ক্যাথরিন দ্যনোভের জন্য আমি কী লজ্জাই না পেয়েছিলাম: আনি এর্নো

দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ সংখ্যায় প্রকাশিত সদ্য নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত ফরাসি লেখিকার সাক্ষাতকার। ইংরেজি থেকে সাক্ষাতকারটি তর্জমা করেছেন প্রাবন্ধিক অনুবাদক আলম খোরশেদ

আলম খোরশেদআলম খোরশেদ
Published : 6 Oct 2022, 07:53 PM
Updated : 6 Oct 2022, 07:53 PM

কিম উইলশের: আপনি এই দ্য ইর্য়াস বইটি মূলত ‘কেউ একজন’, ‘আমরা’, কিংবা কখনোসখনো ‘সে’ বা ‘তারা’ সর্বনাম ব্যবহার করে লিখেছেন, কিন্তু কখনোই ‘আমি’ নয়, যা এমনকি একটি নৈর্ব্যক্তিক আত্মজীবনীর জন্যও বেশ অস্বাভাবিক ...

আনি এর্নো: আমি যখন আমার জীবন নিয়ে ভাবি তখন আমার গল্পটাকে শৈশব থেকে আজ অবধি বিস্তৃত দেখি, কিন্তু কখনোই আমি সেটাকে আমি যে-পৃথিবীতে বেঁচে ছিলাম তা থেকে আলাদা করতে পারি না; আমার গল্পটা আমার প্রজন্মের গল্পের সঙ্গে এবং সেইসময়ে যা যা ঘটেছিল, তার সঙ্গে মিশে যায়। আত্মজীবনী সাহিত্যের ঐতিহ্যে আমরা নিজেদের সম্পর্কে কথা বলি, ঘটনাগুলো তখন নেপথ্যে থাকে। আমি এটাকে উল্টে দিয়েছি। এই গল্পটি একজন ব্যক্তিমানুষের ষাট বছরের জীবনে যা যা ঘটে, যে উন্নতি, পরিবর্তন ইত্যাদি হয় তারই গল্প, কিন্ত সেটাকে প্রকাশ করা হয় ‘আমরা’ ও ‘তারা’র মধ্য দিয়ে। আমার বইয়ের ঘটনাসমূহ প্রত্যেকটি মানুষের, সমাজের ও ইতিহাসেরই অংশ।

কিম উইলশের: এটি পুরোই একটি আবেগবর্জিত আখ্যান। আপনি ব্যক্তিগত কথা খুব কমই প্রকাশ করেন: আপনার পরিবার, সন্তান, বিবাহবিচ্ছেদ ইত্যাদি সম্পর্কে; আপনি যৌনতার কথা বলেন কিন্তু প্রেমের বিষয়ে কিছু নয়। আপনি মায়ের স্মৃতিবিলোপের কথা উল্লেখ করেন, বিড়ালটিকে মেরে ফেলার সময় তার চোখের চাহনি লক্ষ করেন, আপনার প্রাক্তন প্রেমিক তরুণতর এক সঙ্গিনী জোটানোর পর ঈর্ষার কথাও বলেন, কিন্তু বাকিটুকু একেবারেই আবেগের লেশবর্জিত...

আনি এর্নো: আমি সেই লেখক নই যিনি আবেগের ওপর বেশি জোর দেন, আর এই বইটার বিষয়ও তা নয়। আমার লক্ষ্যটাই এখানে ব্যক্তিগত বিষয়ে কিছু না বলা। ব্যক্তিগত বিষয়গুলো তো কয়েকটি ছবির বর্ণনা থেকেই সংগ্রহ করা সম্ভব। আমি একটি ছবির (একেক দশকের) ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করি, পোশাক ও আলোর বর্ণনা দিই এবং সেই মুহূর্তটিতে নিজেকে স্থাপন করি। ছবির ভেতর দিয়েই আমি আলতোভাবে হলেও আমার বাবার মৃত্যুকে স্পর্শ করি, আমার সন্তানদের, কিন্তু আমি আমার অনুভূতির কথা বিশেষ বলি না।

কিম উইলশের: আপনি একটি সাধারণ পরিবার থেকে এসেছেন-- আপনার বাবা-মা ছোট একটা দোকান চালাতেন-- কিন্তু আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেছেন। শ্রমিকশ্রেণির অন্তর্ভুক্ত ফরাসি লেখকেরা, যেমন এদুয়ার লুই, লিখেছেন এটা তাঁদেরকে কীভাবে পরিবার থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল ....

আনি এর্নো: এটা বেশ দুর্লভ, তবে আমি পরিবারের একমাত্র সন্তান ছিলাম-- আমার জন্মের আগে একটি বোন মারা গিয়েছিল- আমার মা খুব কড়া ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন এবং তিনি পড়তে পছন্দ করতেন, আমার ওপর তাই জোর করা হয়েছিল। হ্যাঁ, এটা আমার ও পরিবারের মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরি করেছিল। এই দূরত্ববোধের বিষয়টাই চল্লিশ বছর আগে লেখা আমার প্রথম বইয়ের উপজীব্য ছিল।

কিম উইলশের: দ্য ইয়ারস বইটি ফ্রান্সের অর্ধশতকেরও অধিককালের ঘটনাপুঞ্জ ও পরিবর্তনের বিবরণী। যদিও আপনি এতে বৈশ্বিক ঘটনাসমূহের অভিঘাতের কথা বলেন--- বিটলস, ৯/১১, ইরাক যুদ্ধ ইত্যাদি--- কিন্তু সেসবই ফ্রান্সের দৃষ্টিকোণ থেকে। বইটি অন্যত্র কেমন গৃহীত হয়েছিল? এটি ইন্টারন্যাশনাল ম্যান বুকার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হওয়াতে আপনি কি কিছুটা বিস্মিত হয়েছিলেন?

আনি এর্নো: হ্যাঁ, খুবই। তবে বইটি জার্মানি, ইতালিতে খুব ভালোভাবেই গৃহীত হয়েছিল এবং এমনকি চিনা ভাষাতেও অনূদিত হয়েছিল, তার মানে এর এমন একটা আবেদন ছিল যেটি ফ্রান্সের ইতিহাসের চাইতেও অধিক কিছু ছিল। আমি এটা সরাসরি না বললেও, স্পষ্টতই তা ছিল আমার অনুভূতি ও স্মৃতিরোমন্থনের মধ্য দিয়ে এই সম্মিলিত ইতিহাসেরই গল্প বলা। এর প্রধান চরিত্র সময় ও তার প্রবহমানতা, যা সমস্তকিছুকেই তার মধ্যে গ্রহণ করে, এমনকি আমাদের জীবনকেও।

কিম উইলশের: দ্য ইয়ারস-এ বর্ণিত ছয়টি দশকের মধ্যে পেছনের দিকে তাকিয়ে এমন একটি সময়কে কি দেখতে পান যেটি আপনার জন্য সবচেয়ে বেশি মজাদার, শিক্ষণীয় ও সুখকর ছিল?

আনি এর্নো: যৌথ অভিজ্ঞতার বিবেচনায় ১৯৬৮র অব্যবহিত আগের সময়টা এবং ১৯৮০র দশক পর্যন্ত বিটলসই বোধহয় সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপার ছিল। আর ব্যক্তিগত পর্যায়ে, আমার জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময় ছিল পঁয়তাল্লিশ থেকে ষাট বছর পর্যন্ত বয়সটা, যখন আমার অনুভূতি ছিল সত্যিকারের এক স্বাধীন নারীর, আমার তখন যা মন চাইত তা-ই করতে পারতাম। আমার জন্য সেটা এক দারুণ স্বাধীন সময় ছিল, যখন আমি জীবন সম্পর্কে খুব ভালো বোধ করতাম।

কিম উইলশের: আর এখন?

আনি এর্নো: আমার এখন বয়স হচ্ছে। আমি এবছর ৭৯ হব, আর তখন সবসময়ই ছোটখাটো স্বাস্থ্যসমস্যা আর ক্লান্তির ব্যাপারটা থাকে। সিমোন দ্য ব্যোভোয়ারের শেষদিককার কোনো একটা বইয়ের এক চরিত্র বলে, পেছনে লম্বা একটা অতীত থাকার মধ্যে একধরনের মিষ্টত্ব রয়েছে। এই বয়সটাতে একজন ঠিক সেই অনুভূতিটাই পেতে পারে যা খুব ইতিবাচক। দ্য ইয়ারস-এর সবশেষ ছবিটাতেও, যেখানে নাতনির সঙ্গে এক নারীকে দেখা যায়, এইধরনের একটা বয়সোচিত কোমলতা রয়েছে।

কিম উইলশের: এই বইয়ে আপনি আপনার নারীবাদী মনোভাব গড়ে ওঠার বিষয়টার বর্ণনা দেন, আবার আপনাদের প্রজন্মের নারীদের মধ্যে বিয়ে ও সংসার বিষয়ে যে বিভ্রান্তি তার কথাও বলেন। এখন নারীবাদ বিষয়টা সম্পর্কে আপনার কী অনুভূতি, বিশেষ করে এই #মিটু আন্দোলনের সময়ে, ফ্রান্সে যা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে, যেমনটি ক্যাথরিন দ্যনোভ বলেন যে, এটি বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে গেছে?

আনি এর্নো: ক্যাথরিন দ্যনোভ যখন এটি বলেন তখন আমার তাঁর জন্য খুব লজ্জা হয়েছিল। এটি আসলে একদল সুবিধাভোগী শ্রেণির নারীর মনোভাব। সত্যি বলতে কী, এটিকে আমার বিবমিষা উদ্রেককারী মন্তব্য বলে মনে হয়েছিল। আমি এই আন্দোলনের সঙ্গে পুরোপুরি একমত পোষণ করি। নিশ্চয়ই কিছু অতিরেক রয়েছে, কিন্তু জরুরি বিষয় হল যে, নারীরা আর এই ধরনের ব্যবহার গ্রহণ করতে রাজি নয়। ফ্রান্সে আমরা মেয়েদের খোশামোদ করার এই সংস্কৃতি নিয়ে কত কথা শুনি, কিন্তু এটা মোটেও খোশামোদ নয়, এটা স্রেফ পুরুষাধিপত্যের বিষয় । ক্ষমতার এই অপব্যবহারটা শুধু যৌনতার পরিসরেই নয়, এটি সর্বত্র বিদ্যমান, এমনকি সাহিত্যেও। টেলিভিশন অনুষ্ঠানে মেয়েদেরকে খুব কম ডাকা হয়, যেখানে প্রতি একটি নারীর জন্য তিনজন পুরুষ থাকে। এমন একটা ধারণা রয়েছে যে, মেয়েরা স্রেফ উপন্যাসলিখিয়ে আর পুরুষেরা হচ্ছেন লেখক....

কিম উইলশের: আপনার ভাষ্যে আপনি বরাবরই একজন সর্বগ্রাসী পাঠক ছিলেন। কোন বইগুলো আপনাকে প্রভাবিত করেছে?

আনি এর্নো: এরকম পছন্দ করাটা খুব কঠিন। আমি জারমেইন গ্রিয়ারের দা ফিমেইল ইউনাক বইটা আমার জীবনের এমন একটা সময়ে পাঠ করেছিলাম যখন পড়াটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং সেটা আমার লিখনভঙ্গিকে প্রভাবিত করেছিল। সেরকমই জাঁ পল সার্ত্রের লা নোজে, সিমোন দ্য ব্যোভোয়ারের দা সেকেন্ড সেক্স, ভার্জিনিয়া উল্ফ, অসাধারণ এক লেখক যাঁকে আমি আমার কুড়িতেই আবিষ্কার করেছিলাম, আরও আছেন জর্জ পেরেক। এমনকিছু বই ছিল যেগুলো আমি পড়তে চাইতাম এবং পরে যেগুলোর মতো করে লিখতেও চাইতাম। আমার জন্য গল্প আর বিষয়টাই প্রধান ছিল না, প্রধান ছিল তার আঙ্গিক।

কিম উইলশের: এখন কী বই পড়ছেন?

আনি এর্নো: এই মুহূর্তে আমি লরেন এলকিনের ফ্লান্যোজ: উইমেন ওয়াক দা সিটি ইন পারি, নিউ ইয়র্ক, টোকিও, ভেনিস অ্যান্ড লন্ডন বইটি পড়ছি। এই ভবঘুরেমির বিষয়টা ফ্রান্সে মূলত একটা পুরুষালি ব্যাপার হিসাবে স্বীকৃত; তিনি সেটিকে খুব মজাদারভাবেই মেয়েদের জন্য আত্মসাৎ করে নিয়েছেন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক