লিহাই গোর্জ-এর রঙিন শরৎ
প্রায় এক ঘণ্টার এই বর্ণিল ও তথ্যবহুল যাত্রা শেষে ট্রেন যখন আবার জিম থর্পের স্টেশনে ফিরে এলো, তখনো আমার চোখে ভাসছে লাল-কমলা পাতার সেই দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য। ট্রেন থেকে নেমে আমরা আবারও হেঁটে ঘুরে দেখলাম ছোট্ট শহরের অলিগলি।
প্রকৃতির সবচেয়ে বর্ণিল আর জাদুকরী রূপটি দেখা যায় শরতের পাতা ঝরার মৌসুমে। শীতের আগমনী বার্তায় চারপাশের গাছপালা যখন সবুজ খোলস পাল্টে লাল, গাঢ় কমলা আর সোনালী রঙের চাদর গায়ে জড়ায়, তখন পেনসিলভানিয়ার ছোট্ট শহর জিম থর্প আক্ষরিক অর্থেই এক রূপকথার ক্যানভাসে পরিণত হয়।
পাহাড় আর নদীঘেরা এই ঐতিহাসিক শহরের পাতা রাঙানো সেই অগ্নিরঙা সৌন্দর্য উপভোগ করার চমৎকার পরিকল্পনাটি করেছিল আমার আমেরিকা প্রবাসী বন্ধু আনোয়ার শামীম। একসময় এই শামীমের সাথেই কাঁধে ক্যামেরা ঝুলিয়ে বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তে ছবির খোঁজে ছুটে বেড়িয়েছি। দীর্ঘ এত বছর পর ভিনদেশে পুরনো সেই ভ্রমণসঙ্গীর সাথে আবারও অচেনা পথে নামার রোমাঞ্চটা তাই একটু অন্যরকমই ছিল।
আমার প্রায় এক মাসের আমেরিকা ভ্রমণে শামীমের সাথে সময়টা কিছুতেই যেন মিলছিল না। দেখতে দেখতে কখন যে দিনগুলো ফুরিয়ে গেল। শুরুর দিকে আমাদের দারুণ একটা পরিকল্পনা ছিল নিউ হ্যাম্পশায়ারে গিয়ে শরতের পাতা রাঙানো রূপ দেখার। কিন্তু দুজনের সময় না মেলায় সেটি আর সম্ভব হলো না। তবে সত্যি বলতে, সময় বের করতে না পারার দোষটা আমারই ছিল। যাই হোক, দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো শামীম শেষ মুহূর্তে এক দিনের এই ট্রিপের প্ল্যান করল পেনসিলভানিয়ার জিম থর্পে। তবে জিম থর্পের রূপও নেহায়েত কম নয়; শরতের এই মৌসুমে পাহাড়ি এই শহরেও যেন প্রকৃতির রূপের আগুন ঝরে।
সেদিন খুব ভোরে শামীম আমাকে নিউইয়র্কের ওজন পার্ক থেকে পিক করল। ওর অ্যাকুরা এমডিএক্স-এ চেপে আমাদের যাত্রা শুরু হলো পেনসিলভ্যানিয়ার উদ্দেশে। শামীমের ড্রাইভিংয়ের হাত এককথায় অসাধারণ। গাড়িতে বসে পুরনো স্মৃতিগুলো বড্ড মনে পড়ছিল। বাংলাদেশে থাকতে শামীম একটি বিদেশি বিমান সংস্থায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিল। সাধারণত ওর ডিউটি থাকতো রাতেই বেশি। সারারাত হাড়ভাঙা ডিউটি করার পরও ভোরবেলায় আমরা ওর গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম নতুন কোনো গন্তব্যে ছবির খোঁজে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটানা ড্রাইভিং করলেও ওর চোখেমুখে কখনোই কোনো ক্লান্তি দেখিনি। আজও যেন তার ব্যতিক্রম হলো না; স্টিয়ারিংয়ে ওর হাত আগের মতোই সাবলীল।
আমরা মূলত ইন্টারস্টেট ৮০ এবং এর সংযোগকারী পাহাড়ি হাইওয়ে ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। শরতের পাতা রাঙ্গানো মৌসুমে এই পথটির সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। নিউ জার্সির সীমানা পেরিয়ে ডেলাওয়্যার ওয়াটার গ্যাপ-এর বুক চিরে যখন গাড়ি ছুটছিল, মনে হচ্ছিল যেন কোনো নিপুণ শিল্পীর আঁকা ক্যানভাসের ভেতর দিয়ে ছুটে চলছি আমরা। রাস্তার দু'পাশের উঁচু পাহাড়গুলো তখন গাঢ় কমলা আর সোনালী পাতায় মোড়া। ভোরের মিষ্টি রোদ সেই রঙিন পাতায় পড়ে চারপাশের পরিবেশকে এক মায়াবী আবেশে মুড়ে দিয়েছিল।
জিম থর্প শহরে আমরা পৌঁছালাম সকাল দশটা নাগাদ। তবে ছোট্ট এই পাহাড়ি শহরে ঢোকার বেশ আগে থেকেই ট্রাফিকের কারণে গাড়ির গতি ধীর হয়ে গিয়েছিল। গাড়ির জানালা থেকে এক দৃষ্টিতে আমি দেখছিলাম পাহাড়ের গায়ে গায়ে রঙিন সৌন্দর্য। ছবিও তুলছিলাম সমানতালে।
শরতের প্রকৃতির এই রূপ দেখতে হাজারো পর্যটকের ভিড় জমে জিম থর্পে। ঐতিহাসিক রেলওয়ে স্টেশনের কাছাকাছি বেশ কয়েকটি পার্কিং লটে ঘুরেও আমরা গাড়ি রাখার জায়গা পেতে ব্যর্থ হলাম। অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে পার্কিং জুটল, তবে তা স্টেশন থেকে বেশ দূরে। শুরুতে হাঁটতে হবে ভেবে একটু অস্বস্তি লাগলেও পরে বুঝলাম, দূরে পার্কিং পাওয়াটা আসলে শাপে বর হয়েছে! গাড়ি রেখে হেঁটে স্টেশনে ফেরার পথে চমৎকার এই ভিক্টোরিয়ান শহরটিকে খুব কাছ থেকে দেখার ও উপভোগ করার সুযোগ হয়ে গেল।
পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠা জিম থর্প শহরের রাস্তায় হাঁটতেই এর ঐতিহাসিক গাম্ভীর্য মুগ্ধ করে। উনবিংশ শতাব্দীতে এই শহরের নাম ছিল 'মাউচ চাঙ্ক', নেটিভ আমেরিকান লেনেপ ভাষায় যার অর্থ 'ভল্লুক পাহাড়'। সেসময় এটি ছিল আমেরিকার কয়লা উত্তোলনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালে কিংবদন্তি নেটিভ আমেরিকান অলিম্পিক অ্যাথলেট জিম থর্পের প্রতি সম্মান জানিয়ে শহরটির নতুন নামকরণ করা হয়। একসময় যে পথ দিয়ে টন টন অ্যানথ্রাসাইট কয়লা ফিলাডেলফিয়াসহ বিভিন্ন বড় শহরে যেত, আজ সেই পথেই আমরা হাঁটছি স্মৃতির সন্ধানে।
শরতের এই পাতা রাঙানো সময়ে জিম থর্পে পর্যটকদের এমন ঢল নামে যে, ট্রেন রাইডের টিকিট পাওয়া রীতিমতো সোনার হরিণ। তবে শামীম আগেভাগেই অনলাইনে টিকিট কেটে রেখেছিল বলে আমাদের আর কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না। হেঁটে লিহাই গোর্জ সিনিক রেল স্টেশনে পৌঁছাতেই এর নস্টালজিক রূপটি আমাদের মুগ্ধ করল। স্টেশনটি যেন এক টুকরো ইতিহাস বুকে নিয়ে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে। পুরোনো ধাঁচের ছিমছাম স্থাপত্য, চারপাশের পাহাড়ি আবহ এবং স্টেশনে অপেক্ষমাণ রিডিং অ্যান্ড নর্দার্ন রেলরোডের শতবর্ষী পুরোনো লাল-হলুদ ভিনটেজ কোচগুলো মিলে এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেন আমরা সময় পরিভ্রমণ করে ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে পড়েছি।
লিহাই গোর্জ স্টেশনে কাকতালীয়ভাবে দেখা হয়ে গেল নাহিদ ও তার পতির সঙ্গে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার স্ত্রীর ডিপার্টমেন্টের জুনিয়র নাহিদ। ওর স্বামী মঞ্জুরুল কাদের ভাইর সঙ্গে সেই সূত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটমণ্ডলের সামনে মাঝে মাঝে দেখা হতো। বহুবছর পরে আবার এই দূরদেশের ছোট্ট শহরে দেখা হলো তাদের সঙ্গে।
কন্ডাক্টরের চিরাচরিত ‘অল অ্যাবোর্ড!’ ডাক আর ট্রেনের লম্বা হুইসেলে আমাদের লিহাই গোর্জ সিনিক রেলওয়ের যাত্রা শুরু হলো। ট্রেনের ভেতর কতো দেশের কত মানুষ! সবার মাঝেই এক অদ্ভুত প্রাণচাঞ্চল্য আর নতুন কিছু দেখার উত্তেজনা। নানা ভাষা আর সংস্কৃতির মানুষের কোলাহলে ভিনটেজ কোচটি যেন এক টুকরো বিশ্ব হয়ে উঠেছিল। ধীরে ধীরে ট্রেনটি ঐতিহাসিক স্টেশন ছেড়ে লিহাই গোর্জ স্টেট পার্কের গহীন অরণ্যের দিকে এগোতে লাগল।
আমাদের ট্রেনটি চলছিল ঠিক খরস্রোতা লিহাই নদীর গা ঘেঁষে। জানালার কাঁচ নামিয়ে দিতেই হু হু করে ভেতরে ঢুকে পড়ল শরতের শীতল বাতাস। চারপাশের বনভূমির ওক, ম্যাপল আর হিকরি গাছের পাতাগুলো তাদের তীব্র লাল আর গাঢ় হলুদ রঙে পুরো গিরিখাতকে এক অদ্ভুত সুন্দর রূপ দিয়েছে। নদীর নীল জলের সাথে পাহাড়ের গায়ে থাকা এই রঙিন পাতার বৈপরীত্য চোখ জুড়িয়ে দেয়।
ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই চোখে পড়ল নদীর সমান্তরালে বয়ে চলা একটি চমৎকার সাইক্লিং ট্রেইল। রঙিন পাতার ছাউনির নিচ দিয়ে বেশ কয়েকজন সাইক্লিস্ট তীব্র বেগে প্যাডেল চালিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। ট্রেনের হুইসেলের শব্দের সাথে পাল্লা দিয়ে তাদের সেই ছুটে চলা আর মাঝে মাঝে হাসিমুখে ট্রেনের যাত্রীদের দিকে হাত নেড়ে অভিবাদন জানানোর দৃশ্যটি ছিল ভারি চমৎকার। প্রকৃতির এই অগ্নিরঙা ক্যানভাসের মাঝে মানুষের এই প্রাণোচ্ছল উপস্থিতি পরিবেশটাকে আরও জীবন্ত করে তুলেছিল।
ট্রেনের স্পিকারে ভেসে আসছিল এই গিরিখাতের ফেলে আসা দিনের নানান গল্প। উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে এই লিহাই গোর্জ ছিল কাঠুরে আর কয়লা খনি শ্রমিকদের কর্মচাঞ্চল্যে ভরপুর। নদীর স্রোতকে কাজে লাগিয়ে তৈরি হয়েছিল বিখ্যাত 'লিহাই ক্যানাল', যার মাধ্যমে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো কাঠ আর কয়লা। জানালার বাইরে উঁকি দিলেই নদীর তীরে এখনো চোখে পড়ে সেই পুরনো খালের ধ্বংসাবশেষ এবং পাথরের তৈরি পুরনো দেয়ালের চিহ্ন। প্রকৃতির এই বর্ণিল সাজের মাঝেই যেন উঁকি দিচ্ছিল এককালে এই গিরিখাতে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটা মানুষদের ঘামে ভেজা ইতিহাস।
প্রায় এক ঘণ্টার এই বর্ণিল ও তথ্যবহুল যাত্রা শেষে ট্রেন যখন আবার জিম থর্পের স্টেশনে ফিরে এলো, তখনো আমার চোখে ভাসছে লাল-কমলা পাতার সেই দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য। ট্রেন থেকে নেমে আমরা আবারও হেঁটে ঘুরে দেখলাম ছোট্ট শহরের অলিগলি। ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যের পুরনো বাড়িগুলো, ছোট ছোট ক্যাফে আর স্যুভেনির শপগুলো মিলে এক অদ্ভুত মায়াময় পরিবেশ।
শহরটি দেখতে দেখতে কখন যে বিকেল গড়িয়ে গেল টেরই পেলাম না। সন্ধ্যা নামার আগেই আমাদের ফেরার পালা শুরু হলো। পাহাড় আর জঙ্গলের বুক চিরে আমারা আবার যখন ফিরতি পথে ছুটলাম, মনের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি কাজ করছিল। তবে ট্রাফিক আর দীর্ঘ পথের কারণে নিউজার্সি পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমে এল। এরপর পরিচিত সেই হাইওয়ে ধরে যখন নিউইয়র্কে এসে পৌঁছালাম, তখন চারদিকে গভীর রাত।
(চলবে)
