Published : 25 Aug 2026, 12:31 AM
বোর্হেস, মানে হোর্হে লুইস বোর্হেসের প্রভাব স্প্যানিশ সাহিত্যে এতটাই আগ্রাসী ও সর্বাত্মক ছিল যে শুধু গল্পই নয়, এমনকি আধুনিক লাতিন আমেরিকান উপন্যাসও তার প্রভাব এড়িয়ে লেখা সম্ভব হয়নি।
এই প্রসঙ্গে আমাদের মনে পড়বে কার্লোস ফুয়েন্তেসের সেই উক্তি: “Without his prose, there would be no modern novel in south America today”. এমনকি যারা তার মতো লেখেননি, তাদের উপরও পড়েছিল বোর্হেসের ভূতুরে ছায়া। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যিনি লাতিন আমেরিকান পরবর্তী গল্প-লেখক ও ঔপন্যাসিকদের প্রভাবিত করলেন, যিনি ৭০/৮০ টির মতো গল্প লিখলেন, লিখলেন বেশ কিছু প্যারাবল বা রূপকগল্প, কিন্তু আশ্চর্য, তিনি একটি উপন্যাসও লিখলেন না। যদিও কাল্পনিক বহু উপন্যাসের তিনি জন্মদাতা, অবশ্যই তার গল্পে; যেমন স্মরণ করা যাক তার ‘দ্য এপ্রোচ টু আলমুতাসিম’, ‘পিয়ের মেনার্ড, অথর অব দ্য দন কিহোতে’, কিংবা ‘দ্য গার্ডেন অব ফর্কিং পাথস’-এর আখ্যানে কোন না কোন চরিত্রের হাতে রচিত উপন্যাসের কথা আমরা শুনতে পাই। এমনকি, ১৯৭১ সালে প্রকাশিত ‘দ্য কংগেস’ নামে তার যে দীর্ঘতম গল্পটি রয়েছে, সেটি লিখিত হওয়ার ১৬ বছর আগে দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি এটাকে উপন্যাস বলেই আখ্যায়িত করেছিলেন:
“আমি একটা উপন্যাসও লিখবো বলে আশা করছি, ওটার শিরোনাম ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে: “দ্য কংগ্রেস”। এটা হবে এক কাল্পনিক উপন্যাস, তবে ভূতের গল্প বা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি নয়, বরং এক মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস। আমি যখন ইতিমধ্যে এটার পরিকল্পনা করে এনেছি, তখন হারমান হেসের “Journey to the Orient”-এর প্রথম পৃষ্ঠায় এর অলিখিত প্রথম পৃষ্ঠাটি খুঁজে পেয়েছিলাম, যা, নিশ্চিতভাবেই, আমাকে এই প্রকল্পে লেগে থাকার ব্যাপারে বিরত রাখছে না। এক আদর্শ কংগ্রেসরূপী “দ্য কংগ্রেস ” শুরু হবে উপন্যাসে হিসেবে এবং এটি শেষ হবে রূপকথা হিসেবে।”
“Deseo igualmente escribir una novela de la que ya ha nacido por lo menos el titulo : “El Congreso”. Seria una novela fantastica, no de fantasmas ni una fantasia cientifica, sino psicologicamente. Cuando ya tenia planeado ese libro encontre su primer pagina no escrita en la primera pagina de “Viaje de Oriente”, de Herman Hesse, lo cual, por supuesto, no me hace desistir de mi proyecto. “El Congreso”—un Congreso ideal—comenzaria como una novela y terminaria como un cuento de hadas.” ( Textos Recobrados 1931-1955, Jorge Luis Borges, Emece Editores, 2001, P 371)
এই সাক্ষাতকারে পুরোপুরি স্পষ্ট যে তিনি একটি `উপন্যাস’ লিখতে চেয়েছিলেন। কখন? যখন কিনা গল্পকার হিসেবে তাঁর সেরা গল্পগুলো বেরিয়ে গেছে। কিন্তু স্ববিরোধী ব্যাপার এই যে ১৯৪১ সালে প্রকাশিত তাঁর Ficciones গল্পগ্রন্থের ভূমিকায় তিনি উপন্যাস শব্দটি উল্লেখ না করেই কেবল এর আয়তনকে( “To go on for five hundred pages developing an idea whose perfect oral exposition is possible in a few minutes!” –Ficciones, Grove Press, 1962, P 15) ইঙ্গিত করেই উপন্যাসের বিপক্ষে তাঁর শৈল্পিক অবস্থান তুলে ধরলেন। তবু শেষ পর্যন্ত এই বিরোধী অবস্থান এক পাশে সরিয়ে রেখে যদি তিনি কংগেস গল্পটি উপন্যাস রূপে লিখেও থাকেন, পরে তিনি সেটিকে নভেল থেকে নভেলায় সংক্ষিপ্ত করে এনেছিলেন বলে মনে করেন বোর্হেস-বিশেষজ্ঞ এডউইন উইলিয়ামসন:
“By the time of its publication in 1971, The Congress had been refined down to the dimensions of a novella (although it would be still the longest work of fiction Borges would ever produce).” ( Borges, Edwin Williamson, Viking, 2004, P 246)
পরিশীলিত (refined) রূপটা পাওয়ার আগের চেহারাটা অবশ্য এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি, ফলে সত্যি সত্যি জানার উপায় নেই, বোর্হেস আসলেই এটাকে উপন্যাস হিসেবে লিখে পরে সেটাকে কেটেছেটে দীর্ঘ গল্পের আকৃতি দিয়েছেন কিনা। তবে অনুমান করা অসম্ভব নয় যে তিনি যদি প্রথমে এটিকে উপন্যাসের ‘এলায়িত’ ও ‘শিথিল’ গড়নে প্রাথমিক খসড়া তৈরি করেও থাকেন, পরবর্তীকালে তিনি সেই গড়নকে সংকুচিত করে নিয়ে এসেছিলেন, কারণ বোর্হেসের সার্বিক শৈল্পিক স্বভাব উপন্যাসের একেবারেই বিপরীত। এই সূত্রে এটাও লক্ষণীয় যে এই দীর্ঘ গল্পটি প্রকাশের পর বোর্হেসকে কোনো সাক্ষাৎকার বা প্রবন্ধে এটিকে আর কখনোই নভেল বা নভেলা বলে দাবী করতে দেখা যায় না। তবে বোর্হেস একে নভেলা না বললেও একাধিক সাহিত্যসমালোচকের বিবেচনায় তা আসলে নভেলা( Borges, Edwin Williamson, P 19, 69) হিসেবেই উল্লেখিত হতে দেখি। জেইসন উইলসন তাঁর Jorge Luis Borges নামক জীবনীগ্রন্থে চমকে দেয়ার মতো এই তথ্যও জানাচ্ছেন যে ২০ বছর বয়সে বোর্হেস একটি উপন্যাস লিখেছিলেন যেটি কিনা মাইয়্যোর্কায় (“ Where Borges, pere, selfpublished his sole novel.”–p 42) প্রকাশিতও হয়েছিল। যদিও বোর্হেসের এই উপন্যাস লেখার চেষ্টা ও প্রকাশের তথ্য আমি অন্য কারো গ্রন্থে কখনো উল্লেখিত হতে দেখিনি। তাঁর যৌবনের শুরুর দিককার অনেক লেখা এবং অস্বীকৃত গ্রন্থ –যেমন Inquisiciones –তাঁর মৃত্যুর পর পুনরায় প্রকাশিত হলেও, স্প্যানিশ ভাষায় প্রকাশিত তাঁর রচনাবলী কিংবা অগ্রন্থিত রচনার কোন খণ্ডেই এই উপন্যাসটি খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে এটা খুবই সম্ভব যে তিনি লিখেছিলেন এবং সম্ভবত, এটিকেও তার অন্য দুটি পাণ্ডুলিপিসহ ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। অতএব, বোর্হেসের ঔপন্যাসিক পরিচয় এখনও পর্যন্ত অনিশ্চিত ও প্রমাণাতীত। একই লেখকের সূত্রে এও জানা যাচ্ছে যে বোর্হেস তার গুরু মাসেদোনিয় ফের্নান্দেসের সঙ্গে যৌথভাবে একটি উপন্যাস লেখার পরিকল্পনা করেছিলেন ( Jorge Luis Borges, Jason Wilson, Reaktion Books,2006, P 60), যার শিরোনামও ঠিক হয়েছিল –El hombre que sera president (যে-লোকটি রাষ্ট্রপতি হবেন)। যদিও সেই উপন্যাস শেষ পর্যন্ত লেখা হয়নি। আর লেখা হলেও, আমার ধারণা গুরু মাসেদোনিয়র অন্য দুটি উপন্যাসের মতোই এটিও প্রতি-উপন্যাসই হয়ে উঠতো। আমি কেন এমনটা অনুমান করছি তার যৌক্তিকতা এই লেখাটির শেষের দিকে লক্ষ করা যাবে। যাইহোক, উপন্যাস রচনায় তিনি আর এগিয়ে না গেলেও, উপন্যাসের প্রতি তার আগ্রহ কিন্তু নিভে যায়নি। আরও পরিণত বয়সে আমরা লক্ষ্য করবো, একটু আড়পথে, উপন্যাসের সাথে তিনি বিভিন্ন সময়ে মোলাকাত করেছেন অনুবাদের মাধ্যমে: আঁদ্রে জীদ, ফকনার, কাফকা, ভার্জিনিয়া উল্ফ-এর উপন্যাস নামে বেনামে (মূলত তার মায়ের নামে) মূল থেকে স্প্যানিশে ছড়িয়ে দিয়েছেন। এসব তিনি প্রকাশক বা অন্যের তাগিদে কিংবা অর্থের প্রয়োজনে অনুবাদ শুরু করলেও পরে কাজগুলো তিনি এতটাই পছন্দ করেছেন যে মনে হয়েছিল তিনি ‘ঠিক’ কাজটিই করছেন। “I was asked to do it, and I needed the money. As I went on, I felt I was doing right, and I did my best to do full justice to Faulkner.” (Jorge Luis Borges: Conversations, Ed:Richard Burgin, University press of Mississipi, 1998, P 131) অর্থাৎ, অন্যের তাগিদে করলেও সেখানে ‘সঠিক’(right) কাজটি করার অনুভূতি জড়িয়ে ছিল ঠিকই। আবার অনুবাদ করেননি, কিন্তু সের্বান্তেস, আদোল্ফো বিয়ই কাসারেস, উইলকি কলিন্স, হেনরি জেমস, কাফকা, মেলভিল, আঁদ্রে জীদ, ভলতেয়ার, একা দে কিরোজ, দস্তয়েভস্কি, যোসেফ কনরাড, ফ্লবেয়ার, রুলফো, ডানিয়েল ডিফো, জোনাথন সুইফটসহ বহু লেখকের উপন্যাসের স্প্যানিশ কোনো বিশেষ সংস্করণে ভূমিকা লিখেছেন। আর এসব ভূমিকা লেখা ছাড়াও, তার যৌবনে বুয়েনোস আইরেসের দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে অসংখ্য উপন্যাস ও ঔপন্যাসিক সম্পর্কে লিখেছেন নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ। আমাদের নিশ্চয়ই এও মনে পড়বে যে রুলফো কিংবা মার্কেসের উপন্যাসের তিনি প্রশংসাও করেছেন। জোসেফ কনরাডের Heart of Darknessকে তিনি “A very fine novel”(Conversations, p-159)বলে উল্লেখ করেছেন। এইসব উদাহরণ যে উপন্যাসের প্রতি তার বীতরাগের প্রকাশ নয়, তা সহজেই অনুমেয়। তিনি ছিলেন এমন এক লেখক যিনি রুচি ও আস্থার বিরুদ্ধে গিয়ে কিছুই করেননি প্রায়। ফলে পক্ষপাত না থাকলেও, বীতরাগ নিশ্চয়ই ছিল না। এবং বোর্হেস সম্পর্কে ওয়াকিবহাল মাত্রই জানেন তিনি ছিলেন গোয়েন্দা উপন্যাসের এলাহি ভক্ত। তার প্রিয়দের মধ্যে ছিলেন আগাথা ক্রিস্টি, এলারি কুইন, ড্যাসেল হ্যামেট। গোয়েন্দা উপন্যাস তার এতটাই প্রিয় ছিল যে এরই অনুকরণে তিনি ‘মৃত্যু ও কম্পাস’ নামক এক দুর্দান্ত গল্পও লিখেছিলেন। আর তার চেয়ে বয়োকনিষ্ঠ লেখক আদোল্ফো বিয়ই কাসারেসের সাথে তো তিনি যৌথভাবে বেনামে ( H. Bustos Domecq, B. Suarez Lynch ছদ্মনামে) লিখলেন একাধিক উপন্যাস। কিন্তু তবু, জীবনে তিনি একটি উপন্যাসও স্বনামে লেখেননি। যদিও তার বাবা El Caudillo শিরোনামে একটি উপন্যাস লিখেছিলেন। কিন্তু তিনি কখনো উপন্যাস লেখেননি। এবং লেখেন নি বলে এ নিয়ে তার কোনো অনুতাপ বা আফসোসও ছিল না। তবে টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের হেফাজতে থাকা মৃত্যুর পর বোর্হেসের অপ্রকাশিত ও অসমাপ্ত পান্ডুলিপি ও নথিপত্র ঘেটে হুলিও ওর্তেগা বোর্হেসের লেখা পাঁচটি পৃষ্ঠা পেয়েছিলেন যেখানে The Rivero Family বলে একটি ঐতিহাসিক উপন্যাসের প্রাথমিক খসড়া লক্ষ্য করেন। ওর্তেগার ধারণা উপন্যাসটি কিছু দূর এগিয়ে বোর্হেসের কাছে যখন মনে হল এটি উপন্যাস হয়ে উঠছে তখন তিনি ওটা ওখানেই থামিয়ে দেন। La Tercera নামক এক জার্নালে রবের্তো কারেয়াগার সাথে ওর্তেগা এই অসমাপ্ত উপন্যাস সম্পর্কে পরে বলেছিলেন যে “My hypothesis is that when he realized that he had to continue writing, he saw, with horror, that he was about to write a novel… And he abandoned the story, surely with a sense of relief,” (https://www.faena.com/aleph/borges-and-the-art-of-not-writing-a-novel)
ওর্তেগা যা বলছেন তা হয়তো নিছকই অনুমান। বোর্হেসের ওই সময়ের অনুভূতি পুরোপুরি বুঝে ওঠা, কিংবা অনুমান করা বেশ দুরূহ, তবে এই অনুমান ভিত্তিহীন নয়। কিন্তু তবু বোর্হেসের মনোজগতের কিছু ইঙ্গিত এই বক্তব্যের মধ্যে আছে যাকে সত্য বলে মেনে নেয়া যায় যদি বোর্হেসের লেখার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে আমাদের জানাশোনা থাকে।
১৯৬৬ সালে রিচার্ড স্টার্ন-এর সাথে এক সাক্ষাৎকারে বোর্হেস কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন :
I would never think of attempting a novel, because I know I would get sick and tired of it before I had written the first chapter. Then I know that I can’t attempt descriptions, and I think that psychological analysis is something I should avoid, because I can’t do it.(Jorge Luis Borges: Conversations, Edited by Richard Burgin, University Press of Mississipi, USA, 1998,p-6)
ওর্তেগা নিশ্চয়ই বোর্হেসের এসব কথা মনে রেখেই মন্তব্যগুলো করেছেন। আমরা দেখতে পাচ্ছি এক সময় উপন্যাস লিখতে গিয়েও বোর্হেস তা শেষ না করেই বা কিছু দূর এগিয়ে তা পরিত্যাগ করেন এবং ওর্তেগার ভাষায়, ‘নিশ্চিতভাবেই স্বস্তির এক বোধ থেকে’। কিন্তু ‘স্বস্তি’ কেন এবং কেনই বা ত্যাগ করলেন? এই প্রশ্ন দুটো আমাদেরকে খানিকটা উতলা করে তোলে; কারণ শুরুই যদি করলেন, কেন শেষ করলেন না।
কৌতুহলটা আমাদের জন্য আরও তীব্র হয়ে ওঠে এটা জানার কারণে যে তিনি উপন্যাস সম্পর্কে বেশ খানিকটা নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন। এমনও বলেছেন, “উপন্যাস এমন এক ধরনের সাহিত্যকর্ম, যা একসময় হারিয়ে যাবে।”(হোর্হে লুইস বোর্হেসের সাথে সাতটি আলাপ, ফের্নান্দো সররেন্তিনো, পাঞ্জেরী প্রকাশনী, ২০২১, পৃ: ১৬১) তার এই মন্তব্যের পর অর্ধশতক পেরিয়ে গেছে, উপন্যাস এখনও বহাল তবিয়তেই শুধু নয়, শানশওকতের সাথেই আছে। খুব শিগগিরই উপন্যাস তার জনপ্রিয়তা হারাবে বলেও মনে হয় না। কিন্তু তবু, এটা আমাদের আগ্রহকে তাতিয়ে তোলে যখন জানতে পারি যে একদিকে উপন্যাসের প্রতি তার এই বিরাগ, অন্যদিকে উপন্যাস লেখায় তার এক অসমাপ্ত প্রয়াস। ফের্নান্দো সররেন্তিনোর সাথে এক সাক্ষাৎকারে ১৯৭১ সালে তিনি এও বলেছিলেন যে “আমার মনে হয় যদি আমি কোনো উপন্যাস লিখতে শুরু করতাম আমার কাছে এটা অর্থহীন মনে হতো এবং আমি এর শেষটা ধরে রাখতে পারতাম না।”(হোর্হে লুইস বোর্হেসের সাথে সাতটি আলাপ, ফের্নান্দো সররেন্তিনো, পাঞ্জেরী প্রকাশনী, ২০২১, পৃ: ১৭১) বাস্তবে হলোও তাই, অন্তত হোসে অর্তেগার অনুসন্ধান ও ভাষ্য আমাদেরকে সেই সাক্ষ্যই দেয়।
তাহলে ওই না-পারার জন্যই কি তিনি উপন্যাস লেখা শুরু করেও, পরে তা পরিত্যাগ করলেন? আমরা সবাই জানি, গল্প ও উপন্যাসের কলাকৌশল সম্পর্কে তার ধারণা ছিল বিস্ময়কর রকমের স্বচ্ছ এবং পরিপূর্ণ। এ দুয়ের পার্থক্যও তিনি জানতেন। এই জানাশোনা সত্ত্বেও তিনি কেবল সফল গল্পই লিখলেন না, লিখলেন রীতিমতো গোটা বিশ্বসাহিত্যেই বাঁকবদল করার মতো অসংখ্য গল্প। সেই তিনি কি একটি উপন্যাসও লিখতে পারতেন না? আসলেই তিনি পারতেন না। এই না-পারা অক্ষমতাজনিত নয়, বরং মাত্রাতিরিক্তি সক্ষমতাপ্রসূত। অত্যধিক ক্ষমতাই তাকে অক্ষম করে রেখেছিল। শৈল্পিক দক্ষতার এমন এক শীর্ষে তিনি অবস্থান করছিলেন যে ওখান থেকে তিনি শিল্পের অন্যান্য মাধ্যমের তুলনায় উপন্যাসকে অপেক্ষাকৃত শিথিল মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছেন। উপন্যাসের এই ‘শিথিলতাই’ হয়তো তাকে দিয়েছে অন্য যে-কোনো শিল্পমাধ্যমের তুলনায় একটু বেশি জনগ্রাহিতা ও প্রিয়তা। বিশ্বব্যাপী গল্প নয়, কবিতা নয়, প্রবন্ধ নয়, সাহিত্যের জনপ্রিয় মাধ্যম তো এখনও পর্যন্ত উপন্যাসই। কিন্তু বোর্হেসের কেন এই বিরূপতা উপন্যাসের প্রতি? আমরা জানি, গল্পের জগতে ভাষা, শৈলী, শিল্পকুশলতা, সংযম, যথাযথতায় তিনি ছিলেন এক ওস্তাদ শিল্পী। অভিনব বিষয় উদ্ভাবনায় তার জুরি মেলা ভার। দর্শন ও ধর্মতত্ত্বকে সাহিত্যের উপাদানে রূপান্তরে তার অসামান্য ভূমিকার কথা, সর্বোপরি ‘বিস্ময়-উদ্রেককারী নন্দনতত্ত্বের’ নতুন বিন্যাসের(“El estilo Borgiano es uno de los milagros esteticos de siglo que termina.”—Medio siglos con Borges, Mario Vargas Llosa, P-72) কথা সবারই জানা। বোর্হেসের আগে কোনো ভাষাতেই এককভাবে কোনো লেখক একই সঙ্গে এতগুলো বিষয়কে পুনর্বিন্যাস্ত ও প্রভাবিত করেছেন কিনা জানি না। একইসঙ্গে যুক্তি ও আবেগ, গাণিতিক হিসেবের পাশেই খামখেয়োলিপনা–মানুষের পরস্পরবিরোধী এই প্রবৃত্তিগুলোকে নিখুঁত যৌক্তিক পরম্পরায় বেঁধে দিয়েছেন তিনি তার গল্পগুলোয়, যেখানে কোন কিছুর ঘাটতি যেমন নেই, তেমনি নেই বাড়তি কিছু। বার্গাস যোসা তার গদ্যের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলেছিলেন, “প্রতিটি শব্দের আলাদা স্বাদ নেয়া যায়। বোর্হেসের গদ্যের বৈপ্লবিক দিক হলো এতে শব্দ যত কল্পনাও তত, সংক্ষিপ্তকরণ এবং যথার্থ শব্দ প্রয়োগে তাঁর অনন্যতাই এর কারণ।” (প্রসঙ্গ বোর্হেস, সম্পা: রাজু আলাউদ্দিন, ঐতিহ্য, ২০১০, পৃ: ২৭)
শিল্পের এই অভাবনীয় ও অপূর্ব দক্ষতা যে-শিল্পীর অধীন, তার পক্ষে উপন্যাস লেখা কঠিন। এই ব্যাপারটা লাতিন আমেরিকার ঔপন্যাসিকরাই শুধু নন, মার্কিনি ও ইউরোপিয় ঔপন্যাসিকরাও পরিস্কারভাবে উপলব্ধি করেছিলেন বলেই উপন্যাসের প্রতি বোর্হেসের বিরূপতা সম্পর্কে ছিলেন নিশ্চুপ।
উপন্যাসের প্রতি তার বিরূপতার পেছনে ধারণাগত ইতিহাস এবং কলাকৌশলগত কারণগুলো একটু খতিয়ে দেখা যাক। ইংরেজ জীবনীকার ও সাহিত্য সমালোচক এডউইন উইলিয়ামসন তার সম্পাদিত Jorge Luis Borges গ্রন্থের ভূমিকায় প্রায় শুরুতেই আমাদেরকে জানাচ্ছেন যে “Borges challenged the supremacy of the novel in the hierarchy of modern literature:” ( The Cambridge Companion to Jorge Luis Borges, Edwin Williamson, Cambridge, 2014, P 1) ইউরোপিয় লেখক ভালেরির পর তিনিই একমাত্র লেখক যিনি উপন্যাস নামক সাহিত্যের এই জনপ্রিয় শাখাটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এই প্রশ্ন তোলার অনেক কারণ আছে। প্রধান দুটো কারণের একটি হচ্ছে ধারণাগত আর অন্যটি শৈল্পিক। যদিও এক অর্থে এই দুইয়েরই আছে অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক।
১.
প্রথমেই দেখা যাক ধারণাগত দিকগুলো। আর্হেন্তিনিয় ঔপন্যাসিক হুয়ান হোসে সায়েরের ভাষায়:
“উপন্যাসের প্রতি বোর্হেসের বিরূপতা এসেছে, এক অর্থে ভালেরির কাছ থেকে যিনি একইভাবে বিতৃষ্ণা দেখিয়েছেন এর প্রতি। অন্যজন হচ্ছেন বোর্হেসের গুরু আর্হেন্তিনিয় লেখক মাসেদোনীয় ফের্নান্দেস, যিনি দুটি উপন্যাস লিখেছিলেন: একটির নাম আদ্রিয়ানা বুয়েনোস আইরেস, এটির উপশিরোনাম হিসেবে জুড়ে দিয়েছেন ‘সব শেষ খারাপ উপন্যাস’। অন্যটির নাম শাশ্বত উপন্যাসের স্মৃতিশালা। এটির উপশিরোনাম হচ্ছে ‘প্রথম ভালো উপন্যাস’। ‘সব শেষ খারাপ উপন্যাস’টি হলো মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস নিয়ে একটি প্যারোডি। ‘সাংস্কৃতিক কারখানা’ যাকে বলা বা অভিহিত করা হচ্ছে, সেখানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সব সাহিত্যে আজ কীভাবে এর চর্চা হচ্ছে, তা নিয়ে এক কৌতুকাবহ উপন্যাস। মাসেদোনীয় ফের্নান্দেসের ‘প্রথম ভালো উপন্যাস’ বা শাশ্বত উপন্যাসের স্মৃতিশালা মূলত একরাশ ভূমিকা; গোটা উপন্যাসটিই হচ্ছে প্রকাশিতব্য এক উপন্যাসের ভূমিকাসমূহের এক দীর্ঘ তালিকা, যে উপন্যাস আর কখনোই প্রকাশিত হয় না। উপন্যাস লেখা সম্পর্কে এ দুটি নেতিবাচক মনোভাবের উৎস ঐতিহাসিক, কিংবা এভাবে বলা যেতে পারে, উপন্যাস লেখার ব্যাপারে এ দুটি উদাহরণ সক্রিয় ছিল বোর্হেসের ব্যক্তিগত নেতিবাচক মনোভাবের পেছনে।” (প্রসঙ্গ বোর্হেস, সম্পাদনা: রাজু আলাউদ্দিন পৃ: ৯৫)
হুয়ান হোসে আরও একটি কারণকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন, আর সেটা হচ্ছে,“ উপন্যাসের বিরুদ্ধে বোর্হেসের রয়েছে তীব্র তত্ত্বগত পক্ষপাত। বলা যেতে পারে এ প্রত্যাখ্যান হচ্ছে তাৎক্ষণিক ও তুচ্ছ বাস্তববাদের এক সাধারণ প্রত্যাখ্যান; বাস্তবের বাস্তববাদী প্রতিনিধিত্বের প্রত্যাখ্যানের এক নমুনা।” (প্রসঙ্গ বোর্হেস, পৃ: ৯৬)
হুয়ান হোসের এই পর্যবেক্ষণের খুব কাছাকাছি কিন্তু আরও বেশি বিশদে ও বিস্তারে গিয়ে মারিও বার্গাস যোসা বিষয়টিকে অনেক বেশি প্রত্যক্ষ করে তোলেন উপমা ও উদাহরণের মাধ্যমে:
“সাধারণভাবে উপন্যাসের প্রতি তিনি ছিলেন বীতশ্রদ্ধ। বলা যায় এর বাস্তবমুখী প্রবণতা তাঁর কাছে অস্বস্তিকর মনে হতো কারণ হেনরি জেমস এবং আরো কয়েকজন বিখ্যাত ঔপন্যাসিক ছাড়া উপন্যাস এমন একটি সাহিত্যরীতি যা বিশুদ্ধভাবে কল্পনা এবং শৈল্পিকতাকে বাধা দেয় এবং তা তত্ত্ব এবং প্রবৃত্তি, ব্যক্তি ও সমাজ, বাস্তবতা এবং কল্পনা–মানব অভিজ্ঞতার এই মোট সমষ্টিতে দ্রবীভূত হয়ে নষ্ট হয়ে যায়। উপন্যাসের অন্তর্নিহিত ত্রুটি এবং মানব মূর্তির উপর এর নির্ভরতা বোর্হেসের কাছে অসহনীয় মনে হতো। তাই ১৯৪১ সালে দি গার্ডেন অব ফরকিং পাথস-এর ভূমিকায় তিনি লিখলেন ‘কয়েক মিনিটের পরিধিতে যে আখ্যানের বিবরণ দেয়া সম্ভব তাকে বিস্তৃত করে পাঁচশো পৃষ্ঠার সুদীর্ঘ গ্রন্থরচনার অভ্যাস শ্রমসাধ্য এবং ক্লন্তিকর অসংযম।’”(প্রসঙ্গ বোর্হেস, ঐতিহ্য প্রকাশনী, ২০১০,, পৃ: ২৯)
বোর্হেস নিজেও শিল্পমাধ্যম হিসেবে উপন্যাসের শিথিলতার কথা একাধিকবার বলেছেন। উপন্যাস না লেখা বা এর প্রতি পক্ষপাত না দেখাবার কারণ হিসেবে বলেছিলেন :
That’s why I don’t believe in the novel because I believe a novel is as hazy to the writer as to the reader. (Jorge Luis Borges: Conversations, Ed:Richard Burgin, University press of Mississipi, 1998, P 33)
বোর্হেস-বিশেষজ্ঞ জেন এইচ. বেল-ভিয়াদা উপন্যাসের প্রতি তার বিরাগের কারণ হিসেবে যা বলেছেন তা মূলত এর বাস্তবপ্রবণতা। অন্যদিকে, বোর্হেসের মূল ঝোঁকটাই হচ্ছে কল্পনার প্রতি। আর সেই কল্পনাকে তিনি এমন এক নিখুঁত দক্ষতায় বাস্তবায়িত করেন যে সেখানে নির্মাণকুশলতা এক চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। এটা করতে গিয়ে যা কিছু আতিশয্য বলে মনে হয় তাকে বর্জন করতে হয় নান্দনিক সৌকর্যের খাতিরে। অথচ উপন্যাসের বাস্তবানুগতা বোর্হেসের শৈল্পিক প্রবণতার অনেকটাই বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে। বেল-ভিয়াদার ভাষায়:
The realist novel of character analysis and individual psychology, a genre which Borges actively and notoriously dislikes for a number of reasons. For Borges the novel is formally hazy, the behavior of its characters irrational and false, and the attempt to represent reality a pernicious illusion which leads a Proust or a Tolstoy to overburden their works with irrelevant detail. The young Borges thought Dostoevski the greatest of all novelists but later found his books filled with exaggerated, unconvincing attitudes. He continued to esteem Don Quijote and Huckleberry Finn later in life, though thinking them both shapeless. (Gene H. Bell-Villada, Borges and His Fiction, The University of North Carolina Press, 1981, P 25)
উপন্যাস থেকে তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেও, কখনো কখনো ঔপন্যাসিক ও উপন্যাসের নাম তিনি নিয়েছেন তার গল্পে ও প্রবন্ধে। যেই দস্তয়েভস্কিকে আধা পৃষ্ঠার একটি নাতিদীর্ঘ রচনা ছাড়া তিনি কখনো কোনো প্রবন্ধ লেখেন নি, সেই দস্তয়েভস্কিকে এসে উপস্থিত হতে দেখি দুই বোর্হেসকে নিয়ে লেখা তার The Other গল্পে এবং সেটা বেশ তারিফের সঙ্গেই:
“দেখলাম হাতের মুঠোয় ধরা একটা বই। জিজ্ঞেস করলাম ওটা কী?
--দ্য পজেসড বা আমার মনে হচ্ছে, ফিওদর দস্তয়েভস্কির দ্য ডেভিলস—গরিমা ছাড়াই উত্তর দিলো।
এটার কথা আর খুব একটা মনে নেই। কেমন এটা?
তেমন ভালো নয়—বলার সঙ্গে সঙ্গেই মনে হলো প্রশ্নটা ধর্মানুভূতিতে আঘাতের মতো হয়ে গেল।
--রাশান গুরু—মতামত দিলো—স্লাভ আত্মার গোলকধাঁধার মাঝে ওর মতো আর কেউই প্রবেশ করতে পারেনি।”
এই প্রশংসা সত্ত্বেও রুশ উপন্যাসতো দূরের কথা, নিখুঁত শিল্পমাধ্যম হিসেবে উপন্যাসকেই তার কাছে অগ্রহণীয় বলে মনে হতো। এবং সেরকম মনে হওয়ার কারণও তিনি দেখিয়েছেন।
বোর্হেস বিশেষজ্ঞ বেয়াত্রিস সার্লো উপন্যাসের শৈল্পিক দুর্বলতা বা সীমাবদ্ধতাকে দায়ী করেছেন বোর্হেসের বিরাগের পেছনে। তার ভাষ্যমতে:
The length required by the rules of the genre was one of the causes of its weakness; the length of the novel, if compared to the short story, offered a formal limitation to its perfection. (Beatriz Sarlo, Jorge Luis Borges: A writer on the Edge, Verso, 1993,P 51)
অর্থাৎ, বোর্হেসের কাছে শৈল্পিক যথাযথতা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে উপন্যাসের মতো এই জনপ্রিয় শিল্পমাধ্যমটিকে তার স্বভাবজাত ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতার জন্য কোনভাবেই মেনে নিতে পারেননি। যদিও বহু ঔপন্যাসিকই ছিল তার প্রিয়। যেমন ধরা যাক, জেমস জয়েস, তাকে নিয়ে বোর্হেস একাধিকবার লিখেছেন, তার প্রশংসাও করেছেন কথাসাহিত্যে তার মুক্তিদাতার ভূমিকার জন্য। এমনকি জয়েসের ইউলিসিস-এর অংশবিশেষ স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদও করেছেন। কিন্তু তারপরও, জয়েসের উপন্যাসকে তিনি পুরোপুরি মেনে নিতে পারেননি ওই শৈল্পিক সীমাবদ্ধতার জন্য। এমনকি, এটাকে তিনি ব্যর্থ এক শিল্পকর্ম হিসেবেও অভিযোগ করতে দ্বিধা করেননি:
“But I think that Ulysses is a failure, really. Well, by the time it’s read through, you know thousands and thousands of circumstances about the characters, but you don’t know them.” ( Richard Burgin, Jorge Luis Borges: Conversations, University Press of Mississippi, 1998, P36)
মোটামুটি এই হচ্ছে উপন্যাস বিষয়ে তার বিরোধিতার তত্ত্বগত এবং শৈল্পিক দিক। কিন্তু তত্ত্ব কোনোভাবেই শৈল্পিক প্রকরণ ও কুশলতা থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। এই তত্ত্বেরও রয়েছে এক শৈল্পিক ভিত্তি, ওই ভিত্তির মেরুদন্ড ছাড়া তত্ত্বও কোনোভাবেই দাঁড়াতে পারে না। শৈল্পিক দিক থেকে বোর্হেসের পক্ষে উপন্যাসকে কেন সমর্থন করা সম্ভব হয়নি সেটা যদি আমরা খতিয়ে দেখতে চাই, তাহলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে তার গল্পগুলোর গড়ন ও কারিগরি দিকগুলোর প্রতি।
মার্কিন সাহিত্য সমালোচক ডেভিড গালাগা বোর্হেসের A Universal History of Infamy বইটির নন্দনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট, ভাষার চোখধাঁধানো ব্যবহার, ছেনি দিয়ে ছেঁদে তোলার মতো শব্দের আয়োজন লক্ষ্য করে বলেছিলেন, A Universal History of Infamy হচ্ছে:
“Eloquently [expressed] the contention that reality and its interpretation are afairs of the mind, that therefore there are as many realities as there are minds or interpretations, and that where several evaluations of a given event are possible, none can be said to be defective.” ( The Lesson of the Master, Norman Thomas di Giovanni, Continuum, 2003, p 112)
গালাগা-এর এই উদ্ধৃতির সাথে আপাতভাবে উপন্যাস প্রসঙ্গে আলোচনার হয়তো কোন যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যাবে না, কিন্তু বোর্হেসের উপন্যাসের প্রতি বিমুখতার একটা শৈল্পিক ও কারিগরি দিকের পরোক্ষ কারণগুলো এতে বুঝে ওঠা সম্ভব হবে। প্রথম কথাই হচ্ছে বাস্তবতা আর তার ব্যাখ্যা যদি মনেরই ব্যাপার স্যাপার হয় আর সেই কারণে বহু রকম মন ও ব্যাখ্যার সূত্রে যদি থাকে বহু রকমের বাস্তবতা, তাহলে নিশ্চিতভাবেই তার বিন্যাস ও বুননও প্রচলিত শিল্পকাঠামো থেকে ভিন্ন হতে বাধ্য। কারণ বাস্তবতা ও বস্তুর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিই শিল্পরীতি ও কাঠামোর নির্ধারক হয়ে ওঠে। মারিও বার্গাস যোসার ভাষায়, বোর্হেসের কাছে “এর বাস্তবমুখী প্রবণতা তাঁর কাছে অস্বস্তিকর মনে হতো”। মারিও বার্গাস যোসা তার অন্য আরেকটি লেখায়ও বোর্হেসের এই বিমুখতাকে উপন্যাস ও ছোটগল্পের মধ্যে একটা বড় পার্থক্য হিসেবে দায়ী করেছেন। আর এই পার্থক্য হচ্ছে জীবনের সামগ্রিকতা ও বাস্তবতাকে মূর্ত করার দায় থেকে।
“কারণ উপন্যাস হচ্ছে সমগ্রিক মানব-অভিজ্ঞতার, অবিচ্ছেদ্য জীবনের, অপূর্ণতার এক এলাকা। এটি বুদ্ধি এবং আবেগ, জ্ঞান এবং প্রবৃত্তি, সংবেদন এবং স্বজ্ঞা, অসম এবং বহুমুখী উপাদানকে একত্রিত করে যা এককভাবে ধারণাসমূহকে প্রকাশের জন্য যথেষ্ট নয়। এই কারণে, মহান ঔপন্যাসিকরা কখনই নিখুঁত গদ্য লেখক নন।”
Por que la novela es el terriotorio de la experiencia humnana totalizada, de la vida integral, de la imperfeccion. En ella se mezcla el intelecto y las pasiones, el conocimiento y el instinto, la sensacion y la intuicion, material desigual y poliedrica que las ideas, por si solas, no bastan para expresar. Por eso, los grandes novelistas no son nunca prosistas perfectos.(Mario Vargas Llosa, Medio Siglo con Borges, Alfaguara, 2020, P 73)
উপন্যাসকে যদি প্রধানত বাস্তবমুখী প্রবণতার উপরেই নির্ভর করতে হয়, তাহলে বোর্হেসের পক্ষে উপন্যাস লেখা সম্ভব নয়, যেহেতু বোর্হেসের প্রধান ঝোঁকটাই হচ্ছে কল্পনার প্রতি আর সেই কল্পনার বৃহত্তর অংশই হচ্ছে উদ্ভটত্বের এমন এক মননশীল পরিমণ্ডল যা নির্মাণের গাণিতিক শৃঙ্খলায় স্পন্দিত। শিল্পীর এই ধরনের মনের গড়নের একেবারেই বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে উপন্যাস। অধিকন্তু বোর্হেসের পরিমিতি আর শৈল্পিক সুক্ষ্ণতা উপন্যাসের বিরাট পরিসরে এবং এর স্বভাবসুলভ শৈথিল্যে গিয়ে অকার্যকর হয়ে পড়ে। সুতরাং বোর্হেস যদি অল্পবয়সে উপন্যাস লিখেও থাকেন, এবং চল্লিশের দশকে মাসেদোনিয় ফের্নান্দেসের সাথে যৌথভাবে উপন্যাস লেখার পরিকল্পনা করেও থাকেন, তিনি সচেতন মুহূর্তে ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন যে উপন্যাস তার দ্বারা লেখা সম্ভব নয়। আর হয়তো এ কারণেই উপন্যাস শুরু করলেও তিনি আর শেষ করতে চাননি নিজের প্রবণতার নান্দনিক গড়নটি বুঝতে পেরে।
নান্দনিকতা ও শিল্পকুশলতার দিকটি নিয়ে আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে ভাষার দিকটিও অনিবার্যভাবেই এসে যাবে এই কারণে যে প্রকরণ, বিষয় ও শিল্পকুশলতা--এসবই ভাষাশ্রয়ী। ভাষাভঙ্গির বিন্দুমাত্র পরিবর্তন না-ঘটিয়ে উপরোক্ত সবই করা সম্ভব। কিন্তু বোর্হেসের ক্ষেত্রে আমরা যা দেখতে পাই তা হলো ভাষার ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন ছাড়া তার প্রার্থিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব ছিল না। কারণ তিনি যে–ধরনের লেখক ছিলেন এবং তিনি যা লিখতে চেয়েছেন তা ভাষাকে আগের মতো অপরিবর্তিত রেখে, কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ফলে যুগপৎভাবেই তাকে ভাষার ব্যাপারেও উদ্বিগ্ন হতে হয়েছে।
তার বয়স যখন ২৮ বছর,তখনই ‘আর্হেন্তিনোদের ভাষা’ (Fl Idioma de los Argentinos) সম্পর্কে লিখে বহু কিছু স্পষ্ট করে নিতে হয়েছে। আরও পরে লেখক হিসেবে নিজের ভাষা নির্ধারণের জন্যে লড়াই করতে হয়েছে ভাষার ভিতরেই আরেকটি ভাষাভঙ্গি নির্মাণের লক্ষ্যে। কার্লোস ফুয়েন্তেস এই লড়াইটিকে আমাদের সামনে পরিস্কারভাবে তুলে ধরেছেন এভাবে:
“স্প্যানিশ ভাষার সবগুলো সংকটের (Lacks) সাথেই বোর্হেসকে লড়তে হয়… যে-কারোর ওষ্টাধর পুড়িয়ে দেবার মতো ঠান্ডা গদ্য এই প্রথম আমাদেরকে (লাতিন আমেরিকানদেরকে) গল্প শোনায়… আমাদেরকে বিচ্ছিন্ন খোপ থেকে বের করে এনে ছুঁড়ে মারে পৃথিবীতে। এটা এমন এক ভাষা, যা আমাদেরকে সম্পর্কিত করার মাধ্যমে হীন করে না, বরং আমাদেরকে নির্মাণ করে। বোর্হেসের গদ্যের চূড়ান্ত গুরুত্ব হচ্ছে–সোজা কথায় যেটি ছাড়া লাতিন আমেরিকার আধুনিক উপন্যাসের অস্তিত্বই থাকতো না–লাতিন আমেরিকা ভাষার সংকটের মধ্যে রয়েছে, অতএব একে নির্মাণ করতে হবে, মূলত এই সত্যের সঙ্গেই তা যুক্ত হয়ে আছে। এটা করতে গিয়ে বোর্হেস সাহিত্যের সবগুলো জনরাকে (genres) মিশিয়ে ফেলেন, উদ্ধার করেন সব ঐতিহ্য, সবগুলো বদখাসলতকে তিনি খুন করেন, তৈরি করেন কঠিন ও দরকারী এক নতুন বিন্যাস, যার উপর ভিত্তি করে নির্মিত হতে পারে পরিহাস, রসিকতা, লীলালাস্য… আর… লাতিন আমেরিকার এক নতুন ভাষা নির্মাণ করা যা নিখাঁদ বৈপরীত্যের মাধ্যমে প্রকাশ করবে মিথ্যা, সমর্পন, আর আমাদের মাঝে ঐতিহ্যগতভাবে ‘ভাষা’ হিসেবে যা গণ্য হয়েছিল তার অসারতাকে উন্মোচিত করা।” (Borges and his Fiction, Gene H. Bell-Villada, university of North Carolina Press, 1981, P 37)
ফুয়েন্তেসের এই কথাগুলোরই প্রতিধ্বনি আছে, একটু ভিন্ন ভঙ্গিতে, বোর্হেসের ভাষা ও শৈলী প্রসঙ্গে হুলিও কোর্তাসারের পর্যবেক্ষণে। কথাগুলো তিনি বারোক শৈলী সম্পর্কে বলতে গিয়ে বোর্হেসের বারোকবিরোধী বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে যা বলেন, সেটাও উপন্যাস না-লেখার পেছনে অনেক কারণের একটি:
“He has always been an enemy of the baroque; he tightened his writings, as if with pliers. Well, I write in a very different way than Borges, but the great lesson he taught me is one of economy. He taught me when I began to read him, being very young, that one had to try to say what one wanted to with economy, but with a beautiful economy.” ( Latin American writers at work, Edi: George Plimton, The Modern Library, 2003, P-120)
প্রচলিত ভাষাকে চিপড়ে ওর মধ্যে জমে থাকা গাদ ও বদভ্যাসের ময়লাগুলোকে বের করে নতুন ধরনের গল্প লেখার জন্য ভাষা তৈরি করলেন তিনি। বিদেশে যেমন জেমস জয়েস করেছেন, স্বভাষায় মনে পড়বে কমলকুমারের কথা। কিন্তু কমলকুমারে ভাষিক অস্বচ্ছতা, কখনো কখনো বাক্যরীতির অবোধ্যতায় ঘটে তার শৈল্পিক সমর্পন, অন্যদিকে, বোর্হেসের ক্ষেত্রে তা একদমই বিপরীত। ভাষাগত এই কারণ ছাড়াও, যেটি উপন্যাসের প্রতি বোর্হেসের বিরূপতাকে আরও বেশি উস্কে দিয়েছে তা হলো কলাকৌশলের ক্ষেত্রে বিস্ময়কর দক্ষতা। বোর্হেস-বিশেষজ্ঞ বেল-ভিয়াদা মনে করেন, “লাতিন আমেরিকায় গদ্যশৈলীর শৈল্পিক আদর্শ (Model artisan) হিসেবে বোর্হেসের ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে ইউরোপিয় ভাষার ফ্লবেয়ারের (যিনি একটি মাত্র পৃষ্ঠায় সপ্তার পর সপ্তাহ কাটিয়ে দিতেন) সাথে তুলনীয়।” (Borges and his Fiction, P 38)
সংযম, যথাযথতা, আবেগকে সঠিক জায়গায় পরিবেশন এবং পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে বাঙ্ময় করে তোলা–এসবই বোর্হেসের গল্পের কিছু বৈশিষ্ট্য। বেল-ভিয়াদার অনুসরণে এবার দেখা যাক উপন্যাসের বিপরীতে তিনি শৈল্পিক সংযম ও দক্ষতাকে কিভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন তার গল্পগুলোয়:
“বোর্হেসের গল্পগুলোকে প্রায়শই শীতল আর অনুভূতিহীন বলে মনে করা হয়। এখানে যা সক্রিয় তাহলো, বাচনিক সংযম, স্প্যানিশ সাহিত্যে যা বিরল। আসলে বোর্হেসের বেশির ভাগ গল্পগুলোতেই আবেগ, ছোটখাট শিহরণগুলো যথাযথ স্থানে গিয়ে প্রদর্শিত হয়ে কৌশলগত নির্দিষ্ট মুহূর্তে প্রবলভাবে নিষেধাত্মক বহিরঙ্গকে খান খান করে দেয়। যেমন, ‘মৃত্যু ও কম্পাস’ গল্পের শেষদিকে, লনরট মাত্রই আনন্দহীন এক সত্য আবিস্কার করে তার পদক্ষেপের অপেক্ষায় আছে, শিরশিরে ঠান্ডা অনুভব করলো সে। শীতল, আর নৈর্ব্যক্তিক প্রায় অনামা এক বিষাদ সে অনুভব করলো। ইতিমধ্যে রাত হয়ে গেছে; ধুসর বাগান থেকে একটা পাখির নিষ্ফল চিৎকার ভেসে এলো” (L. 86; F, 157) । এখানে বিষণ্নতা আছে, যদিও (আত্মগত মনোভাবের প্রতি বোর্হেসের বিরাগ অনুযায়ী) তাকে “নৈর্ব্যক্তিক”, “অনামা” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। উপরন্তু, লনরট নিশ্চয়ই পরাজয় ও বেদনা অনুভব করলেন। এই অনুভবকে বিমূর্ত সব আবেগী শব্দে দুর্বলভাবে বর্ণনা না করে বরং তা মূর্তিমান করা হয়েছে সুক্ষ্ণ, নির্মোহ ও বিরান দৃশ্যকল্পের মাধ্যমে, যেমন ধুলিধুসর বাগান, নিশাকাল, নিঃসঙ্গ পাখি।
একইভাবে ‘চক্রাকার ধ্বংস’ গল্পে, শেষ মুহূর্তে স্বাপ্নিক যখন বুঝতে পারে তাকেও কেউ স্বপ্ন দেখছে তখন বোর্হেসের প্রিয় শৈলীগত কৌশলের মাধ্যমে তা শেষ হয়–তীব্র আবেগঘন এক অবস্থা, নাছোড় যে-তিনটি শব্দে তিনি নৈপুণ্যের সাথে সারসংক্ষেপ তৈরি করেন তা হলো “স্বস্তির সাথে, অপমানের সাথে, ভয়ের সাথে সে বুঝতে পারলো যে সে-ও নিছকই এক ছায়ামূর্তি…”
বোর্হেস এখানে সরাসরি কিছু বিসদৃশ আবেগের একটা তালিকা করেন, কিন্তু সক্ষমতার (‘ভয়’ শব্দটি ‘স্বস্তির’ চেয়ে অনেক বেশি প্রখর অনুভূতিসম্পন্ন) ক্রমোচ্চ বিন্যাসে সাজানোর মাধ্যমে এগুলোকে আঁটোসাটো করে তোলেন, অধিকন্তু “সাথে” শব্দটির পুনরুক্তির মাধ্যমে তাদের অভিঘাতকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলেন।
অনুভূতির এই রকম বাড়াবাড়ি কেবল মাঝেমধ্যেই বোর্হেসের গল্পের আঁটসাট বাঁধনকে শিথিল করে দেয়। বিপরীতে, ঐতিহ্যবাহী স্প্যানিশ সাহিত্যে, এই বিষয়গুলো আরও বিস্তৃত আর পৌনপুনিক হয়ে ওঠে। বোর্হেস অভিঘাতকে বিলুপ্ত করেন না; মানবীয় আবেগকে তিনি ধরে রাখেন, তবে তা সংরক্ষিত রাখেন কেবল মাত্র আখ্যানের শিখরের জন্য। একে তিনি ঘষামাজা করেন, পরিশীলিত করেন, সম্পর্কিত করেন এবং পরিপ্রেক্ষিতের সাথে একে আকৃতি দান করেন। হুগো ও বালজাকের কাঠামোগত ও আবেগগত অপরিশীলিত বিষয়গুলোকে তীব্রভাবে কেটেছেটে ফ্লবেয়ার যেমনভাবে তার অভিব্যক্তির কৌশলে সাফল্য অর্জন করেছিলেন, বোর্হেসও একই পথ অনুসরণ করে স্পষ্ট এক বিকল্প তুলে ধরেন। যে বিকল্প ইস্পানো-আমেরিকায় আলংকারিক আতিশয্যের ঐতিহাসিক বোঝার বিরুদ্ধে এক বিকল্প আদর্শ (Counter-model.)।” (Borges and his Fiction, P 38-39)
উপরোক্ত এই দীর্ঘ উদ্ধৃতি পড়ে আমরা সহজেই বুঝতে পারছি গল্প রচনার ক্ষেত্রে বোর্হেস কেবল এর সবদিক সম্পর্কে অতিমাত্রায় সতর্কই ছিলেন না, সবকিছুকে তিনি প্রায় নিখুঁত করে তোলার ব্যাপারে ছিলেন অবিশ্বাস্য রকমের এক দক্ষ শিল্পী।
স্বয়ং পাস, অক্তাবিও পাসও বোর্হেসের এই দক্ষতার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছিলেন:
“তার গদ্যের ভারসাম্য আমাকে বিস্মিত করে: খুব মিতবাক যেমন নয়, আবার তা বাগাড়ম্বরও নয়; না নির্জীব, না এলোমেলো। এই গদ্যের গুণ ও সীমাবদ্ধতা হচ্ছে এই যে এ দিয়ে একটি গল্প লেখা যায়, কিন্তু উপন্যাস সম্ভব নয়;” (Borges y Mexico, Compilador: Miguel Capistran, Plaza Y janes, Mexico, 1999, P 316)
তার গদ্যের এই গুণ তারই সেই ‘এল আলেফ’ গল্পের আলেফের মতোই। “আলেফ হচ্ছে স্থানের সেই সব বিন্দুর একটি যেখানে অন্য সব বিন্দুর অবস্থান।” তার মানে, গল্পের ভাষ্য অনুযায়ী, খাবার ঘরের নিচে, সেলারে ওই আলেফের মধ্যে সবই আছে একটি মাত্র বিন্দুতে। এ যেন নখাগ্রে নিখিল।
এমনিতেই শিল্প-কাঠামো (Genre ) হিসেবে উপন্যাসের তুলনায় গল্প পরিসরের স্বল্পতার কারণেই মিতবাক, ইঙ্গিতময়, আর ঘনবদ্ধ। আর বোর্হেসের মতো শিল্পীর হাতে পড়লে তা কতদূর পৌঁছাতে পারে সে নমুনা আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি। সুতরাং উপন্যাসের ক্ষেত্রে শিল্পকৌশলের এই বোর্হেসীয় প্রয়োগ ঘটানো হলে উপন্যাসের পক্ষে বেশি দূর অগ্রসর হওয়া সম্ভব হতো না। কারণ উপন্যাসের আছে স্বভাবসুলভ বাচালতা আর কাঠামোগত এলায়িত রূপ।
দান্তের কম্মেদিয়া সম্পর্কে অভিভাষণের এক জায়গায় উপন্যাসের এই শৈথিল্যকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেছিলেন:
“A contemporary novel requires five or six hundred pages to make us know somebody, if it ever does. For Dante a single moment is enough.”( Seven nights, Jorge Luis Borges, New Direction Books, 1984,P 15)
এসবই হচ্ছে উপন্যাসের প্রতি বোর্হেসের বিরূপতার কারণ, না-লেখারও কারণ। তারপরও তিনি ঔপন্যাসিক, একটিও মাত্র উপন্যাস না লিখে(জ্যাসন-কথিত বোর্হেসের ২০ বয়সে রচিত বিলুপ্ত উপন্যাসটির কথা যদি গ্রাহ্য না করি)।
ঔপন্যাসিক বোর্হেস
কিন্তু এই না-লেখার মধ্যেই আছে অন্য এক বোর্হেস যিনি ঔপন্যাসিকের শৈল্পিক দায় পালন করেছেন গল্পকারের মুখোশে। কথাটা স্ববিরোধী শোনালেও এর সত্যতা আমরা খুঁজে পাবো তার গল্পগুলোয়।
তার The Congress গল্পটিকে দৈর্ঘ্যের কারণে উপন্যাস যদি না-ও বলা হয়, এটিকে নভেলা বলে অভিহিত করেছেন অনেকেই। সন্দেহ নেই যে উপন্যাসের বৈশিষ্ট্যের শর্তগুলো পূরণ করেছে বলেই সাহিত্যের সমালোচকরা এই নামে অভিহিত করেছেন। এই বৈশিষ্ট্য কেবল ‘দ্য কংগ্রেস’ গল্পেই নয়, অন্যান্য গল্পেও আছে—তা দৈর্ঘ্যের কারণে যতটা নয়, তার চেয়ে বরং স্বভাবের নির্যাসের কারণে। কিভাবে আছে, আমরা সেই দিকটি বুঝবার চেষ্টা করবো।
শিল্পী হিসেবে ফ্লবেয়ার উপন্যাসে যে-সাফল্য অর্জন করেছিলেন, ছোটগল্পে বোর্হেসের অর্জনও ঠিক সে-রকমই। অর্থাৎ দুজনই ভিন্ন দুই শিল্প-শাখায় উৎকর্ষের চূড়াকে ছুঁয়েছেন। উপন্যাসে ফ্লবেয়ারের ওই শৈল্পিক সাফল্যের কারণেই সম্ভবত বলা হয়ে থাকে: “উপন্যাসের শুরু সতেরো শতকের প্রথম দিকে, আর এর শেষ উনিশ শতকের শেষ দিকে। তার মানে উপন্যাসের শুরু দোন কিহোতে দিয়ে, আর শেষ হচ্ছে বুভার এ্যান্ড পিকুশেট-এর মাধ্যমে। এর আগে বা পরে কোনো উপন্যাস নেই।” (প্রসঙ্গ বোর্হেস, পৃ ৯৪)
‘বুভার এ্যান্ড পিকুশেট-এর মাধ্যমে’ যদি শেষ হয়ে থাকে, তার মানে ফ্লবেয়ার দিয়ে উপন্যাসের শেষ। বোর্হেস-বিশেষজ্ঞ ও পাঠকমাত্রই জানেন বোর্হেসের কোনো কোনো গল্পে রয়েছে মহাকাব্যের অভিঘাত, বা আরও পরিষ্কার করে বলা যেতে পারে, ওসব গল্পে তিনি, মহাকাব্যের ভিতকে ক্ষইয়ে দিয়েছেন, যেমনটা কার্লোস ফুয়েন্তেস একবার মারিয়ানো আসুয়েলার ঔপন্যাসিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, “তিনি হচ্ছেন সেই ঔপন্যাসিক যিনি সাধারণ ঐক্যকে ভেঙে মহাকাব্যকে দুমড়ে মুচড়ে বদলে দেয়ার উদ্দেশ্যে মহাকাব্যিক বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন।” (La Gran Novela Americalatina, Carlos Fuentes, Alfaguara, Mexico, 2011, P 118)। এ কথা বোর্হেসের কোনো কোনো গল্পের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। তার ‘এল আলেফ’ গল্পেই আমরা দেখবো ডিভাইন কমেডির এক সৃষ্টিশীল পুনর্বিন্যাস–খানিকটা কৌতুককর ভঙ্গিতেই–নায়িকা বেয়াত্রিচ বিতার্বো যেন দান্তের বেয়াত্রিস পোর্তিনারি হিসেবে উপস্থিত। আর ‘দক্ষিণ’ গল্প সম্পর্কে তো বোর্হেস তার বইয়ের ভূমিকায় নিজেই সরাসরি বলেছিলেন: “ of “The south”, which is perhaps my best story, let it suffice for me to suggest that it can be read as a direct narrative of novelistic events, and also in another way.”
(Ficciones, Jorge Luis Borges, Edi: Anthony Kerrigna, Grove Pross, 1962, P 105-106)
অর্থাৎ তার এই আখ্যানটিকে উপন্যাস হিসেবে পড়া যায়, চাইলে অন্যভাবেও পড়া যায়। বুঝাই যাচ্ছে, বোর্হেস নিজে সচেতনভাবেই এর মধ্যে উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য বপন করে রেখেছেন। কিন্তু প্রচলিত অর্থে ওই ধরনের উপন্যাস বলতে যা বুঝায়, তা নিশ্চয়ই নয়। কারণ, বিষয়টি আরেকটু পরিস্কারভাবে বোঝার জন্য আবারও ফুয়েন্তেসের কাছেই ফিরতে হবে:
“মহাকাব্যের ভিত ক্ষইয়ে দিয়েছে উপন্যাস, আর উপন্যাসের ভিত ক্ষইয়ে দিয়েছে ঘটনাপঞ্জি,” (Underdog, Mariano Azuela, University of Pittsburg Press, 1990, P 129)।
উদ্ধৃতির শেষ শব্দ ‘ঘটনাপঞ্জি’র পরিবর্তে ‘গল্প’ শব্দটি বসালেই স্প্যানিশ সাহিত্যে ‘মহাকাব্য’ থেকে ‘উপন্যাস’, আর ‘উপন্যাস’ থেকে ‘ঘটনাপঞ্জি’ এবং‘ ঘটনাপঞ্জি’ থেকে ‘গল্পে’ বিবর্তনের ধারাটি লক্ষ্য করলে আমরা বোর্হেসকে স্পষ্টভাবে তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য পেয়ে যাবো। তিনিও একইভাবে মহাকাব্য আর উপন্যাসকে ক্ষইয়ে দিয়েছেন তার গল্পসমূহে। তার দীর্ঘ গল্প ‘ট্লন, উকবার, অর্বিস তার্তিয়াস’, কিংবা ‘দি কংগ্রেস’, ‘ব্লু টাইগার’ কিংবা ‘শেক্সপিয়র মেমোরি’ আয়তনে যেমন দীর্ঘ গল্প, আর স্বভাবেও এগুলো উপন্যাসকে শোষণ করে নিয়েছে, কিংবা বলা ভালো উপন্যাসের ভিতকে ক্ষইয়ে নতুন রূপ দেবার চেষ্টা করেছে এই গল্পগুলোয়। ঠিক যেমনভাবে এ যুগে এসে মহাকাব্যের সারাৎসারকে আত্মসাৎ করে ডেরেক ওয়ালকট গড়ে তোলেন Omeros নামক মহাকাব্য।
এন্থনি ক্যারিগান বোর্হেসের Ficciones গ্রন্থের সম্পাদকীয় ভূমিকায় তো স্পষ্ট করেই বলেছেন যে “No Gargantuan Novel says more than he can in one of his Ficciones.” (P 10)
উপন্যাসের পোষাকি ও পৃথুলতানির্ভর ধারণার বাইরে গিয়ে বোর্হেস তার গল্পে উপন্যাসকে সংকুচিত করে এনেছিলেন অসামান্য দক্ষতায়। এ ছাড়া তিনি সম্ভবত জানতেন যে ফ্লবেয়ারের পরে আর কোনো উপন্যাস নেই, যা আছে তা আখ্যানমাত্র। তাই যদি হয়, তাহলে উপন্যাসকে হয় নতুন সজ্জায় হাজির করতে হবে নয়তো আখ্যানের মধ্যে উপন্যাসের বৈশিষ্টগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। বোর্হেস এ দুয়ের যে কোনো একটি করেছেন, কিংবা ভিন্ন উপায়ে এ দুটোই তিনি নিষ্পন্ন করেছেন তার সৃষ্টিশীল খামখেয়ালের মাধ্যমে। আর হয়তো এই কারণেই ঔপন্যাসিক হুয়ান হোসে সায়েরের কাছে মনে হয়েছে:
“সব উপন্যাসই হচ্ছে একটা আখ্যান, তবে সব আখ্যানই উপন্যাস নয়। উপন্যাস আখ্যানের ঐতিহাসিক কালানুক্রমের চেয়ে বেশি কিছু নয়, আর আখ্যান হচ্ছে মনোজাগতিক কর্মকান্ডের এক নমুনা। উপন্যাস হচ্ছে সাহিত্যের একটি শাখা। বুভার এন্ড পিকুশেট-এর পর থেকে আখ্যান সরে দাঁড়িয়েছে উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য থেকে। বিশ শতকের উপন্যাসগুলো যদি উপন্যাসের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন না হয়ে থাকে, আর বোর্হেস যদি উপন্যাস না লিখে থাকেন, তাহলে এর কারণ হচ্ছে, বোর্হেস মনে করেন, উপন্যাস না লেখার মধ্যেই নিহিত রয়েছে বিশ শতকের কোনো লেখকের ঔপন্যাসিক হওয়ার একমাত্র উপায়। বোর্হেসের সব রচনা এ ধারণাকেই তুলে ধরে।” (প্রসঙ্গ বোর্হেস, পৃ: ১০০)