একটা কাঁটাঝোপভরা পথ ও অন্যান্য কবিতা

কবি ও প্রাবন্ধিক সরকার মাসুদের নতুন পাঁচটি কবিতা

সরকার মাসুদসরকার মাসুদ
Published : 22 Sept 2022, 09:21 AM
Updated : 22 Sept 2022, 09:21 AM

একটা কাঁটাঝোপভরা  পথ

একটা কাঁটাঝোপভরা পথ বুড়িগঙ্গার

দিকে গেছে

পথের মাথায় ছোট্ট এক কুঁড়েঘর

আঁধারের শিখা জ্বলে পানির  ওপর

ওই রাস্তা যায় নদীর হারানো গৌরবের  দিকে

পানির ওপর পোড়া মবিল ভাসে সারাক্ষণ

নদীর দুপারে কংক্রিটের বহুতল  ভালোবাসা

আর মনে হয়, বিষকাটা খানা-খন্দ শটিঝাড়ময়

ওই পথে কিছু পড়ে আছে অবহেলিত  মহত ! 

শুভ তৎপরতার অভাব, অশিষ্ট ভাব  আমাদের

বীজপ্রীতি,উন্মোচনের নানা  রীতির  ভেতর

সৃষ্টি  করেছে খত

মতামত  ভেঙে পড়ছে  মূক  অনুভবে ! 

একটা কাঁটাঝোপভরা পথ কালিগঞ্জের

দিকে  গেছে।  প্রেমিক  আমি

সুতা একটু আলগা  হলেই  বেরিয়ে  পড়ি

শান্ত সবুজ প্রশান্ত জলাশয় আছে একটু ভেতরে

তার টানে ভেসে যাই  বালু দিয়ে  খেলাঘর

বানাই  প্রতিদিন

যেখানেই যাই গাড়ি থেকে নেমে ঝোপ-খাল

পাড়ি দিয়ে  উঠি আবার ওই ঝোপভরা রাস্তায়

যেখানেই যাবো দেখবো ওইসব  ঘনসবুজ পথ

চলে  গেছে  নদীতীরের  সংশয়ের  দিকে

যেখানে আবার নীল ট্রাউজার লাল টুপি পরা

ফর্শা লোক স্তূপ করে রাখা লোহালক্কড়ের পাশে

দাঁড়িয়ে  নির্মল  হাসে

নিচে বুড়িগঙ্গায় কারখানার মল 

আর  মৃত্যুর গন্ধ  নিয়ে পোড়া  তেল  ভাসে

মানব অসভ্যতার সবরকম উষ্ণ-শীতল প্রবাহে ! 

ঝিনুক

ঝিনুক  পড়ে  আছে  নদীর  কিনারে

ঝিনুকের  ওইভাবে  পড়ে থাকা  দেখে

ব্যথা  পেলো  কাদাখোঁচা । 

দ্যাখো ,  আমি কী  অবোধ ! 

অস্পষ্ট নারীর  মুখ  ঝুঁকে  দেখতে  গিয়ে

ডুবে  গেছি  নিজের  অতলে !  আমার

মনেই ছিল না ওই  ঝিনুক  শামুক

কেউ  ভালোবেসে  বলেছিল, যাও নিমতলা

ওখানে গল্প আছে  কল্পছবি  আছে

মানুষের  চেয়ে  বেশি  বিষণ্ণ  সাঁকো  আছে

আর  সিকি জোছনায়  শূন্য  কুঁড়েঘর ! 

যাইনি  নিমতলা বরং  দেখতে  এসেছি

স্রোতের কতটা কাছে পড়ে আছে মুক্তাপ্রসূ

তার গায়ে শুকিয়েছে বকের অশ্রু , শাদা  দাগ

সন্ধ্যা নামবে  একটু পরে  ঝিনুকের  খোলে

ভাবতেই ঝরা পাতা পড়ে যায়  ভেতর- বাগানে

আঁধার নামার আগে ঝিনুক কি নড়ে উঠবে না

ঝিনুক কি বলবে না "শুভসন্ধ্যা" শুভার্থী নদীকে? 

একটা  হলুদ  বাড়ির  কথা

আমি  একটা  হলুদ  বাড়িতে  থাকতাম

বাড়িটার গেটের ওপর শুধু " ভিলা" শব্দটি আছে

পাতাবাহারের  অল্প  একটু  ঝোপ  আছে

বাড়িটার  ছাদের কোণে চোঙ দিয়ে পানি  পড়ে

বিশ্বের সব অশ্রু জলধারা  হয়ে  নিচে  পড়ে

এই সেদিন হালকা নীরবতা সন্ধ্যার  মুখে

ভারী হয়ে নেমেছিল আমার গাছপালার মাথায়

দেখে  খুব  ভালো  লেগেছিলো

যেহেতু আমার সাথে ছিল কাচপোকার  ঘূর্ণিছবি

আর  পাথরঘাটার নড়বড়ে  সাঁকো । 

জানি পৃথিবীতে ভালোবাসা সোনার তৈরি  ডিম

জেনেও আলনায়  জামার  পাশে

আমি  ঝুলিয়ে  দিয়েছি  বাবুই  পাখির  বাসা

মৃত্যুর  কাছে  আমাদের  শিল্পকর্ম  হাস্যকর

কবিতা ও ছবি শূন্য হয়ে মিশে যাবে মহাকালে

ওই হলুদ  বাড়িতে শুয়ে শুয়ে 

একদিন  এসব  কথা  এলোমেলো  ভাবতাম ! 

আলো  ফেলবো  কোথায়  ? 

কোথায়  কোথায়  আলো  ফেলবো ? 

বাদামি  পাথরের  খন্ডে

গত  জীবনের  নড়বড়ে  স্মৃতির  ওপর ? 

না- বিকাল  না-সন্ধ্যার আত্মচিন্তার  ওপর                                                         

আলো  ফেলবো ? 

আর  কোথায়  কোথায় আলো  ফেলবো ,বলো ? 

আটপৌরে  ধাতুর  ওপর ? 

ঝর্ণা - স্নানের  ওপর ? 

যে অশেষ  গতিপ্রবাহে  জেগে থাকে  জীবনের

 অদৃশ্য  উৎসারণ ,  তার  ওপর ? 

সন্ধ্যা  নামছে  দেবদারুর  দীর্ঘ  স্বপ্ন  ছুঁয়ে

আঁধার  নামছে জলাশয়ের ঢালু কোল  ঘেঁষে

সন্ধ্যা  নামছে দেহচ্যুত পালকের বিষণ্ণ বিভাবে

তাহলে  এখন  বলো,   আমি

আলো  কোথায়  কোথায়  রাখবো  আর

তা  কীভাবে আজীবন খরচ করবো  আঁধারে ? 

ঝর্ণার   কবিতা

বিকাল  ঝর্ণার  অন্যমনস্কতা  ধরে  রেখেছিল

বিকালের নিঝুম আলোয়  ক্যামেরার ' ক্লিক '

তখন ঝর্ণার ঔদাস্য  মন দিয়ে  এঁকেছিলো

গীতিকবি ,  তার  ভেতরের  সবুজ  প্রেমিক ! 

কবিতা বোঝে  না  ঝর্ণা । তার পক্ষপাত

সংগীতের  প্রতি। ভালো গানও তো কবিতা

এই গূঢ় কথার  মানে  সে  জানে  না

তবে স্বপ্নে দেখেছে ন্যাড়া গাছে লাল-নীল ফিতা

সমতল পথের জংগল- বাঁকে পাহাড়ের সুর  

অষ্টাদশী  সিকি অন্ধকারে বেয়ে যায় ' কোষা '

আরও জানি অষ্টগ্রাম  জলপথে  কতদূর

বিষবৃক্ষের নিচে পড়ে আছে শুধুই প্রেমের খোসা           

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক