বেন ওকরি’র গোপন উৎস

কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক ফারুক মঈনউদ্দীনের অনুবাদে বেন ওকরি’র সর্বসাম্প্রতিক গল্প

ফারুক মঈনউদ্দীনফারুক মঈনউদ্দীন
Published : 19 Sept 2022, 08:16 AM
Updated : 19 Sept 2022, 08:16 AM

নাইজেরিয়ান বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ কবি ও কথাসাহিত্যিক বেন ওকরিকে (১৯৫৯) উত্তরাধুনিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক লেখকদের অগ্রগন্য হিসেবে ধরা হয়। ফ্যামিশড রোড উপন্যাসের জন্য তিনি বুকার পুরস্কার পান ১৯৯১ সালে। তাঁর পাওয়া অন্যান্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে কমনওয়েলথ লেখক পুরস্কার (১৯৮৭), কথাসাহিত্যে আগা খান পুরস্কার (১৯৮৭) ইত্যাদি। গার্ডিয়ান কথাসাহিত্য পুরস্কারের (১৯৮৮) হ্রস্বতালিকায়ও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন তিনি। 

একদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, অন্যদিকে মানুষের অসচেতনতা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যবিধি সংকটের দিকে ধাবমান অনেক দেশ। পৃথিবীর দেশে দেশে শুকিয়ে গেছে হাজার হাজার নদী-উপনদী, বাকি জলপ্রবাহকে দূষিত করেছে শিল্প ও আবাসিক এলাকার বর্জ্য, ফলে দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির সংকট। এসব কারণে মিঠা পানি হবে আগামি বিশ্বের স্বল্পোন্নত ও জনবহুল দেশগুলোর জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের নদীনালার দিকে তাকালেই এই অবস্থার ভয়াবহতা উপলব্ধি করা যায়। বিষয়টি নিয়ে দ্য নিউ ইয়র্কার ম্যাগাজিনের ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২২ তারিখের সংখ্যায় সর্বশেষ প্রকাশিত গল্পের মাধ্যমে বেন ওকরি যেন আমাদের মতো দেশগুলোর আসন্ন বিপদ সম্পর্কে সাবধান করে দিয়েছেন।

গল্পটি সম্পর্কে তিনি বলেছেন, "গল্পটা এক খন্ড বাস্তবতা, একটা উপকথা, একটা স্যাটায়ার, একটা সতর্কতামূলক আখ্যান, অশরীরী আঙুলে দেয়ালে লেখা একটা হুঁশিয়ারি বার্তা, অন্ধকারে একটা চিৎকার, কাঁদিদ বা ডেকামেরনের মতো প্রচলিত প্রাচীন ধারার বেশ পুরনো ধাঁচের দূরকল্পী গল্প, যেসব গল্প আমরা অদ্ভুত সময়ের প্রদোষকালে বসে একে অন্যকে বলি।"

গল্পটির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে পাওয়া যাবে মনঃসমীক্ষামূলক ব্যাখা। রয়েছে প্রজন্মগত ব্যাখ্যা। আর অবশ্যই রাজনৈতিক মাত্রা। আমার মনে হয়, এই সময়ে সবাই একটা গোপন উৎসের স্বপ্ন দেখে - শক্তির, সত্যের, ক্ষমতার। এটা আমাদের জগতে বিরাজমান স্বপ্নভঙ্গের কিছু কথা বলে। গল্পটির পানি অনেক কিছুকে বোঝাতে পারে। তবে আমি মনে করি যখন কোনো একটি জিনিস কেবল সেটিকেই বোঝায়, তখন প্রতীক আর তেমন শক্তিশালী থাকে না, পানি তখন অন্য কিছু নয়, পানিকেই বোঝায়। ভাষাকে যা পরিপুষ্ট করে এবং অপরিহার্যতার চূড়ান্ত ইঙ্গিত দেয়, সেই জিনিসটির অভাবে যখন আমরা বিনষ্ট হতে শুরু করি, সেটাকে বস্তুত এক ভয়াবহ পরিস্থিতিই বলা যায়।”  --অনুবাদক  

এক সকালে ফিশার আবিষ্কার করে যে পানিতে কিছু একটা করা হয়েছে। বহুবছর ধরে কিছু লোক বলে আসছিল যে পানিটা অন্যরকম মনে হচ্ছে, কিন্তু কেউই বিশ্বাস করেনি ওদের। ওদের দাবিকে দেশের বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি থেকে উদ্ভুত সর্বশেষ অতিরঞ্জিত গুজব বলে ভেবে নেওয়া হয়। শহরটা ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছিল। উপকুলগুলোতে বেড়ে যায় সীমাছাড়া ইঁদুরের উৎপাত। গির্জার ভিতগুলো ভরে যায় ইঁদুরের দঙ্গলে। প্রকাশ্য দিনের আলোতে কবরের ভেতর থেকে উঠে আসতে দেখা যায় তাদের। মিনারগুলো পড়ে যায়। রাস্তাজুড়ে থাকে ভাঙাচোরা আর খানাখন্দক। বাসগুলো রাস্তার পাশে পার্ক করে রাখা,  কোনোটি পড়ে আছে কাত হয়ে, খোল পুড়ে গেছে কোনোটির। গত কয়েকদিন ধরে রেডিওর শব্দ ক্ষীন হয়ে আসছিল। ঘোষকদের মসৃণ কণ্ঠস্বর থেকে চুঁইয়ে পড়ে অবসাদের সুর। সরকার চলছিল যথারীতি, যেন অস্বাভাবিক কিছুই ঘটছে না, তবে প্রধানমন্ত্রী সংসদে “ভেতরের শত্রুদের” কথা বলেন। অশুভ এই শব্দগুচ্ছ নাগরিকদের মধ্যে একধরনের উত্তেজনার আগুন জ্বেলে দেয়। লোকজন ভেতরের শত্রু আবিষ্কার করার জন্য একে অপরের দিকে তাকাতে শুরু করে। যাদের অন্যরকম দেখায়, তারা স্বাভাবিকভাবেই এই বিশেষণের যোগ্যতা অর্জন করে। রাস্তায় এলোপাতাড়ি হামলা শুরু হয়, আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় শত্রু বলে মনে হওয়া মানুষের বাড়ি। পাড়ায় পাড়ায় গড়ে ওঠে নজরদারি দল। কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতারহিত বলে মনে হয় পুলিশকে, সরকারের অপর্যাপ্ত অর্থায়ন তাদের পদবিন্যাস ধ্বংস করে দিয়েছিল, তাদের ভূমিকার ওপর মানুষের আস্থা এমনভাবে ক্ষয়ে যায়, যা ফিরিয়ে আনা অসম্ভব হয়ে পড়ে। রাতারাতি নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাওয়া পানির দামের প্রতিবাদে শ্রমিকরা ধর্মঘটে যায়। কেউই জানে না, কেন এমন ঘটল। বহুদিন ধরে পুরো জাতি নদী ও খালগুলোতে পয়োঃআবর্জনা ফেলে আসছিল। যারা সাঁতার কাটতে যায়, তাদের মধ্যে অদ্ভুত ধরনের রোগ দেখা যেতে থাকে। পানির দাম বেড়ে গেছে বলে অন্যান্য খরচও বেড়ে যায়। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, জলের ঘাটতি শুরু হয়েছিল বিশ্বজুড়ে। যেসব দেশ পৃথিবীর নদীগুলো নিয়ন্ত্রণ করছিল, তারা এর ভেতর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা দেখতে পায়। মহাসাগরগুলোও এমন দূষিত হয়ে ওঠে যে সেখান থেকে ধরা মাছ যারা খাচ্ছে, তাদের মধ্যে দেখা দিচ্ছিল বিষক্রিয়া। অবস্থার আরো অবনতি ঘটিয়ে কমে যায় বৃষ্টিপাত, এমনকি দূষিত জলেরও সংকট দেখা দেয়। আগে যেটা অতি সাধারণ পণ্য ছিল, যা লোকজন গোসলে কিংবা চত্বরে শোভাবর্ধক ফোয়ারায় অপচয় করত, সেটাও এখন এমনভাবে রেশনিং করা হয় যেন সোনার মতো দামি। প্রতিটি বাড়িতে দৈনিক মাত্র পনের মিনিটের জন্য পানি দেওয়া হতো। কেবল এই সময়টুকুতেই পানি থাকত জলের কলগুলোতে, তারপর বন্ধ হয়ে যেত। পানির ব্যবহার নিয়ে ঝগড়াঝাটি আর মারামারি হয়ে পড়ে নৈমিত্তিক ঘটনা। মোবাইল ফোন নয়, ছিনতাই শুরু হয় জলের বোতল। অধিকাংশ পরিবারের মানুষ অসাধারণ দক্ষতায় তাদের শারীরিক প্রয়োজনগুলোকে সংকুচিত করে আনা শিখে নেয়। এক মিনিটেরও কম সময়ে স্নান সারে ওরা। দাঁত মাজে এক টেবলচামচ পানি দিয়ে। আগে যেখানে রান্নায় প্রচুর পানি ও রস ঝরানো হতো, এখন তার প্রতিটি ফোঁটা অসাধারণ সৃষ্টিশীলতায় পুনর্ব্যবহার করা হতে থাকে।

কিন্তু ফিশারের কাছে মনে হয় যে লোকজন বদলে যাচ্ছিল। কাউন্সিল এস্টেটের একপ্রান্তে স্কুল বন্ধুদের সঙ্গে একটা ফ্ল্যাট ভাগাভাগি করে গার্লফ্রেন্ড ভেনাসের সঙ্গে থাকত ও। অন্যের বাড়িতে বাচ্চা দেখাশোনার কাজ করত ভেনাস। ফ্ল্যাটের সহবাসীদের মতো ফিশারের কোনো নির্দিষ্ট চাকরি ছিল না। গ্রাফিক ডিজাইন আর রিপোর্টিংয়ে ফ্রি ল্যান্সিং করত ও। বাকি সময় বিভিন্ন বিষয় পর্যবেক্ষণ করে কাটানোর সময় ও লক্ষ করে সরকারের সব ধরনের পরামর্শের প্রতি চারপাশের মানুষজন অনুগত ও বশংবদ হয়ে উঠেছে। এমনকি মূলধারার সাংবাদিকদেরও সরকারের চরম কোনো ধারণার প্রতি অস্বাভাবিকরকম সহানুভুতিশীল মনে হতে থাকে। বিরোধীদলগুলোও কোনোকিছুর বিরোধিতা করে না। শ্রমিকদের ইউনিয়নগুলো তাদের কোম্পানি না চাইলেও মালিকপক্ষের বিভিন্ন শর্ত মেনে নেয়। আগুনের মতো সক্রিয় কর্মী ও কৌতুকাভিনেতারা রক্ষনশীলতার বিপদসংকেত দিয়ে আবেগপূর্ণ বক্তব্য উগড়ে দিতে শুরু করে। এসব কিছুর মধ্যেও প্রধানমন্ত্রীকে প্রায়ই হাসতে দেখা যেত। এক সাম্প্রতিক বক্তব্যে তিনি বলেন, “মনে হয় আমরা উল্লেখযোগ্য এক সমকেন্দ্রিক মতাদর্শের জাতিতে পরিণত হচ্ছি। ভিন্নমত প্রায় তিরোহিত হয়েছে।”

এই বক্তব্যের আত্মতুষ্টিকে কেউই চ্যালেঞ্জ করে না।

নিজের ঘরে বসে এসব ঘটনার উদ্ভটতা নিয়ে ভাবছিল ফিশার। তার হাতে দিনের শেষ গ্লাস পানি। ভাবতে ভাবতে কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই গ্লাসের পানির দিকে তাকিয়ে ছিল। মনটা অন্যমনস্কভাবে ঘুরে বেড়ালেও ওর দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল পানির ওপর, এসময় সে লক্ষ্য করে অস্বাভাবিক কিছু একটা আছে পানির মধ্যে। পানির মতো মনে হলেও আঠালো একটা ভাব। তার ওপর, ওটার ওপর ম্লান আলোটা পড়ছিল অস্বস্তিকরভাবে। খুব কাছ থেকে পানিটা লক্ষ্য করে ও। তখন দেখতে পায় ওটা।

“এটা কী পানি! পানির মধ্যে কিছু একটা করেছে ওরা।”

ভেনাসকে খোঁজার জন্য ছুটে ঘর থেকে বের হয় ও। রান্নাঘরে ছিল ও, কল থেকে ঝরে পড়া জলের শেষ ফোঁটাগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল।

ফিশার চিৎকার করে বলে, “এটা কী পানি! ওরা এটাকে বিরল করেছে বটে, তবে আজবও করে তুলেছে।”

আতস কাচের ভেতর দিয়ে তরলটার মধ্যে অদ্ভুত ডোরার মতো দাগ দেখতে পায় ওরা। জলের উপরিতলটা দেখে মনে হয় ওটা ছুরি দিয়ে কাটা যাবে। এক ফোঁটা পানিতে একটা নতুন দুনিয়া ফুটে ওঠে। সেটাতে এমনই ভয়াল কিছু ছিল যে ওরা আর তাকাতে চায় না। ওদের কাছে মনে হয় পানিটা সত্যিকারের পানি নয়। ওটা ছিল পানির একধরনের ছায়া, আপাতদৃষ্টিতে পানি থেকে আলাদা করা যায় না। দুআঙুলে নিয়ে ঘষা দিলে তরলটার মধ্যে একটা পিচ্ছিল ভাব বোঝা যায়। ওটার মধ্যে একই সঙ্গে অতিরিক্ত নিখুঁত ও অতিমাত্রায় বাস্তব কিছু একটা ছিল।

ওদের এই আবিষ্কার নিয়ে কী করা যায়, সেটা আলোচনা করার জন্য সেই সন্ধ্যায় ফিশার আর ভেনাস ওদের ফ্ল্যাটের অন্যদের সঙ্গে বসে। ওরা একমত হয় যে কোনো বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করে পানিটা পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া উচিত, কিন্তু বুঝতে পারে যে এরকম কোনো বিশেষজ্ঞকে বিশ্বাস করা যায় না। ওরা পুলিশের হাতে তুলে দিতে পারে ওদের। ওরা মাধা খাটিয়েও এমন কারো কথা ভাবতে পারে না যে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ না করে একটা পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষার কাজটা করতে পারে। ওদের আলোচনা কয়েকটা বিষয় পরিষ্কার করে তোলে। যে পানিটা খেয়ে আসছিল ওরা, সেটাকে কোনোভাবেই বিশ্বাস করা যায় না। পানির পরিবর্তনের সঙ্গে জনগণের আচরণ বদলে যাওয়ার একটা সরাসরি যোগসূত্র দেখতে পায় ওরা। ওরা জানত না পানিটা কখন পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে বুঝতে পারে যে ব্যাপারটা ঘটেছে বেশ আগে, কারণ পিছন দিকে তাকালে বুঝতে পারে, ওরা সবাই অনেক বেশি নিস্ক্রিয় এবং কোনো বিষয়ে প্রশ্ন তোলার ব্যাপারে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছে।

ফিশার বলে, “আমাদের দুটো জিনিস করতে হবে।”

ভেনাস বলে, “পানিটা পরীক্ষা করানো।”

“এবং ওটা খাওয়া বন্ধ করা,” ওদের মধ্যে একজন বলে।

ফিশার বলে, “তার মানে দূষিত হয়নি এমন পানি খুঁজে বের করা খুব জরুরী।”

“এটা কীভাবে করব আমরা?”

“আমি জানি না। বেঁচে থাকার জন্য পানি দরকার আমাদের। পানি ছাড়া নিশ্চিত মারা পড়ব সবাই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কী এই পানিই খেতে থাকব যা অজানা কোনোভাবে ক্ষতি করছে আমাদের, হয়তো জড়বুদ্ধি করে ফেলছে, না কি কারো হাতের স্পর্শ নেই এমন বিশুদ্ধ পানি খুঁজে বের করতে পারব আমরা?”

গভীর রাত পর্যন্ত আলোচনা করে ওরা। প্রথমে ভেবেছিল স্বাভাবিকভাবেই চলতে থাকবে সব। তারপর বুঝতে পারে, এই আবিষ্কার ওদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার একটা জায়গা দেখিয়ে দিয়েছে। কিছু একটা করতে হবে এখন। ওরা ঠিক করে, ফলের ভেতরের পানির ওপর বেঁচে থাকবে। ফল কলের পানি দিয়ে ধুয়ে নেবে, কিন্তু সেই পানি খাবে না। ওরা বুঝতে পারে, যথেষ্ট পানি না খাওয়ার কুফলগুলো শুরু হওয়ার আগে খুব বেশি সময় নেই ওদের হাতে। বন্ধুদের কেউ পানি পরীক্ষা করানোর কাজটার ভার নেবে। অন্যেরা যাবে পরিষ্কার পানি খুঁজে বের করার চেষ্টায়। লটারি করে ওরা। বিশুদ্ধ পানি খুঁজে বের করার দায়িত্বটা পড়ে ফিশার ও ভেনাসের ওপর। সে রাতে পুরোপুরি অবসন্ন কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো পরিষ্কার মন নিয়ে ঘুমাতে যায় ওরা।

সকাল বেলায় সবাই যে যার কাজে ছড়িয়ে পড়ে। ঠিক করা হয়, সপ্তাহে একবার ওদের ফ্ল্যাটে মিলিত হবে সবাই। যদি কোনো কিছু ঘটে যায়, পরিত্যক্ত হবে সভা। ওদের মধ্যে যদি একজন বা একের বেশিও মারা যায়, তাহলে বাকিরা নিজেদের মতো চেষ্টা করে যাবে এবং তাদের আবিষ্কারটা সমাজের মানুষজনের কাছে পৌঁছে দেবে, যদি ততদিন ওদের কথা শোনার জন্য কেউ বেঁচে থাকে।

যাদের ভাগে পানি পরীক্ষা করানোর কাজ পড়েছিল, তারা রওনা হয় প্রথমে। ইউনিভার্সিটির দিকে যায় ওরা। এসময় ফিশার আর ভেনাসের সঙ্গে সাংকেতিক ভাষায় যোগাযোগ রাখছিল মোবাইল ফোনে। পানিটা পরীক্ষা করতে রাজি হওয়া রসায়ন বিভাগের একজন সদস্যের সঙ্গে দেখা করার আগে পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাকভাবে চলছিল। পরীক্ষাটা শুরু হয়েছিল, ফলাফল আসারও সময় হয়ে আসে, তখন সাংকেতিক মেসেজ আসা বন্ধ হয়ে যায়। তারপর থেকে সব পুরোপুরি নীরব।

সকাল গড়িয়ে যাওয়ার পর ফিশার আর ভেনাস বুঝতে পারে যে তাদের অনুসন্ধান শুরু করতে হবে, তবে তাদের ফ্ল্যাটটা আর নিরাপদ থাকবে না। কিছু দরকারি জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে হালকা হয়ে বের হয় ওরা। কোথায় যাবে তার কোনো নির্দিষ্ট ধারণা ছিল না কারো। প্রথমেই যায় শহরের ধনী এলাকায় বন্ধুদের বাড়ি। ওদের সন্দেহকে হাস্যকর বলে মনে হয় বন্ধুদের কাছে। এসময় ওপরের তলার একটা জানালা দিয়ে ফিশার দেখতে পায়, পুলিশ আসছে বাড়িটার দিকে। ভেনাসকে সাবধান করে পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে আসে দুজন, তারপর বাগানের মধ্য দিয়ে বেড়া টপকে কেটে পড়ে। অগত্যা শহর ছেড়ে যায় ওরা। আত্মীয়স্বজনের বাড়িতেও যায়, যাওয়ার পর বুঝতে পারে যেখানেই যাচ্ছিল, কোনোভাবে যেন ওদের যাওয়ার কথা আগে থেকেই জানত সবাই। তাই চেনাজানা সবাইকে এড়িয়ে ঠিক করে, সমাজের একদম নিচতলায় ডুব দেবে ওরা। পোশাক পালটে চেহারা পরিবর্তন করে উধাও হয়ে যায় তারপর।

মাদক ব্যবসায়ী আর ছিন্নমূল মানুষের সঙ্গে ভবঘুরে জীবন কাটাতে শুরু করে ওরা। গৃহহীনদের সঙ্গেই নিরাপদ বোধ করে বেশি। কিন্তু পানি সেখানেও একটা সমস্যা। নগরে সেবার খরা হয়। বড় বড় নদীগুলোতে কাদাটে জল বয়ে যায়। প্লাস্টিক ব্যাগ, আবর্জনা আর মাছ ধরা জালের মধ্যে বড় শামুকের মতো কোনো জীব -  অপরিচিত রঙের অদ্ভুতদর্শন নানান বস্তুর সঙ্গে সবকিছু জড়াজড়ি করে নদীতে ভাসতে দেখা যায়। রাতের বেলায় বেশি দামে বোতলের জল বিক্রি করে লোকেরা। মুখে মুখোশ পরা থাকে ওদের, কারণ রাস্তার বাতি আর বিভিন্ন ভবনের পাশ থেকে তাক করে থাকা ক্যামেরায় চিহ্নিত হতে চায় না ওরা। গোপনে বাড়ি থেকে বের হয়ে লোকজন কিংবা তাদের গাড়ি আসে সেই পানি কেনার জন্য, তারপর দৌড়ে পালিয়ে যায় পরিচয়হীন। ফিশার এক বোতল পানি কিনে আনে, একবার তাকিয়েই বুঝতে পারে, ওটা পানের অযোগ্য। পানির ভেতর ডোরার মতো ঢেউ খেলানো রেখা। ক্ষুদ্র গোল ফুটকিগুলো দেখা যায় আতস কাচ দিয়ে।

ফিশার আর ভেনাস ছিন্নমূল মানুষের দলের সঙ্গে ভেসে চলে। এদের মধ্যে কেউ কেউ আধুনিক জীবনের ফাঁদ এড়ানোর জন্য ছিন্নমূল হওয়াকেই বেছে নিয়েছে। রাতের বেলায় মাঠের মধ্যে কিংবা খালের পাড়ে তাঁবুতে থাকে ওরা। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিচক্ষণ যারা, তারা পানি খায় না, আশ্চর্যরকম প্রতিরোধে তাদের চোখ জ্বলজ্বল করে, কম কথা বলে ওরা, আর সন্দেহ করে সবাইকে। এদের কাছ থেকেই ফিশার জানতে পারে, কিছু মানুষ বিকল্প পানি উৎপাদন করছে। ওদের ভ্রাম্যমান রাসায়নিক কার্যক্রম আছে, সেটা দিয়ে বৃষ্টির পানিকে শোধন করে ওরা। ফিশার শহরের শেষপ্রান্তের ঘনবসতিপূর্ণ বিবর্ণ বাড়িঘরের মধ্যে এসব শোধনাগার খুঁজে বেড়ায়। বেশ সাবধানী ওরা, কারণ, সরকারি লোকজন কয়েকবার ওদের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল, ফলে অনেক সহকর্মীকে হারাতে হয়েছে ওদের। প্রায় প্রতি রাতে ওরা জায়গা পরিবর্তন করে। ফিশার আর ভেনাস সুপারিশ নিয়ে আসে, মিথ্যা শনাক্তকরণ পরীক্ষায় উৎরেও যায়। তবে যে পানি ওরা প্রক্রিয়াজাত করছিল, সেটাকে স্বাভাবিক বৃষ্টির জল মনে হলেও সেটা ছিল দূষিত। এই আবিষ্কার গোপন জল শোধনকারীদের বেশ বিচলিত করে তোলে। অন্তর্ঘাতক সাব্যস্ত করে ফিশার আর ভেনাসকে বের করে দেয় ওরা।

ভেনাস চিৎকার করে বলে, “আমরা অন্তর্ঘাতক নই, আপনাদের মতো আমরাও সত্য বের করার চেষ্টা করছি, এটাই আসল কথা। কিন্তু প্রকৃতিও দূষিত হয়ে গেছে।”

জল শোধনকারীরা আর কিছু শুনতে চাইছিল না। আরেকটা গোপন জায়গায় গিয়ে নিজেদের চাঙ্গা করে ওরা। ফিশার আর ভেনাসের শহরে ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। ফেরার পথে রাস্তায় পড়ে থাকা খবরের কাগজের পাতায় ছোট একটা শিরোনাম চোখে পড়ে ফিশারের। ওর প্রজন্মের লোকজন খবরের কাগজ পড়া কিংবা তাদের বিশ্বাস করা ছেড়ে দিয়েছে বহুদিন আগে। কারণ, ওদের প্রায় সবগুলোরই মালিকানা ছিল বড় কর্পোরেটদের হাতে, যাদের ছিল নিজস্ব গোপন এজেন্ডা। এমনকি যেগুলো স্বাধীন, সেগুলোও সম্পাদনা কিংবা পরিচালনা করত বিদ্যমান গোঁড়ামীতে বহু আগে কলুষিত হয়ে যাওয়া অভিজাত স্কুল আর ইউনিভার্সিটি থেকে আসা মানুষেরা। সরকারের কাছ থেকে গোপন নির্দেশ নেওয়া ছাড়াও কাগজগুলো এতটুকু সত্য লিখতে পারত যে জাতি একটা অবরুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে আছে। ফিশার আর ওর বন্ধুরা যেসব খবরের ওপর আস্থা রাখত, সেসব আসত গোপন সুত্র, চাপা গুজব আর শহুরে কিংবদন্তী থেকে, যা পাওয়া যেত বিশ্বাসী লোক মারফত, যাদের কোনো টাকা-পয়সা দিতে হতো না, কিংবা যাদের ছিল না কোনো ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থ। তবু - “জলযুদ্ধ” - শিরোনামটা ফিশারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

ও বলে, “এটা দেখো!”

দুজনে মিলে খবরটা পড়ল। লেখাটার কেবল অর্ধেকাংশ পাওয়া গেল, বাকিটুকু ছিঁড়ে বাতাসে উড়ে গেছে।

ওটাতে লিখেছে, “বর্তমানে অর্ধেক বিশ্ব জলযুদ্ধে অবতীর্ণ। বাকি অর্ধেকে কোনো জল নেই। বিশ্বের বিভিন্ন শহর জলতৃষ্ণায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সব পানি কোথায় গে-”

এর পরের অংশ ছিল না।

ভেনাস বলে, “তার মানে এটা সারা দুনিয়ার সমস্যা।”

“হতে পারে। তবে এই অসম্পূর্ণ অংশটাকে বিশ্বাস করছি না আমি।”

ক্লান্ত হয়ে রাস্তার পাশে বসে থাকে ওরা। চারদিন ধরে পানি খাওয়া হয়নি। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে তারপর আবার চলতে শুরু করে ।

এবারে একজন বৈদ্য খুঁজতে থাকে ফিশার ও ভেনাস। যাদের পাওয়া গেল, তাদের চোখের মধ্যে ছিল অর্থলিপ্সা। একজন ভেনাসের প্রতি পরোক্ষ ইঙ্গিতও দিল। আরেকজন দাবি করে যে ওর কাছে বিশ্বের সেরা পানীয় জল আছে। সেই পানি আনার পর ওটার রঙ দেখে প্রায় মুর্ছা যাচ্ছিল ভেনাস। আলকাতরার মতো কালো তার রঙ। পারদের মতো ঝিকমিক করছিল পদার্থটা, তবে স্বাদ জলের মতোই। এরকম আজব জিনিস আগে কখনো দেখেনি ওরা।

ভেনাস বলে, “মনে হয় আমি হ্যালুসিনেট করতে শুরু করেছি। কী ছিল ওটা?”

আবার রাস্তায় নেমে আসে ওরা। এর মধ্যে মোবাইল ফোনটা হারিয়ে ফেলেছে ভেনাস। ও নিশ্চিত, শেষবার যে বৈদ্যের কাছে গিয়েছিল ওরা, সে-ই চুরি করেছে ওটা। ওরা ভাবল, এর পর ওদের মনে হয় আবার কোনো বিজ্ঞানীর কাছে যাওয়া উচিত। আগের কাজগুলোর মধ্যে বহু কিছু ছিল যুক্তিহীন। একটা গাড়িতে লিফট নিয়ে ভেনাস যে ইউনিভার্সিটিতে পড়ত সেখানে পৌঁছে ওর সাবেক রসায়ন শিক্ষকের খোঁজ করে ওরা। অফিসেই পাওয়া গেল তাঁকে। তাঁর মাথায় কয়েকগাছি চুল, তবে নাকের ফুটোয় আর ঘাড়ের পেছনে ছিল অঢেল লোম। তাঁকে কিছুটা বুড়োটে আর ক্লান্ত দেখায়, ভেনাসকে দেখেও তাঁর চোখে কোনো প্রাণের আভাস পাওয়া যায় না।

তিনি বলেন, “তোমাকে মনে আছে আমার। তুমি ভেনাস, তাই না? পুরো ইউনিভার্সিটিতে তুমি ছিলে সবচেয়ে সুন্দর, এটা কী জানতে তুমি? আমাদের ক্লাসে তোমাকে পাওয়া একটা বিশেষ সুবিধা বলে মনে করতাম আমরা সবাই। এখন বলো, কী করতে পারি তোমার জন্য?”

তাঁর মন্তব্যের প্রাথমিক অস্বস্তি কাটানোর পর ওরা ওদের আগমনের উদ্দেশ্য জানাল তাঁকে। চোখ বন্ধ করে ওদের কথা শুনলেন তিনি। শেষ হওয়ার পর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

তিনি বললেন, “মনে হয় তোমাদের কাছে বিজ্ঞানের মৌলিক বিশ্বাসটা পৌঁছাতে পারিনি আমি। আর সেটা হচ্ছে যৌক্তিকতা। প্রকৃত সত্য থেকে দূরে সরে যেতে পারো না তুমি। বিজ্ঞানের কাছে তোমাদের আবেগের কোনো গুরুত্ব নেই। তোমাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিরও নয়। এখন বলো, কী কারণে কেউ পানিকে নষ্ট করতে চাইবে? যদি তাই হয়, তোমরা যেরকম বলছ, নাগরিকদের মধ্যে একধরনের চিন্তাসাম্য তৈরি করার জন্য, সেটাই বা কীভাবে ঘটবে? আমি সত্যিই বুঝতে পারছি না কীভাবে খাওয়ার পানি তোমার রাজনীতিকে পরিবর্তন করতে কিংবা আবেগের ওপর প্রভাব খাটাতে পারে।”

“শান্ত করার জন্য অনেক অষুধ আছে। সিজোফ্রেনিয়া অথবা মানসিক বিষাদরোগের জন্য আমরা সেসব ব্যবহার করি ...।”

“তোমরা কী বলতে চাইছ সরকার ... সেটা একেবারেই অসম্ভব। অবৈজ্ঞানিক।”

“তাহলে পানির পরীক্ষার ফলের ব্যাপারে কী হবে, ভেসে থাকা দাগগুলো?”

“পানি কখনোই বিশুদ্ধ ছিল না। হাজার বছর ধরে আমরা দূষিত পানি নিয়ে চলে আসছি। মাত্র একশ বছরের আগে পানিকে বিশুদ্ধ করার কৌশল আবিষ্কার করেছি আমরা। পরিশুদ্ধ করা মানে দূষিত করা নয়। এই ধারণা তোমরা কোথা থেকে পেলে?”

ভেনাস আর ফিশার বিস্ময় চেপে রেখে তাঁর কথা শুনে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল তিনি ওদের উদ্দেশ্যে নয়, তাদের পুরো প্রজন্মের সামনে কথা বলছেন যেন। তাঁর মধ্যে এক ধরনের আক্রোশ ছিল, ওদের দুজনকে সেটার ধাক্কা সামলাতে হচ্ছিল। কথা বলতে বলতে তিনি উঠে গিয়ে ট্যাপের কাছে রাখা একটা বড় গ্লাসভর্তি পানি নিয়ে এলেন। তারপর ওদের দিকে তাকিয়ে থেকে সেই পানি খেতে থাকেন।

তিনি বলেন, “এই পানিই আমি সবসময় খাচ্ছি, কিন্তু আমার মানসিক অবস্থার কোনো বেচাল দেখিনি কখনো। সত্যি বলতে, ওটা প্রতিদিন আরো ধারালো হচ্ছে। এই একবছরেই পাঁচটা নতুন বিষয় আবিষ্কার করেছি আমি, যেখানে প্রমাণ করেছি যে পরিবেশ আন্দোলনের বেশিরভাগ কথাবার্তাই প্রশংসা কুড়ানোর জন্য ফাঁকা বুলি। কোনো বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নেই এখানে। পৃথিবীর বনভূমিগুলো চমৎকার আছে। কোনো প্রজাতির নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ারও কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই। নোবেল পুরস্কারের জন্য আমার নাম পাঠানো হচ্ছে, বুঝতেই পারছ তাহলে।” তারপর গ্লাসের বাকি পানিটুকুও খেয়ে নিলেন।

সময় দেওয়ার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে দ্রুত বের হয়ে আসে ওরা। ওদের ক্যাম্পাস ছেড়ে যাওয়ার ঠিক সেই মুহূর্তে পুলিশের একটা গাড়ি এসে পৌঁছায় সেখানে। আবার নগরীর নিচের পরতে ডুব দেয় ওরা। ঘোরাঘুরিতে এমন লোকের সঙ্গে ওদের পরিচয় হয়, যারা দাবি করে, জীবনে কখনো কলের পানি খায়নি ওদের কেউ। তাদের কেউ প্রমাণ হিসেবে ওদের ত্বকের সজীবতা দেখায়। এদের একজন রাসটাফারিয়ান (এই ধর্মীয় আন্দোলনের অনুসারীদের রয়েছে আলাদা আচরণবিধি ও পোশাক, যেমন মাথায় জটা রাখা ও গাঁজা খাওয়া ইত্যাদি। শুকরের মাংস, চিংড়ির মতো খোসাওয়ালা মাছ ও দুধ খায় না ওরা - অনুবাদক) দাবি করে, তার বয়স একশ বছর। আরো বলে, সে যে এত বছর বেঁচে আছে, তার কারণ পুরো ব্যবস্থার সব দূষণকে এড়িয়ে চলেছে ও।

সে বলে, “পানিকে নিয়ে কী করা হয়, দেখেছি আমি।”                         

আরো কিছু প্রশ্ন করার পর বেরিয়ে আসে যে আসলে কিছুই চাক্ষুষ করেনি ও। অন্যের দেখা ও তাদের কাছ থেকে শোনা কথা বলছিল সে। বয়সের ব্যাপারেও ধোঁয়াশা ছিল ওর কথায়। ওদের হিসাবে ওর বয়স আশির কাছাকাছি হতে পারে। তবু ওর সুস্পষ্ট প্রাণশক্তিতে যেটুকু বোঝা যায়, সেটাও বেশ চমকপ্রদ।

ওরা এমন লোকের দেখাও পায়, যারা বিশুদ্ধ পানি সম্পর্কে গুজব শুনেছে। বিভিন্ন জায়গায় অনেক লোকের কাছে পাঠানো হয় ওদের। একজন ত্রিকালদর্শী, এক জ্ঞানী মহিলা, এক আধ্যাত্মিক গুরু, একজন চিকিৎসক এবং এক দার্শনিকের সঙ্গে দেখা করে ওরা। কিন্তু বিশুদ্ধ পানি কোথায় পাওয়া যেতে পারে, সেসম্পর্কে কোনো ধারণা নেই কারো। 

দার্শনিক বলেন, “যে পানি আপনি খাচ্ছেন, সেটা নিয়ে প্রশ্ন করা মানে, যে সমাজে আপনি বাস করছেন সেটার মূল ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা। এটা যেন যে বাতাসে আপনি শ্বাস নিচ্ছেন সেটাকে প্রশ্ন করার মতো।”

ভেনাস বলে, “কিন্তু কেউ কেউ ঠিক সেটাই করছে।”

তিনি বলেন, “বাস্তবতাকে সন্দেহ করা বিজ্ঞতার পরিচয় নয়। কারণ, এখানে অন্য কিছু নেই।”

ফিশার বলে, “এটা কি সত্যি?”

দার্শনিক ওর কথা না শুনেই বলেন, “আমার আশঙ্কা, আপনি নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছেন। নিজের পায়ের তলার মাটি সরিয়ে ফেলেছেন আপনি। এটা একটা ভঙ্গুর দার্শনিক অবস্থান। পানিটা খাঁটি এবং সবসসময়ই খাঁটি ছিল। এর পরে তো আপনি খোদ জীবনটাকেই সন্দেহ করবেন, যা সেই জীবন ছেড়ে যাওয়ার নিশ্চিত একটা পথ।”

একথার পর দার্শনিক ওদের বিদায় হতে বলেন, এবং পাতলা লম্বা গøাস থেকে এক ঢোঁক পানি খান।

এর মধ্যে সাতদিন হয়ে গেছে ওরা পানি খায় না, বেঁচে আছে কেবল ফলের রসের ওপর । ওদের মনে হয় যেন মাথার মগজ কুঁচকে যাচ্ছে। এমনকি যে বোতলের পানি অকৃত্রিম ঝরনা ও পাহাড়ের হৃদ থেকে আসার কথা, সেগুলোর মধ্যেও একই রকম অদ্ভুত ডোরা দাগ আর প্রায় অদৃশ্য বলয় দেখা যায়। জল নিয়ে এই বিশৃঙ্খল অবস্থা ছিল বিশ্বজনীন। ফিশার জানায় যে সত্যিকার অর্থেই এখন হ্যালুসিনেশন হচ্ছে ওর। রাস্তার ওপর নিস্কলুষ জলের পুকুর দেখতে পাচ্ছে সে। ভেনাস দেখছিল কংক্রিটের ভেতর থেকে সবেগে বের হয়ে আসা ফোয়ারা। ওরা এতই শুষ্ক হয়ে যায় যে শেষপর্যন্ত স্বীকার করে, ওদের কাজের ধারাটা ছিল পাগলামি। 

বহু কষ্টে শব্দ বের করতে পেরে ফিশার বলে, “পৃথিবীর বিরুদ্ধে যেতে পারো না তুমি।”

প্রায় অচেতন অবস্থায় পরস্পরের ওপর হেলান দিয়ে বসে থাকে ওরা। চোখ বন্ধ করে বিস্মৃতির কাছে সঁপে দেয় নিজেদের। চেতনা মলিন হয়ে এলে দূর থেকে ভেসে আসে বহু গলার আওয়াজ। সেই শব্দগুলো সত্যিকার ছিল কি না সেটা নিশ্চিত হতে পারেনি ওরা। এসময় একটা ছোট ছেলে এগিয়ে আসে ওদের দিকে।

ছেলেটি বলে, “কী করছেন এখানে?”

ফিশার বলে, “খেতে পারি এমন ভালো পানি খুঁজছি।”

ভেনাস বলে, “তবে এখন হাল ছেড়ে দিয়েছি আমরা। এরকম কোনো পানির অস্তিত্ব নেই।”

ছেলেটার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, বলে, “আমি একজনকে জানি যার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো পানি আছে।”

“কে তিনি?”

“আমার দাদু।”

“আমাদের তাঁর কাছে নিয়ে যেতে পারো?”

“হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।”

ছেলেটি ওদের একটা গর্তের খোলা মুখের কাছে নিয়ে পাথরের সিঁড়ির ধাপ বেয়ে নিচে অন্ধকারের মধ্যে নেমে যায়। অনেক সময় ধরে নিচে নামতে থাকে ওরা। কোথাও কোথাও ধাপগুলো পেঁচানো হয়ে গেছে, তাই পাক খেয়ে নামতে থাকে। ভেতরটা খুব গরম। ছেলেটার কাছে কোনো বাতি নেই।

ভেনাস জিজ্ঞেস করে, “নিচেটা নিরাপদ তো?”

“খুব নিরাপদ।”

ফিশার জিজ্ঞেস করে, “অনেকদূর যেতে হবে?”

“অনেকদূর।”

এখন আর সিঁড়ির ধাপগুলো দেখতে পাচ্ছিল না ওরা, তবে টের পাচ্ছিল। দেয়ালগুলো অমসৃণ। মনে হয় যেন কয়েক ঘণ্টা ধরে নামছে ওরা।

ফিশার জিজ্ঞেস করে, “কে তোমার দাদু?”

“অল্প কয়েকজনই জানে।”

ভেনাস জিজ্ঞেস করে, “তিনি কীভাবে জলটা পেলেন?”

“ওটা সবসময়ই ছিল।”

“তাহলে তিনি সেটা অন্যদের দেননি কেন?”

“তিনি দিয়েছিলেন, কিন্তু লোকেরা চায়নি সেটা। যেটা মেরে ফেলছে ওদের, সেটাই চেয়েছে ওরা।”

আচমকা কুঁকড়ে যায় ভেনাস। ফিশার ওকে ধরে ফেলে। ভয় পেয়েছে ও, আর সামনে যেতে রাজি হয় না তাই।

ছেলেটি বলে, “আপনাদের যে খুঁজে পেয়েছি, সেটা কোনো দৈবাৎ ঘটনা নয়। আমরা শুনেছি, আপনারা এই জলের খোঁজ করছিলেন। বহুদিন পর আপনারাই একমাত্র এই পানি খুঁজছেন। এটা কখনোই নিজে থেকে খুঁজে পেতেন না আপনারা।”

“কেন পেতাম না?”

“জলকেই আপনাদের খুঁজে নিতে হবে।”

তারপর ছেলেটা অন্ধকারের মধ্যে ভেনাসকে কিছু একটা পান করতে দেয়, সেটা খেয়ে চাঙ্গা হয়ে ওঠে ও।

ভেনাস বলে, “জীবনে সবচেয়ে মধুর পানি খেলাম।”

আবার নামতে শুরু করে ওরা। ক্রমে ফিশারের পক্ষে শ্বাস নেওয়া কঠিন হয়ে ওঠে। হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলে ভেনাস ধরে ফেলে ওকে, তারপর একটা ধাপের ওপর বসিয়ে দেয়। ডাঙায় তোলা মাছের মতো বাতাসের জন্য খাবি খাচ্ছিল ও।

ও বলে, “আমি আর যেতে পারব না, মরার জন্য এখানেই ফেলে যাও আমাকে।”

ছেলেটা তখন অন্ধকারের মধ্যে ওকে কিছু একটা পান করতে দেয়, এবং সে-ও চাঙ্গা বোধ করে। বাতাসটা ঠান্ডা ও সঞ্জীবনী হয়ে ওঠে। ভূতলের কবরের মতো কালো অন্ধকারের মধ্যে অস্পষ্টভাবে সিঁড়ির ধাপগুলো ঠাওর করতে পারে ফিশার। ও লক্ষ্য করে ভেনাসের চোখজোড়া জ্বলজ্বল করছে।

নিচে নামতে থাকে ওরা। নিজেদের পায়ের শব্দ কিংবা শ্বাসের প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছিল না আর। এসময় ওরা বুঝতে পারে ছেলেটি ওদের সঙ্গে নেই। সামনে কেবল একটা ক্ষীণ সাদা আলো। ওরা পৌঁছায় সেখানে।

একটা খোলা জায়গা ওটা। এক বৃদ্ধ লোক একটা পাথরের চেয়ারে বসে আছেন। তাঁর পেছনে একটা অপ্রাকৃত আলোয় কিছু একটা উজ্জ্বল হয়ে আছে। এটাই অন্ধকারকে আলোকিত করে রেখেছে।

ওরা বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করে, “কী ওটা।”

তিনি বলেন, “এটাই পৃথিবীর শেষ সত্যিকার অবশিষ্ট পানি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক