জ্যাক হার্শম্যানের সাক্ষাৎকার: আমি লেখি এবং পড়ি আমেরিকান সরকারকে ক্রোধান্ধ করে দেবার মতো কবিতা

পরাগ চৌধুরী
Published : 13 Dec 2020, 03:08 PM
Updated : 13 Dec 2020, 03:08 PM


জ্যাক হার্শম্যানের জন্ম ১৯৩৩ সালে ১৩ ডিসেম্বর নিউইয়র্কে হলেও তিনি বড় হয়েছেন ব্রোঞ্জ (Bronx)-এ। ক্যালিফোর্নিয়ার প্রাক্তন রাজকবি জ্যাক-এর কাব্যশৈলীকে ওয়াল্ট হুইটম্যান, হার্ট ক্রেন, ডিলান টমাস এবং অ্যালেন গিনসবার্গের মতো বিট কবিদের সঙ্গে তুলনা করা হয় । প্রবন্ধ, কবিতা ও অনুবাদ মিলিয়ে তার গ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশের উপরে। জ্যাক ১৯৫৫ সালে নিউইয়র্ক সিটি কলেজ থেকে বি এ ডিগ্রি নিয়ে ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান। সেখান থেকে ১৯৫৭ সালে এম এ এবং ১৯৬১ সালে পিএইচ ডি ডিগ্রি সম্পন্ন করেন । ছাত্র থাকা অবস্থায় একটা বামপন্থী সাহিত্যপত্রিকা Left Curve-এর সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। বর্তমানে The People's Tribune-এর সংবাদদাতা। তার বহু কবিতাগ্রন্থের মধ্যে কয়েকটি: A Correspondence of Americans (1960), Black Alephs (1969), Lyripol (1976), The Bottom Line (1988), Endless Threshold (19992), Front lines (2002) -ইত্যাদি । স্যান ফ্রানসিসকো পাবলিক লাইব্রেরি তাকে 2009-সালে Poet-in-Residence- এর মর্যাদা দেয়। এই অঞ্চলে সাহিত্যচর্চাকারীদের উৎসাহ দেয়ার কাজে আনন্দ পান। এছাড়া প্রতি দুই বছরে একবার অনুষ্ঠিত হওয়া স্যানফ্রানসিসকো আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসবের প্রধান সংগঠক তিনি।

কবিতা উৎসব ২০০৭ সালের পর জ্যাক স্যান ফ্রানসিসকো পাবলিক লাইব্রেরির যৌথ প্রয়াসে লাতিনো, ভিয়েতনামি ও ইরানি কবিতা উৎসবে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া জ্যাক রেভ্যুল্যুশনারি পোয়েটস ব্রিগেডের একজন সক্রিয় কর্মী এবং এগারোটা সাহিত্যসংকলনের সম্পাদনা কাজে সাহায্য করেছে। এতে সংগৃহীত হয়েছে শহরের এগারোটা অঞ্চলের কবিতা।

এই সাক্ষাৎকারটি ইকুয়েডরের গুয়াইয়াকিল শহরে গৃহীত হয়েছিল ২০১৯-এর নভেম্বরে একটি কবিতা উৎসব চলাকালে। কবি জ্যাক হার্শমানকে সেবারেই আমি প্রথম ব্যক্তিগতভাবে চেনার সুযোগ পাই। অবশ্য প্রায় ৩২ বছর আগেই 'আমেরিকান পোয়েট্রি রিভিউ'এর মাধ্যমে তার অসাধারণ কাব্যকৃতির সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল।
মোট দুই ঘন্টার এই সাক্ষাৎকারটি প্রথমে তিন দফায় গৃহীত হয়েছিল– এক দুদিনের ব্যবধানে। পরে দেশে ফিরে বছরখানেক পরে জ্যাককে আরও কিছু জিজ্ঞাসা করার আছে বলায় তিনি প্রশ্নগুলো লিখে পাঠাতে বললেন। গত সেপ্টেম্বরে (২০২০) তাকে আরও কিছু প্রশ্ন লিখিত আকারে পাঠালে তিনি দ্রুতই উত্তরগুলো লিখে পাঠান।
এই সাক্ষাৎকারের প্রথম তিন দফায় সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয়েছিল অডিওতে । অডিওর ওই অংশটি শ্রুতি থেকে লিপিতে নিয়ে এসেছেন অনুবাদক রুহিনা ফেরদৌস ও নূর-ই-ফাতিমা মোশাররফ জাহান। জ্যাক হার্শম্যান কর্তৃক সংশোধিত ও পরিমার্জিত সাক্ষাৎকারটি ইংরেজি থেকে বাংলায় তর্জমা করেছেন প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও সাবেক অধ্যাপক পরাগ চৌধুরী।– রাজু আলাউদ্দিন


অডিও-১

রাজু আলাউদ্দিন: আপনার সম্পর্কে একটা বিশেষ ঘটনা দিয়ে আলাপ শুরু করি। শুনতে একটু অবিশ্বাস্য মনে হলেও আজ থেকে বত্রিশ বছর আগে আমি 'আমেরিকান পোয়েট্রি রিভিউ' এর মাধ্যমে আপনার কবিতার সংস্পর্শে আসি। আপনি যখন জানতে পারেন যে আপনার বাসভূমের বাইরেও আপনার পাঠক আছে তখন আপনার কী অনুভূতি হয়?
জ্যাক হার্শম্যান: সে তো আমার জন্য অবশ্যই আনন্দের বিষয়। কারণ কম্যুনিস্ট হিসাবে আমার আন্তর্জাতিকতার শেকড় কবিতাকে ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করার ভেতর নিহিত। তাই যখন শুনি অন্য ভাষাভাষীরা আমার কবিতা পড়ছে তখন স্বাভাবিকভাবেই আমি আনন্দ বোধ করি । মনে হয় বেশ চমৎকার তো। কবিতার এই যোগাযোগগুলো বিস্ময়কর কিছু করে ফেলতে পারে । এই পারস্পরিক বিনিময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । আর এই যে আপনার সাথে দেখা হওয়া (জ্যাক মৃদু হাসে) অবশ্যই এটা আগ্রহব্যাঞ্জক যে আপনিও আমার কবিতা পড়েছেন। ওগুলো এখনো কার্যক্ষম …এখনো তা উপভোগ্য।
রাজু: অবশ্যই । ঐ কবিতা পত্রিকাটা আমি ভালোবাসি।
জ্যাক: হুঁ। অনেক ভালো ভালো কবিতা ছাপে ওরা। বিশেষ করে, আমার মনে হয় ওদের কাজগুলো ভিন্ন ভিন্ন রঙের পৃষ্ঠায় ভাগ করে ছাপা দরকার। যেমন ধরেন, পল সেলান, যে কিনা থাকতো ফ্রান্সে আর লিখতো জার্মান ভাষায় …
রাজু: আমি প্রথমবার আপনার কবিতা পড়ে অভিভূত হয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছে কবি হিসেবে আপনার যে চৈতন্য তা সীমানা অতিক্রমী …মানে জাতীয় সীমানা। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ।
জ্যাক: হ্যাঁ, যেমন 'রেভ্যুলিউশনারি পোয়েট ব্রিগেডে'র প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন আমি । আমরা একটা সংকলন প্রকাশ করি …এই বাৎসরিক সংকলন একটা। আসলে সামনের বছরের সংকলনে আপনার কোন লেখা প্রকাশের আশা করছি। আপনার অনেকগুলো কবিতা পড়ার পর মনে হয়েছে একটা কবিতা এখানে অবশ্যই ছাপা দরকার। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে আমদের একটা সংকলনের নাম 'ওভারথ্রোয়িং ক্যাপিটালিজম'। আবার বর্তমান ইস্যুর একটা উপ-শিরোনাম হচ্ছে 'এ ওয়ার্ল্ড উইদাউট ওয়ার্স'। গত বছরের উপ-শিরোনাম ছিল ' এ ওয়ার্ল্ড উইদাউট ওয়ালস'। সুতরাং দেখতেই পাচ্ছেন এসব ব্যাপারে আমরা খুবই সচেতন । এগুলোই হচ্ছে যা আমরা করি। এভাবেই আমরা গুরুত্বপপূর্ণ ঘটনাগুলোকে'রেভোল্যুশনারি পোয়েট ব্রিগেড'এবং 'ওয়ার্ল্ড পোয়েট্রি মুভমেন্ট'এ সংগঠিত করি।
রাজু: আপনার কি মনে আছে যে হেমিংওয়ের কাছে, মানে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের কাছে একটা গল্প পাঠিয়েছিলেন… যখন আপনার বয়স মোটে উনিশ বছর ? আর উনি বলেছিলেন "ওহে বালক, আমি তোমাকে মোটেই কোন সাহায্য করতে পারবো না । আমার উনিশ বছর বয়সে আমি যা লিখতাম তার চেয়ে অনেক বেশি ভালো লেখো তুমি"। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো যে এই স্বীকৃতির পরেও আপনি মূলত কবিতার প্রতি নিজেকে নিবেদন করলেন । কিন্তু কেন?


জ্যাক : দাঁড়ান, আমি বিষয়টা ব্যাখ্যা করি। কিন্তু তখন হেমিংওয়ে যা বলেছিলেন তা আপনার পুরোপুরি উদ্ধৃতি দেননি।(জ্যাক হাসতে থাকে)।
রাজু: না । এটা তো উদ্ধৃতির খানিকটা মাত্র।
জ্যাক: যাক,আপনার মনে আছে তাহলে। আমি উনাকে পুরোপুরি নকল করে দুইটা গল্প পাঠিয়েছিলাম। এমন কি উনি আমাকে জবাব দেওয়াতে আমি তো অবাক। জবাবে উনি আমাকে বললেন "আমার উনিশ বছর বয়সে আমি যা লিখতাম তার চেয়ে অনেক বেশি ভালো লেখো তুমি । কিন্তু তোমার লেখার ধরনে চরম ত্রুটির ব্যাপারটা কি জানো? তুমি একদম আমার মতো করে লেখো যা মোটেই ভালো কথা নয়। সুতরাং এখানে তোমার নিজস্ব কন্ঠস্বর নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে"। আর এখানে আপনার প্রশ্নটা নানা দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ এইজন্য যে আমি তখনো একজন ছাত্র । আমি ছোট গল্প লেখার উপর ক্লাস করছিলাম। তখনই আমি হেমিংওয়েকে একশো ভাগ নকল করে তার কাছেই গল্পগুলো পাঠাই। আমি হেমিংওয়ের কাজগুলো খুব ভালোবাসতাম। হেমিংওয়ে একজন অসাধারণ …এবং অন্যভাবে বিচার করলে উনি একজন কবিও বটে। কারণ উনি অত্যধিক সংযমের সঙ্গে বক্তব্য বলার বিষয়টা এমনভাবে রপ্ত করেছিলেন যে তার লেখা ছোট গল্প কি বলে…কাব্বালায় একটা শব্দ আছে …শব্দটা হলো Zimzum আর কাব্বালিক পরিভাষায় এ সম্পর্কে বলা হয় … ঈশ্বরই যদি সবকিছু হয় তাহলে জগৎ সৃষ্টি হলো কিভাবে? ঈশ্বর নিজেকে প্রত্যাহার করে গুটিয়ে নিয়ে আমাদের ঐ স্থানে সুযোগ করে দিলেন পৃথিবীতে বস্তুনিষ্ঠতায় নিজেদের প্রকাশ করতে … এটাই ছিলো ঈশ্বরের লক্ষ্য । এই হচ্ছে কাব্বালিক দর্শন zimzum । হেমিংওয়ের এই অত্যধিক সংযমের ব্যাপারটা …নিজের এই ঊণপ্রকাশ ঈশ্বরের মতোই নিজেকে গুটিয়ে নেবার মতো। বুঝতে পারছেন? হেমিংওয়ে ঊণপ্রকাশের ক্ষেত্রে একজন ওস্তাদ শিল্পী। মানে উনি তার শব্দগুলোকে সর্বোচ্চ নিশ্চয়তায় স্মৃতিজাগানিয়া পরিণতি দিতে চেয়েছেন । যাকগে, কিন্তু এসব সত্বেও যে কারণে আমি হেমিংওয়ে থেকে সরে গিয়ে বেড়ে উঠতে লাগলাম তা হলো তদ্দিনে আমি জেমস জয়েসকে আবিষ্কার করে ফেলেছি। এবং জেমস জয়েস হচ্ছে আমার আসল গুরু । সত্যি বলতে কি আন্ডারগ্রাজুয়েটে তার 'ফিনিগানস ওয়েক' নিয়ে আমি সন্দর্ভ লেখি।
রাজু: হে ঈশ্বর! ওটা যে সবচে বেশি কঠিন!
জ্যাক: হ্যাঁ, তাই। অনেক বেশি জটিল। কিন্তু আমার বর্তমান কাজে এই বইটার প্রভাব সর্বোচ্চ । আমি যে ভাষায় লিখেছি তাকে আমি বলি"punese", "chinese" নয়, বরং "punese".
রাজু: পুনিজ… আপনি মনে হয় শব্দ আর ধারণা নিয়ে খেলা করতে লেগেছেন।
জ্যাক: শব্দ ধরে ধরে ফিনিগানস ওয়েক-এর ব্যাপ্তি নিয়ে খেলা করছি। যতোখানি সম্ভব আমার সকল গুরুকে স্বীকৃতি দিয়েই আমি তা করেছি।
রাজু: এইজন্যই কি কোন কোন সমালোচক আপনার কাজকে জয়েস কিম্বা হুইটম্যানের সঙ্গে তুলনা করেছেন?
জ্যাক: ওরা যদি এমন করে থাকে তাহলে আমার তা জানা নাই … এটা আপনি বোধহয় আমার চেয়ে ভালো জানেন …আপনি ওগুলো পড়েছেন। কোন কোন সমালোচক …জয়েস এবং হুইটম্যানের সঙ্গে।
রাজু: যাকগে, আমি ইউলিসিস পড়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু শেষ করতে পারিনি।
জ্যাক: তাই নাকি?
রাজু: হ্যাঁ ।
জ্যাক: কিন্তু বিশ শতকের সর্বাধিক প্রভাবশালী বই ওটা।
রাজু: অবশ্যই। বইটার উপর কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ আমি পড়েছি। কিন্তু কখনোই বইটার শেষ অব্দি পড়তে পারিনি।(জ্যাক হাসতে থাকে) প্রথমে শুরু করে কয়েক পাতা পড়ে ফেলি, তারপর আরো কতটুক অগ্রসর হই, কিন্তু এরপর আর পড়া হয় না। কিন্তু এই বইটা থেকে যে কত কিছু শেখার আছে … এতে কোনো সন্দেহ নেই।
জ্যাক: হ্যাঁ । অবশ্যই ।
রাজু: তো,আপনি হেমিংওয়েকে অনুসরণ করেননি। মূলত কবিতায় নিজেকে উৎসর্গ করলেন । আমার প্রশ্ন ছিলো কী আপনাকে কবিতায় টেনে আনলো?
জ্যাক: বেশ। আমি কবিতা লেখা শুরু করলাম । কলেজে যাবার আগে পনের বছর বয়সে আমি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হলাম। The Bronx নামের একটা সাপ্তাহিক পত্রিকায় লেখালেখির কাজ পেলাম। আমি তখনো হাই স্কুলে যাচ্ছি। কিন্তু হতে চাচ্ছি সাংবাদিক। এবং …কদিন পর অফিসে পুলিশ এসে পত্রিকার লালবাতি জ্বালিয়ে গেল। কি অদ্ভুত ব্যাপার। মনে আছে প্রথম দিন অফিসে গিয়ে দেখি একটা লোক এগারোটা টেলিফোন সামনে নিয়ে বসে আছে। আমি ভাবলাম এ আবার কি? অন্য ঘরটায় আরো দুইজন মানুষ আসলো…ওখানে আরো একটা ঘর ছিলো …ঐ দুইজন বসতো একটা সুইচবোর্ডের সামনে। আসলে ওটা ছিল Yonkers raceway-র সঙ্গে যুক্ত একটা ঘোড়দৌড়ের বাজির অর্থের হিসাবের খাতা রক্ষা করার অবৈধ অফিস। ঐ সুইচবোর্ড মারফত ওরা গ্রাহক সংগ্রহের কাজ করত। এই উৎখাতের কাজটা করেছিলো Kefauver Crime Commission, ১৯৫২ সালের আমেরিকায় সবচে বড় ক্রাইম কমিশন । আসলে সম্পাদকসহ আমি তখন জেলে যাওয়ার অপেক্ষায় । কিন্তু আমাদের বলা হলো ….আমারা যখন কোর্টে যাবার জন্যে বের হচ্ছি তখন আমাদের বস বললো যে আমাদের এমনকি শহরেও যাওয়া লাগবে না । সবকিছু সামাল দেয়া গেছে। শুধু পত্রিকাটা বন্ধ করে দিতে হবে।

তো আমার শুরুটা ছিলো সাংবাদিক হিসেবে লেখালেখালেখি করা। আমার বাবা ….আমার বাবা ছিলো …মানে কুড়ি বছর ধরে বাবা Knights of Pythias নামের একটা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে লেখালেখি করছিল। বাবা নকল করতো এমন একজন সাংবাদিককে যে কিনা ফিনিগানস ওয়েক-এর মতো করে একই ধ্বনির ভিন্নার্থক শব্দ-কৌতুকের ব্যবহার জানতো। বাবার ব্যাক্তিগত উদ্ভাবনী শক্তি তেমন ছিলো না । কিন্তু বাচনিক দিক দিয়ে উদ্ভাবন ছিলো ভালো । আমিও ভাষা খুব ভালোবাসি । এরপর যখন কলেজে যাওয়া শুরু করলাম …তখন পড়তে লাগলাম জয়েস । ওর লেখা আমার খুবই ভালো লাগতো। এরপর, দুইজন কবি আমাকে ভয়ানক রকম প্রভাবিত করে।
রাজু: ওরা কারা ?
জ্যাক: ওদের একজনের নাম হলো হার্ট ক্রেন । আর তখন আমি ডিলান টমাস প্রায় শেষ করে এনেছি। ওকে নিয়ে যে কবিতা লিখেছি তা আগামীকাল আপনাকে যে বইটা দেবো তাতে আছে (জ্যাকের লেখা বই দ্য ফ্রন্ট লাইনস )। তার মৃত্যুর পর কবিতাটা লেখি। খেয়াল করে দেখুন আমি বলেছি হার্ট ক্রেন এবং ডিলান টমাস । একজন হলো আমেরিকান যে কিনা একটা মহাকাব্য না হলেও মহাকাব্যিক কবিতা দ্য ব্রিজ লিখেছে । আরেকজন হচ্ছে ইউরোপীয়। আমার জীবনের একটা বড় অংশ জুড়ে আছে ইউরোপ । জয়েস, ডিলান টমাস এবং অনেক ইতালিয়ান, ফ্রেঞ্চ, রাশান সাহিত্য আমি অনুবাদ করেছি।
রাজু: দুইটা দেশ।
জ্যাক: শুধু দেশ না মহাদেশও বটে । এই হচ্ছে আমার…এখান থেকেই শুরু …আমি ঠিক জানি না …কি আমার প্রথম দিককার কোন প্রেমিকা অথবা …ঠিক করে বলা মুশকিল যে কিসে আমাকে কবিতার দিকে ঠেলে দিলো। তবে এটা ঠিক যে কবিতা লেখা শুরু করি কলেজের প্রথম বছর থেকেই …বয়স সতের ….আমি তখন সতের বছরের । তখন কিছু একটা ছাপা হয়েছিল …একদম ঠিক। এ সময় লিখেছিলাম বটে কিন্তু ছাপা হলো ১৯৫২তে। তখন আমি উনিশ বছরের।
রাজু: আপনার জন্মসাল তো ১৯৩৩।
জ্যাক: হুঁ। এরপরে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পুরোটা সময় আমি একজন কবি। সেটা এগারো বছর ধরে । যখন UCLA থেকে চাকরিচ্যুত হই তখনো অবশ্যই আমি কবিতা লেখি। এবং আমার সবথেকে বড় কাজ হচ্ছে …মনে হয় বলেছি আপনাকে …The Arcanes নামে এক হাজার পৃষ্ঠার এক দীর্ঘ কবিতা। এখন এই রকম আছে দুইটা। প্রকাশ করেছে ইতালির সালেরনোর Multimedia Edizioni; শুধু আমেরিকান ভাষায়।
রাজু: ও হ্যাঁ । আপনার এক হাজার পৃষ্ঠার বড় কাজটা ।
জ্যাক: আর তিন নম্বরটা এই বেরোল বলে। ওটা এখন মেইলে আছে । আমার জন্মদিন ১৩ ডিসেম্বরে সান ফ্রান্সিসকোতে তিন নম্বরটার উদ্বোধন করা হবে ।
রাজু: আপনি বলছিলেন যে…. আপনি একজন প্রফেসর ছিলেন, একজন উজ্জ্বল প্রফেসর। উদ্ভাবনী শক্তি সম্পন্ন একজন। এভাবেই আপনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে ।"উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন প্রফেসর "। তো আপনি ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন বলে আপনার চাকরিটা চলে গেল । আপনি এই যুদ্ধের বিরুদ্ধবাদী ছিলেন।


জ্যাক: আমি আমার ছাত্রদের শিখানোর চেষ্টা করছিলাম ….
রাজু: এবং আপনি এই যুদ্ধের বিরোধিতা করতে ওদের সাহস দিচ্ছিলেন …
জ্যাক: শুধু এটাই না। টিভিতে দেখলাম যে যদি কোন মেধাবী ছাত্র এ গ্রেড পায় তাহলে তাকে আর বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে হবে না । আমার দুইটা ক্লাসে মোট ছাত্র ছিলো সাতশো জন। তখন আমি ঘোষণা দিলাম যে, যোগ্যতা সম্পন্ন যে কোন ছাত্রকে এ গ্রেড দেবো আমি। কারণ আমি চাইনি যে ওরা কেউ যুদ্ধে যাক। সুতরাং সকল সুযোগ্য ছাত্রই এ গ্রেড পাবে। আমি অন্যদেরকেও বললাম …মানে শারীরিক অক্ষমতার জন্য যে ছাত্রদের যুদ্ধে যেতে হবে না এবং মেয়েদেরকেও বললাম যে তারা যেন বি গ্রেড নেয় । কারণ সাতশোজনকে তো আর একত্রে এ গ্রেড দেয়া যায় না । আমি সক্ষম ছেলেদের বললাম যে "তোমরা যদি কেউ এ গ্রেড চাও তাহলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করো । আমি এ গ্রেড দিয়ে দেবো"।
সাত আটটা মেয়েও এসে এ গ্রেড নিয়ে গেল। ছেলেরা এসে এ গ্রেড নিয়ে নিল। বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে বললো যে এ কাজটা হলো রাষ্ট্রনীতি ভাঙার সামিল …এবং আগড়ম বাগড়ম বলতে লাগলো । ওরা চাকরিটা খেয়ে দিলো। ওটা ছিলো আমার জন্য সবচেয়ে ভালো ব্যাপার।( রাজু হাসতে থাকে ) এভাবে আমি বিত্তবানদের জগৎ থেকে নির্বাসিত হলাম । এক্কেবারে পথে নেমে এলাম আমি । ডেরা বাঁধলাম লস এঞ্জেলেসের ভেনিসে। ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পাক্কা চার বছর। পরের বছর সরে গেলাম ভেনিসের কাছেই টোপাঙ্গা কেনিয়নে। ইতোমধ্যে সত্তর সালেই লিখে শেষ করলাম একটা বই যার শেষ পর্যন্ত নাম হলো The Vietnam Arcane. আমি জানি আপনার বিশ্বাস হবে না কিন্তু এটাই সত্য । বইটা লেখা হয়েছে ভিয়েতনামের Vodou সম্প্রদায়ের উপর ভিত্তি করে । এরা Dao Mau ধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত । যার সরলার্থ মাতৃবন্দনা । বর্তমানে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় ওদের এগারোটা মন্দির আছে । একদল আছে স্যানফ্রানসিসকো। আমি ওখানে গিয়েছিলাম । ওদের কাজেও অংশ নিয়েছি আমি । আমেরিকান যুদ্ধের সময় এসব নিষিদ্ধ ছিলো । কারণ ওরা চাইতো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত সবাই যেন এই যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে…আমেরিকানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হলে ভিয়েতনামে এই ধর্মচর্চা আবার শুরু হয় । আমার একজন প্রিয় ভিয়েতনামী বন্ধু আছে । ও যখন আত্মীয় বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে দেশে যায় তখন আমার জন্য Dao Mau নিয়ে লেখা বইপত্র নিয়ে আসে । ওদের ধর্মাচার Len Dong নামে পরিচিত । ঘটনাক্রমে আমি এটা আবিষ্কার করি। ঐ বিশেষ সময়ে আমার কবি হয়ে ওঠার কথা আপনাকে জানাচ্ছি আমি। এর আগে থেকেই আমি লিখছি । মাস দুয়েকের মধ্যে আমার অনুবাদে একটা ডাচ কবিতার বই প্রকাশিত হবে …সামনের বছর, জানুয়ারিতে। মহৎ ডাচ কবি Jan Slauerhoff – কৃত কবিতাগ্রন্থের এটাই আমার প্রথম অনুবাদ । তারপর ধরুন,ছেষট্টি সালে UCLA আমার চাকরিটা কেড়ে নিলেও একটা জিনিস নেয়নি: আমার লাইব্রেরি কার্ড । সাতষট্টি সালে আমি লাইব্রেরিতে খুঁজে পেলাম-কাছাকাছি সময়ে প্রকাশিত- কম্যুনিস্ট কবি রেনে দেপেস্ত্রে-এর লেখা একটা কবিতার বই ।
রাজু: রেনে দেপেস্ত্রে… হাইতির বিখ্যাত কবি ।
জ্যাক: হ্যাঁ। আর বইটার নাম হচ্ছে A Rainbow for the Cristian West.বইটার ভিত্তি হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের Vodou Loas – এ Vodou হামলা। এই অঞ্চলটা হচ্ছে সবচেয়ে বেশি সাম্প্রদায়িক এবং সবচেয়ে বেশি গোলাবারুদ ঠাসা অঞ্চল …আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চল শুধু যে বেশি মাত্রায় সাম্প্রদায়িক তা নয় এখানেই আছে অস্ত্রাগার, ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় জঙ্গিরা এখানে বসেই বন্দুক পিস্তল বানাতো। সুতরাং …এর পর আমি ঐ বইটা অনুবাদ করি। তখন থেকেই আমি নিজেকে আর কবি বলি না, বলি কম্যুনিস্ট কবি। এই বইটা আমার সমস্ত প্রবণতাই বদলে দেয়। আপনি বুঝতে পারছেন, যে আমি কিন্তু তখনো রাস্তায়। আমি তখন আর শিক্ষা সম্পর্কিত কিছুর সঙ্গে যুক্ত নই।
রাজু: হ্যাঁ, একদমই সত্যি । এবং … মায়াকোভস্কির গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব আছে আপনার বদলে যাবার ব্যপারে ।
জ্যাক: কার কথা বললেন?
রাজু: ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির ভূমিকা আছে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি …
জ্যাক: দাঁড়ান আমি ব্যাখ্যা করি। ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত আমি ডক্টোরাল থিসিস করি…. সে সময় ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি থিসিস সম্পর্কিত পড়াশোনা করছি ।
রাজু: আপনার থিসিসের বিষয় কী ছিলো?
জ্যাক: বিষয় …The Orchestrated Novel. আমি কাব্যিক উপন্যাস নিয়ে কাজ করছিলাম ।
রাজু: ও, অর্কেস্ট্রেটেড নভেল?
জ্যাক: হ্যাঁ । জেমস জয়েসের দুজন বন্ধুকে নিয়ে। একজন মহিলা যার নাম জুনা বার্নেস (Djuna Barnes), উনার একটা বই আছে যার নাম হচ্ছে Nightwood,আমার ধারণা এটা বিশ শতকের একটা অসাধারণভাবে লেখা বই ।
রাজু: আরেকজন কে?
জ্যাক: আরেকজন হচ্ছে হেরমান ব্রখ, সে ছিলো ভিয়েনার লোক। তার উপন্যাসের নাম The Death of Virgil। দুইজনই ছিলো জয়েসের বন্ধু । লেখক হেরমান ব্রখ সম্পর্কে বলা হয় …সাধারণত ওরা বলে Ulysses -এর লিওপোল্ড ব্লুম একটা বাস্তব চরিত্র অবলম্বনে লেখা । তার নাম ইতালো স্ভেবো, একজন ইহুদি লেখক…খুব ভালো লেখক…ইতালীয়-ইহুদি লেখক।
রাজু: হ্যাঁ । খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন ইতালীয় লেখক।
জ্যাক: ইতালো স্ভেবো ছিলো ত্রিয়েস্তে-এর এক ইহুদি ছাত্র। জয়েস তাকে ইংরেজি পড়াতো।
রাজু: তাই নাকি? এটা তো জানা ছিলো না । খুবই ভালো ঔপন্যাসিক।
জ্যাক: হ্যাঁ, একজন অসাধারণ ঔপন্যাসিক। ওরা বলে যে আসলে লিওপোল্ড ব্লুম একটা বাস্তব চরিত্র …আসল লোকটা হচ্ছে ইতালো স্ভেবো, ও হচ্ছে ইউলিসিস-এর ব্লুম-এর বর্ণনার প্রতিরূপ । অথবা এমনটাই বলেন অর্তেগা ই গাসেৎ। আবার অনেকই বলে এটা অন্য কেউ । তা যাকগে, আমি ইন্ডিয়ানায় থিসিস লিখছি। তখন শুধু এর জন্যই পড়াশোনা করছি । ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা School of Letters ছিলো । আমার প্রথম স্ত্রী রুথ ছিলো ওখানকার সেক্রেটারি। একদিন হলো কি… ওখানে সামার সেশানে ওয়াশিংটন থেকে এক লোক এলো… একজন প্রফেসর । রাশিয়ান প্রফেসর । তার নাম হচ্ছে ভিক্টর আর্লিখ.
রাজু: হ্যাঁ । নামটা আমি দেখেছি কোথাও।
জ্যাক: ভিক্টর ওখানে পড়াতে এলে আমাদের বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো । ওর একটা বই আছে, বেশ নামকরা বই, Russian Formalism, রাশিয়ার সাহিত্য জগৎ নিয়ে লেখা বই। আমি ওকে মায়াকোভস্কির কবিতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললাম:" ভিক্টর তুমি আমাকে মায়াকোভস্কির অনুবাদের আদিপাঠ দাও না কেন" ? ও আমাকে তাই দিলো। এবং আমি তা Electric Iron নামের বইয়ে সংযুক্ত করেছি। এটা হচ্ছে আমার রাশিয়ান ভাষায় লেখালেখি শুরু করার ঠিক দশ বছর আগের ঘটনা ।( এরপরের বারো বছর ধরে আমি রাশিয়ান ভাষায় প্রতিদিন একটা করে কবিতা লিখে তা কোন ক্যাফে অথবা পাবলিক পাঠ্যস্থানে আবৃত্তি করতাম )
রাজু: সত্যি তাই? ওরেব্বাস! কি অসাধারণ!
জ্যাক: এখন সেগুলো একটা বই আকারে ছাপা হবে …দুই এক বছরের মধ্যেই ।
রাজু: রাশিয়ান ভাষায়?
জ্যাক: যে রাশিয়ান ভাষায় আমি ওগুলো লিখেছি।
রাজু: আপনার নিজের করা অনুবাদসহ?
জ্যাক: ইয়ে, মানে আমি যখন কবিতাগুলো পড়বো তখনি অনুবাদ করবো। যেমন ধরুন (জ্যাক রাশিয়ান ভাষায় কবিতা আবৃত্তি করে) এখন আমার রাশিয়ান ভাষায় লেখা কবিতা আপনার জন্য অনুবাদ করি: " তুমি তো ক্রীতদাস নও/এবং আমিও নই যন্ত্র/ এবং এটা কোন আফিম-ডেরার স্বপ্ন নয়, কমরেড "।
রাজু: ওয়াও! (রাজু হাততালি দিলে জ্যাক হাসতে থাকে ) ব্রাভো! কি চমৎকার, কি সুন্দর কবিতা! মায়াকোভস্কির প্রভাব…শুরুটা তো সেখান থেকেই।
জ্যাক: ওটা একটা প্রধান প্রভাব তো বটেই। আমি সেদিন যে সাক্ষাৎকার দিলাম, ওখানে এটাই জিজ্ঞেস করেছিল । মেয়েটি আমার কাছে দুটো শব্দ চেয়েছিলো। সিয়ামারা ( ইকুয়েডরের সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী মেয়েটি) আমাকে বলল" আমাকে ডিলান টমাস কি তা দুই শব্দে বলুন"। আমি বললাম " একজন শামান"। এরপরে সে মায়াকোভস্কি সম্পর্কে জানতে চাইলো । আমি বললাম "উনি বীট প্রজন্মের পিতা"।
রাজু: আপনি কি এই কথাগুলো কখনো আপনার বন্ধু এলেন গিনসবার্গকে বলেছেন যাকে আপনি মায়াকোভস্কির টেক্সট দেখিয়েছিলেন?
জ্যাক: হ্যাঁ, অবশ্যই । এ হলো আপনার জানার বিষয়। কিন্তু আমি আপনাকে আরেকটা বিষয় জানাতে চাই।
রাজু: হ্যাঁ, অবশ্যই । প্লিজ ।


জ্যাক: মায়াকোভস্কি হচ্ছে এই শতকের প্রথম পথ-কবি । তার প্রতি আমার দৃষ্টি পড়ার একটা কারণ বলশেভিক বিপ্লবের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা । আরেকটা কারণ মায়াকোভস্কির সাংবাদিক সুর-সংকেতে গিনসবার্গের "হাউল" কোনো একটা স্মৃতি জাগানিয়ার কাজ করেছিলো । আপনাকে আরেকটা বিষয় জানাতে চাই … ১৯৫৭ সালে আমি নিউইয়র্ক যাই। অ্যালেনের বাড়িতে গিয়ে আমি তাকে টাইপ করা অবস্থায় Electric Iron দেখাই …. যা ছিলো আমার করা মায়াকোভস্কির রূপান্তর । ভিক্টর আমাকে শব্দগুলো দেয়,আমি তখনো রাশান জানি না । ভিক্টর আমাকে শব্দগুলো দিলে আমি সেটাকে আমেরিকান কবিতায় রূপান্তর করি। আমি মায়াকোভস্কির লেখা আমেরিকান ভাষায় আনি মুক্তক-ছন্দে। এবং এটাই সেই অনুবাদ (অবশ্য " হাউল"প্রকাশিত হলে অ্যালেনের জন্য একটা ছোট প্রশংসা-কবিতাও লেখি আমি ) যার মাধ্যমে ওর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে,যখন আমি ঐ টেক্সট নিয়ে নিউইয়র্ক যাই ১৯৫৭ সালে। এলেন আমাকে বলল " মায়াকোভস্কি …সে তো আমার গুরু"। এবং এরপর এ কথা সে আর দ্বিতীয়বার কোথাও বলেনি এবং আমি এ কথা কখনো ছাপার অক্ষরেও দেখিনি। গিনসবার্গ কম্যুনিজমের ব্যাপারে মানসিক বিভ্রমে (Paranoid) ছিলো। সে সবসময় উইলিয়াম ব্লেইকের নাম উল্লেখ করতো । ও অ্যাংলো আমেরিকান হয়েই থাকলো। উইলিয়াম ব্লেইক না হয় ওয়াল্ট হুইটম্যান ….
রাজু: কিন্তু উনি তো কখনো উল্লেখই….
জ্যাক: আপনি কখনোই জানতে পারবেন না কারণ ও ছিলো ভ্রমগ্রস্ত একজন মানুষ। আর ছিলো বিষন্ন । খুবই বিষন্ন । পিয়ের পাওলো পাসোলিনির মতোই বিমর্ষতায় ভুগতো ।
রাজু: পিয়ের…যার কাজ ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন আপনি?
জ্যাক: হ্যাঁ । আমিই অনুবাদ করি। পিয়ের আমাকে বললো "সকল কবির মধ্যে এই একজন অ্যালেন গিনসবার্গ, যে কিনা জনমানুষকে ভাই বানাতে পারে…সবাইকে ভ্রাতৃত্বে বাঁধতে পারে । ইতালিতে এমনটা হয় না"। ও যে অ্যালেনকে ভালোবাসতো তার কারণ কোথায় থামতে হবে তা অ্যালেনের জানা ছিলো । এ ব্যাপারে খুবই ভালো সে। ভ্রাতৃত্বে পূর্ণ একজন মানুষ, জনগণের পর্যায়ের একজন মানুষ। জনগণের পর্যায়ের। এদিকটায় খুবই ভালো। যাকগে…তো, মায়াকোভস্কির যে ব্যাপ্তি …সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমার জীবনেও মায়াকোভস্কি একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর আমি জানি আপনি বিশ্বাস করবেন না বটে কিন্তু ব্যাপারটা সত্যি । ( জ্যাক হাসতে থাকে )
রাজু: ( রাজু হাসে ) আচ্ছা ঠিক আছে,বলেন প্লিজ।
জ্যাক : আমি ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৮ পর্যন্ত (জ্যাক একটা পৃষ্ঠা নিয়ে কিছু একটা দেখায় ) আমি এগুলো সাধারণ কাগজ অথবা কার্ডবোর্ড যাই পাওয়া যেত তার উপর ৭৫০০০ থেকে ১০০০,০০০-টা পর্যন্ত বানাতাম। প্রথমে একটা ছবি আঁকতাম … যা একদম জীবন্ত মনে হয় । তারপর আমি একটা শব্দ লিখতাম … একটা রাশান শব্দ, ঠিক আছে? ( জ্যাক একটা ছবি এঁকে দেখায়)….এর উপর আমি বলতাম "AmeRus" শব্দ-খেলা "Amorous" মতো। আর নিচে লিখতাম কম্যুনিস্ট । আমার প্রতিটা কাজেই আমি এটা লিখতাম ।

(ছোট্ট বিরতি )
রাশান ভাষায় লিখতাম আমি । তারপর আমেরিকান ভাষায় লিখতাম "সলিডারিটি" । ঠিক "সলিডারিটি" বাংলাদেশের মতো। এটা লিখতাম একদিকে আর অন্যদিকে লিখতাম "No Nazis" আমি আরো বলতাম "NoNukes" অথবা "No Klan"। তারপর আমি বলতাম …এখানে নিচে…সেখানে শুধু লিখতাম "ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি"। আমি কিন্তু "presente" বলতাম না, বরং আমেরিকান ভাষায় বলতাম "present " যেটা স্প্যানিশ ভাষায় " presente"- এর অনুরূপ । কিন্তু আমি বলবো মায়াকোভস্কি…ঠিক যেন …যেন এই উপহারটুকুতে ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির উপস্থিতি আছে …যা আমি জনগনের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করছি …ক্বচিৎ কখনো,ঐ লিফলেটে একটা হাইকুও লিখে দিতাম …মানে একটা ব্যঞ্জনাময় ইশারায় …আমি এক,দুই,তিন,চার,পাঁচ, ছয়টা ইঙ্গিতসহ আমি তৈরি করতাম ৭৫-১০০,০০০ লিফলেট ।
রাজু: আচ্ছা, এটা তাহলে আপনার একটা নতুন সৃষ্টি। একটা নতুন সাহিত্যরূপ যা আপনাকে আপনার ভাবনাগুলো নিয়ে খেলতে দেয়?
জ্যাক : এটাকে "Agitprop"- এর একটা সাহিত্যরূপ বলা যায়,সাংস্কৃতিক অ্যাজিটপ্রপ যা রাশিয়া থেকে …
রাজু: সাংস্কৃতিক কি বললেন?
জ্যাক: অ্যাজিটপ্রপ …অ্যা-জি …অ্যাজিটপ্রপাগান্ডা …অ্যাজিটপ্রপ …এটা একটা রাশান শব্দ ।
রাজু: ঠিক আছে । প্রপাগান্ডা।
জ্যাক: শুধু প্রপাগান্ড না …. সাংস্কৃতিক প্রপাগান্ডা। এখানে কবিদের উল্লেখ থাকে এবং আমি এগুলো বারো বছর ধরে বিতরণ করেছি। এগুলোর প্রত্যেকটা আলাদা আলাদা শিল্পকর্ম । মাত্র দুই মাস আগে আমর এক কবি বন্ধু রোনাল্ড সউর (Ronald Saur) মারা গেছে। তার মৃত্যুর পরে তার স্ত্রী একটা খামে ভরে ওগুলোর তিরিশটা আমাকে দিয়ে গেল যা আমার বন্ধু বহু বছর ধরে সংগ্রহ করেছিলো।
রাজু: আপনি যখন শিক্ষকতার পেশায় ছিলেন তখন আপনার কিছু ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র ছিলো … যেমন জিম মরিসন…গায়ক এবং …সে তো আপনার ছাত্র ছিলো।
জ্যাক: দাঁড়ান আমি ব্যাখ্যা করি। এবং …আমি ব্যাখ্যা করার পর জিম মরিসনের কথা শেষ হবে।


রাজু: অবশ্যই ।
জ্যাক: আসলে আমি যেখানে বক্তৃতা দিচ্ছিলাম তার পাশের বিল্ডিংয়েই জিম মরিসন ফিল্ম নিয়ে পড়াশোনা করছিল। এটা ছিলো জনগণের জন্য উন্মুক্ত একটা বক্তৃতা । তো সে আমার বক্তৃতার ক্লাসে এসে বসতে পারতো। আসলে, যথেষ্ট পরিহাসের কথা এটাই যে সে আমার ক্লাসে এসে বসতো একজন ছাত্র-বন্ধুকে নিয়ে । সেই বন্ধু এখনো জীবিত এবং থাকে সান ফ্রান্সিসকোতে । ওর নাম মাইকেল হাওয়ার্ড । Aggi( জ্যাকের স্ত্রী) এবং আমার খুবই ভালো বন্ধু সে। ওরা এসে আমার ক্লাসে বসতো। একদিন ক্লাসের শেষে আমি তখনো স্টেজে দাঁড়ানো । যদি কেউ চলতি ক্লাসে প্রশ্ন না করে থাকে তাহলে সে তখন এসে একটা প্রশ্ন করতে পারতো। তো, সেদিন একজন প্রশ্ন করলো । কি উত্তর দিয়েছিলাম মনে নাই । তখন অন্য ছাত্রটা প্রশ্নকারীকে দেখিয়ে বলল" ও হচ্ছে জিম মরিসন"।এখন বুঝে দেখেন, রাজু, আমি হচ্ছি নিউইয়র্কবাসী একজন । আমার কাছে সংগীত-রুচি মানে পপ সংস্কৃতি না। জ্যাজ হলো আমার পছন্দ। এবং সেজন্যই আমি বললাম "জিম মরিসন কে"? কারণ তার রেকর্ড তখন সবেমাত্র বেরিয়েছে। ওর কাজ সঙ্গে সঙ্গে সকল ছাত্রের জানা হয়ে গেছে। কিন্তু আমি কিছুই জানি না।
রাজু: হ্যাঁ। বুঝতে পারছি … সে তো তখনি বিখ্যাত।
জ্যাক: হ্যাঁ, সে ছাত্রদের মধ্যে তখনি বিখ্যাত এবং সাধারণ্যেও । এর কয়েক বছর পর চাকরিহীন আমি যখন ভেনিস বিচে বাস করি তখন একদিন মাইকেল ম্যাকম্লুর (Michael McMlure)-এর পরিবর্তে একটা অনুষ্ঠানে কবিতা পড়ার ডাক পড়লো আমার । এবং যথারীতি আমি কবিতা পড়লাম …ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতা করে,আমেরিকান সরকারের বিরোধিতা করে। এবং তখন তার কাছ থেকে আসতে থাকলো শ্লেষাত্মক উক্তি। কিন্তু এখন আমার মনে হয় এটা ওর কাজ ছিলো না, সম্ভবত ওর কোন বন্ধু। ওরা আমার প্রতি শ্লেষোক্তি করায় আমি গেলাম ক্ষেপে। ওরা আবৃত্তিতে আমাকে বাধা দিলো কারণ আমার কবিতা ছিলো যুদ্ধবিরোধী। ওদের ব্যাঙ্গোক্তিতে রাগে ক্ষিপ্ত হয়ে আমি থিয়েটার হল ছেড়ে চলে এলাম । আমিও ওদের সঙ্গে এক জায়গায় থাকতে যাচ্ছিলাম না কারণ আমি লেখি এবং পড়ি আমেরিকান সরকারকে ক্রোধান্ধ করে দেবার মতো কবিতা । তখন সে স্টেজে উঠলো এবং আমার স্পষ্টতই মনে হলো ও খুব শ্লেষপূর্ণ ভঙ্গিতে গাইতে যাচ্ছে "The Star-spangled Banner." কিন্তু আমার মনে হয় ওর বোধহয় পরে গ্লানিবোধ হয়েছিল। কারণ দুই দিন পরে ওর লেখা এবং প্রকাশ করা একটা কবিতার বই পেলাম ডাকে। বইটা সে তার সেক্রেটারিকে দিয়ে পাঠিয়েছিলো। এই একই গল্প আমি আমার সব সাক্ষাৎকারে বলেছি, এই যেমন এখন আপনাকে বললাম। কিন্তু সেই সাক্ষাৎকারের একটাও আজ পর্যন্ত জনগণের সামনে আসে নাই। (জ্যাক হাসিতে ফেটে পড়ে ) কেন আসেনি আপনি বুঝতে পারছেন?
রাজু: (হাসতে থাকে ) হ্যাঁ । হ্যাঁ অবশ্যই । আপনার আর কোন ছাত্র আছে যে খুব বিখ্যাত?
জ্যাক : হ্যাঁ আছে …
রাজু: আপনার মনে আছে?
জ্যাক: হ্যাঁ তা মনে আছে । আমার একজন ছাত্র ছিলো যার নাম স্টিফেন কেসলার, ও হচ্ছে কবি এবং স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদক। খুবই ভালো অনুবাদক । আরেকজন হচ্ছে গ্যারি গ্যাক (Gary Gach), গ্যারি হচ্ছে বৌদ্ধ । বুদ্ধিজম নিয়ে বই লেখার পাশাপাশি ও একজন কবিও । আরেকজনও ছিলো কবি। রেডিওর কবি। জেলখানায় বসে আসামীদের সঙ্গে কাজ করতো। সে আর বেঁচে নেই । ওর নাম ম্যাক্স স্কুয়ার্টজ (Max Schwartz)… বছর কয়েক আগে মারা গেছে।
রাজু: আমাকে বলবেন কি …আপনার সমসাময়িক কবিদের কথা । যেমন ধরুন অ্যালেন গিনসবার্গ, বব ডিলান, জর্জ হ্যারিসন …
জ্যাক : না, আমি তো ওদের চিনি না । আমি ডিলানকে চিনি না, আমি হ্যারিসনকে চিনি না…
রাজু : বেশ,কিন্তু আপনি তো অ্যালেন গিনসবার্গের বন্ধু ছিলেন।
জ্যাক: হ্যাঁ । ও আচ্ছা, আপনাকে আবার বলি। অ্যালেন ছিলো সাহিত্য-লেখক। বব ডিলান নোবেলজয়ী হলেও আমার মনে হয় সে সাহিত্য-লেখক না। সে মূলত একজন লোকগানের গায়ক মাত্র। খুবই ভালো গায়ক। তাছাড়া সে চার্চের গায়কদের জন্য স্তুতিগানেরও লেখক। বুঝেছেন? এজন্যই তাকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়।
রাজু: আপনি কি বিশ্বাস করেন না যে, ঐ গানগুলির কোন সাহিত্যমূল্য আছে?
জ্যাক: ও হ্যাঁ । অবশ্যই আছে । ষাটের দশকের ঐ গানগুলি …দেখা যাচ্ছে এগুলো খুবই স্থায়ী …


রাজু: আমার ধারনা ওগুলো গীতিময় কবিতা।
জ্যাক: হ্যাঁ,তা অবশ্য ।
রাজু: এবং এ নিয়ে বিতর্ক আছে …ঠিক বিতর্ক না, কিন্তু তার গীতিকবিতার উৎকর্ষ বিষয়ে কোন কোন সমালোচকের সন্দেহ আছে।
জ্যাক: হ্যাঁ, তাই।
রাজু: আসলে, গানের কাব্যমূল্য কিন্তু অনেক বেশি … যেমন আমাদের কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । তাকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছিল "গীতাঞ্জলির"জন্য । আসলে তো "গীতাঞ্জলি" একটা গানের সংকলন । কিন্তু ঐ গানগুলি গানের চেয়ে অনেকবেশি । আসলে আমি বলতে চাই ওগুলো ছিলো কবিতা।
জ্যাক: হ্যাঁ, অবশ্যই । আপনি ঠিকই বলেছেন।
রাজু: আচ্ছা, আমি আসলে আপনাকে যা জিজ্ঞেস করতে চাচ্ছিলাম তা হলো…আপনার বন্ধু অ্যালেন গিনসবার্গ,আমাদের একাত্তর সালে হওয়া মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন তিনি। এমনকি তিনি "সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড" নামে একটা কবিতা লিখেছিলেন । তিনি যশোর গিয়েছিলেন । যশোর বাংলাদেশের একটা অংশ ।
জ্যাক: হ্যাঁ ।অবশ্যই । অবশ্যই ।
রাজু : আচ্ছা সেই সময়ে কি এই ব্যাপারে কিছু জানতেন আপনি? আমরা যে সংগ্রামে …
জ্যাক: না । আমি কিছু জানতাম না ।
রাজু: আপনার প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে । কার্ল শাপিরো এ বইয়ের ভূমিকা লিখে দেন এবং আপনার অনেক প্রশংসা করেন ।
জ্যাক: হ্যাঁ, সত্যি কথা । শাপিরা হচ্ছে একজন শিক্ষাসম্পৃক্ত মানুষ । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও জড়িত ছিলো। এবং এ যুদ্ধে সে লড়াই করেছিল । সেই হচ্ছে একমাত্র ব্যক্তি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে, যখন ওরা কবিতার জন্য এজরা পাউন্ডকে Boillingen Prize দিতে চাচ্ছিলো তখন একমাত্র সেই এটা প্রত্যাখ্যান করে। কেন জানেন? কারণ পাউন্ড ছিলো একজন অসম্ভব উচ্চাকাঙ্ক্ষী ফ্যাসিবাদী এবং সেমিটীয়দের বিরুদ্ধাচারী।
রাজু: হ্যাঁ, আমি জানি ।
জ্যাক: আর অন্যান্য কবিরা …বলতে লাগল "আরে ও একটা আস্ত পাগল"। বুঝতে পারছেন এই হচ্ছে এজরা পাউন্ডের সঙ্গে থাকার কৈফিয়ত। "আরে না না, অসাধারণ লেখক একজন, খালি রাজনীতির ব্যাপার উঠলেই পাগল হয়ে যেতো"। এই কথা বলার মতো দুঃসাহসী ছিলো একমাত্র কার্ল শাপিরো। এ বিষয়টা নিয়ে ভেবেছে এমন একজন, খুবই বিশেষ একজন মানুষ, আমি আপনাকে তার নাম বলবো না, এই সেদিন সে ঢুকেই এখানে বসে থাকা সবাইকে বলল, "হাই"। তারপরে বলল "হালু"। এরপরে (রাজু হাসতে থাকে ) ঐ কবিদের মধ্যে একজন ওখান দিয়ে পার হবার সময় সে বলে",Sieg Hail"."Sieg Hail"- নাৎসিরা বলে। যাকগে,আমরা বন্ধু ছিলাম। সে যে শিক্ষা-সম্পৃক্ত জগতের মানুষ সেটা সে জানতো। কিন্তু এই বিষয়টা তার চেয়ে বেশি কিছু ছিলো। সে একটা Poetry পত্রিকার সম্পাদকও ছিলো। সেটা আমেরিকান পোয়েট্রি রিভিউ না। অন্য একটা। ওখানে কার্ল খুবই ভালো করছিলো।
রাজু: হ্যাঁ, আমি জানি ওটা ছিল ছোট সাইজের…মানে বই সাইজের কবিতা পত্রিকা একটা । খুবই পুরনো …
জ্যাক : শুনুন, ওটা আবার ফিরে আসছে । কারণ কেউ একজন ওদের এক মিলিয়ন ডলার দিয়েছে ওটা নতুন করে শুরু করতে । কিন্তু ওটা কি আর আগের …এ কাজের জন্য কার্ল ছিলো সবচেয়ে উপযুক্ত ।
রাজু: এটা ছিলো সেই Poetry পত্রিকা যেখানে ভারতের বাইরে রবীন্দ্রনাথের কবিতা প্রথমবারের মতো ছাপা হয়।
জ্যাক: একদম ঠিক ।
রাজু: … এজরা পাউন্ডের সাহায্য নিয়ে ছাপা হয়েছিল।
জ্যাক: হ্যাঁ, হ্যাঁ । একদম ঠিক কথা ।
রাজু: ঐ যে মহিলা … সেই সম্পাদকের নাম মনে নাই আমার।
জ্যাক: ও, ডরোথি ( জ্যাক মনে করার চেষ্টা করে )
রাজু: হ্যাঁ, অনেকটা ঐ রকমই।
জ্যাক: কি, ডরোথি ওয়ার্ডসওয়ার্থ ? না…
রাজু: হতেও পারে।
জ্যাক: না, আমি নিজেই ভুলে গেছি।
রাজু: এ কোন চিন্তার বিষয় না। এ নিয়ে আপনি অযথা বিব্রত হবেন না । আমরা সবাই জানি আপনাকে কম্যুনিস্ট কবি বলে দাগিয়ে দেয়া হয়েছে। কখনো কখনো পথ-কবিও বলে ওরা।
জ্যাক: হ্যাঁ ।
রাজু: এ ছাড়াও আপনি জনপ্রিয় ও প্রগতিবাদী চিন্তা নিয়ে একইসঙ্গে কবিতা এবং রাজনীতির সঙ্গে অঙ্গীকারাবদ্ধ । তো কি আপনাকে রাজনীতির সঙ্গে কবিতাকে মেলাতে প্রলুব্ধ করে?


জ্যাক: কবিতাকে আমি শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে শুরু করি। আপনি তো জানেন যে কম্যুনিস্ট বিপ্লব হচ্ছে এমন এক ধারার বিপ্লব যা গোটা পৃথিবীর শ্রমিকশ্রেণীর মানুষদের নিয়ে কথা বলে। যারা উনিশ শতক হোক অথবা আজকের দিনই হোক, বন্টন ব্যাবস্থায় কখনোই সুবিধাজনক অবস্থানে যারা কখনোই থাকতে পারে না । এখন তো এটা প্রমাণিত যে সমস্ত পৃথিবীতে বিপুল সংখ্যক খেটে খাওয়া মানুষ এখনো সুষম বন্টন থেকে বঞ্চিত । এটা তো গেল একদিক । এটা খুবই স্বাভাবিকভাবে এলো। এই সময়ে আমি বসবাস করছিলাম একজন মহিলার সঙ্গে । আমার প্রথম স্ত্রী ছিলো খুব সংস্কৃতিমনা। একটা রেডিও স্টেশনের জন্য সে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মিটিংয়ের ব্যাবস্থাপনার কাজ করতো। আমরা একত্রেও এ ধরনের অনেক কাজ করেছি। কিন্তু এই সময়ে আমি রাশিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়লাম … মানে এছাড়া আর …আপনি যদি কম্যুনিস্ট হন তাহলে কোন না কোন ভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে জড়িয়ে পড়বেনই। আমার ক্ষেত্রেও তাই হলো । রেডিও স্টেশনের কাজে আমিও অংশগ্রহণ করতে লাগলাম । আচ্ছা, আমি কথাটা এভাবে বলতে চাই । ভিক্টর আর্লিখ …সে কিছুতেই মায়াকোভস্কি অনুবাদ করবে না …গাঢ় গভীর কোন কিছু সে অনুবাদ করবে না। সে চাইতো তরুণ বয়সের কিছু যেখানে মায়াকোভস্কি হলো ভবিষ্যতবাদী কিন্তু যখন সে কম্যুনিস্ট ছিলো না, তখন । বিপ্লবের পর ভিক্টরের বাবাকে কমিউনিস্টরা হত্যা করে…কাজটা করে বলশেভিকরা। যেহেতু ওর বাবা ছিলো মেনশেভিক …কম্যুনিস্ট না, এবং ওরাই বলশেভিক বিপ্লবকে ব্যর্থ করতে চেয়েছিলো। ওর একটা বিশেষ …আর এমন কি আমার প্রথম স্ত্রীও … এটা অবশ্য অন্য কারণ …দুজনই ছিলো ইহুদি, জুদাইজমের সঙ্গে জড়িত । কিন্তু আমার প্রথম স্ত্রী …একদিন যখন একজন রাশান কবি রেডিও স্টেশনে এলো আমি তাকে না চিনলেও একসঙ্গে কাজ করলাম। তার নাম ছিলো Robert Rozhdestvensky. এবং অনেক পরে আমি যখন স্যানফ্রানসিসকোয় বসবাস করি তখন সে নাৎসিদের পরাজিত করেছিলো যে সোভিয়েত রাশিয়ার জনগন তাদের জন্য Requiem নামে অসাধারণ এক কবিতা লেখে। কবিতাটা দশ ভাগে লেখা । ওটা আমি অনুবাদ করি। পরে আমরা ব্লু প্রিন্ট পেপারে তা প্রকাশ করি। ব্লু প্রিন্ট পেপার কী তা কি আপনার মনে আছে? …আক্ষরিকভাবেই নীল রঙের কাগজ।
রাজু: সত্যি তাই?
জ্যাক: হ্যাঁ, এবং তার উপর সাদা কালিতে আমার হাতের লেখা । আমাদের এই সংস্করণে ছিলো একশ পঞ্চাশ কপি। রবার্ট আর আমাদের মধ্যে নাই। কয়েক বছর আগে মারা গেছে । মায়াকোভস্কি দ্বারা প্রভাবিতদের মধ্যে রবার্ট একজন । জানেন, রাশান কবিতার একটা শ্রোতধারা আছে । সেখানে আছে পুশকিন,আছে মান্ডেলস্টাম..
রাজু: অসিপ মান্ডেলস্টাম?

জ্যাক: হ্যাঁ । মান্ডেলস্টাম স্ট্যালিনের সঙ্গে কাজ করতো। তবে শেষে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাকে নির্বাসন দেয় কারণ সে স্ট্যালিনের বিরুদ্ধে একটা কবিতা লিখেছিলো। কিন্তু সে তো সাইবেরিয়া থাকাকালীন স্ট্যালিনের পক্ষেও অনেক কবিতা লিখেছিলো । মোটেও এমন না যে সে ওগুলো লিখেছিলো মুক্তি পাবার আশায় । আচ্ছা, আমরা আবার Rozhdestvensky- র কাছে ফিরে যাই …আমি তখন স্যান ফ্রানসিসকোয় আরেকজন মহিলার সঙ্গে থাকছি । এবং তখন আমি রাশান ভাষায় "Requiem"- গানটা গাইতাম। মন লাগিয়ে পড়তাম আর গাইতাম। এবং ওটা আমি সপ্তাহে তিনদিন রাশান ভাষায় গাইতাম।
রাজু: বাহ। চমৎকার তো!
জ্যাক: আমি রাশান ভাষাটা খুব ভালোবাসতাম। অবশ্যই সঙ্গীতের দৃষ্টিকোণ থেকে । আপনি তো জানেন যে অপেরা এসেছে ইতালী থেকে । কিন্তু ডেসিবেলের উচ্চতার উপর আর কিছু হয় না । আপনার যদি রাশান ভাষা জানা থাকে …. এমন গাঢ় গভীর ভাষা একটা । আপনি কখনো ভাবেননি যে এটা আপনি পারবেন, কিন্তু এই ভাষায় আপনি তা লিখে ফেলবেন । আপনি যখন এই ভাষায় গান করেন…কখনো ভাবেননি যে আপনার কন্ঠে এমন আওয়াজ ধ্বনিত হতে পারে । বাস্তবত এই ভাষাটা এমনি অদ্ভুত । তখন মনে হবে আপনার মধ্যে কিছু একটা ঘটে গেছে । যাকগে, এটা হচ্ছে আমার জীবনের আরেকটা অংশ। সেই অংশ…যা রাশান অংশ …আমার সোভিয়েত অংশ …

রাজু: পাবলো নেরুদার মতো আপনিও রাশান বিপ্লবের ভক্ত। নেরুদা স্ট্যালিনকে নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন। আপনি যখন জানতে পারেন যে স্ট্যালিনের কালে অনেক লেখক,এমনকি নির্দোষ মানুষকে পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছে অথবা জেলে ঢোকানো হয়েছে অথবা নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে তখন আপনার কী অনুভূতি হয়?
জ্যাক: দাঁড়ান, আমি বিষয়টা ব্যাখ্যা করি। আপনার জোগাড়ে একটা বই থাকা দরকার । বইটার নাম হচ্ছে Another View of Stalin। লিখেছে বেলজিয়ান কম্যুনিস্ট লেখক Ludo Martens.বেলজিয়ামে একটা ছোট কর্মিদলের প্রধান ছিলো সে। মারা গেল ২০১১ সালে। তার বইয়ের শুরুটা এরকম "বহু বছর আগে আমি স্ট্যালিনের এতো বড় বিরুদ্ধাচরী ছিলাম যে তাকে খুন করার জন্য একটা সন্ত্রাসী দল গঠন করি।" এটাই বইটার প্রথম পরিচ্ছেদ । পরের অংশ হচ্ছে একটা কাহিনী । আর আপনি দেখবেন এখানে …আপনার প্রশ্নের উত্তর আছে …আপনি দেখবেন স্ট্যালিন ছিলেন ঘৃণিত । একদল মানুষ দ্বারা একদম শুরু থেকেই যেমন ঘৃণিত ছিলেন লেনিন। বলশেভিক বিপ্লব ব্যর্থ করার জন্য যারা নিজ জীবনের একটা বড় অংশ ব্যয় করেছিল সেইসব মানুষ । আমি কিন্তু ঠাট্টা করছি না । এই ব্যাপারে লুডো নির্দিষ্ট প্রমাণাদিও দিয়েছে। ঐ সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে বসবাস করছিলেন এমন অনেক আমেরিকান মানুষের কথার উদ্ধৃতি আছে বইটায়। খুবই ভালো বই একটা । বইটা নিয়ে এমনকি আমি একটা মস্ত Arcane লেখি, যা আমি কদাচিৎ করে থাকি। সাধারণত Aggie, যে কিনা স্ট্যালিনকে একদমই পছন্দ করতো না সেও একই কথা বলত, এইমাত্র আপনি যা বললেন। বিপুল সংখ্যক মানুষ দ্বারা নানাভাবে আক্রান্ত হতো স্ট্যালিন। শুরু থেকেই সবাই তার হাত থেকে পরিত্রাণ চাচ্ছিলো। ( দুইজনেই হাসতে থাকে )। বিস্মিত হবার মত ব্যাপার একটা । এই বইটার লেখক মানুষদের দেখিয়ে দিলো…লুডো কি করতে পারে ।
রাজু: বইটার কি নাম বললেন যেন?


জ্যাক: Another View of Stalin.
রাজু: ইংরেজিতে লেখা, তাই না?
জ্যাক: হ্যাঁ । ওটা আপনি পেয়ে যাবেন । ইংরেজিতে লেখা । হয়তো ওটা আপনি বাংলাতেও পাবেন।
রাজু: জানেন, বাংলাদেশে স্ট্যালিনের অনেক অনুসারী আছে । ভালোই হলো,আমি ওদের জানাতে পারবো যে ইংরেজিতে এ জাতীয় একটা বই আছে ।
জ্যাক: হ্যাঁ । অবশ্যই । আপনার কম্পিউটারে গিয়ে Lulu.com টাইপ করে শুধু লিখতে হবে Another View of Stalin.
রাজু: আপনার শ্রেষ্ঠ লেখা … যার পৃষ্ঠাসংখ্যা এক হাজার সেই Arcanes প্রকাশিত হয় ২০১৬ সালে, তাই না?
জ্যাক: ঐ সালেই দ্বিতীয়টাও প্রকাশিত হয় …আরো এক হাজার পৃষ্ঠার। তিন নম্বরটা এখন মেইলে আছে। তেরই ডিসেম্বরে আমার জন্মদিনে এই বইটার প্রকাশনা উৎসব হবে স্যান ফ্রানসিসকোর মস্ত বড় "Dolby Chadwick Art Galleryতে"।
রাজু: আহা। ঐ সময়ে আমি যদি ওখানে থাকতে পারতাম । লেখক Alan Kaufman আপনার The Arcanesকে ওয়াল্ট হুইটম্যানের Leaves of Grass এবং জেমস জয়েসের Ulysses এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই বইটার সূচনা বিষয়ে আমাদের কিছু বলবেন কি ? মানে আপনার এই মহৎ শিল্পকর্ম The Arcanes বিষয়ে?
জ্যাক: আক্ষরিক অর্থে এর সূচনাবিন্দু হচ্ছে আমার প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে আমার সম্পর্কের শেষ দিকের কথা। আমার ছেলে আমাকে গাড়ি চালিয়ে লস এঞ্জেলেসের অন্য অংশে নিয়ে গেল। ঐ সময়ে আমি …না না তখনো আমি অন্য একজন নারীর সঙ্গে জড়িয়ে পড়িনি। কিন্তু সম্পর্কের কাছাকাছাকাছি চলে গিয়েছি। আমি প্রথম Arcane দেখি ১৯৭২ সালে …ঐ বছরের প্রথম দিকে আমি এক কবি বন্ধু Paul Vangelisti- র বাড়ি যাই…ইতালিয়ান কবি …ইতালিয়ান-আমেরিকান কবি বন্ধু । ওখান থেকে শুরু হয়ে আমার স্যানফ্রানসিসকোয় চলে আসা পর্যন্ত তা অবয়বে বেড়ে উঠতে থাকে । এই সময়েই বইটার ধারণা আমার মনে গড়ে ওঠে ও পরিণতি পায়। যদিও প্রথম বারোটা Arcane প্রকাশিত হয় Count of St. Germaine-কে নিয়ে । কাউন্ট অব সেইন্ট জারমেইন কে জানেন? মূলত এই চরিত্রটি আসে হাঙ্গেরি থেকে । তার আসল নাম হচ্ছে Rakoczi.সে আঠারো শতকে দেশে ফিরে যায় । অসাধারণ এই মানুষটিতে ছিলো বিচিত্র জ্ঞানের সমাহার । আলকেমিস্ট, দার্শনিক, বিজ্ঞানী, কি নয়? পৌরাণিক এই চরিত্র মনে হয় যেন প্রত্যেক শতাব্দীতে পুনর্জন্ম নিয়ে ফিরে ফিরে আসে । সতেরো কি আঠারো শতকে যেমন সে ছিলো তেমনি বারো কি তেরো শতকেও সে ছিলো …আর কি জানেন আসলে সকল শতকেই। সুতরাং এ হচ্ছে সেইরকম এক চরিত্র । শুরুতে আমি তাকে পৌরাণিক হিসেবেই অঙ্কন করি। এবং তাকে আনি আমার এক হাজার পৃষ্ঠার বইয়ের প্রথমদিকে । সেই অংশটা বারো ভাগে বিভক্ত। এই বারো অংশ আবার একটা পূর্ণাঙ্গ বই হিসেবেও প্রকাশিত হয় । আমার বৃহৎ বইটার প্রথমাংশও এটাই। আমি প্রথম দিকে এই পৌরাণিকতা ব্যবহার করলেও কিছু পরেই তা অতিক্রান্ত হয়ে পরিণত হয় Arcane -এর মতো একটা সাধারণ নামে । যেমন,আমি কবিদের নিয়েও লিখেছি, আবার মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন, স্ট্যালিনের মতো ঘোরতর বিপ্লবীদের নিয়েও লিখেছি । Aecane-এ আমি এদের সবাইকে নিয়েই লিখেছি । এখানে দীর্ঘ কবিতা আছে Aggieকে নিয়ে অথবা আমার প্রথম স্ত্রী কি পুত্র ডেভিডকে নিয়ে । ছেলেটা আজ আর আমাদের সঙ্গে নাই। ১৯৮২ সালে ও মারা গেছে লিউকোমিয়া/ লিম্ফোমা ক্যানসারে। আমার মেয়ে সেলিয়া জীবিত । ওখানে আরো অনেক বিষয় নিয়ে লেখা আছে । ধর্ম বিষয়ক কবিতা যেমন আছে তেমনি আক্রমণাত্মক কবিতা আছে "Donald Dreck"-কে নিয়ে । ওটা হচ্ছে একটা ইদ্দিশ শব্দ যার অর্থ ' Shit'.
রাজু: আচ্ছা ।
জ্যাক: এখানে পুরনো কি আধুনিক অনেক ইদ্দিশ শব্দের ব্যবহার আছে । সেগুলোকে আমি কবিতায় ব্যবহার করেছি…জানেন তো অনেক ভাষাতেই শব্দ-খেলা আছে । আর আপনি জানেন আমি ভাষা ভালোবাসি।
রাজু: হ্যাঁ, সেটা আমি জানি । আপনি তো জার্মান,গ্রিক,রাশান, ইতালিয়ান, আলবেনিয়ান এবং …
জ্যাক:এবং হেইতিয়ান,…হেইতিয়ান ক্রিওল।
রাজু: হেইতিয়ান ক্রিওল এবং অবশ্যই ভিয়েতনামীজ ।
জ্যাক: হ্যাঁ, অবশ্যই ভিয়েতনামীজ । এই ভাষায় আমি অনুবাদ করেছি।
রাজু: অবশ্যই আপনি ভিয়েতনামীজ ভাষায় অনুবাদ করেছেন। এটা আরেকটা পয়েন্ট যেটা আমি উল্লেখ করতে চাই। এই সবগুলো ভাষা থেকেই আপনি অনুবাদ করেছেন। জিজ্ঞেস করতে চাচ্ছিলাম যে আসলে আপনি অনুবাদ করেন কেন? মানে ঐ সময়টাতো অনুবাদ করার পরিবর্তে আপনি নিজের কবিতা লেখার কাজে ব্যয় করতে পারতেন ।
জ্যাক: অনুবাদ করি কারণ…আমি চেষ্টা করি কমরেডদের লেখা অন্য ভাষায় পরিচিত করতে।
রাজু: শুধুমাত্র এই সহমর্মিতার জন্য?
জ্যাক: হ্যাঁ । ওরা সবাই আমার কমরেড। তার ওপর আমি ওদেরকে আবিষ্কারও করি। যেমন ধরুন, আমি একদিন স্যান ফ্রানসিসকোর ট্রিয়েস্টে কফিশপে বসে আছি। ওখানেই আমরা কফি পান করতে যেতাম। ঐ মস্ত কফিশপটা আসলে অনেক কবির কাছে ছিল ক্যাফে কালচারাল সেন্টার।
রাজু: তার মানে কি এই যে বিভিন্ন ভাষায় টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া নিজেকেই আপনি কুড়িয়ে নিচ্ছেন?


জ্যাক: না, না । আমি ওভাবে চিন্তা করি না।
রাজু: না, না…আপনি "কমরেড" শব্দটা ব্যবহার করলেন তো, তাই। এজন্যই আমি তাকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করলাম । মানে আপনি টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়া নিজেকে অন্যান্য ভাষা থেকে আবার সংগ্রহ করে নিচ্ছেন।
জ্যাক: ওহ,খুব ভালো । খুবই সত্যি কথা ।
রাজু:একটা পরিপূর্ণ ভাবমূর্তি পাওয়া যায় ওখানে ।
জ্যাক: হ্যাঁ । খুবই সত্যি কথা । হ্যাঁ, আপনার সঙ্গে একমত আমি ।
রাজু: হ্যাঁ । কারণ,ভাবাদর্শের জায়গা থেকে …..
জ্যাক: আপনি তো বুঝতেই পারছেন বিভিন্ন কারণেই এমনটা হয়েছে । যেমন উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, একজন অসামান্য পন্ডিত টমাস রকমোর যখন বলে যে,হাইডেগারের দর্শন মূলত নাৎসি চিন্তার অনুসারী । তখন আমি তা মোটেও বিশ্বাস করি না । বলে যে হাইডেগার একজন নাৎসি ছিলো । বেশ তো সে না হয় তাই ছিলো কিন্তু তার দর্শন…??
রাজু: দার্শনিক হাইডেগারের কথা বলছেন?
জ্যাক: হ্যাঁ । দার্শনিক হাইডেগার। আমি এই দার্শনিকের কবিতার নিরঙ্কুশ ভক্ত এবং আমি তার সবগুলো কবিতাই অনুবাদ করেছি।
রাজু: আমিও বাংলায় তার গুটিকয় কবিতা অনুবাদ করেছি।
জ্যাক: বাহ। চমৎকার!
রাজু: বিশ্বাস করেন, চার কি পাঁচটা কবিতা ।
জ্যাক: কোথায় পেলেন আপনি ওগুলো?
রাজু: কবিতাগুলো আমি তার বই " পোয়েট্রি, ল্যাঙ্গুয়েজ, থট" -থেকে নিয়েছি। এটা ছিলো ইংরেজিতে ।
জ্যাক: আচ্ছা ।
রাজু: চিন্তা, ভাষা এবং আরো কিছু বিষয়ে তার বক্তব্য ছিল বইটিতে। বইটা ইংরেজিতে কে অনুবাদ করেছিল তার নাম মনে নাই ।
জ্যাক: ও,হ্যাঁ ! বইটার নাম "পোয়েট্রি, ল্যাঙ্গুয়েজ, থট"।
রাজু : এই রকমই একটা নাম । এটাতেই ছিলো হাইডেগারের কিছু কবিতা । আমি কবিতাগুলো ১৯৯৭ অথবা ১৯৯৮ সালের মধ্যে অনুবাদ করি। কি অদ্ভুত কাকতালীয় ব্যাপার ।
জ্যাক: কি বিস্ময়কর ব্যাপার। এ নিয়ে আপনাকে একটা চমৎকার গল্প বলি। আমি তার একটা কবিতার বই অনুবাদ করি। আমরা তার একটা কবিতার প্রথম চিত্রকল্পটি দিয়ে বইটার নাম দেই "Fling of Flame". কারণ "ফ্লিং" হচ্ছে দ্ব্যর্থবোধক। এ দিয়ে শুধুমাত্র ছুঁড়ে দেয়া বোঝায় না বরং এর অন্য অর্থ একধরনের প্রণয় সম্পর্ক। সুতরাং" Fling of Flame" …Aggie বইটার কভার করেছিল। Aggie খুবই সুন্দর একটা কভার করেছিলো। আমরা তখন ইতালি ভ্রমণে ছিলাম । Aggie এবং আমার …একজন বন্ধু …আমারা এই প্রকাশকের কাছে যাই…ছোট এক শহরের ছোট এক প্রকাশক। ওর নাম Andrea. ওর এবং আমাদের আরেক বন্ধু র‌্যাচেলকে জানালো যে, "ওরা একটা বইয়ের কভারের সন্ধান করছে"। ওরা দুইজন একটু আলাপ করলো। ও জার্মান বা আমেরিকান ইংরেজি জানে না । সে এবং আরো দুইজন মিলে বইটার একশো কপি ছাপিয়ে দিলো। অসাধারণ একটা এডিশন তৈরি হলো। মানে আমি এতটাই কৃতজ্ঞ হলাম যে তার জন্য একটা শিল্পকর্ম তৈরি করলাম । আমি কিন্তু একজন শিল্পীও। আমি রাশান লিপির অলঙ্করণ দিয়ে বিশাল একটা চিত্রপট তৈরি করে তার জন্য উপহার স্বরূপ দিলাম । আসলে আমি ঐ রকম তিনটা তৈরি করি। মজার ব্যাপার হলো যে, …আপনি জানতেও পারেন, নাও পারেন…ওর একটা বই, যেটা আমি প্রথমে আবিষ্কার করি সেটা লেখা হয়েছিলো Rene Char-এর জন্য, যে কিনা ….


রাজু: সে তো আমার প্রিয় কবিদের একজন । তাকে ছাপ মারা হয়েছে অস্তিত্ববাদী কবি হিসেবে । তাকে প্রশংসা করেছে …আমার মনে হয় আলবেয়ার কাম্যু। আসলেই একজন চমৎকার কবি ।
জ্যাক: আচ্ছা । তো হাইডেগার একটা কবিতার বই লিখলো যার আটটা কবিতা Rene Char-কে উৎসর্গ করা হয়েছে । আমি ওগুলো অনুবাদ করলাম । পাঠক ঐ বইটা পরিহাসের সাথেই ভালোবাসার কারণ … মানে আমি বলতে চাইছি যে পাঠক পরিহাসের সাথেই বইটা পছন্দ করে …কারণ একজন নাৎসি আর অন্যজন রেনে শার হচ্ছে যুদ্ধকালে নিজ দলের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ এক ফরাসি পার্টিজান নেতা।

অডিও-২
জ্যাক: এবার আপনার যা ইচ্ছা হয় তাই আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন ।
রাজু: ধন্যবাদ । আমরা জানি যে আপনি পাবলো নেরুদা অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন । এমন অনেক অনুবাদক আছে যারা মূল লেখকের সঙ্গে দেখা করে অনুবাদের ক্ষেত্রে তার সহযোগিতা নিয়েছে। আপনি কি তার মৃত্যুর আগে কখনো তার সঙ্গে দেখা করেছেন?
জ্যাক: না। অন্য কবিদের সঙ্গে আমার তেমন দেখা সাক্ষাৎ হয়নি। তবে কম্যুনিস্ট ধারা থেকে আসা কবি ফেররুচ্চিও ব্রুগনারো-এর কথা আলাদা । এখানে শ্লেষপূর্ণ ব্যাপার হলো যে ওর ছেলে ইতালির ভেনিসের মেয়র, অথচ বাবার সম্পূর্ণ বিপরীত। পুরোপুরি প্রতিক্রিয়াশীল একজন মানুষ।
রাজু: হ্যাঁ, কখনো কখনো এমনটা হয়ে থাকে ।
জ্যাক: হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন, এমনটা হয় । কিন্তু ব্রুগনারো একজন কম্যুনিস্ট কবি। আমরা একবার তাকে আমেরিকায় আমন্ত্রণ করে আনলাম। রাজকবি হিসেবে আমি একটা উৎসবের আয়োজন করছিলাম …চারুকলার বিষয়ে একটা আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব। সে এসে কবিতা পড়লো। এবং সে মোটেও ইংরেজি জানে না । সুতরাং সে ইতালিয়ান ভাষায় কথাও বললো আবার কবিতাও পড়লো। এবং শ্রোতারা তাকে ও তার কবিতাকে ভালোবাসলো।
রাজু: আপনি তো পাসোলিনির কাজও অনুবাদ করেছিলেন । তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল কখনো?
জ্যাক: না,কোন দিন দেখা হয়নি । কিন্তু আপনি কি জানেন যে ১৯৭৫-এ তাকে খুন করা হয়েছিলো।
রাজু: হ্যাঁ, আমি তা জানি । আমার খুব ভালোবাসার কবি একজন । বিশেষ করে তার সিনেমা…
জ্যাক: হ্যাঁ, খুবই চমৎকার, বিশ শতকের খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ ওগুলো।
রাজু: একদম ঠিক কথা । অবশ্য আমি জানি না কেন তাকে খুন করা হয়েছিলো।
জ্যাক: একদল ফ্যাসিবাদী তাকে খুন করে।
রাজু: ফ্যাসিবাদীরা?
জ্যাক: হ্যাঁ । পাসোলিনি ছিলো সমকামী। তাকে নিয়ে প্রথম যে গল্পটা শোনা গেল তা এ রকম, সে কাউকে তুলে বাসায় নিয়ে আসে। তখন সেই লোকই ওকে খুন করে। কিন্তু যে-লোকটি, পিনো পেলোসি, যাকে তুলে নিয়েছিল শাস্তি হিসেবে তার ছয় বছরের জেল হয়। আমরাসহ তাবৎ লোকজন তো তাজ্জব! সমস্ত ইতালির শ্রেষ্ঠতম কবিকে খুন করার এই শাস্তি? এবং এরপর খুনি পিনো পেলোসি জেল খেটে বেরিয়ে এলে জানা গেল সত্য ঘটনা । আসলে একদল লোক…অনেক লোক মিলে কবিকে খুন করে। মাত্র একজনের পক্ষে ওকে মেরে ফেলা সম্ভব ছিলো না । খুব সম্ভব তার করা সিনেমা Salo-র কারণে ক্ষিপ্ত একদল লোক মিলে এ কাজ করে। জানেন তো সে সিনেমাও তৈরি করতো। সবচেয়ে বড় কথা একদল ফ্যাসিবাদী তাকে খুন করে। কারণ একই সময়ে সে পত্রিকায় একটা কলাম লিখছিল । ওখানে সে ইতালিতে ফ্যাসিবাদীদের চলতে থাকা Sennanigans – কর্মকাণ্ডের সকল গোমর সে ফাঁস করে দিচ্ছিলো।
রাজু: আপনি তো আলবেনিয়ান ভাষা থেকেও অনুবাদ করেছেন।
জ্যাক: হ্যাঁ। আমিই ঐ ভাষা থেকে প্রথম অনুবাদ করি কবি … Agim Gjakova-র লেখা । বইটার নাম "কম্যুনিস্ট "। চটি বই একটা । খুব সম্প্রতি করেছি Yusuf Gervalla-র কাজ । এই বইটার নাম A Mother's Blessing. আলবেনিয়ার এক চমৎকার কবি, যে তখন প্যারিসে ছিলো, আমি তার সঙ্গে মিলে এই অনুবাদটা করি। মজার ব্যাপার হলো যে, সে জ্যাক কেরুয়াক-এর বিশাল ভক্ত। সে ম্যাসাচুসেটসের লওয়েল ( যেখানে অ্যালেন গিনসবার্গ ছিলো) -এ গিয়ে কেরুয়াক-এর কবরে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করেছিলো। সেই আলবেনিয়ান কবির নাম Idlir Azizaj. অনুবাদক হিসেবেও খ্যাতি আছে তার। আলবেনিয়ান ভাষায় জেমস জয়েসের ইউলিসিস-এর অনুবাদ তার করা। আলবেনিয়া ছেড়ে এসে এখন বসবাস করছে দক্ষিণ প্যারিসে। আমরা একত্রে Gerballa-র বই A Mother's Blessing অনুবাদ করেছি। ওটা মাত্র গতবছর প্রকাশিত হয়েছে ।
রাজু: আপনি কি কখনও আলবেনিয়ার খ্যাতনামা ঔপন্যাসিক ইসমাইল কাদারে-র কোন বই পড়েছেন?
জ্যাক: আসলে, সে যখন আলবেনিয়াতে থাকতো আমি তার তখনকার কাজগুলো জানি। এখন সে প্যারিসে থাকে । কি জানেন আমি যখন প্যারিসে এলাম তখন গল্প শুনেছি যে সে কম্যুনিস্ট রাজত্ব থেকে পালাতে চেয়ে এখানে এসেছে । কিন্তু আসলে ঘটনা তা নয়। আলবেনিয়াতে কম্যুনিস্ট রাজত্ব এবং আনোয়ার হোজ্জা-কে নিয়ে লেখা তার বই প্রকাশিত হয়েছে । আসলে সে প্রেমে পড়েছিলো …আমার মনে হয় ফ্রান্সের কোন এক বেহালাবাদকের সঙ্গে। আমার মনে হয় পরে সম্পর্কটা ভেঙে যায় । কিন্তু সে ফ্রান্সেই থেকে গেল । তার বই Chronicle in Stone দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে লেখা একটা অসামান্য উপন্যাস ।
রাজু: The General of the Dead Army ?
জ্যাক: ওহ, সেটাও কিন্তু অসাধারণ ।
রাজু: বিস্ময়কর লেখক ।
জ্যাক: হ্যাঁ, বিস্ময়কর লেখকই বটে । আমার বিশ্বাস এখনো সে ফ্রান্সেই বসবাস করছে।
রাজু: দুর্ভাগ্যক্রমে আজ পর্যন্ত তাকে পুরস্কৃত করা হয়নি । অথচ প্রায় প্রতি বছরই সে নোবেল পুরস্কার কমিটির সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকছে। কিন্তু তার পাওয়া উচিৎ …অবশ্যই যোগ্য। আমার যতদূর জানা আছে যে আপনি ভিয়েতনামি ভাষা থেকেও অনুবাদ করেছেন ।
জ্যাক: ও হ্যাঁ। আমি ভিয়েতনামি ভাষা থেকে যা অনুবাদ করেছি …মনে হয় তার কথা বোধহয় আপনাকে বলেছি … ওটা ভিয়েতনামের ভিন্ন মতাবলম্বী Vodou-দের নিয়ে এবং ভিন্ন মতের Dao Mau-দের Len Dong ধর্মাচার বিষয়ে। মূলত আমি প্রত্নতাত্ত্বিক লেখক Maurice Durand-এর মাধ্যমে এদের কথা জানতে পারি । তার বইটার নাম হচ্ছে Technique et Pantheon des Mediums Vietnamienns. The Technique and Pantheon of the Vietnamese Mediums.
এই মিডিয়ামের অবস্থান Vodou-দের সঙ্গে একই ছাতার তলায় । ভিয়েতনামি মিডিয়াম বিষয়ে এটা একটা অসাধারণ বই । এই বইটাতে চব্বিশটি কবিতা আছে ভিন্ন মতাবলম্বীদের নিয়ে। মিডিয়ামদের প্রথমে চিনাদের মধ্যে ও পরে ভিয়েতনামিদের মধ্যে দেখা যায় । ঐ বইগুলো থেকে আমি গোটা দুয়েক কবিতা অনুবাদ করি। আধুনিক মার্ক্সীয় চেতনা থেকে সম্প্রচার মনস্কতা নিয়েই ওগুলো অনুবাদ করি আমি । সুতরাং আমি মূল বইটাকে "Communize" করতে চেয়েছিলাম । কারণ যুদ্ধের সময় সকল ভিন্ন মতাবলম্বী ধর্মীয় দলকে তাদের ধর্মাচার বন্ধ রাখতে বলা হয়েছিল । এইজন্য যে হামলাকারী আমেরিকানদের সঙ্গে লড়ার জন্য প্রতিজন মানুষের সহায়তা প্রয়োজন ছিলো । একটা অসাধারণ বই ওটা। আমি ফরাসি ভাষা জানে এমন সবাইকে সম্ভব হলে বইটা পড়ার পরামর্শ দেই। একটা অনন্যসাধারণ অভিজ্ঞতা হবে।


রাজু: আরেকজন কম্যুনিস্ট কবি, তুরস্কের খ্যাতনামা নাজিম হিকমত।
জ্যাক: ওহ, নাজিম। নাজিম একজন অসাধারণ কবি । পোয়েট্রি প্লানেতারিয়েতের বর্তমান সম্পাদককে তো নাজিমই অনুপ্রাণিত করেছে World Poetry Movement-এর জন্য । Ataol Behramoglu- যে নিজেই কিনা একজন স্বনামধন্য তুর্কি কবি, তাকেই প্রেরণা দেয় । জানি না আপনি জানেন কিনা যে,নাজিম কিউবা নিয়ে একটা চমৎকার বই লিখেছে। যদিও এটা খুব বেশি পরিচিত না । আমি এটা বুঝি না এমন চমৎকার একটা বই কেন পরিচিতি পায়নি।
রাজু: বইটার ইংরেজি অনুবাদ আছে?
জ্যাক: তা আছে । জীবিতাবস্থায় একবার সে কিউবা গিয়েছিল । কিন্তু কি জানেন সে কবে যেন ছাব্বিশ বছর জেলে আটক ছিলো …আমি একবার Kaminsky-র রাশান ভাষায় লেখা সুন্দর এক কবিতা অনুবাদ করি। এর বিষয়বস্তু হচ্ছে এই কবি নাজিম হিকমতের সঙ্গে দেখা করার একটা তারিখ ঠিক করে। কিন্তু এদিকে জেল থেকে বেরিয়ে নাজিম সোজা মস্কো চলে যায়। কথা ছিলো এই কবি নাজিমের সঙ্গে দেখা করতে নির্দিষ্ট একটা ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে থাকবে। কিন্তু নাজিম দেখা করতে ওখানে আসেইনি। নাজিমের মৃত্যুর পর এই কবি এসব কথা বলে। খুবই স্পর্শকাতর এবং অপূর্ব সুন্দর একটা কবিতা …চিরন্তন অসাধারণ।
রাজু: বেশ অনেক বছর আগে নাজিম হিকমতকে নিয়ে লেখা পাবলো নেরুদার একটা কবিতা আমার হাতে আসে । আপনি হয়তো জানেন নেরুদার সঙ্গে নাজিমের দেখা হয় মস্কোয়: "Aqui viene Nazim Hikmet" – হচ্ছে তার কবিতার শিরোনাম। এটা আমি বাংলায় অনুবাদ করেছি।
জ্যাক: বাহ, কি চমৎকার!
রাজু: জ্যাক, আপনি তো রাশান ভাষা থেকে প্রচুর অনুবাদ করেছেন । আপনি মায়াকোভস্কি অনুবাদ করেছেন ।
জ্যাক: হ্যাঁ, ভিক্টর আর্লিখকে সঙ্গে নিয়ে মিলিতভাবে আমরা মায়াকোভ্স্কির Electric Iron অনুবাদ করি। স্যান ফ্রানসিসকো থাকাকালীন আমি এককভাবে যে বইটা অনুবাদ করি তার নাম হচ্ছে Nistcheta,যার অর্থ ক্ষুধা। ছোট্ট একটা বই। স্যান ফ্রানসিসকোয় একটা রাশান বইয়ের দোকান আছে যেখানে আমি প্রায়ই যেতাম। ছোট্ট বইটা ওখানেই খুঁজে পাই। এটা প্রকাশিত হয়…আপনি কল্পনা করতে পারেন যে, ১৯৪৩ সালে! প্যারিসের স্বাধীনতার পরে। এর মূদ্রণশৈলি ছিলো অপ্রচলিত অক্ষরের। খুব সম্ভব প্যারিসের কোথাও কোন সেলারে বইটার মুদ্রণ হয়েছিল । মূলত এক ফিনিশ কবি যে রাশান ভাষায় লেখে। ওর নাম "N" অথবা Belyaeva- একটু ভিন্নরকম নাম
…ভিন্ন ধারার নাম । এটা নিশ্চিত যে বইটা কোন মহিলার লেখা। যুদ্ধ শেষে পঞ্চাশ দশকে সেই লেখক ওয়াশিংটন ডি সি-তে আসে। সেই সময় রাশানরা স্টেটসে আসতে শুরু করেছে। নাম ছাড়া এই কবি সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা যায় না … শুধু তার নামের N হচ্ছে নাতাশার সংক্ষেপ। মানে তার পুরো নাম Natasha Belyaeva.
রাজু: আপনি কি টেগোর নামটা শুনেছেন কখনও?
জ্যাক: টেগোর ?
রাজু: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর? মানে বলতে চাই, যে বাঙালি কবি নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলো।
জ্যাক: ও হ্যাঁ, অবশ্যই । আমি তার কাজের কথা জানি। তার খুব বেশি বই আমার পড়া হয়নি । আমার কম বয়সে পশ্চিমা বিশ্বের অনেক মানুষ তার বই পড়তো। যথার্থ কবি একজন …আপনি যদি আমাকে অথবা যে কোন সাধারণ মানুষকে প্রশ্ন করেন "ভারতীয় কবিতার ব্যাপারে কিছু জানা আছে"? সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর আসবে, "কেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর"। ভারতের সবচেয়ে খ্যাতনামা কবি ।
রাজু: একদম ঠিক কথা বলেছেন । আমি জানি না কখনো "জাতীয়তাবাদ" নামে তার একটা ছোট বই আপনার পড়া হয়েছে কিনা, রবীন্দ্রনাথের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া বক্তৃতামালার সংকলন । কিন্তু রবীন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদের বিরোধী একজন কবি। এমন কি এজন্য তার নিজের দেশের মানুষই তাকে ভুল বুঝেছিলো। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তখন জাতীয়তাবাদের খুবই প্রয়োজন ছিলো।
জ্যাক: ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে, ও হ্যাঁ, অবশ্যই ।
রাজু: চূড়ান্ত পর্যায়ের জাতীয়তাবাদ তো ফ্যাসিবাদ।
জ্যাক: হ্যাঁ, তা ঠিক, কিন্তু আমি রবীন্দ্রনাথের এই ব্যাপারটাই তো পছন্দ করি । আমি নিজেও অবশ্য …আমি ভাবতাম যে এই অবস্থান নেওয়াটাই ঠিক । কারণ তখন তার অবস্থান অনেক বেশি …পৃথিবীর প্রেক্ষিতে অনেক বেশি সাম্প্রদায়িক। রবীন্দ্রনাথ সুচিন্তিত ভাবেই বুঝেছিলো যে এশিয়ানদের তুলনায় ব্রিটিশরা অনেক বেশি সাম্রাজ্যবাদী। কিন্তু এই সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদ একা লড়াই করে পারবে না। আপনাকে এর চেয়ে বড় একটা কিছু করতে হবে।
রাজু: ঠিক তাই।
জ্যাক: এবং অবশ্যই । এ ছাড়া মার্ক্স বলেন লেনিন বলেন মানে বলশেভিক বিপ্লবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবকিছু, সবচেয়ে বড় সত্য হলো পৃথিবীতে মানব সমাজের সর্বাধিক বড় শত্রু হলো জাতীয়তাবাদ।
রাজু: ঠিক বলেছেন । একদম সত্যি কথা । উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে ইতালিতে জাতীয়তাবাদের মুখোশ পরে ফ্যাসিবাদ একটা বড় ভূমিকা পালন করেছিলো ।
জ্যাক: হ্যাঁ, অবশ্যই ।

রাজু: আপনি কি ভারতের আর কোনও কবির কথা জানেন, বাংলাদেশ অথবা বাংলা ভাষার? বাংলা ভাষার আর কোন কবি ?
জ্যাক: বাংলা ভাষার নয়, তবে হিন্দি ভাষার একজনকে চিনি। রতি সাক্সেনা নামে ভারতীয় এক কবির সাথে আমি কাজ করি যিনি আবার একই সঙ্গে অনুবাদক এবং বেদ-বিষয়ে পণ্ডিত। কলম্বিয়ার মেদিইয়িন-এ অবস্থিত World Poetry Movement -এর সাথে আমরা যুক্ত।
রাজু : যতদূর জানা আছে কম্যুনিস্ট কবি সেসার বাইয়্যেহো আপনার খুব প্রিয় । তিনি এক মহান কবি। তিনিও ছিলেন কম্যুনিস্ট।
জ্যাক: হ্যাঁ, তাই ছিলো । স্প্যানিশ সিভিল ওয়ারে আহত হয়ে প্যারিস এসে মারা যায় । প্যারিসে মৃত্যুবরণ বিষয়ে তার একটা কবিতাও আছে । খুবই বিখ্যাত কবিতা ছিলো সেই সময়।
রাজু: হ্যাঁ,
"I will die in Paris, on a rainy day,
On some day I can already remember.
I will die in Paris—and I don't step aside—
Perhaps on a Thursday, as today is Thursday, in autumn."

জ্যাক: কি মনোরম কবিতা । অনিন্দ্য কবি একজন । আমার মনে হয় ভালো কবি …জানেন এখনো লোকজন সবসময় নেরুদা ও বাইয়্যেহো-র কথা বলাবলি করে । ও ছিলো আবেগপ্রবণ । তার প্রথম দিককার লেখাতে স্প্যনিশ ভাষায় গভীর নাটকীয় বোধের সঙ্গে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছিলো । নিজের ভাষার সঙ্গে তার সম্পৃক্তি ছিলো ঘনিষ্ঠ ।
রাজু: হ্যাঁ, অবশ্যই ।
জ্যাক: পাবলো যেমন … ওয়াল্ট হুইটম্যানের সত্যিকার সন্তান । হুইটম্যান হচ্ছে সেই কবি যে সকল দুয়ার খুলে দিয়েছে।
রাজু: অনেক দরজা ।
জ্যাক: সে বিগত শতাব্দীতে সকল দরজা খুলে দিয়েছে। তাই আমাদের বেড়ে ওঠা একধরনের শিক্ষিত বুর্জোয়া পরিবেশে । আমরা মনস্থির করে ভাবতাম যে, উনিশ শতকের শিক্ষকেরা হচ্ছে ফরাসি কবি বোদলেয়ার, র‌্যাঁবো এবং মালার্মে । এ কথা সত্যি যে,পশ্চিমা কবিদের তুলনায় সবচেয়ে বেশি প্রগতিশীল কবিতার লেখক মালার্মে। প্রগতিশীল এই অর্থে …একটা কবিতার নাম..".A Throw of the Dice Never Will Abolish Chance". যে কবিতাটার …সতের পৃষ্ঠার কবিতাটা চার স্তবকের শৈলিতে মুদ্রিত । খুবই সুন্দর একটা কবিতা । একদিকে এটা চলচ্চিত্র পর্দার পূর্বেকার অনুভূতি দেয়,একইসঙ্গে তা দেয় সুরের মূর্ছনা। এই কবিতাটার কথা আপনি জানেন না বোধহয়, জানেন কি?


রাজু: না, মনে করতে পারছি না ।
জ্যাক: কবিতাটার শততম বার্ষিকীতে Aggie এবং আমি একে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করি । কারণ ওটা প্রথম ছাপা হয়েছিল ১৮৯৭ সালে এবং তাই ভাষার সম্মানে এর নতুন অনুবাদ হলো ১৯৯৭-এ। তবে 'A Throw of the Dice' এর বদলে আমি বললাম 'A Fling'. কারণ ফ্লিং-এর আরেকটা অর্থ কিন্তু ভালোবাসা সম্পৃক্ত । তখন Aggie এবং আমি সবেমাত্র সবকিছু গুছিয়ে নিতে শুরু করেছি …তাই আমি এর নাম দিলাম 'A Fling of Two Die'…এবং লন্ডনের আদি বাসিন্দাদের উচ্চারণগত বৈশিষ্ট্য সহজতায় ও ব্রিটেনের ককনি উচ্চারণের ঠাটে । ইংল্যান্ডে আমি যদি বলতে চাই 'টুডে' তাহলে উচ্চারণ করতে হবে 'টু-ডাই'। তাই কবিতার শিরোনাম করলাম 'A Fling of Two Die Never Will Abolish Chance'.
রাজু: আপনি আরো একজন ফরাসি কবি সম্পর্কে কথা বলছিলেন, রেনে শার। কখনো কি তার কোন কবিতা অনুবাদ করেছিলেন?
জ্যাক: না, আমি কখনো ওর কোন কবিতা অনুবাদ করিনি। কিন্তু সে খ্যাতনামা কবি নিঃসেন্দহে । তবে একসময় আমি ফ্রান্সের Grenoble-এ বসবাস করতাম । আমার ফ্রেঞ্চ অনুবাদক Gilles Vachon ওখানেই থাকতো। ওখানে ওরা রেনেকে নিয়ে আলোচনা করতো…জানেন এই কবি হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফসল। সে ছিলো সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনের সদস্য…ফ্রান্সের পক্ষে সে নাৎসিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করেছিলো। একেই আমি বলি আয়রনি যে, যুদ্ধের পরে সে হাইডেগারের বন্ধু হয়ে যায় । তাদের এই বন্ধুত্বের মূলে ছিলো সক্রেটিস-পূর্ব গ্রিক দর্শনের প্রতি দুজনের এন্তার ভালোবাসা। সক্রেটিস-পূর্ব গ্রিক দর্শনই তাদের একত্রে নিয়ে আসে ।
রাজু: ভাবাদর্শগতভাব আপনি তো একজন কম্যুনিস্ট কবি । কিন্তু আপনি যখন কাব্বালা চর্চা করেন,যা ধর্মীয় চর্চা ও ধর্মগ্রন্থ হিসেবে পরিচিত, এই দুইয়ের মিশ্রণ করেন কিভাবে? আপনার ভাবাদর্শ ও ধর্মগ্রন্থ এই দুইটিকে সাধারণত সম্পূর্ণভাবে পরস্পরের বিপরীত বলে ধারনা করা হয় ।
জ্যাক: দেখেন, আমি পঁয়ষট্টি বছর ধরে কাব্বালা চর্চা করছি। এবং এই পর্যন্ত …কাব্বালা মিস্টিসিজম হলেও মনে রাখতে হবে এর শেকড় প্রোথিত কবিতায়।

আসলে বাইবেলের কবিতাংশ হচ্ছে কাব্বালা। একদম এর প্রথম অক্ষর থেকে শুরু করে …অক্ষরের ব্যবহার । আমার জন্য কাব্বালার KBL অর্থ গ্রহণ করা । আমি একে প্রথাগতভাবেই গ্রহণ করি। কাব্বালাকে গ্রহণ করতে হয় কারণ এটা মৌখিকভাবে একজন থেকে আরেকজন শিখে একে অগ্রসর করে নিয়ে যায় …শতাব্দীর পর শতাব্দী । কিন্তু আমার আধুনিক প্রজ্ঞায় কবিতা স্বয়ং KBL. নিজ অন্তরে গ্রহণ করা গেলে তা রচিত কবিতা হয়ে নির্গত হয় । আমি কিন্তু ঈশ্বরের কথা বলছি না। কবিতা অন্তরে এসে স্বয়ং কথা বলবে আর আপনি শুধু তার অনুলিখন করবেন । আমার কাছে এটাই কাব্বালা। আমার ধারণা সকল কবিতাই এক ধরনের কাব্বালা। সকল কবিই…
রাজু: সেই অর্থে?
জ্যাক: হ্যাঁ, সেই অর্থে । হ্যাঁ সেই …এবং আপনি যদি আপনার হৃদয়কে আপনার সঙ্গে কথা বলতে দেন তাহলে সেইভাবে আপনার নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে । কবিতাকে শুনতে হলে নিজেকে সেইভাবে উন্মুক্ত করতে হবে । অন্য কথায়, আমি বলতে চাইছি,…এটা হাইডেগারিয়ানও বটে । একে হাইডেগার এভাবে বলেছেন " কবিতা আমাদের সঙ্গে কথা বলে । আমরা কবিতার কথা শোনার আধার মাত্র । আমরা শুধু কাগজের ওপর তার বলা কথা লিপিবদ্ধ করি মাত্র ।" অন্য কথায়, কবিতা…এমন নয় যে আমরা কবিতা লিখি। আসলে কবিতাই আমাদের লেখে।
রাজু: ভাষা প্রসঙ্গে প্রায় একইরকম কথা বলেছে হাইডেগার।"আমাদের বিশ্বাস আমরা ভাষাকে নির্দেশ দেই কিন্তু না, বরং আমরাই ভাষা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হই"।
জ্যাক: একদম ঠিক কথা ।
রাজু: হ্যাঁ, কিন্তু ব্যাপারটা খুবই মজার । কাব্বালা নিয়ে বোর্হেসের লেখাকে আপনি কি ভাবে দেখেন? যেমন, তার দীর্ঘ বক্তৃতা এবং কিছু ছোট গল্প যাতে কাব্বালার ধারণা ব্যবহার করা হয়েছে।
জ্যাক: আচ্ছা, ব্যাপারটা এভাবে বলা যায় কারণ তার রাজনীতি নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে । সে তো আসলে ছিলো দক্ষিণপন্থী ।
রাজু: হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন । একজন প্রতিক্রিয়াশীল লেখক ।
জ্যাক: … এবং একদমই টি এস এলিয়টের মতো । পুরোপুরি দক্ষিণ-পন্থী।
রাজু: কিন্তু তার প্রতিক্রিয়াশীলতা কোথায় প্রকাশিত হতো,লেখালেখিতে,
রাজনীতি বিষয়ে তার মতামতে অথবা তার মন্তব্যে?
জ্যাক: রাজনীতি নিয়ে তার মতামতেই তা প্রকাশ পায়।
রাজু: একদম ঠিক বলেছেন ।
জ্যাক: এবং একজন লেখক হিসেবে তার কিছু চমৎকার লেখালেখালেখি আছে। কিন্তু তাকে নিয়ে আমি কিছুটা দ্বিধান্বিত। যেমন ঠিক পাউন্ডকে নিয়ে সবসময় আমার দ্বিধা আছে তার নোংরা সেমিটিজম বিরোধিতা এবং ফ্যাসিবাদ প্রীতির জন্য। সে তো খোলাখুলিভাবে ফ্যাসিবাদকে আলিঙ্গন করেছিলো। কিন্তু সবসময় মনে রাখবেন মুসোলিনি কি বলেছিলো, "আমরা যা তার জন্য ফ্যাসিবাদ সঠিক শব্দ নয়। সঠিক শব্দটি হল কর্পোরেশন" । মাই গুডনেস! আপনি যদি তখন না জেনে থাকেন, অবশ্যই আমরা তাহলে দীর্ঘকাল ধরে ফ্যাসিবাদী কর্পোরেট শাসনের অধীনে বসবাস করছি। দুই প্রজন্ম ধরে …দ্বিতীয় প্রজন্মের সময় শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে কর্পোরেট দুনিয়ার বিজয় আসলে ফ্যাসিবাদের বিজয় এবং অন্য অর্থে আমরা বাস করছি সেইরকম এক আধুনিক পৃথিবীতে।
বলতে চাই কম্যুনিস্টরা এর বিরুদ্ধেই লড়াই করছে । কম্যুনিস্টরা চায় রাস্তার উপর ঘুমায় যে গৃহহীন মানুষ তাদের যেন আর ওখানে ঘুমাতে না হয় । তারা যেন ঘুমানোর জন্য সঠিক একটা জায়গা পায়। কিন্তু ফ্যাসিবাদীরা এমনটা চায় না। তারা বলে, আরে সব জাহান্নমে যাক।
রাজু: হ্যাঁ অবশ্যই । রাজনৈতিকভাবে সচেতন কবি হিসেবে আপনি এই দীর্ঘমেয়াদী সমস্যাটাকে কিভাবে দেখেন …মানে ইসরায়েল ও প্যালেস্টাইন সমস্যা । আপনি কি মনে করেন যে ব্যাপারটার সমাধান খুব সহজেই করা সম্ভব? অথবা এটা এখনো কেন…
জ্যাক: এতোদিনে এ প্রসঙ্গে আমার অবস্থান সবারই জানা হয়ে গেছে । আমি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প কখনোই পছন্দ করি না; আমার মতো একজন, যার জন্ম ইহুদি পরিবারে তার জন্য এটাই স্বাভাবিক । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইওরোপের হলোকাস্টের কারণে অবশ্যই আমি তা পছন্দ করি না। পরিহাসের ব্যাপার এটাই যে, এখন ইজরায়েল কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বানিয়েছে এবং প্যালেস্টাইনিরা সেখানে থাকছে। গাজায় ওরা কনসেনেট্রশন ক্যাম্পে থাকছে।
রাজু: ছোট্ট একটা দেশ, কিন্তু বিশাল একটা কনসেনেট্রশন ক্যাম্প।
জ্যাক: হ্যাঁ । খুবই শ্লেষাত্মক ব্যাপার । কিন্তু কি জানেন, কবি হিসেবে আমি বর্তমানে হলোকাস্ট নিয়ে লেখা শ্রেষ্ঠতম কবিতাটি অনুবাদ করছি । এই কবির নাম হচ্ছে Itzhak Katzenelson.এবং কবিতার শিরোনাম হচ্ছে The Song of the Massacred Jewish People. এ কবিতায় কবি বলছে " যদি তুমি তুলে নাও বন্দুক হাতে তোমার, তুমিও হয়ে যাবে তাদেরি মতন, যারা করেছিলো নির্যাতন, তোমাদের "। এবং এখানে ঠিক সেটাই ঘটছে ।
রাজু: একদম সত্যি কথা।
জ্যাক: জাতীয়তাবাদের কারণেই …ইজরায়েল এমনটা করছে । সমস্যাটা ওখানেই । আমি জানি এটা বলা খুবই কঠিন। আমি এখানে আপনাকে একটু কাব্বালা-চিন্তা দিলাম। ইহুদিদের প্রতি…. এখন আমি ঈশ্বরের চাটুকারিতার দৃষ্টিকোণ থেকে বলছি । ঈশ্বর সবকিছুর বাইরে। সকল মানুষের চিন্তার ঊর্ধে। সরাসরি ঈশ্বরের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে যাওয়া সম্ভব নয় । মানুষের এমন কিছু নাই যা নিয়ে সে ঈশ্বরের মুখোমুখি সান্নিধ্যে যেতে পারে । কারণ ঈশ্বর সবকিছুর বাইরে । কিন্তু ঈশ্বর নিজেকে নারীর মধ্যে প্রত্যক্ষগোচর করে,Shekinah-র মাধ্যমে । The Shekinah-হচ্ছে ঈশ্বরের শাশ্বত প্রকাশ। তার প্রকাশ নারীর আকৃতিতে।
রাজু: নারী? বাহ খুবই অদ্ভুত কিন্তু।
জ্যাক: এবং এটাই হচ্ছে কাব্বালার চাবি ।
রাজু: ভারতীয় পুরাণে একই ধারণার পরিচয় আছে।
জ্যাক: ওহ,তাই নাকি?
রাজু: হ্যাঁ, পুরোপুরি ।
জ্যাক: হ্যাঁ । প্রাচীনকালের অনেক সমাজে নারীর কর্তৃত্ব ছিলো । এমনকি প্রাচীন আয়ারল্যান্ডেও মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ছিলো ।
রাজু: আমাদের ওখানেও প্রচীনকালে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ছিলো । হরপ্পা ও মহেঞ্জাদড়োর সভ্যতায়। তার পূর্বেও মা-ই ছিলো …মায়ের আধিপত্য ছিলো জোরদার।

(নতুন প্রশ্ন, সেপ্টেম্বর ২০২০)
রাজু: আচ্ছা, আপনার কিছু অসাধারণ কবিতা আছে যা শিল্পী, সঙ্গীতজ্ঞ, লেখক এবং কয়েকজন ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে লেখা। এই মানুষগুলো কাব্যিকভাবে রূপান্তরিত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা এবং শিশ্পকুশলতায়। যেমন, " Murder of Geordano Bruno", "Vladimir Mayakovsky," "On the Death of Willem de Kooning," "American Painter," "Jackson Pollock," " Ezra Dog," এবং "Bruno".এই কবিতাগুলোয় আপনার মহাকাব্যিক স্পর্শ আছে। একটা বৈশ্বিক কাব্যসত্য প্রয়োগ করে চরিত্রগুলোর বাইরের চেহারাকে আপনি তাদের অভ্যন্তরীণ চেহারা করে তুলেছেন। আপনার সমসাময়িক কবিরা কিন্তু এ রকমটা করতে পারেনি। এটা কি কমরেডদের নিয়ে আপনার সমষ্টিগত ধারণা যা আপনাকে তাড়িত করেছে কবিতার জন্য এই বিষয় বাছাই করতে? আমি বলতে চাচ্ছি যে,আপনি কি এভাবে একটা চরিত্রের মধ্যে অনেক হয়ে ওঠেন?

জ্যাক: এরা সবাই শিল্পী । তাই আমি Ezra Dog (pound) ছাড়া আর সবার সঙ্গেই একাত্মতা বোধকরি । ওর ফ্যাসিবাদী মনোভাবকে আমি সবসময় ঘৃণা করি । তার সেমিটিজম বিরোধিতা তো হিটলারীয় । কিন্তু মায়াকোভস্কি হচ্ছে বিশ শতকের প্রথম পথ-কবি এবং বিশ শতকের বিপ্লবকে সেই প্রথম গ্রহণ করে। এই জন্যই আমি যে তাকে নিয়ে শুধু কবিতা লিখেছি তা নয়,ভিক্টরের সঙ্গে মিলে তার Electrc Iron থেকে অনুবাদও করেছি।
রাজু: যখন একজন কবি সক্রিয় রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠে তখন সে কিন্তু বাজে লেখক হয়ে যাবার ঝুঁকিতে থাকে । অক্টাভিও পাজের একটা লেখা আপনার মনে আছে কিনা জানি না, যেখানে সে নেরুদার গুটিকয় রাজনৈতিক কবিতাকে 'খারাপ' কবিতা বলে মন্তব্য করেছে : "Su literature eats cotaminada por la politica, su politica, por la literature". কিন্তু স্পষ্টতই তার সকল কবিতা বিষয়ে এ কথা খাটে না । কিন্তু অদ্ভুতভাবে আপনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কবিতাগুলো ঐ রকম বিপদ থেকে অনেক দূরে । আজ পর্যন্ত আপনি আপনার রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করেননি । অথচ এই রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকেই নির্গত হয়েছে বিপুল পরিমাণে বিচিত্র সব কবিতা। পাঠক মুহূর্তেই আপনার কন্ঠস্বর চিনতে পারে।
জ্যাক: আমি পাজের বিচারের সঙ্গে একমত নই। তার আগ্রহ শুধুমাত্র " সাহিত্য "। যেহেতু কম্যুনিস্ট বিপ্লব জড়বিশ্বের প্রয়োজনকে সামনে রেখে মানবতাকে মুক্তি দিতে চেয়েছে, তখন বিশ ও একুশ শতকে এসে কবিতা ও সাহিত্য দুটি ভিন্ন বস্তুতে পরিণত হয়েছে । সাহিত্য হচ্ছে বুদ্ধিমন্ত কল্পনার আধার । সেই বিচারে আপনি আমাকে অতিমূল্যায়ন করে ফেলেছেন, প্রিয় রাজু । আমি ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত প্রতিদিন আমেরিকান ভাষায় দুইটা কবিতা লেখার পাশাপাশি দুইটা রাশান ভাষার কবিতা লিখেছি । এগুলো আমি পড়তাম ও অনুবাদ করতাম ভেসুভিও ও ক্যাফে ট্রিয়েস্টে এবং স্পেকস বারে। স্যানফ্রানসিসকো ও অন্যান্য জায়গাতেও এগুলো পড়েছি আমি । রাশান ও আমেরিকান ভাষায় লেখা এসব কবিতার অনেকগুলোই পাজ-এর মাপকাঠিতে "খরাপ" বলে চিহ্নিত হবে। অথচ সত্যি বলতে কি এসব কবিতা সেই সময়ের পরিধিতে বসবাসকারী শ্রোতাদের কাছে প্রচারণামূলক বলেই মূল্যবান মনে হয়েছে । সেই পুরো "দাসত্বের" কালে আমি রাশান ভাষায় লিখতাম সোভিয়েত ইউনিয়নকে "বাঁচাতে" । সেটা আমার জীবনের বশ্যতার সময়, যেমন ছিলো ভিয়েতনামে আমেরিকান যুদ্ধ । সেই সময়ে লেখা আমার কিছু নির্বাচিত কবিতা এবং অনুবাদ একুশ বাইশ সালে প্রকাশিত হবে । আমার এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে, সেই পরবশ্যতার কাল আমাকে সুযোগ দিয়েছিলো The Arcane সৃষ্টির।
রাজু: আপনার যে কবিতার শিরোনাম " Twin Towers Arcane" সেখানে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কিন্তু আমেরিকান চিন্তাধারা থেকে ভিন্নভাবে প্রকাশিত। আমার বিশ্বাস এটা সম্ভব হতো না যদি না আপনি ইতিহাস এবং রাজনীতির দিক থেকে সঠিক না হতেন।
জ্যাক: ধন্যবাদ রাজু । আপনি ঠিকই বলেছেন। আমি খুব সাধারণভাবে সেটাই প্রকাশ করেছি যা অনেক আমেরিকান তখনো ভাবতো, এখনো ভাবে। টুইন টাওয়ার ধ্বংসের সময় আমার কন্যা সেলিয়া নিউইয়র্কে টাওয়ারের কাছাকাছিই বাস করতো। সে কারণে এই Arcane-এর সঙ্গে আমার একটা অর্থবহ ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে।
রাজু: আপনি ১৯৬৫ সালে 'প্যারিস' , ১৯৬৮ সালে 'ইওরোপ', এবং ১৯৬৯ সালে 'লন্ডন' রচনা করেছেন । সত্যি বলতে কি তিনটা কবিতাই চমৎকার । কিন্তু 'লন্ডন' কবিতায় কিছু স্ববিরোধী অথচ ঐতিহাসিক সত্যতা আছে । "লন্ডনের মর্যাদা শায়িত গভীর অবমাননায় /স্বাধীনতা তার বাস করে অজটিল এক বিধ্বংসী সাহসে/ লন্ডনের পরাক্রম সঙ্গ দেয় সযত্ন লালিত স্ফুলিঙ্গের/লন্ডনের শক্তি নিহিত সীমিত সাম্রাজ্যে"।
("The dignity of London lies deep with humiliations contained/ The freedom of London resides in a simple blitzed courage/ The power of London lives with a carefully conserved flame/ The strength of London is the limitation of its Empire.)
আমি বিস্মিত । এই কবিতায় সত্যতা এবং কাব্যকৃতির মিথস্ক্রিয়া আমাকে বিস্ময়াবিভূত করে। কী আপনাকে এমন প্রভাময় একটা কবিতা লেখায় প্রলুব্ধ করে?
জ্যাক: আবারও আপনাকে ধন্যবাদ রাজু । আমি UCLA থেকে বহিষ্কৃত হই ভিয়েনামে আমেরিকান যুদ্ধের বিরুদ্ধে ছাত্রদের ক্ষেপিয়ে তোলার অপরাধে। এর এক কি দুই বছর পরে একটা কবিতা লিখেছিলাম আমার ভালোবাসার শহর থেকে আমার বিয়োগ হয়ে যাওয়া বর্ণনা করে। ক্যালিফোর্নিয়ার ভেনিসে বসে। কিন্তু এর তিন বছর পরে লস এঞ্জেলেস শহরে ১৯৬৭ সালে আমি যখন প্রথম Arcane লেখি সেখানে যে কন্ঠস্বর পাওয়া যায় তা লন্ডন শহরের।
রাজু: এই সাক্ষাৎকারের শুরুতে আমি আপনাকে বলেছিলাম যে, আপনার কবিতা আমি প্রথম পাঠ করি আমেরিকান পোয়েট্রি রিভিউ -এ। ওখানেই "The New Palestine Arcane " পড়ি। ওখানে আপনি বলেছেন ""50,000 Striking with placards " এ লেখা আছে STOP ISRAEIi APARTHEID/অসাধারণ শুদ্ধ চিন্তা/ জেরুজালেমকে পথ ছেড়ে দিতেই হবে/ মানবের তত্ত্বজ্ঞানের কাছে শেষাবধি । "
বর্তমানে অনেক আরব দেশ ইজরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক বিষয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে । প্যালেস্টাইনের ভাগ্য নিয়ে আপনার ভাবনা কী? আপনি একটা শব্দ সৃষ্টি করেছেন " jerusalism".এই শব্দ দিয়ে আপনি কি বোঝাতে চেয়েছেন?
জ্যাক: বেশ, এই শব্দ-খেলা আসলে একটা ভবিষ্যদ্বাণী । কারণ ফ্যাসিবাদী দুর্বৃত্ত ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইজরায়েলের "CAPITOL" বানিয়েছে । প্যালেস্টাইন ও তার অধিবাসীদের পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে জেরুজালেমের নবজন্ম দিয়েছে । খুবই বেদনাদায়ক একটা চিন্তা যে,ট্রাম্প মনে করছে এর ফলে অন্তত সত্তুর শতাংশ ইজরায়েলি এখন প্যালেস্টাইনের দখল থেকে নিজেদের মুক্ত করতে তাদের সংগ্রামে আরো তীব্রতা আনবে এবং নির্বোধ জাতীয়তাবাদের সমাপ্তিতে গড়ে তুলবে এমন এক কো-অপারেটিভ সোসাইটি যার নাম হবে Palisrael অথবা Israstine.
রাজু: আপনার গদ্য, বিশেষ করে প্রবন্ধগুলো কবিতার তুলনায় কমই আলোচনায় এসেছে । সংখ্যায় অনেক কম হলেও আপনার প্রবন্ধগুলো আমার খুবই প্রিয় । এগুলোর মধ্যে একটা আপনার সম্পাদিত Art On the Line বইটিতে আছে। Culture and Struggle নামক প্রবন্ধটিতে আছে চমৎকার গদ্যভঙ্গী। অথচ এতে আছে রাজনৈতিক মতবাদ বিষয়ে আপনার সুস্পষ্ট ও গভীর চিন্তা চেতনা । এক অর্থে এটি আপনার সাহিত্যিক ইস্তাহার । এখানে আপনি সাহিত্যের অনেক বিষয় খুব পরিষ্কার করে ব্যাখ্যা করেছেন । ইতিহাস এবং সমাজে একজন নিষ্ঠাবান কবির ভূমিকা নিয়ে আপনার বিশুদ্ধ বিশ্লেষণ আছে । আরো বেশি বেশি সাহিত্যিক প্রবন্ধ আপনি লেখেননি কেন?
জ্যাক: আমার আরো অনেক প্রবন্ধ আছে । তার কিছু আমি আপনাকে ভবিষ্যতে পাঠাবো।
রাজু: অনেক ধন্যবাদ প্রিয় জ্যাক । আমি আপনার একটা বাক্যের উদ্ধৃতি দেই যা অনুপ্রাসের দৌলতে একইসঙ্গে গীতিধর্মী এবং জলদমন্দ্র । যেমন " Can't sell soul, one big hole, feel like a mole".শুধু এটাই না, আপনার লেখায় শব্দ নিয়ে খেলা আছে। আছে এক শব্দ থেকে অন্য শব্দে অর্থ স্থানান্তরের খেলা । যেমন "Everything's being driven backwards to the wrong right, not to right to wrongs but deeper into acorporate state whose media-evil snares and traps are thick with decay, info-terrorism,more double-talk than hands could shake ten fingers at". এছাড়া আপনার ক্রোধ এবং ঘৃণাও একইরকম ভাষায় প্রকাশিত : " We know it is deep shit of it's own decay and has been rotting amid its desperate half-assed triumphs for more than two generations ". একটিমাত্র গদ্য রচনায় আপনার বহুমাত্রিক চরিত্রটি বিপুলভাবে প্রকাশিত হয়েছে । আপনি শুধুমাত্র একজন কবি নন, যে শুধুই কবিতা লেখে। বরং আপনি হচ্ছেন সেই শিল্পী যে গদ্য লিখলে সেখানে কবিতা এসে ভর করে । এসব আপনি করেন কিভাবে?
জ্যাক: সত্য কথা বলতে কি গদ্য আমি খুব একটা লেখি না । বিশেষ করে চুয়ান্ন বছর আগে শিক্ষকতা ছাড়ার পর থেকে । তখন ঐসব প্রবন্ধের বিষয় ছিলো "সাহিত্য"। আসলে ওগুলো আমার কবিতা । বিশেষ করে The Arcanes যা এখন তিন খন্ডে প্রকাশিত আমার দীর্ঘ কবিতার সংকলন । আর এখন আমি চতুর্থ বইটার কজ করছি যা শীঘ্রই প্রকাশিত হবে ।
রাজু: ট্রাম্পের সময়কালে আমেরিকায় সাম্প্রদায়িকতার এক নতুন পর্যায় চলে। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে বেশ কয়েকজন কালো-আমেরিকানকে হত্যা করা হয় । হত্যাকারীরা হচ্ছে " massively growing police-brutal state apparatuses"(Culture and Struggle ).আপনার কি মনে হয় যে আমেরিকা ও আমেরিকানরা আরো বেশি সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠছে?
জ্যাক: জো বাইডেন ও কামালা হ্যারিসের বিজয় ছিলো খুব সহজ । একানব্বই শতাংশ আফ্রিকান-আমেরিকান মহিলা ওদের ভোট দেয় । সবচেয়ে চাঙ্গা করার মতো বিষয় হচ্ছে যে,পনের, ষোলো, সতেরো বছরের কালো-আমেরিকান মেয়েরা যেভাবে সামনে তাকিয়ে আছে চব্বিশ সালের ইলেকশনে ভোটার হবার আশায় । হ্যাঁ, এটা আমাদের জানা আছে যে ট্রাম্পের মতো বাইডেনও কর্পোরেট জগতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত । তবে সবারই মুসোলিনির একটা কথা মনে রাখা দরকার যে, ফ্যাসিবাদী শব্দটা যথার্থ না। সঠিক শব্দটা হচ্ছে কর্পোরেটিজম । এবং আমারা সবাই কর্পোরেট সাম্রাজ্যে দুই প্রজন্মেরও বেশি সময় ধরে বসবাস করছি। কিন্তু বর্তমান ইলেকশনে কালো-আমেরিকানদের অবিশ্বাস্য ভোট প্রদানের পরে একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে যে হয়তোবা সোশালিজমের জন্য এবার শ্রেণী-সংগ্রাম শুরু হবে ।
রাজু: অন্য ভাষার কোন কবিদের আপনার পছন্দ?
জ্যাক: বিভিন্ন ভাষার অনেক সমসাময়িক কবি, যাদের অনেকেই এখনো জীবিত আবার অনেকে সম্প্রতি মারা গেছে, তাদের কবিতা আমি অনুবাদ করেছি। তবে আমি আমেরিকান কবির চেয়ে মহিলাদের কবিতা বেশি অনুবাদ করেছি। মহিলাদের মধ্যে: ক্যাথেরিন গগুও (Greek), এম্বার পাস্ট(Spanish), সারা কির্শ(German), আন্না লোম্বার্দো (Italian) নাতাশা বেলায়েভা(Russian) কার্লা বাদিইয়ো করোনাদো (Spanish) লুসিয়া লুচ্চেসিনো, তেওদোরা মাস্তোতোতারো (Italian). পুরুষের মধ্যে আমি সমসাময়িক চমৎকার সব ইতালীয় কবিদের অনুবাদ করেছি। যেমন পিয়ের পাওলো পাসোলিনি, ফেররুচ্চিও ব্রুগানারো,সান্দ্রো সার্দেল্লা, মার্কো সিঙ্গুই, আলবের্তো মাসালা, সান্দ্রো স্পিনাজ্জি, আান্দ্রেয়া সুক্কোলো -অনেকের মধ্যে কয়েকজনের নাম । ফরাসী কবিদের মধ্যে: ইসমায়েল আইত জাফির, রেনে দেপেস্ত্রে, স্তেফান মালার্মে আর হেইতিয়ান ভাষা থেকে: পল লারোক, দেনিস লাতুর, রাশান ভাষার: Alexei Kruchenykh আলেক্সি ক্রুচেঙ্ক, জার্মান ভাষার: পাউল সেলান, মার্টিন হাইডেগার, আলবেনিয়ান ভাষার: আজিম জাকোভা ইদলির আজিজাহ, স্প্যানিশ ভাষার: রোকে দাল্তন, পাবলো নেরুদা। ইদ্দিশ ভাষার: হার্শ গ্লিক, ইটসজাক কাটেনেলশন । সুইডিশ ভাষার: ক্লেটুস নেলসন ওয়াডিকে, জর্জিয়ান ভাষার: জোসেফ স্টালিন।
রাজু: আপনার আত্মজীবনী লেখার লোভ হয় না?
জ্যাক: The Arcane -ইতো আমার আত্মজীবনী ।
রাজু: আপনার সঙ্গে বিট কবি লরেন্স ফার্লিংগেট্টির বন্ধুত্বের বিষয়ে কি কিছু বলবেন দয়া করে । এই কবিও আপনার মতই একাধারে কবি, শিল্পী, সক্রিয় কর্মী ।


জ্যাক: প্রথম কথা হলো লরেন্স কখনোই বিট কবি না। সে হচ্ছে ওদের প্রকাশক। আমাদের মধ্যে একটা চুটকি আছে যে,আমাদের দুইজনের কেউই বিট কবি না–তবে বিট কবিদের দীর্ঘদিনের বন্ধু আমরা–কারণ আমাদের দুইজনেরই পিএইচ ডি ডিগ্রি আছে যা ওদের নাই। লরেন্সের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় ১৯৬০ সালে। সে যখন নিউ হ্যাম্পশায়ারের হানোভার এসেছিল একটা পাঠ উপলক্ষে। পাঠের অনুষ্ঠান ছিলো ডার্টমাউথ কলেজে যেখানে আমি শিক্ষকতা করছিলাম। বছর খানেক পরে আমি ক্যালিফোর্নিয়া চলে যাই। আমি থাকছি লস এঞ্জেলেসে আর লরেন্স তখন স্যানফ্রানসিসকোয় বসবাস করে। দুজনেই লেখালেখি করি আর বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে ফোনালাপ করে দিন কাটাই। এ সময় বছর দুয়েক পরে লরেন্স আমকে Artaud Anthology for City Lights Books সম্পাদনা করতে বলে ।
এর বছর কয়েক পরে সে আমার Lyripol এবং Front Lines প্রকাশ করে। আমি ২০০৬ সালে যখন রাজকবি হলাম তখন সে PL সিরিজে আমার All thats Left প্রকাশ করে। ওর বয়স এখন ১০০১ বছর । আমরা সবাই তার বহুপ্রজ সৃষ্টিশীল জীবনের শেষদিনগুলো মঙ্গলময় হোক এই কামনা করছি ।
রাজু: আপনি কি বলবেন আপনার সমসাময়িকদের মধ্যে কে আপনাকে সবচেয়ে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে?
জ্যাক: আপনি হয়তো জানেন যে, এখানে পৃথিবীর নানা দেশের কবিদের রচনা নিয়ে প্রতি বছর Revolutionary Poets Brigade থেকে একটা সংকলন প্রকাশিত হয় । এ বছরের শিরোনাম হচ্ছে Building Socialism Anthology. এতে যাদের লেখা আছে তাদের মধ্যে যারা আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে তারা হলো: Agneta Falk,ভারতীয় লেখক যে কিনা চারটি ভাষায় লেখে: Amirthanayagam, John Curl, DorothyPayne, Sarah Menefee,Scott Bird, Mauro Fotissimo, Gregory Pond, Devorah Major, Amber Tamblym, Lisbit Bailey, Bruce Isaacson, Diego De Leo, Karen Melander Magoon –এরা সকলেই আমেরিকান বা ইংরেজিতে লেখে। এরপরে ফরাসি ভাষায় লেখে: Frances Combes, পর্তুগিজ ভাষায় লেখে: Luis Felipe Sarmeto, ইতালীয় ভাষায় লেখে: Alessandra Bava, Marco Cinque, Antonella Laschi, Ludovica Lanini, Alberto Masala. স্প্যানিশ ভাষায় লেখে: Nancy Morejon, Fernando Rendon. চিনা ভাষায় লেখে: Jidi Majia, Xiao Xiao,AnnaKeiko.ফার্সি ভাষায় লেখে: Mahnaz Badihian. আরবি ভাষায় লেখে: Sabah Jasim.রাশান ভাষায় লেখে: Vadim Terekhin.ক্যাটালান ভাষায় লেখে: Angelina Llongueras.
রাজু: বাংলাদেশের পাঠক যারা ইতোমধ্যে অনুবাদের মাধ্যমে আপনার কবিতার সঙ্গে পরিচিত তাদের উদ্দেশ্য আপননি কি কিছু বলবেন?
জ্যাক: এইটুকুই বলতে পারি যে, বাংলাদেশের ঐতিহ্য এবং কবিতাকে আমি অনেক সম্মান করি। এই ঐতিহ্য থেকেই স্নেহময় একজন রাজু আলাউদ্দিন উঠে এসেছে যে কিনা অ্যামেরিকায় আমার সম্পর্কিত যে-কোনা লেখাকেই অতিক্রম করে গেছে। আর এই ঘটনাটি পরিস্কারভাবে এটাই ইঙ্গিত করে যে রাজুর মধ্যে বাংলাদেশের জনগণের সাংস্কৃতিক সম্পদ বিদ্যমান।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক