেশে বাকস্বাধীনতা নেই, চিন্তার স্বাধীনতা নেই, অধিকার নেই, যেখানে কয়েকটি দুর্বৃত্ত সর্বশক্তিমান, সেখানে উৎকৃষ্ট প্রতিভা জন্ম নেয়া দূরের কথা, একটি ভালো চর্মকারও জন্ম নিতে পারে না।”
বিশ বছর পার হয়েছে বইটি প্রকাশের পর, সামগ্রিক পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়েছে বলা যাবে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বরং আরো খারাপ হয়েছে। এবং অদূর ভবিষ্যতেও এ-পরিস্থিতি আমরা কাটিয়ে উঠতে পারবো বলে মনে হয় না।
আরেকটি নির্বাচন আসছে, জনগণ আতংকে দিশাহারা। কোনদিকে যাবে তারা! জলে কুমির ডাঙ্গায় বাঘ। পরিস্থিতি এখন উভয় দিকে আগুনগরম।
‘আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম’ বইয়ের শুরুতে হুমায়ুন আজাদ একটা অসামান্য কবিতা লিখেছিলেন। আজও সেই কবিতাটা সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। আমাদের সবার হাহাকার, আর্তনাদ এই কবিতাটার মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে। পুরো কবিতাটাই নিচে উল্লেখ করছি: