হোম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড: মর্ত্য-মানবের অমর্ত্য আত্মকথা

অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিক অমর্ত্য সেন-এর Home in the World বই নিয়ে প্রাবন্ধিক অনুবাদক আলম খোরশেদের আলোচনা

আলম খোরশেদআলম খোরশেদ
Published : 8 August 2022, 08:07 AM
Updated : 8 August 2022, 08:07 AM

আত্মজৈবনিক সাহিত্যপাঠে বরাবরই আমার আগ্রহ অসীম। আর সেটি যদি হয় নোবেলবিজয়ী অমর্ত্য সেনের মতো বিদগ্ধ অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, গবেষক, সমাজচিন্তক, বহুদর্শী একজন বাঙালি ও বিশ্বমানবের, তাহলে তো কথাই নেই। তো, সেই সুযোগটিই করে দিলেন সম্প্রতি আমার বহুদিনের বন্ধু একজন সর্বগ্রাসী গ্রন্থসুহৃদ, তাঁর পাঠসমাপ্তির অব্যবহিত পরই Home in the World নামক অমর্ত্য সেনের সম্প্রতি-প্রকাশিত, রয়েল সাইজের প্রায় সাড়ে চারশত পৃষ্ঠার ঢাউস আত্মজীবনী গ্রন্থটি আমার হাতে সোপর্দ করে।

বইটি হাতে পাওয়া মাত্রই পড়তে শুরু করে দিয়েছিলাম অন্যসব পাঠবস্তুকে দূরে সরিয়ে রেখে। তারপর তো আর সেই বই হাত থেকে নামিয়ে রাখার কোনো উপায় ছিল না, এমনই অমোঘ আকর্ষণ তার! অমর্ত্য সেনের ইংরেজি ভাষার শক্তি ও সৌন্দর্য, লিখনভঙ্গি, শৈলী, রসবোধ ও বুদ্ধির দীপ্তি যেমন, তেমনি তাঁর অভিজ্ঞতার বিস্তার, জ্ঞানের গভীরতা, প্রজ্ঞার পরিধি, মানবিকতার বোধ, রাজনীতি-অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে মৌলিক চিন্তাক্ষমতা। সব মিলিয়ে, সুন্দর, সজ্জন,সংস্কৃতিবান, পরিশীলিত একটি মন ও মননের ছটায় উজ্জ্বল এই বইয়ের আদ্যোপান্ত।

কী নেই এতে! পুরনো ঢাকার বাল্যস্মৃতি; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পিতার সঙ্গে একেবারে শৈশবেই মায়ানমার গমন ও সুশোভন মান্দালয় শহরে বাস; পূর্ববাংলার নদীপথে ভ্রমণের মেদুর ও মায়াময় বর্ণনা, রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিধন্য শান্তিনিকেতনে, মাতামহ বিখ্যাত পণ্ডিত ক্ষিতিমোহন সেনের তত্ত্বাবধানে আনন্দময় বিদ্যাভ্যাস; প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় একেবারে যুবাবয়সেই মুখগহ্বরের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া ও প্রায় অলৌকিকভাবে সেরে ওঠার গল্প থেকে শুরু করে কলকাতা ও কেমব্রিজে অর্থনীতি, গণিত ও দর্শনশাস্ত্রে উচ্চতর শিক্ষাগ্রহণ; যাদবপুর, দিল্লি, হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড, এমআইটি, বার্কলে, কর্নেল, লন্ডন স্কুল অভ ইকনমিক্সের মতো খ্যাতনামা সব বিশ্ববিদ্যাপীঠে শিক্ষকতা ও গবেষণার মূল্যবান অভিজ্ঞতা সঞ্চয়; পিয়েরো স্রাফা, মরিস ডব, জোয়ান রবিনসন, পল স্যামুয়েলসন, কেনেথ অ্যারো, জন রল্স, মেঘনাদ দেশাই, মাহবুবুল হক, রেহমান সোবহান প্রমুখ জগদ্বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ, দার্শনিক ও সমাজচিন্তকদের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য ও বন্ধুতালাভের মতো অসংখ্য দুর্লভ, নাটকীয় ও অভাবনীয় সব ঘটনার সুখপাঠ্য স্মৃতিচারণে ঠাসা এর পৃষ্ঠাসমূহ।

লেখার শুরুতে ছোটবড় মোট ছাব্বিশটি অধ্যায়ে বিভক্ত বইটির কয়েকটি প্রণিধানযোগ্য অধ্যায়ের শিরোনাম উল্লেখ করছি: The Rivers of Bengal, School Without Walls, A World of Arguments, The Last Famine, Bengal and the Idea of Bangladesh, Britain and India, What to Make of Marx, What Economics?, Where is Europe?, American Encounter, Cambridge Re-examined, Near and Far। এ থেকেই বোদ্ধা পাঠক সহজে অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন এই মহাগ্রন্থের বিষয়বস্তুর বিস্তৃতি ও গভীরতা, স্থানিকতা ও বৈশ্বিকতা, ব্যক্তিক ও বিদ্যায়তনিক মাত্রা এবং গ্রন্থকারের জীবনদর্শন আর বিশ্ববীক্ষার উচ্চতা ও ঐশ্বর্যকে।

এই বইয়ের একটি বড় আকর্ষণ, অমর্ত্য সেনের অসাধারণ রসবোধ, সূক্ষ্ম শ্লেষ এমনকি নিজেকে নিয়ে রসিকতা করার ক্ষমতা। প্রসঙ্গত, গ্রন্থের মুখবন্ধে তিনি সুবিখ্যাত ইরানি পণ্ডিত আল-বেরুনি রচিত ভারতবর্ষের অমর ইতিহাসগ্রন্থ ’তারিখ আল হিন্দ’ থেকে একটি উদ্ধৃতি প্রদানের মাধ্যমে তাঁর এই আত্মজীবনী রচনার কারণ ব্যাখ্যা করেন। সেটি একদিকে যেমন অত্যন্ত অকর্ষণীয় ও চমকপ্রদ, অন্যদিকে তাঁর সুগভীর জীবনবোধ ও সত্যনিষ্ঠার পরিচায়ক। বইয়ের ভূমিকার সেই মজাদার, মূল্যবান অংশটুকু এখানে উদ্ধৃত করার লোভ সংবরণ করা গেল না: This fondness however did not prevent him from teasing them a little. ”Indian Mathematics is very good,“ Al Beruny says, ”but the most unusual gift Indian intellectuals have is something quite different. It is their ability to talk eloquently on subjects about which they know absolutely nothing.” Would I be proud of that gift if I had? I don’t know. But perhaps I should begin by talking about things I do know. This memoir is a small attempt to do just that. Or, at least to talk about the things I have experienced, whether or not I actually know them.

(তাঁর এই প্রীতি অবশ্য তাঁকে ভারতীয়দেরকে নিয়ে কিঞ্চিৎ মশকরা করা থেকে নিবৃত্ত করেনি। ”ভারতীয় গণিত খুবই ভালো,” আল বেরুনি বলেন,“তবে ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের সবচেয়ে অসাধারণ যে গুণটি রয়েছে সেটি খুবই আলাদা ধরনের। এটি হচ্ছে, কোনোবিষয়ে বিন্দুমাত্র কিছু না জেনে তা নিয়ে তাদের অনর্গল কথা বলতে পারার ক্ষমতা।” আমার যদি সেই ক্ষমতা থাকত আমি কি তবে গর্বিত হতাম? আমি জানি না। তবে আমার সম্ভবত সেই বিষয়গুলো নিয়েই কথা বলা শুরু করা উচিত যা আমি জানি। এই স্মৃতিকথাটি তারই একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। অথবা, অন্তত সেই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করা যেগুলো সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা হয়েছে,তা সেসব সম্পর্কে আমি আদৌ জানি কি জানি না, বলতে পারি না।)

এই বইয়ের অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়,The Last Famine, যেখানে তিনি তার প্রতক্ষ্যদর্শীর অভিজ্ঞতার মর্মস্পর্শী বর্ণনা দেন, ১৯৪৩ সালে সংঘটিত বাংলার সেই মর্মান্তিক মন্বন্তরের। পাশাপাশি এই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণ অনুসন্ধানেও প্রবৃত্ত হন এবং এই সিদ্ধান্তে আসেন যে,এর জন্য মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি ও শাসনব্যবস্থাই দায়ী। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন,ভারতে ব্রিটিশদের শাসন শুরুও হয়েছিল এরকমই আরেকটি ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দিয়ে, ১৭৭০ সালে, যার ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষের করুণ মৃত্যু হয়েছিল। আর তাদের শাসনব্যবস্থার অবসানও হয়েছিল বস্তুত পরবর্তীকালের এই তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষের অভিঘাতেই, যার নেপথ্যে বিরাট ভূমিকা পালন করেছিলেন ’দ্য স্টেটসমেন’ পত্রিকার ইংরেজ সম্পাদক ইয়ান স্টিফেন্স। ব্রিটিশ রাজশক্তি তখন ফরমান জারি করেছিল প্রচারমাধ্যম তথা পত্রপত্রিকায় তাদের শাসনের কোনোপ্রকার সমালোচনা করা চলবে না। ইয়ান স্টিফেন্সও অনেকটা বাধ্য হয়ে সেই ডিক্রি মেনে নিয়েছিলেন, কিন্তু কলকাতার আকাশবাতাস যখন ক্রমে গ্রাম থেকে আসা লক্ষ লক্ষ অভুক্ত, হাড় জিরজিরে মানুষের করুণ আর্তনাদে ভারি হয়ে উঠেছিল, যখন ফুটপাথগুলো ভরে উঠছিল হাজার হাজার নারীপুরুষ ও শিশুদের লাশের স্তূপে, তখন আর চুপ করে থাকতে পারলেন না তিনি। তাঁর পত্রিকায় বাংলাজুড়ে সংঘটিত এই নারকীয় নরমেধযজ্ঞের লোমহর্ষক বর্ণনা ও সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশের পাশাপাশি জ্বালাময়ী ভাষায় সম্পাদকীয় লেখেন, যা ব্রিটেনের পার্লামেন্টে রীতিমতো তোলপাড় তোলে। সরকার তখন গৃহহীন, খাদ্যহীন অসহায় মানুষদের জন্য রেশন ও লঙ্গরখানা খুলতে বাধ্য হয়, যার ফলে এক পর্যায়ে দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা ধীরে ধীরে কমে আসে। যদিও এতে করে তাদের পায়ের তলার মাটি ক্রমে সরে আসতে থাকে এবং কয়েকবছরের মধ্যেই এদেশ থেকে পাততাড়ি গোটাতে বাধ্য হয় তারা। এ-থেকে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে,সমাজে যেকোনো মানবিক বিপর্যয়ের কালে প্রচারমাধ্যমের স্বাধীনতা, তথা গণতান্ত্রিক চর্চার সংস্কৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য। সাংবাদিকেরা তখন হাত খুলে লিখতে, ও রাজনীতিবিদেরা মন খুলে কথা বলতে পারলে শাসকশ্রেণির পক্ষে বেশিদিন তাকে উপেক্ষা করা ও সেই ঘটনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নিষ্ক্রিয়ভাবে বসে থাকা সম্ভব হয় না।

গ্রন্থে বর্ণিত একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার কথা বলে এই আলোচনার ইতি টানছি। এটি ঘটেছিল অমর্ত্যর যখন মাত্র ছয় কি সাত বছর বয়স, তখন। ঢাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা তখন ছিল নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। তেমনি কোনো এক সহিংস দাঙ্গার সময় একদিন একজন নিরীহ মুসলিম মুদি দোকানি শত্রুর ছুরিকাঘাতে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে তাঁদের পুরনো ঢাকার বাড়িতে ছুটে আসে সাহায্যের আশায়। অমর্ত্যর পরিবারের সবাই মিলে তাকে বাঁচিয়ে তোলার সাধ্যমতো চেষ্টা করেন, তাঁর শিক্ষক বাবা এমনকি নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে তাকে হাসপাতালেও নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি শেষ পর্যন্ত। মৃত্যুর আগে সে বারবার করে ঘরে তার অভুক্ত সন্তান ও স্ত্রীর কথা বলছিল। নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করা এই মর্মান্তিক ঘটনাটি অমর্ত্যের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেইদিন থেকে তিনি মনে মনে দারিদ্র্য, শোষণ, অনাহার, দুর্ভিক্ষ, বৈষম্য-- আমাদের সমাজের এইসব নিদারুণ অভিশাপ বিষয়ে গভীরভাবে ভাবতে শুরু করেন, পরবর্তীকালে যা তাঁর কাজের একটা বড় অংশ জুড়ে থাকবে। এর পাশাপাশি তিনি নিজেকে সর্বান্তঃকরণে একজন উদার, অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ, পরমতসহিষ্ণু, মানবিক ও কল্যাণমনস্ক মানুষ হিসাবে গড়ে তোলার সাধনায় লিপ্ত হন, যেটিকে আমার কাছে এই বইয়ের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ী ও শিক্ষণীয় বিষয় বলে মনে হয়েছে। কেননা গ্রন্থকারের মতো এই লেখকেরও একান্ত বিশ্বাস, এই আন্তরিক আত্মানুসন্ধান ও আত্মশক্তির সাধনার পথেই ব্যক্তি ও সমষ্টির প্রকৃত মুক্তির দিশা নিহিত রয়েছে।

বর্তমানে প্রায় নব্বুই-ছোঁয়া অমর্ত্য সেনের সারাজীবনের সেই ব্যক্তিগত ও বৌদ্ধিক সাধনার আখ্যান, এই একটি গ্রন্থ পাঠ করেই কী অপার প্রাপ্তিযোগই না হল এই লেখকের: অবিভক্ত বাংলার সমাজ ও ইতিহাসের নানা অজানা অধ্যায় সম্পর্কে জানা; বিশ্বব্যবস্থার রাজনৈতিক অর্থনীতির জটিলতা অনুধাবন; বাংলা, ভারত ও বিশ্বের সংস্কৃতি ও সাহিত্যের অঢেল কথামৃত পান; অর্থনীতি, দর্শন ও সমাজবিজ্ঞানের সহজপাঠ গ্রহণ; বিশ্বমনীষার শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধিদের অন্তরঙ্গ জীবনের গল্প শোনা- এর কোনো শেষ নেই। এটি আমার সাম্প্রতিক কালের পাঠাভিজ্ঞতার মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান, সমৃদ্ধ ও স্মরণীয় অর্জনের একটি,এতে কোনো সন্দেহ নেই।


তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক